রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা এবং তার প্রাধান্য ও প্রায়োগিকতা

  কাকন রেজা ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২০:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

‘চাকরি না পেয়ে কুড়িগ্রামে যুবকের আত্মহত্যা’, ‘শেয়ার বাজারে ক্ষতিগ্রস্তের এগারো তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা’ কিংবা ‘মেয়ের চিকিৎসার টাকা জোগাতে না পেরে মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা’, এমন সব খবর কি খুব বেশি আলোড়িত করে সমাজকে, মনে হয় না।

আমাকেও করে না। করলে, আমিও লিখতাম। শরিয়ত সরকার থেকে বেশি মানবিক ছিল এই খবরগুলো। আলোকিত রাজপথের চেয়ে, ঘুপচি গলির দৈর্ঘ্য বেশি এটা তারই অবহেলিত প্রমান। কথিত জিডিপি’র গড় হিসাবের শুভংকরের ফাঁকি, এটা তারই উদাহরণ।

পুঁজিবাজারে গত কয়েকবছরের মধ্যে এবার ধ্বস সবচেয়ে বেশি। হাজার হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছে এই বাজার থেকে। এই টাকা দেশে থাকলে তাও বাজারে ‘মানি ফ্লো’টা থাকতো। কিন্তু এর বেশির ভাগই পাচার হয়ে যাবে বা গেছে দেশের বাইরে। অর্থাৎ আমাদের টোটাল লস। এই দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ে না। পড়ে, রকেটে চড়া মাওলানা এবং তার বিপরীতে পরবাসী ইসলাম বিদ্বেষীর বাকোয়াজ।

যা অনেকটা পরস্পরের পিঠ চুলকানির মত। একজনের কথায় আরেকজন উত্তেজিত হন। বিতর্ক যাদের আলোচনায় থাকার মূলপুঁজি। আর সেই পূঁজি ভাঙিয়েই চলেন তারা। এরা একে অপরের সম্পূরক। এদিকে তাদের সম্পূরণের দায়ে হারিয়ে যায় আসল বিষয়। মানুষের বেঁচে থাকার আলাপ। পুঁজিবাজার থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাটের কথা! পুঁজি হারানো বিপর্যস্ত, বিপদগ্রস্ত মানুষগুলোর আত্মকাহন!

উল্টো দিকে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ এর মতন এই দুই ধারার ফায়দাগত বিরোধীতার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। যারা নিজ চিন্তায়, নিজের মতো করে ভালো থাকতে চায় তারা। সঙ্গে তারা, যারা নিজের চিন্তার কথা বলে। যে চিন্তার বয়ানে কারো প্রতি ঘৃণা থাকে না। কারো প্রতি অশ্রদ্ধা থাকে না। যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায়, কোনটা সহি, কোনটা ভুল। দেখিয়ে দেয়া পর্যন্তই তারা দায়িত্ব নেয়, পছন্দ করার দায়িত্ব পাঠক-শ্রোতা-দর্শকদের।

আমাদের মূল সমস্যাগুলি কী, এটা নির্ধারণ করা এমন সময়ে জরুরি। ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এমন দুটি অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, যা সামাজিক বিভক্তিকে ভয়াবহ করে তোলে, তার প্রকট রূপ আমাদের সমুখে দৃশ্যমান। ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক সুষমতা বর্তমান সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে প্রাধান্য পাবার বিষয়। আর এগুলোর প্রাধান্য নিশ্চিত করতে হলে দরকার বাক স্বাধীনতার। সমস্যার কথা জানাতে না পারলে সমাধান অসম্ভব। একজন ভিক্ষুকও তার ক্ষুধার জানান দেন খাবার চাওয়ার মাধ্যমে। ফলে গৃহকর্তা বুঝে নেন, বাইরে ক্ষুধার্ত কেউ।

আর নাগরিকরাতো রাষ্ট্র তৈরি করেই তাদের প্রয়োজন জানান দেয়ার জন্য। সেই প্রয়োজন জেনে রাষ্ট্র দেখবে নাগরিক স্বার্থ। রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছিলো এমন ভাবনা থেকেই। স্বাধীন ভূখন্ড, রাষ্ট্র গঠন, স্বাধীনতা এমন ধারণা থেকেই প্রসূত। এর ব্যত্যয় হলে রাষ্ট্র গঠনের সার্বিক চিন্তাই বিফলে যায়।

রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা বিফলে গেলে কী হয়? মানুষের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য গড়ে উঠে। ন্যায় বিচার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ মানবিক সমাজ ক্রমেই ‘ক্যানিবাল’ হয়ে উঠে। অর্থাৎমানুষ মানুষকে হত্যার চিন্তায় সহজ প্রকারান্তরে ‘নরভুক’ হয়ে উঠে। মুখ থেকে অতি সহজেই মানুষ হত্যার কথা উচ্চারিত হওয়া তারই লক্ষণ। আমাজনের সমাজে এমনটা হতো এক সময়। মানুষ হত্যা ছিলো অন্য প্রাণি হত্যার মতন সহজ কাজ। বুনো পশ্চিমের কথা বলি। যেখানে এক সময় জাস্টিস হয়ে উঠেছিলো মবের অধীন। মব যা জাস্টিস হিসাবে জানান দিতো, তাই হতো। মানুষকে ফাঁসি দেয়া বা গুলি করে হত্যা সহজ স্বাভাবিক ছিল সে সময়।

রাষ্ট্র বিফলে যাওয়ার চূড়ান্ত লক্ষণ হলো সামাজিক ঐক্য নষ্ট হওয়া। স্রেফ ভালো-মন্দের পার্থক্যে বিভিন্ন গৌণ প্রশ্নের উদ্ভব হওয়া। আর তাকে কেন্দ্র করেই চূড়ান্ত সংঘাতের দিকে যাওয়া। ইসলামি মাহফিলগুলিতে দেখা যায়, এক বক্তা আরেক বক্তার ফাঁসি চাচ্ছেন। পালাগানগুলোতে এক বয়াতি আরেক বয়াতিকে দেখে নিতে চাচ্ছেন। নিজ মতের মধ্যেই অসংখ্য মত সৃষ্টি করছেন। এতো গেলো ধর্ম আর সংস্কৃতির একটা অংশের কথা। সব অংশেই খোঁজ নিয়ে দেখেন, একই অবস্থা। রাজনীতিতে যাবেন, সামান্য মতভেদের কারণে শতধা বিভক্ত রাজনৈতিক চিন্তা। একে অপরের জানের দুশমন। যার ফলে মূল লক্ষ্য থেকে যায় অধরা।

শেষমেশ নিজেদের কথায় আসি। সাংবাদিকতার কথা বলি। মার্টিন নিম্যুলারের ‘দ্যায়ার ওয়াজ নো ওয়ান লেফ্ট টু স্পিক’ কথাটির আবহে শুরু করি। প্রথমে গেলো বিরোধীমতের জন, কথা বলিনি। কারণ মতের ভিন্নতা ছিলো। পরে গেলো নিজমতের অন্যজন। কথা বলিনি, ব্যবসায়িক বিভেদ ছিলো বলে। এরপর নিজেদেরই আরেকজন। তবুও নিশ্চুপ। কারণ ঈর্ষা, তার পরিচিতি ছিলো বেশি। এখনতো আমি ছাড়া আর কেউ নেই! মার্টিন নিম্যুলার মিথ্যা বলেননি যে, আপনার জন্যও বলার কেউ থাকবে না।

এই যে বিভেদ, এই বিভেদ রাষ্ট্র চিন্তার সঙ্গে যায় না। কল্যাণ রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্র অকার্যকর করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। একবার ভাবুন। বিভ্রান্তির বেড়াজাল, মোহের স্বপ্নজাল ছিড়ে বেরিয়ে আসুন, রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাটাকে ন্যায্য করে তুলুন, সফল করে তুলুন।

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত