ভোটের শতাংশ, ভোটারের আস্থা অনাস্থা এবং অন্যান্য

  কাকন রেজা ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৩১:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

কদিন আগেই যুগান্তর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিলো ‘ভোটের হিসাব মোটের হিসাব’ শিরোনামে আমার একটি লেখা। চট্টগ্রামে জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদলের শূন্য আসনের উপনির্বাচন নিয়ে ছিল লেখাটি। স্বভাবতই জিতেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

বাংলাদেশের নির্বাচনে এটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, শাসকদলের মার্কার অধিকারী হওয়া মানে প্রায়ক্ষেত্রেই প্রার্থিত চেয়ারের অধিকারী বনে যাওয়া যায়। কথা সেটা নয়। কথা ছিল সে নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার নিয়ে। যার পরিমাণ ছিল ২৩ শতাংশেরও কম।

সেই লেখাতে বলেছিলাম, বাংলাদেশে সবচেয়ে স্ট্যান্ডার্ড নির্বাচন ছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচন। যা হয়েছিলো শাহাবুদ্দিন সরকারের অধীনে। সে নির্বাচনে ভোটের হার বিএনপি আওয়ামী লীগের কমবেশি ছিল ২৫ শতাংশের ওপরে। এরপর যতগুলো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে তাতেও দুই দলের ভোট উঠানামা করেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। অথচ সেই উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে তেইশ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ এক দলের মোট ভোটের সমানও ভোট পড়েনি।

এখন আসি সদ্য ঘটে যাওয়া ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের চালচিত্রে। এই নির্বাচন নিয়ে মাসাধিকাল যাবত ভয়াবহ বাগাড়ম্বর, কারো কারো মতে রীতিমত উৎসবের এই নির্বাচন। কিন্তু শেষমেশে দাঁড়ালো কী, দক্ষিণে ভোট ২৯ শতাংশ, উত্তরের শতাংশ ২৫। বলিহারি যাই।

সম্ভবত নির্বাচনের আগের রাতেই এক টিভি শোতে একজন ইতিহাসবিদ কম্পমান আবেগে এবারের ভোট যে উৎসবের রূপ নিয়েছে তার বয়ান করলেন। এই কি সেই উৎসব! যে উৎসবের আতিশয্যে ভোট ঠেকেছে সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশে! ভোটকালীন যারা দিনভর গণমাধ্যমের সঙ্গে ছিলেন তারা জানেন, ভোটের মাঠে-ঘাটে-কেন্দ্রে আসলে কী হয়েছে।

এসব আর ঘটা করে বলার মতন কিছু নেই। তবে মজা পেয়েছি বিএনপির অভিযোগ শুনে এবং তাদের হরতাল আহ্বানের আস্ফালনে। তাদের কাছে উৎসুক প্রশ্ন, যারা সরকারে আছেন তাদের না হয় আপাতত পাবলিকের পালস না বুঝলেও চলে।

আপনাদের তো বুঝতে হবে। যেহেতু আপনারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। দাবী করেন, আপনারা দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। শাসকদলও অবশ্য একই দাবী করে। সে দাবী অনুযায়ী তাদের জনপ্রিয়তাও এখন তুঙ্গে। সম্প্রতি বিদেশি একটা জরিপও তাই বলেছে।

সে হিসাবে তাদের ভোট ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলা যায়। বিএনপি যেহেতু ঐক্যফ্রন্ট ও বিশদলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে চলছে তাদের ভোটও তো বাড়ার কথা। সে ক্ষেত্রে দু’দলের ভোট মিলিয়ে ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এমনটাই ধরে নেয়া যায়। সত্যিই গিয়েছি কি? যায়নি। ও, আরও রয়েছে জাতীয় পার্টি, ইসলামি আন্দোলনসহ অন্যান্য দলগুলোও। তাদের ভোট না হয় উল্লেখ নাই করলাম।

অতএব বিষয়টা দাঁড়ালো কী। হয় দলগুলো মানুষের চিন্তা বা ইচ্ছাটা অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছে। না হয় ভোটাররাই দলগুলোর উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে না। মোট কথা আমাদের দেশের রাজনীতি ফেইল করেছে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার চিন্তা ট্র্যাক করতে।

রাজনীতিকরা বুঝতে পারছেন না, কেন মানুষ ভোট দিতে আসছে না, কেন ভোটে আগ্রহ হারাচ্ছে। আর বুঝলেও মানুষকে ভোটের জন্য প্রয়োজন মনে করছেন না। এ দুটোর কোনটাও যদি সত্যি হয়, তাহলে এক কথায় বলতে হবে পরিস্থিতি ভয়াবহ। এমন রাজনীতিকরা একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়েছেন। অবস্থা এমন চলতে থাকলে ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’র মতন ক্রমে রাষ্ট্রও অকার্যকর হয়ে পড়বে।

এখন ভোট ও ভোটারদের কথায় আসি। ৫০ শতাংশের নিচের ভোট মানে নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই জনমনের আস্থা অর্জন করতে পারছে না। এই না পারার মূল কারণ একটিই, মানুষ নিশ্চিত হতে পারছে না, তাদের ভোটে কোন কিছুর পরিবর্তন ঘটবে কিনা।
ভোট হলো পরিবর্তনের জন্য।

না, শুধু লোক পরিবর্তন নয়, চিন্তার পরিবর্তনও। অর্থাৎ নতুন প্রার্থী ছাড়াও নতুন পরিকল্পনা বেছে নেয়ারও অধিকার। যার প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে স্বভাবতই ভোটাররা অনাগ্রহী হয়, উৎসাহ হারায়। এই ব্যাখ্যাটা খুব কঠিন নয়, মানুষের এই চিন্তা অনুধাবনেও বিশেষ ধরণের বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তা স্বত্বেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের অনাগ্রহের কারণটা ধরতে পারছে না, কিংবা নজর-আন্দাজ করছে।

আবার বিএনপির কথায় আসি। তাদের অভিযোগের কথা বলি। আপনাদের এত অভিযোগ, ভোটারদের আসতে দেয় না, ভোট দিতে দেয় না, এটা সেটা, তাহলে ভোটে আসেন কেন! অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলবেন, ভোটের রিগিং প্রমাণ করতে আসি।

বলি, আপনারা কি কাদম্বিনী। আপনারা যে মরেন নাই তা প্রমাণ করতে কতবার কাদম্বিনী সাজতে হবে আপনাদের! যাদের কাছে প্রমাণ করবেন, সেই ভোটাররা আপনাদের থেকে এগিয়ে এবং সে কারণেই ভোটের হার এমন। আর বিদেশিরা এ দেশ সম্পর্কে অন্তত আপনাদের চেয়ে বেশি জানেন। সুতরাং বারবার ‘মরিয়া প্রমাণ করিবার’ কী দরকার! বলিহারি আপনাদের প্রচেষ্টার, রবার্ট ব্রুসও হার মানবেন আপনাদের কাছে।

যাক গে, মূল কথায় ফিরি। ২৩, ২৫ বা ২৯ এমন শতাংশের হিসাব ভোটের ক্ষেত্রে কোনো কাজের কথা নয়। ভোটকে ভোট হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য করতে ৫০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই উপস্থিতি ‘ফেইক লাইনে’র উপস্থিতি নয়। ‘উপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’ও না। যা হবে প্রকৃতই ৫০ শতাংশ। তবেই যদি গণতন্ত্র ‘ট্র্যাকে’ ফেরে।

নাচিয়ে-গাইয়ে নামিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করা যায়নি। শেষ চেষ্টা হিসাবে মসজিদের মাইকের আশ্রয় নিতে হয়েছে। সেই মাইকের আহ্বানের ভোটাররা কেন্দ্রে আসেনি। ব্যর্থতা ঢাকতে নানা ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে।

বলা হয়েছে, ‘ইয়ং পোলাপাইন দেরিতে ঘুম থেকে উঠে পরে আসবে’, সেই পরের আর পর হয়নি। ‘গ্রামের লোকেরা দুপুরে খেয়ে আসবে’, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, তারা আসেনি। এসবই শুধু কথার কথা, কাজের নয়। যার ফলে ‘পোলাপাইন দেরিতে উঠে’ এসব নিয়ে ট্রল করতে বসে গেছে। সামাজিকমাধ্যম এমন ট্রলে ভর্তি।

সুতরাং এসব বাদ। দেশকে ভোটের ধারায় ফেরাতে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে তাদের ভোটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্ভব। সে হোক প্রার্থীর বা পরিকল্পনার। তবেই মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসবে।

কোনো নাচ-গানের প্রয়োজন হবে না, মসজিদের মাইক ব্যবহার করতে হবে না। মানুষ যদি বিশ্বাস করে পরিবর্তন সম্ভব-হবে, তাহলে সকাল থেকেই কেন্দ্রে লাইন দেখতে পাবেন। কেন্দ্রের সামনে মেলা বসে যাবে। ভোট পরিণত হবে সত্যিকার সার্বজনীন উৎসবে। এক সময় যেমন ছিল।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত