রাষ্ট্রের বিপথগামীতা, সুবিধাবাদ, বোকামী এবং অরুন্ধতী রায়

  কাকন রেজা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:০২:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অরুন্ধতী রায়কে প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। এত হুমকি, আপনার লেখায় প্রভাব পড়ে? অরুন্ধতী বললেন, ‘এখন লেখককে প্রতিটি শব্দ লেখার আগে বার বার ভাবতে হচ্ছে। বাক্‌স্বাধীনতা নেই।

এতে সংস্কৃতির ক্ষতি হচ্ছে, মুক্ত চিন্তা থমকে যাচ্ছে।’ একজন লেখকের কাজের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘লেখক হিসেবে আমাদের কাজ প্রশ্ন করে তাতিয়ে তোলা, যে কোনও বিষয় নিয়ে কাটাছেঁড়া করা। অথচ, সব কিছু পিছন দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।’ কিছু মানুষের কথা নিয়ে বলেছেন, ‘বিজ্ঞানীই হোন বা অন্য পেশার মানুষ, বোকার মতো কথা বলছেন।’

একটা উত্তরকেই আমি ভেঙে তিনটি অংশ করলাম কেনো, যারা অরুন্ধতী রায়ের ইন্টারভিউ পড়েছেন তারা এই প্রশ্নটা করতে পারেন। তবে ভাল করে ভেবে দেখলে দেখবেন, উত্তরটা এক নিঃশ্বাসে দিলেও, মূলত অংশ তিনটাই। প্রথমত, আমাদের লিখতে গিয়ে ভাবতে হচ্ছে। ভাবতে হচ্ছে নিজের নিরাপত্তা বিষয়ে।এসে যাচ্ছে সেল্ফ সেন্সরশিপ। প্রশ্ন উঠছে বাকস্বাধীনতার।

কি, প্রশ্ন উঠছে না, ভাবতে হচ্ছে না? হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বড় অংশ জুড়েই এমনটা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, একজন লেখকের কাজ মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন করা একজন লেখকের কাজ। জানতে চাওয়া, প্রশ্ন করে উত্তরটা বের করার চেষ্টা। প্রশ্ন থাকলেই জবাবদিহিতার বিষয়টা থাকে।

মানুষের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও অধিকার আদায় হয়। রাষ্ট্র যখন জবাব চাওয়া ও জবাব দেয়ার বিষয়টির উর্ধ্বে উঠে যায়, তখনই বিপর্যয় ঘটে। রাষ্ট্র উল্টো পায়ের ভূতের মতন পেছন হাঁটতে শুরু করে, বিপথগামী হয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থার এই উল্টোমুখি যাত্রার প্রমান হচ্ছে, ‘পটেনশিয়াল’ মানুষদের ‘ননপটেনশিয়াল’, বোকার মতন কথা বলা। হিসাব কষে দেখুন, রিলেটেড হলেও বিষয় কিন্তু তিনটাই।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কথা বলেছেন অরুন্ধতী অন্য আরেক প্রশ্নের জবাবে। তিনি বললেন, ‘কেউ বলছেন, প্রতিবাদীদের গুলি করে মারতে। কেউ বলছেন, পোশাক দেখে চেনা যায়। কেউ বলছেন, পাকিস্তানে চলে যাও। উত্তরপ্রদেশে প্রতিবাদ হচ্ছিল, মুখ্যমন্ত্রী বললেন, প্রতিশোধ নেয়া হবে।

লোকের থেকে পয়সা উসুল করা হবে। হচ্ছেও।’ এই চিত্র কি শুধু ভারতের? জানি, এই প্রশ্নটা তোলাও নিরাপদ নয়। তবু রাষ্ট্রকে বিপথে যেতে দেখলে প্রশ্নটা উঠে আসে। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে রাষ্ট্র্রের প্রতি দায়িত্ববোধের তাগিদে প্রশ্নটা তুলতেই হয়।

রাষ্ট্রের পরিচালকদের শুধু নয়, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ধর্ম বলে, যে জাতির নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায় না, তাদের ভাগ্যও সৃষ্টিকর্তা পরিবর্তন করেন না। এমন কথাতেই নাগরিকের দায়িত্ব পরিষ্কার করা হয়েছে।

ধর্ম কিংবা ধর্মের বাইরের দর্শন সব একই কথা বলে, নাগরিকদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্বহীন নাগরিকদের রাষ্ট্র্রও আক্রান্ত হয় দায়িত্বহীনতায়। যার কুফল ভোগ করে স্বয়ং নাগরিকরা। অনেকটা বৃত্তের মত, বৃত্তবন্দী খেলা। ঘুরেফিরে নিজের দিকেই ফিরে আসা।

কথাগুলো ভারত প্রসঙ্গে বলা হলেও, একই অবস্থায় থাকা দেশগুলোর প্রতিটির জন্যেই এ কথা খেটে যায়। জবাব ও জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আলোচনা-সমালোচনার বদলে সৃষ্টি হয় বন্দনার, স্তুতি আর স্তাবকতার। সুবিধাবাদীরা নিজেদের সব মেধা ঢেলে দেয় ক্ষমতাধরদের খুশি করতে।

সব কিছু হয়ে উঠে আনুষ্ঠানিকতা। শোক হয়ে ওঠে উৎসব। অনেকটা এবার একুশে’তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যানারের মতন। যেখানে ভাষা শহীদদের বদলে মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি দিয়ে দেয়া হয়েছিল। গণমাধ্যমের খবর ও ছবি তাই জানিয়েছে। এমনটাই হয়, অরুন্ধতীর ভাষায়, ‘বোকার মতন কথা বলা’। সঙ্গে বোকার মতন কাজকর্ম। এ অর্থে সুবিধাবাদ বোকামীরই নামান্তর।

ওহ, অরুন্ধতী রায় আরেকটি জরুরি কথা বলেছেন। রাজনীতি আসা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্রেফ না করে দিয়ে লেখকের নিজ কাজটা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘লেখকের ভূমিকাটা উল্টো বলেই আমার মনে হয়। মনে হয়, অপ্রিয় কথাগুলো কে বলবে?’

অন্য অনেক পেশার মানুষের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘কেউ বড় সিনেমা বানালে তাকে চুপ থাকতে হয়, কারণ তিনি ব্যবসা করে খাচ্ছেন। বলিউডের বেশির ভাগ মানুষ তাই চুপ।’ সুবিধাবাদী লেখকদের কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সঙ্গে লেখক হিসেবে নিজের কর্তব্যের কথাও বলেছেন। জানিয়েছেন, ‘এমন লেখকও আছেন। কিন্তু আমি নিজের কাজটা ভুলতে পারি না। অনেকে মনের মধ্যে সেন্সরশিপ তৈরি করে বসে আছেন। ক্ষমতাতোষণের বাইরে বেরিয়ে কথা বলার সাহস নেই। এটা বিপজ্জনক প্রবণতা।’ ক্ষমতার তোষণ মানেই সুবিধাবাদ। সাধারণ মানুষদের জন্য চিরকালীন বিপজ্জনক প্রবণতা।

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত