রোগী কেন হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা পাবেন না?

  কাকন রেজা ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৩৫:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

রাজধানীর মোড়ে মোড়ে খাবারের আশায় মানুষ, এটি একটা গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম। কদিন আগেই লিখেছিলাম এমন পরিস্থিতির কথা। বলেছিলাম আমাদের মধ্যবিত্তদের কারো হয়তো দু’মাস, তিন মাস ধরে ঘরে বসে খাবার সামর্থ্য রয়েছে। বিত্তবানদের কেউ হয়তো বছরের পর বছর ঘরে বসে খেতে পারবেন।

কিন্তু আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষই দরিদ্র। যাদের আবার বেশিরভাগেরই ‘দিন আনে দিন খায়’ অবস্থা। এসব মানুষদের পরিস্থিতি কী হবে? আশংকা শুধু নয় ভয় ছিল আমার। ভয়টা হলো অরাজকতার। আর কয়দিন এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারবে এসব মানুষ? কদিন তারা ক্ষুধাকে প্রবোধ দিতে পারবে? ক্ষুধার চেয়ে বড় যাতনা আর কিছু নেই।

আমরা যদি এসব মানুষদের ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা না করতে পারি, তবে সৃষ্টি হবে অরাজকতার। ইতিমধ্যেই ত্রাণ লুটের দুয়েকটা খবর কানে আসছে। মানুষজন ছিনিয়ে নিচ্ছে তাদের জন্য আনা খাবার সামগ্রী। এখন পর্যন্ত দৃষ্টিতে পড়ার মত বড় ঘটনা নয় এসব। তবে এগুলো অ্যালার্মিং। এসব দু’একটি ক্ষুদ্র ঘটনাই জানান দিচ্ছে সামনে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে অবস্থা কী দাঁড়াবে। আইনশৃঙ্খলা রীতিমত ভেঙে পড়বে। সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

বর্তমান অবস্থাতে সাহায্য দেবার নামে কিছু মানুষের কার্যক্রম দৃষ্টিকটু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে এমন মহামারীর অবস্থাতেও এসব মানুষের প্রদর্শনবাদিতা বড় বিপদ টেনে আনবে বলেই মনে হচ্ছে। গণ ও সামাজিকমাধ্যমে দেখছি, কিছু লোক পঞ্চাশ থেকে এক’শ পরিবারের মধ্যে অল্প কিছু চাল-ডাল দিয়ে ফটোসেশন করছেন। কিছু লোক স্যানিটাইজার, মাস্ক বিতরণ করছেন। এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়ও দেখেছি আমরা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে।

খবরে দেখানো হচ্ছে বাগাড়ম্বর করে কিছু লোককে দিয়ে ফটোসেশনের পর নাই হয়ে গেছে সেই সাহায্য দেনেওয়ালারা। যারা পাননি তারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। যারা স্যানিটাইজার ও মাস্ক দিয়েছেন তাদের প্রতি দরিদ্র কোনো মানুষ আক্ষেপ করে বলছেন, ‘হাত ধোওনের জিনিস দেন, পেট ভরণের খাওয়া দেন না কেন?’ এই যে প্রদর্শনবাদিতা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্ন, এটা পরবর্তীতে বিপদ ডেকে আনবে।

ফটোসেশনের জন্য লোক জানিয়ে বিতরণের যে প্রদর্শনবাদী প্রক্রিয়া তা না পাওয়া মানুষদের ক্রমেই উত্তেজিত করে তুলবে। ফলে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। হবে লুটপাট অরাজকতা। সুতরাং যারা সত্যিকার অর্থেই মানুষকে সাহায্য করতে চান, তারা অতি জানান দিয়ে না করাই ভালো।

জানান না দিয়েও কাজ করা যায় এবং তা অনেক বড় পরিসরে। যেমন ‘বিদ্যানন্দ’ করছে। ‘বিদ্যানন্দ’ এর কর্মীরা যা করছে তা হাজার ফটোসেশনওয়ালারাও করতে পারবেন না। বরং তারা আরও বাগড়া বাধাবেন। যেমন বাগড়া বাধিয়েছিলেন গণস্বাস্থ্য ও আকিজের উদ্যোগে করোনা হাসপাতাল নির্মাণের ব্যাপারে।

যেমন ঝামেলা পাকিয়েছিলেন করোনা আক্রান্তের লাশ দাফনের ব্যাপারে। যেন তারা কখনো অসুস্থ হবেন না, কখনো তাদের মৃত্যু হবে না। এগুলো সবই ফটোসেশনওয়ালাদের কাজ। এসব নির্বোধ এখনো বোঝে না, মহামারী কোনো রাজনীতি নেই। মহামারী কোনো দলের সমর্থক নয়।

এটা এক সাম্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞ, যার চোখে সব মানুষ সমান। রিকশাওয়ালা কুদ্দুছ থেকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। যারা মনে করছেন, গণমাধ্যমে ছবি দেখিয়ে বিগতদিনের মত হাততালি পাবেন তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। সময়ই তাদের এই বোকামির বিষয়টি জানিয়ে দিবে।

প্রদর্শনবাদিদের কথা গেল। এখন আসি এই অসম যুদ্ধে যোদ্ধা চিকিৎসকদের কথা বলছি। আমি সবসময়ই চিকিৎসকদের পক্ষে কথা বলেছি। আমার ধারণা ছিল মানুষ যখন অসুস্থ হয়, সে সময় তার থেকে অসহায় কেউ থাকে না। সেই অসহায় মানুষের কাছে ঈশ্বরের দূত হিসাবে প্রেরিত হন চিকিৎসকরা। এবারও আশা করেছিলাম সেই চিকিৎসকদের ওপরই। বিপরীতে চারিদিক থেকে যা শুনছি তাতে আমার আশায় চিড় ধরতে শুরু করেছে।

হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মানুষদের চিকিৎসা না পাওয়ার কথা, চিকিৎসকদের চেম্বার বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকার ঘটনা আমাদের আশা ও আস্থাহীন করে তুলছে ক্রমেই। এতদিন চিকিৎসকদের কেন সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হয়নি, কেন আমলারা সুরক্ষা সরঞ্জাম পাচ্ছেন এ নিয়ে আমরা লিখেছি, বলেছি। এখন তো সুরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, তবে এখন কেন চিকিৎসকরা চেম্বার বন্ধ রাখবেন, কেন হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা সেবা পাবেন না!

এ অবস্থায় এখন কিন্তু কথা উঠতে শুরু করেছে, চিকিৎসকরা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে বিভিন্ন উপহার নিয়ে থাকেন। এমনকি গাড়ি পর্যন্ত রয়েছে সেই উপহারের মধ্যে। এমন চিকিৎসকরা কেন প্রয়োজনে নিজেদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরকার না দিলেও নিজেরা জোগাড় করে নেবেন না?

প্রাইভেট চেম্বারে সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়ার দায়িত্ব তো সরকারের নয়। সেখানের জন্য একজন চিকিৎসক কেন সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যক্তিগত উদ্যোগে জোগাড় করবেন না? এখন তো সেবা দেয়ার সময়, নিজেকে চিকিৎসক হিসাবে প্রমাণ করার সময়। এখন কেন আপনারা পিছিয়ে থাকবেন? চিকিৎসকদের বলি, এসব প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এগুলোকে আর আগ বাড়তে দিবেন না। প্রশ্নের আগে আপনারা এগিয়ে আসুন, প্রশ্নগুলো পিছে পড়ে যাক।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, একটি রাজ্য মাত্র। সেখানের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবনবীমা দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। সম্ভবত আগে ছিল পাঁচলাখ এখন করেছেন দশলাখ। দিয়েছেন আরও সহায়তার প্রতিশ্রুতি। আমাদেরও ভাবতে হবে চিকিৎসকদের সম্পর্কে। যারা নিজেদের জান বাজি করে যুদ্ধে যাবেন, তাদের কথা, তাদের পরিবারের কথা ভাবার কথা রাষ্ট্রের।

রাষ্ট্রকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে এই যুদ্ধ অসম। স্বাভাবিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষ দৃশ্যমান, সুতরাং যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ খুব কঠিন নয়। আর এ যুদ্ধ অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। অসম যুদ্ধের সেনাদের জন্য নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থা। রাষ্ট্রকে অবশ্য সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

শেষে আসি আমাদের সাধারণ মানুষদের কথায়। পরিস্থিতিতে অল্প কিছু মানুষ ছাড়া আমরা সবাই সাধারণ মানুষদের কাতারে এখন। অসহায় আর হতবিহবল। সর্ব শক্তিমান আমাদের ভরসাস্থল। আমাদের এখন একটা জিনিসই মানতে হবে তা হলো শারীরিক দূরত্ব। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে সামাজিক দূরত্ব আর যথেষ্ট হচ্ছে না, আমাদের শারীরিক দূরত্বকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

এই মহামারী আমাদের শারীরিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক করে দিচ্ছে। আর একে মোকাবেলায় আমাদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মানসিক দূরত্বকে কমিয়ে আনতে হবে। হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা বাদ দিয়ে মানুষ হিসাবে মানসিকভাবে সবাইকে এক হতে হবে। আর যারা দায়িত্বশীল রয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ত্যাগ করে নাগরিক হতে হবে। করতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে চিন্তা। না হলে উপায় নেই। ঈশ্বর এবং তার প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেবে না। মন্দের ফল ভোগ করতে হয় ভালোদেরও। মন্দের সঙ্গে যাবে ভালোরাও।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত