শহীদ মিনার ছাড়লেও গুরুদক্ষিণার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন শিক্ষকরা

  শাকিলা নাছরিন পাপিয়া ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

শহীদ মিনার
শহীদ মিনারে শিক্ষকদের অনশন। ছবি: সংগৃহীত।

মহাভারতে অর্জুনের নাম বীর হিসেবে যুক্ত হলেও অতি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র একলব্য। গুরুদক্ষিণার জন্য সে অমর। একলব্যের গুরুদক্ষিণার কাছে অর্জুনের গুরুর প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসাও ম্লান হয়ে গেছে। বিনা প্রশ্নে, বিনা বাক্য ব্যয়ে গুরুর জন্য আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা প্রদানের ঘটনা একলব্যকে অমর করেছে।

শত বছরের বঞ্চনার প্রতিমূর্তি এ দেশের শিক্ষক সমাজ। নিরীহ, রুগ্ন, ‘সাত চড়ে রা’ না করা এদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অস্তিত্ব আর মর্যাদার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে, ২৩ ডিসেম্বর থেকে। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে, শীতকালীন অবকাশ প্রত্যাখ্যান করে গ্রাম-গঞ্জ থেকে শিক্ষকরা ছুটে এসেছিলেন, কারণ আন্দোলনটা এখন আর্থিক ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন মর্যাদার। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হওয়ার তিনদিন পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী অনশনরতদের অনশন ভাঙিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন- ‘আলোচনার টেবিলে সমাধান হবে।’ ইতিহাস সাক্ষী, বারবার শুধু আমাদের আশ্বাসই দেয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের দাবি কখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়নি। ১৯৭৩ সালে সহকারী শিক্ষকরা এক গ্রেড নিচে ছিল। আর এখন তাদের অবস্থান ৪ গ্রেড নিচে। এটা কেবল চরম বৈষম্যমূলক নয়; অপমানজনকও।

সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত কালজয়ী গল্প ‘পাদটিকা’। এ গল্পে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটিশ আমলের একজন শিক্ষকের দরিদ্রতার করুণ চিত্র- পণ্ডিতমশাই ক্ষোভে, দুঃখে হুংকার করে সহজ অথচ পৃথিবীর কঠিনতম গাণিতিক সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন ছাত্রদের কাছে। ছাত্ররা লজ্জায় অবনত শিরে বসেছিল সেদিন। পণ্ডিত মশাইয়ের শত শত ছাত্র লেখাপড়া শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশদের তাড়িয়েছে, কিন্তু ভুলে গেছে পণ্ডিত মশাইয়ের ছোট গাণিতিক সমস্যার সমাধান দেয়ার কথা।

মহাভারতে গুরু দ্রোণাচার্য অপমানের প্রতিশোধ নিতে নিজের ছেলে অশ্বত্থামা নয়, তৈরি করেছিলেন অর্জুনকে। প্রিয় শিষ্য অর্জুনকে বিশ্বসেরা বীর তৈরি করতে গিয়ে গুরুদক্ষিণা হিসেবে একলব্যের আঙুল চেয়েছিলেন। একটি কালজয়ী কবিতা ‘তালেব মাস্টার’। মানিক বাবুকে অনুরোধ করা হয়েছিল, শিক্ষকদের স্বপ্ন আর দরিদ্রতার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে। মানিক বাবু কী করেছেন, আমার জানা নেই। দুই দশক আগেও শিক্ষক বলতে বুঝতাম, সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত অথচ দরিদ্র ব্যক্তি। সময় সে চিত্রটা পাল্টে দিয়েছে। সম্মান এবং মর্যাদা ধীরে ধীরে লয়প্রাপ্ত হয়ে অবক্ষয়ের শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা। সময়ের দাবি অস্বীকার করার ক্ষমতা কারও নেই। ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন- মানুষ সময়ের সন্তান। সময়টাই যেন উল্টো চলছে। তাই বেঁচে থাকার কারণে, অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার কারণে, সর্বোপরি, সর্বত্র মুনাফাবাজির চিন্তা-চেতনা বিরাজ করায় কতিপয় শিক্ষক উল্টো পথে হাঁটছেন। এদের নিয়োগ থেকে শুরু করে সবকিছুই উল্টো। এদের বিস্তার এবং টিকে থাকার নেপথ্যে আছে অনেকের সহযোগিতা ও আর্থিক সুবিধা। ফলে কতিপয় বিপথগামী শিক্ষকের অসৎ কর্মকাণ্ডের দায় পুরো শিক্ষক সমাজের ওপর চাপানো হচ্ছে। শিক্ষকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দুর্বৃত্তের দল, তা রুখতে শিক্ষক সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্র সবার সক্রিয় ভূমিকা পালনের সময় এখনই।

সময়টা প্রচারের, মিডিয়ার। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রুনিক মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়া শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষকের বঞ্চনার করুণ ইতিহাস যদি যথাযথভাবে ফুটিয়ে না তোলে, তবে শুধু শিক্ষক নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস ত্বরান্বিত হবে। দেশের উন্নতি নির্ভর করে যে শিক্ষার ওপর- তার প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক স্তর। ভিত যদি দুর্বল হয়, তাহলে বাদবাকি শিক্ষাও নড়বড়ে হতে বাধ্য।

শিক্ষক একজন শিল্পী। তিনি প্রতিনিয়ত শিষ্যের মাঝে সৃষ্টির আনন্দ, বেঁচে থাকার পথ খোঁজেন। শিক্ষকই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মা-বাবার পরে তার চেয়ে উঁচুতে তার সৃষ্টিকে দেখতে চান। দেশের মিডিয়া জগতে যারা আছেন, সবারই পা পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায়। যাদের কলম সময়কে বদলে দেয়, বঞ্চিতকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে যারা ঝলসে ওঠেন, যাদের ক্যামেরা মানুষের দুঃখের-বঞ্চনার গল্প বলে, যারা নীতিনির্ধারণে এবং তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে অনুঘটকের কাজ করছেন, প্রত্যেকের ঋণ শোধের সময় এসেছে। শৈশবের অ, আ, ক, খ শেখানো শিক্ষাগুরু, যিনি একটু একটু করে গড়েছেন শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সোপান, তার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসার সময় এখনই।

২৩ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশনের প্রস্তুতি নিয়ে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা একত্রিত হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। লড়াইটা যতটা না ছিল অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি নৈতিক। শিক্ষক শব্দটার সঙ্গে সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ, উন্নত জীবনমান প্রভৃতি শব্দ চলে আসে। শিক্ষককে শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত করার দায় তার ছাত্রদেরই নিতে হবে। তাদের এখন অবতীর্ণ হতে হবে ‘একলব্য’র ভূমিকায়। শিক্ষকরা শহীদ মিনার ছাড়লেও গুরুদক্ষিণার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। একলব্য! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো গুরুর দীর্ঘশ্বাস?

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া, [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×