জরুরি আলাপ: দোকান খুললে করোনা, না খুললে অভাব
jugantor
জরুরি আলাপ: দোকান খুললে করোনা, না খুললে অভাব

  কাকন রেজা  

১৩ মে ২০২০, ২২:৪০:১০  |  অনলাইন সংস্করণ

দোকানপাট-শপিং মল খুললে করোনায় সংক্রমিতের সংখ্যা বাড়বে। এতে কোনো দ্বিধা বা সংশয় নেই। দ্বিধাহীন এই কথাটিকে একপাশে রেখে আরেকটি আলাপ তুলি। যে আলাপটা রাষ্ট্রের চেইন অব কমান্ড রক্ষার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাষ্ট্র চালাচ্ছে একটা সরকার। যেহেতু সে রাষ্ট্রটা চালাচ্ছে সুতরাং তার অর্ডারটা ফলো করা দরকার।

নাকি? যদি দরকার হয়, তবে সরকার অর্ডার করলো দোকানপাট-শপিং মল খোলার ব্যাপারে। সরকার যেহেতু করেছে, নিশ্চয়ই সম্পর্কিত সবার সঙ্গে আলোচনা করে, সব দিক ভেবেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে। সুতরাং অর্ডার বা সিদ্ধান্তটা না মানা বা উপেক্ষা করার কিছু নেই। এটা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।

যে বিএনপি সরকারকে বৈধ বলে স্বীকার করে না, তারাও এই মুহূর্তে একমত হয়ে কাজ করার কথা বলছে। অন্য রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্যও তাই। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত না মানা বা উপেক্ষা করা একরকম রাষ্ট্রকে অমান্য বা উপেক্ষা করারই সামিল।

অথচ দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চেম্বার অব কমার্স সিদ্ধান্ত দিচ্ছে দোকানপাট-শপিং মল বন্ধ রাখার। এমনকি এমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছে মার্কেট কর্তৃপক্ষগুলোও। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিপরীতে একটা ব্যবসায়ী সংগঠন কিভাবে সরাসরি বিপরীত সিদ্ধান্তে আসতে পারে এটাই মূলত আলাপের ব্যাপারটি।

তবে কি রাষ্ট্র তার নির্দেশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে! কিংবা চেম্বার একটি প্যারালাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে? যে অবস্থায় সরকারের আদেশকেও উপেক্ষা করা যাবে! এভাবে যদি সব সংগঠনগুলোই নিজেদের মত করে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে, তবে তো মূল কেন্দ্র অকার্যকর হয়ে পড়বে।

না, দোকানপাট খোলা রাখার পক্ষে বলছি না। এই দুর্যোগের মুহূর্তে একটি শক্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পক্ষে বলছি। বর্তমান পরিস্থিতি হলো স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা। আইন করে স্বীকৃতি দেয়া আছে যে, স্বাস্থ্যের বিপক্ষে গেলে স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বে যারা আছেন তারা আদালতের মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারবেন।

অর্থাৎ একটা জেলার সিভিল সার্জন যদি মনে করেন মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া উচিত, নিতে পারবেন। কেউ অবজ্ঞা করলে আদালতের মত শাস্তিও দিতে পারবেন। এমন একটা জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা কি অপরাধের পর্যায়ের পরে না?

চেম্বারগুলো বা মূল চেম্বার সরকারকে জানাতে পারতো বিষয়টা। সরকারকে বলতে পারতো, আমাদের অসুবিধা নেই, সরকার চাইলে দোকানপাট বন্ধ রাখতে পারে। তবে কেন্দ্র তথা সরকার বুঝে দেখতো কী করা যায়। আর ব্যবস্থাটাও হতো সে অনুযায়ী। কিন্তু তা না করে উল্টো সরকারের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা। সঙ্গে নিজ আওতাধীন এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রকাশ করাকে কী বলা যায়? ঔদ্ধত্য?

জানি, বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। আমিও জানাই জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থে। তবে এ সিদ্ধান্তটা রাষ্ট্রের তরফে এলে স্বাগত জানানোটা হতো দ্বিধাহীন। সরকারের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, যাক বন্ধ রাখার দায়টা চেম্বার নিজেরাই নিয়েছে, সরকার বেঁচে গিয়েছে। না হলে ছোটখাটো ব্যবসায়ী, কর্মচারী এদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টা সরকারের ঘাড়ে চাপতো।

এখন যেহেতু নিজেরাই বন্ধ করেছে, আর্থিক নিরাপত্তাও তারাই দেখবে। এমন অবস্থা হলো উট পাখির বালিতে মুখ গুজে রাখার মত। আমি কাউকে দেখছি না, কেউ আমাকে দেখছে না। অবস্থাটা অত সহজ নয়। এ করে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকা যাবে না। রাষ্ট্রকে প্রতিটা মানুষের জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। একজন মানুষও যদি না খেয়ে থাকে তাও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, মৃত্যুও তাই।

আর এই ব্যর্থতা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। কেউ যদি ভেবে থাকেন বেঁচে গেলাম তাহলে সেটা তার বিভ্রম। তবে ইচ্ছা করলে পরিস্থিতিটা ঘুরিয়ে দেয়া যেত। সরকার যদি বলতো, তোমরা যেহেতু বন্ধ রাখতে চাইছো, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তাটাও তোমরা দেখো। তাহলেই বোঝা যেত ভালোমানুষিটা কোন স্তরের।

করোনায় আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার এখন পর্যন্ত অতটা ওঠেনি, যতটা আর্থিক দৈন্যতা আর ক্ষুধায় মৃত্যুর হার। দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আমাদের প্রবীণদের অনেকেই ভুলেননি। মানুষের সবচেয়ে বড় যাতনার নাম ক্ষুধা। মানুষ ডাস্টবিন এমনকি ড্রেন থেকেও খাবার তুলে খায়, যার নজিরের অভাব নেই।

এই করোনাকালেই দৈন্যতায় আত্মহত্যার নজিরও দিয়েছে গণমাধ্যম। খোদ অ্যামেরিকার কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাজণিত কারণে আর্থিকভাবে হতাশা বাড়বে এবং এতে অনেকেই আত্মহত্যার মত চরম ব্যবস্থা বেছে নিতে পারে।

সুতরাং মানুষ বাঁচানোর তাগিদে যেমন লকডাউন জরুরি। তেমনি একই তাগিদে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়াটাও ততধিক জরুরি। মনে রাখতে হবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানওয়ালা আর দোকান কর্মচারীরা দুই ঈদের আশাতেই অপেক্ষা করে বছর ধরে।

এদেরও দৈন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে হবে। তানা হলে সমুখে অনেক বড় বিপদ ওত পেতে আছে আমাদের জন্য। নমুনা তো শুরুই হয়েছে, রাজধানীতে গুলি করে ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা চোখের সম্মুখে। ত্রাণের চাল লুটের ঘটনা তো আরও আগের। অতএব কথিত-অকথিত সাধুগণ আপনাদের সাবধান না হয়ে উপায় নেই।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জরুরি আলাপ: দোকান খুললে করোনা, না খুললে অভাব

 কাকন রেজা 
১৩ মে ২০২০, ১০:৪০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দোকানপাট-শপিং মল খুললে করোনায় সংক্রমিতের সংখ্যা বাড়বে। এতে কোনো দ্বিধা বা সংশয় নেই। দ্বিধাহীন এই কথাটিকে একপাশে রেখে আরেকটি আলাপ তুলি। যে আলাপটা রাষ্ট্রের চেইন অব কমান্ড রক্ষার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাষ্ট্র চালাচ্ছে একটা সরকার। যেহেতু সে রাষ্ট্রটা চালাচ্ছে সুতরাং তার অর্ডারটা ফলো করা দরকার। 

নাকি? যদি দরকার হয়, তবে সরকার অর্ডার করলো দোকানপাট-শপিং মল খোলার ব্যাপারে। সরকার যেহেতু করেছে, নিশ্চয়ই সম্পর্কিত সবার সঙ্গে আলোচনা করে, সব দিক ভেবেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে। সুতরাং অর্ডার বা সিদ্ধান্তটা না মানা বা উপেক্ষা করার কিছু নেই। এটা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। 

যে বিএনপি সরকারকে বৈধ বলে স্বীকার করে না, তারাও এই মুহূর্তে একমত হয়ে কাজ করার কথা বলছে। অন্য রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্যও তাই। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত না মানা বা উপেক্ষা করা একরকম রাষ্ট্রকে অমান্য বা উপেক্ষা করারই সামিল। 

অথচ দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চেম্বার অব কমার্স সিদ্ধান্ত দিচ্ছে দোকানপাট-শপিং মল বন্ধ রাখার। এমনকি এমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছে মার্কেট কর্তৃপক্ষগুলোও। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিপরীতে একটা ব্যবসায়ী সংগঠন কিভাবে সরাসরি বিপরীত সিদ্ধান্তে আসতে পারে এটাই মূলত আলাপের ব্যাপারটি। 

তবে কি রাষ্ট্র তার নির্দেশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে! কিংবা চেম্বার একটি প্যারালাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে? যে অবস্থায় সরকারের আদেশকেও উপেক্ষা করা যাবে! এভাবে যদি সব সংগঠনগুলোই নিজেদের মত করে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে, তবে তো মূল কেন্দ্র অকার্যকর হয়ে পড়বে।

না, দোকানপাট খোলা রাখার পক্ষে বলছি না। এই দুর্যোগের মুহূর্তে একটি শক্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পক্ষে বলছি। বর্তমান পরিস্থিতি হলো স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা। আইন করে স্বীকৃতি দেয়া আছে যে, স্বাস্থ্যের বিপক্ষে গেলে স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বে যারা আছেন তারা আদালতের মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারবেন। 

অর্থাৎ একটা জেলার সিভিল সার্জন যদি মনে করেন মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া উচিত, নিতে পারবেন। কেউ অবজ্ঞা করলে আদালতের মত শাস্তিও দিতে পারবেন। এমন একটা জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করা কি অপরাধের পর্যায়ের পরে না?  

চেম্বারগুলো বা মূল চেম্বার সরকারকে জানাতে পারতো বিষয়টা। সরকারকে বলতে পারতো, আমাদের অসুবিধা নেই, সরকার চাইলে দোকানপাট বন্ধ রাখতে পারে। তবে কেন্দ্র তথা সরকার বুঝে দেখতো কী করা যায়। আর ব্যবস্থাটাও হতো সে অনুযায়ী। কিন্তু তা না করে উল্টো সরকারের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা। সঙ্গে নিজ আওতাধীন এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রকাশ করাকে কী বলা যায়? ঔদ্ধত্য? 

জানি, বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। আমিও জানাই জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থে। তবে এ সিদ্ধান্তটা রাষ্ট্রের তরফে এলে স্বাগত জানানোটা হতো দ্বিধাহীন। সরকারের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, যাক বন্ধ রাখার দায়টা চেম্বার নিজেরাই নিয়েছে, সরকার বেঁচে গিয়েছে। না হলে ছোটখাটো ব্যবসায়ী, কর্মচারী এদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টা সরকারের ঘাড়ে চাপতো। 

এখন যেহেতু নিজেরাই বন্ধ করেছে, আর্থিক নিরাপত্তাও তারাই দেখবে। এমন অবস্থা হলো উট পাখির বালিতে মুখ গুজে রাখার মত। আমি কাউকে দেখছি না, কেউ আমাকে দেখছে না। অবস্থাটা অত সহজ নয়। এ করে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকা যাবে না। রাষ্ট্রকে প্রতিটা মানুষের জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। একজন মানুষও যদি না খেয়ে থাকে তাও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, মৃত্যুও তাই। 

আর এই ব্যর্থতা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। কেউ যদি ভেবে থাকেন বেঁচে গেলাম তাহলে সেটা তার বিভ্রম। তবে ইচ্ছা করলে পরিস্থিতিটা ঘুরিয়ে দেয়া যেত। সরকার যদি বলতো, তোমরা যেহেতু বন্ধ রাখতে চাইছো, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তাটাও তোমরা দেখো। তাহলেই বোঝা যেত ভালোমানুষিটা কোন স্তরের। 

করোনায় আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার এখন পর্যন্ত অতটা ওঠেনি, যতটা আর্থিক দৈন্যতা আর ক্ষুধায় মৃত্যুর হার। দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আমাদের প্রবীণদের অনেকেই ভুলেননি। মানুষের সবচেয়ে বড় যাতনার নাম ক্ষুধা। মানুষ ডাস্টবিন এমনকি ড্রেন থেকেও খাবার তুলে খায়, যার নজিরের অভাব নেই। 

এই করোনাকালেই দৈন্যতায় আত্মহত্যার নজিরও দিয়েছে গণমাধ্যম। খোদ অ্যামেরিকার কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাজণিত কারণে আর্থিকভাবে হতাশা বাড়বে এবং এতে অনেকেই আত্মহত্যার মত চরম ব্যবস্থা বেছে নিতে পারে।  

সুতরাং মানুষ বাঁচানোর তাগিদে যেমন লকডাউন জরুরি। তেমনি একই তাগিদে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়াটাও ততধিক জরুরি। মনে রাখতে হবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানওয়ালা আর দোকান কর্মচারীরা দুই ঈদের আশাতেই অপেক্ষা করে বছর ধরে। 

এদেরও দৈন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে হবে। তানা হলে সমুখে অনেক বড় বিপদ ওত পেতে আছে আমাদের জন্য। নমুনা তো শুরুই হয়েছে, রাজধানীতে গুলি করে ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা চোখের সম্মুখে। ত্রাণের চাল লুটের ঘটনা তো আরও আগের। অতএব কথিত-অকথিত সাধুগণ আপনাদের সাবধান না হয়ে উপায় নেই। 

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম