নিভে গেল বাংলাদেশের বাতিঘর

  ড. কাজল রশীদ শাহীন ১৫ মে ২০২০, ০০:৩৮:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

আনিসুজ্জামান স্যারের বিদায়ে কি বাংলাদেশের বাতিঘর নিভে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা একটু পরে তালাশ করি। তার আগে জেনে নিই, তিনি কীভাবে হয়ে উঠলেন আমাদের বাতিঘর, বাংলাদেশের বাতিঘর।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আঁতুড়ঘরের সঙ্গে উনার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সেই সম্পর্কে কখনো দূরত্ব যেমন হয়নি, তেমনি ক্ষণকালের জন্যও ঘটেনি বিচ্যুতি। বরং সেই সম্পর্ককে তিনি আমৃত্যু লালন করেছেন পরম যত্নে, অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্যে।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে স্পিরিট, যে চেতনা, আদর্শ ও লক্ষ্য, তার প্রতিভূ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ একটি ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র। ভাষা আন্দোলনের চেতনার মধ্য দিয়ে এ জাতি নিজেদের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে পরিগণিত করে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের যে সংগ্রাম তার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। সেই একুশে ফেব্রুয়ারি স্মরণে, একুশের চেতনা উজ্জীবিত রাখতে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় একুশের সংকলন।

হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংকলনে আনিসুজ্জামান শুধু গল্পই লিখেননি, এটি প্রকাশে রাখেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

সেই শুরু, তারপর আমৃত্যু তিনি বাঙালি জাতির প্রগতিপন্থার সব আন্দোলনে রেখেছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। পাকিস্তানের অর্গলে বন্দি থাকার কালে এই ভূখণ্ডে যত আন্দোলন হয়েছে সগুলোতেই তিনি ছিলেন সম্মুখ সমরে।

পাকিস্তানের মতো একটা মৌলবাদী রাষ্ট্রে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালন করেছেন সক্রিয়ভাবে। রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ কিংবা জাতীয়প্রচার মাধ্যমে এর প্রচার হ্রাস করার বিরোধিতায় যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে ওঠে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে, তার কেন্দ্রে ছিলেন আনিসুজ্জামান।

১৯৬৭ সালে সংগঠিত এই প্রতিবাদ বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

আনিসুজ্জামান ১৯৬৯র গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের সংবিধান বাংলায় অনুবাদের যে কমিটি ছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন।

তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রিয় ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে উনার সম্পর্কটা কতোটা আন্তরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাচেতনার দ্বারা পরম নির্ভরতার ছিল তা আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ পাঠ করলে স্পষ্ট হয়।
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা সচিব করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি শেষাবধি শিক্ষকতাকে নিজের জীবনের মৌল লক্ষ্য বলে জ্ঞান করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন।

আনিসুজ্জামান শিক্ষকতা করেছেন মূলত চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর বাইরে তিনি গেস্ট প্রফেসর হিসেবে দেশের বাইরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থীদের অন্যতম হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের ক্ষেত্রে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে।

বিপুলা পৃথিবী গ্রন্থে সেইসব দুঃখ কষ্টের রোজনামচা তিনি তুলে ধরেছেন। পরিস্থিতি এমনও হয়েছিল যে, উনাকে দস্তখত দিতে হয়েছিল যে, উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যুক্ত হবেন না। জীবন ঘষে তিনি আগুন হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই আগুন ছিল পরশমনিতুল্য।

আনিসুজ্জামানের স্যারের জীবন ছিল শৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ এক জ্ঞাননিষ্ঠ পণ্ডিতপ্রবরের জীবন। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সময় মেপে চলা এবং সময়ানুযায়ী কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তুলনারহিত। কাউকে কোনো কথা দিলে কীভাবে সেটা রাখতে হয় তারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন।

কাউকে যদি সকাল ৮টায় সময় দেন তাহলে আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে রেডি হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতেন এবং আটটা বেজে পাঁচ মিনিটে তিনি অন্য কাজের জন্য বেরিয়ে পড়তেন। উনার জীবন ছিল এরকমই শৃঙ্খলায়পূর্ণ, সময়ের কড়া নিয়মে শাসিত। পরিমিতিবোধের পরাকাষ্ঠা ছিলেন তিনি।

গবেষণার মতো কঠিন বিষয় সহজে সংক্ষেপে ব্যক্ত করার মতো প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন তিনি। কত বিষয়ের কতদিকে উনার অবাধ গতায়াত ছিল তা কেবল তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব যারা নিবিড়ভাবে দেখেছেন কিংবা উনার প্রযত্নে কোনো গবেষণা কিংবা কাজে যুক্ত হয়েছেন।

তিনি সাহেত্যের শিক্ষক ছিলেন, বিভিন্ন বিষয়ে বিবিধ কার্যাবলী সম্পাদনা করলেও আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল প্রবন্ধ ও গবেষণা। এক্ষেত্রে তিনি সবসময় স্বতন্ত্র জ্ঞানভাণ্ডার উন্মোচন করেছেন।

জ্ঞানচর্চায় উনি ছিলেন দূর্ণিবার ও একরৈখিক। সবসময়ই নতুন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করেছেন। নিজস্ব পর্যক্ষেণ-মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তে অনঢ় ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। চর্বিতচর্বন ছিল রুচির বাইরে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বাঙালীর মনীষার যেসব কীর্তিমানদের নিয়ে তিনি লিখেছেন।

প্রত্যেকের ক্ষেত্রে হাজির করেছেন নতুন যুক্তি, খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন ভ্রান্ত ধারণা কিংবা অপনোদন করেছেন বিতর্কিত বিষয়।

গবেষণা-লেখালেখির পাশাপাশি আনিসুজ্জামান হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, বিবেকের বাতিঘর। ৭১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যে যাত্রা, সামরিক- স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, মৌলবাদ বিরোধিতা, যুদ্ধাপরাধীর বিচার, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখা- সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সংশপ্তকের ভূমিকায়।

প্রজ্ঞা দিয়েই তিনি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আলোকোজ্জ্বল করে রেখেছিলেন বিবেকের বাতিঘর।

আনিসুজ্জামানের প্রজ্ঞার দ্যুতি শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও আদৃত ছিল। বাংলা ভাষাভাষী বিদ্বৎজনমাত্রই উনার গুণমুগ্ধ। ভারত সরকার ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব পদক, পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া গুনীন এই ব্যক্তিত্ব চির প্রয়াণের পথে পাড়ি দিলেন ৮৩ বছর বয়সে। পরিণত জীবনই পাড়ি দিয়ে গেলেন তিনি একথা যেমন সত্য, তার চেয়েও অধিক সত্য হলো, উনাদের মতো ব্যক্তিরা যতদিন থাকবেন ততদিনই আমাদের জন্য আলোর আধার জারি থাকেন।

এ কারণেই উনার মৃত্যুতে এই প্রশ্ন ওঠা সংগত ও যৌক্তিক যে, নিভে গেল বাংলাদেশের বাতিঘর। তবে আমাদের বিশ্বাস যে জীবন ও কর্মের অমৃত সুধা তিনি রেখে গেছেন তা কখনো শেষ হওয়ার নয়। যে আগুনের পরশমনি তিনি ছড়িয়েছেন বাঙালি হৃদ মাঝারে তা নিভে যাওয়ার নয়। এ আলো জ্বলবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

যতদিন বাঙালির জ্ঞানচর্চার স্পৃহা ও অভীপ্সা জারি থাকবে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যতদিন বহমান থাকবে, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি যতদিন সংহত থাকবে ততদিন আনিসুজ্জামান নামক বাতিঘর আলো ছড়াবেই।
জ্ঞানের এই দীপশিখা নিভে যাওয়ার নয়, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ-রাষ্ট্রের প্রাণের গভীরে তিনি আসীন হয়েছেন আপন মহিমা ও মর্যাদায়।

১৪ মে ২০২০ এ আনিসুজ্জামানের এই বিদায় শুধু ইহজাগতিক এক বিদায়।


লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

[email protected]

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত