পাখিদের সঙ্গে আমার মায়ের প্রেম

  সুফিয়ান ফারাবী ১৭ মে ২০২০, ১৭:০০:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

ঘুম ভেঙেছে পাখিদের শ্লোগানে। বারান্দার জানালায় বসে দুটি চড়ুই পাখি প্রচণ্ড শব্দ করছে। সাধারণত উচ্চ আওয়াজেও আমার ঘুম ভাঙে না। পরিচিতজন হয়ত বিষয়টি জানেন। বুঝতেই পারছেন কিচিরমিচির শব্দটা ছিল অসহনীয় পর্যায়ে। 

ঘুম থেকে উঠে আরো কিছুক্ষণ ঘুমাবার জন্য চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। সময় যত গড়াচ্ছে, পাখিদের কোলাহল তত বাড়ছে। বিক্ষোভের সুরে গান গাইছে। 

আমি বুঝতে পেরেছি তাদের বিক্ষোভ আমার মায়ের বিরুদ্ধে। এজন্য সকাল সকাল আমাকে মায়ের অপরাধের মাশুল দিতে হচ্ছে। আমার মা চরম একটি অপরাধ করেছে ফেলেছেন। 

প্রতিদিন সকালে পাশের রুমে গুণগুণ শব্দে কোরআন তিলাওয়াত করেন। এরপর প্রহরের প্রথমাংশে পাশের একতলা বাড়ির ছাদে পাখিদের খাবার দেন। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন খাবার। 

কিন্তু গতরাত আমার মা বিনিদ্রায় কাটিয়েছেন। আমলে মশগুল ছিলেন। ঘুমুতে পারেননি। তাই আজ সকালে ঘুমাচ্ছেন। ভুলবশত পাখিদের কথা ভুলে গেছেন। তাদেরকে আজ খাবার দিতে পারেন নি। সচেতন পাঠকরা এতক্ষণে বুঝে গেছেন পাখিদের আজকের বিক্ষোভ এনিয়েই। 

পাখিদের সঙ্গে মায়ের মায়ার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমার তো মনে হয় আমার চেয়ে ওদেরকে বেশি ভালোবাসেন। 
বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঠিকঠাক মতো আমার খোঁজখবর নেন না। অন্যদিকে দিনে দু’বেলা, সপ্তাহে ৭ দিন, মাসে ৩০ দিন ওদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন, খাবার দিচ্ছেন। 

প্রথম প্রথম বিষয়টিতে আনন্দ পেতাম। এখন পাই না। প্রচণ্ড হিংসে হয়। কেউ যদি নিজের ছেলের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি ভালোবাসে, সেটাকে অবৈধ সম্পর্ক বলা ছাড়া উপায় নেই। 

আমার লেখা পড়ে পাঠকরা আমাকে যতটা মানবিক মনে করেন, আমি কিন্তু ততটা মানবিক নই। অন্যান্য মানুষের মত আমার মনেও আছে হিংসা, জেদ, ভালোবাসা এবং নিজস্ব কিছু বিষয়। 

জীবনের চলতি পথে অনেক মানুষকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে থাকি। কিন্তু ঘুমের প্রশ্নে কারো সঙ্গে আপোষ করতে রাজি নই। 

তাই পাখিগুলোর ওপর আমার প্রচণ্ড রাগ হল। আমি এক মগ পানি নিয়ে পাখিদের বিক্ষোভ থামিয়ে দিলাম। ওরা উড়ে চলে গেল। দূরে একটি গাছের আগায় গিয়ে বসল। এমন সময় হঠাৎ মা এসে উপস্থিত। দেখলেন আমার হাতে মগ। আর পাশের বাসার ছাদেও কোন পাখি নেই। 

তিনি বুঝেছেন, তার প্রেমিকরা আমার তাড়া খেয়ে পালিয়েছে। আমি ওদেরকে তাড়িয়েছি। আমি কমন একটা হাসি দিলাম। তিনি আরো স্পষ্টভাবে বুঝলেন পানি মেরে ওদেরকে আমিই তাড়িয়েছি। বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালেন। আমার প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে। খাবার বন্ধ হয়ে যাবার ভয়। ছোটবেলা থেকে এরকম শাস্তি পেয়ে অভ্যস্ত আমি। 

মা বললেন এই মুহূর্তে আমার ঘর থেকে বের হবি। আমার দু’চোখের সামনে তোকে যেন না দেখি। আজ থেকে সাত দিন তোর খাবার বন্ধ। 

করোনার এই সময়ে কোন হোটেল খোলা নেই। অন্য কোন সময় এরকম হলে, বাইরে খেয়ে নিতাম। এখন সে পথটিও বন্ধ। যাব কোথায়? ছেলে হয়ে মায়ের প্রেমে বাধা দেয়া কি আমার অপরাধ? 

আমি নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলাম পাখিগুলো না গেলে আমি ঘুমাতে পারতাম না। ওরা প্রচণ্ড শব্দ করছিল। ওদেরকে তাড়ানো ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। 

কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষমা করলেন না। তার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি প্রচণ্ড রেগে আছেন। এটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তার কথা হচ্ছে পাখিগুলোকে খাবার দিলে ওরা শান্ত হয়ে যেত। পানি দেওয়ার কোন দরকার ছিল না। আমি গুরুতর একটি অন্যায় করেছি। 

দোষ স্বীকার করে আমি বললাম, আচ্ছা আমাকে ক্ষমা করে দিন। পাখিদের সঙ্গে এরূপ অন্যায় আর করব না। কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষমা করলেন না। আমি যত রকমের অভিনয় জানা ছিল, সব প্রয়োগ করলাম। 

মায়ের মন বোধহয় কিছুটা গলেছে। চোখের রক্তবর্ণ কিছুটা কমেছে। ধীরে ধীরে চোখটা সাদা হচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, পাখি যদি ফিরে আসে তাইলে এবারের মত বেঁচে গেলি। আর যদি না আসে তাইলে আমার আগের হুকুম বলবৎ। 

আমি মায়ের চোখে হাসলাম। মা বললেন, আজ তুই পাখিদের খাবার দিবি। খাবার নিয়ে পাখিদের ডাকতে থাক। ওরা আসলেই তোর রক্ষা। 

বাধ্য ছেলের মত খাবার ছিটাচ্ছি। আর বলছি, ওরে সোনা পাখি, আয়। নে, খা। ইচ্ছে মত খা। ওরে আমার মায়ের প্রেমিকেরা, আয়, আয়। 

 

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত