করোনার ত্রিকোণমিতি: মানবিক সমাজ, সংসার এবং রাষ্ট্র

  ড. শরীফুল ইসলাম দুলু ২০ মে ২০২০, ০২:৪৪:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া করোনা বা কোভিড-১৯ পৃথিবীর মানুষকে কতটা ক্ষতিসাধন করেছে তা ইতিমধ্যে আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি এবং তার ক্ষত আগামীতে কতটা ভয়াবহ হবে তা নিয়ে রীতিমত গবেষণা–বিশ্লেষণ হচ্ছে এবং আরও হবে। এই সকল বিশ্লেষণের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে শুধুমাত্র আগামীর অর্থনীতি এবং তার উত্তরণের উপায়।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব এসেছে এবং তা ইতিমধ্যে ঝেঁপে বসার উপক্রম। আজকের আলোচনা একটু ভিন্ন, কোভিড-১৯ আমাদের সমাজ–সংসার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কী শিক্ষা দিয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আগামী দিনগুলোতে আমাদের পথচলার জন্য পাথেয় হতে পারে।

বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল কয়েক হাজার বছর আগে অসংখ্য সামাজিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি আর অপার সাংস্কৃতিক মিশ্রণে, যা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। আর এই সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে আমাদের সাংসারিক পরিবন্ধন।

এই সংসার পারস্পরিক সন্মান, শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় পরিপূর্ণ, তা হোক যৌথ কিংবা একক পরিবার। আর এটাই এদেশের মানুষের শিকড়। আমরা বিশ্বাস করি কিংবা করতে চাই, আমরা সবসময়ই সমাজ কিংবা পরিবার কেন্দ্রিক, কখনই ব্যক্তি কেন্দ্রিক না। আমরা মানবিক এবং পারস্পরিক সম্পর্কে বা প্রয়োজনে নিবেদিত।

আসলেই কি তাই? কোভিড-১৯ এই মহামারি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, আমরা কারা কিংবা আমাদের মানবিক বা ব্যক্তি সম্পর্কের অবস্থান কোথায়! আজকের লেখার শিরোনাম- করোনার ত্রিকোণমিতি: মানবিক সমাজ, সংসার এবং রাষ্ট্র। একটি মানুষের জন্য তিনটি মানবিক ভিত্তি বা পিলার জরুরি তা ওই সমাজ-সংসার এবং রাষ্ট্র।

বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার আর তার প্রায় ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে আমাদের গর্বের সমাজ এবং ৫০ বছরের একটি রাষ্ট্র। করোনাকালীন সময়ে এই ভিত্তি বা পিলারকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আমরা ফিরে পেয়েছি তা ইতিমধ্যে বোধগম্য হয়েছে হয়তোবা। গতকিছুদিনে এই তিনটি সামাজিক কৌণিক ভিত্তির ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার উদাহরণ আমদের পরবর্তী করণীয়র জন্য কিছুটা হলেও উপলব্ধির সৃষ্টি করবে।

মানবিক সমাজ করোনার আক্রমণের প্রথমেই আক্রান্ত হয় ঢাকার তলারবাগের একটি বাড়ির বাসিন্দা আর তাতে ওই সমাজের মানুষের পৈশাচিক আচরণ হতবাক করেছে হয়তো অনেককে। নারায়ণগঞ্জের জীবনবাজি রেখে সেবা দিয়ে যাওয়া ডাক্তার এবং তার পরিবারের ১৭ জন করোনা আক্রান্ত হলে এলাকার লোকজনের বাড়ি ভাঙচুরসহ অমানবিক আচরণ থেকে পরিবারকে উদ্ধার করে প্রশাসন। এমন অনেক উদাহরণ আজ আমাদের সমাজে।

মানবিক পরিবার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ভালবাসায় গড়ে ওঠা সম্পর্ক আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করে সবসময় সবখানে। চরম খাটনির পরে বাবা-মা কিংবা সন্তান-স্ত্রী-স্বামীর হাসিমুখ খানা আমাদের প্রজ্বলিত করে। সম্পর্কগুলো কি আসলেই ভালবাসায় মজবুত হয়েছে?

গত সপ্তাহে ঢাকায় করোনায় আক্রান্ত মৃত পিতার লাশ গ্রহণ করেনি পরিবার, নারায়ণগঞ্জ এবং ঝিনাইদহে বাড়ির প্রধান মানুষটি লাশ হয়ে পড়েছিল প্রশাসনের অনুরোধ রাখেনি তাদের পরিবার-পরিজন। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যা আলোচনা কিংবা লিখতে শিহরিত হতে হয়।

মানবিক রাষ্ট্র উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠা একটি এমারজিং অর্থনীতির দেশ আমাদের বাংলাদেশ। আসলেই কি এই রাষ্ট্র সকল সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিক? এই প্রশ্নের উত্তর কিংবা আলোকপাত খুবই জটিল, কারণ আমরা রাজনৈতিক বিভাজিত জাতি বা রাষ্ট্রীয় নাগরিক সমাজ। রাষ্ট্রের মৌলিক গঠন প্রক্রিয়া এবং ব্যবহারিক আচরণ বিন্যাস সকলেরই মোটামুটি অবগত যা আজকের আলোচনার বাইরে।

আমাদের সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত বা নিয়োজিত মানুষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা এবং অব্যবস্থাপনা আমদের কী শিক্ষা দেয়? শুধু যোগ্য হলেই চলে না, চাই দক্ষ এবং সৎ মানুষ যারা সামগ্রিকতা বোঝেন কিন্তু বিন্দু লেহন করেন না।

অফিস-আদালত বন্ধ, বাড়ি-ঘর লকডাউন কিন্তু স্বাস্থ্য ঝুঁকির চরমে থাকা গার্মেন্টস খুলে দিয়েছে। তা নাকি সীমিত আকারে বা সামাজিক ডিস্টেন্স মেনে কাজ করবে। এরা ফ্যাক্টরির বাইরে থাকেন কোথায়? এক রুমে সাত-আটজন গাদাগাদি করে থাকেন। এর অভিজ্ঞতা আমরা পেয়েছি মিডিয়াতে। এরা জীবিকার জন্য জীবন বাজি রেখে কাজে যোগ দিয়েছেন। এদের জন্য কি কিছুটা মানবিকতা রাষ্ট্রের দায়িত্ব না?

এই চিত্রের বাইরে আমরা মানবিকতা খুঁজে পেয়েছি অনেক। আমাদের চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সেবা কর্মী, সাংবাদিক, ব্যাংকার, বিক্রয় পেশাজীবী এবং সরকারের প্রশাসনসহ অন্যান্য পেশার মানুষগুলো। সেনাবাহিনী, র‍্যাব আর বাংলাদেশ পুলিশ তাদের মানবিকতা, প্রফেশনালিজম মানুষের মনকে জয় করেছে।

করোনা একটি ভাইরাসজনিত রোগমাত্র কিন্তু পুরো দুনিয়াকে কাঁপিয়ে অজস্র শিক্ষা দিয়েছে মানবজাতিকে, তার মধ্যে আমাদের একটি শিক্ষা অবনত মস্তিকে পালন করা অতীব জরুরি মানবতা। আসুন আমরা মানবিক হই সর্বত্র সবার জন্য সবখানে সবসময়। মানুষ খুবই অসহায় এবং সীমিত তা বুঝে গেছি আমরা সবাই। অঢেল অর্থ-সম্পদ বা ক্ষমতা কাজে আসে নাই। কেননা মানবিক বন্ধনই তৈরি হয়নি আমাদের সমাজ-পরিবার এবং রাষ্ট্রে।

লেখক: ড. শরীফুল ইসলাম দুলু, প্রধান নির্বাহী, মার্কটেল কনসালটেন্সি গ্রুপ এবং ফাউন্ডার স্কুল অব সেলস ম্যানেজমেন্ট

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত