করোনা হয়তো চলে যাবে কিন্তু আমরা কি সব ভুলে যাব?

  মো. শাহ জালাল মিশুক ৩০ মে ২০২০, ০২:১৯:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

নোভেল করোনাভাইরাস, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯। এই রোগটিকে বিশ্ব মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাসের জন্য যেহেতু এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি, তাই এর প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সাধারণ মানুষের বদলাতে হবে কিছু অভ্যাস। এসব অভ্যাস পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের নিজের যেমন ঝুঁকি কমে, অন্যরাও ঝুঁকি থেকে বাঁচে।

তাই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে, পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোকে ও সমাজের অন্যদের নিরাপদ রাখার স্বার্থেই এগুলো করতেই হবে। এছাড়াও করোনা প্রতিরোধে বাসার বাইরে বের হলে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ভ্রমণের সময় এবং অধিক মানুষের সমাগম হলে সামাজিক দূরত্বের পাশাপাশি নিয়মানুযায়ী মাস্ক পরতে হবে। পাশাপাশি সব সময় নিজের সঙ্গে হ্যান্ড-স্যানিটাইজার রাখতে হবে যাতে যখনই হাত অথবা সঙ্গে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অপরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে তখনই যেন প্রয়োজন মতো হাত কিংবা মোবাইল, মানিব্যাগ, চশমা ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিষ্কার করে ফেলা যায়।

টাকা (ব্যাংক নোট) ছাড়া আমাদের প্রাত্যহিক জীবন অচল। অথচ সেই টাকাই আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই টাকা একেক সময় একেক জনের হাত ঘুরে অন্যজনের হাতে যাচ্ছে। ময়লা আবর্জনায় পড়ে যাওয়া টাকা আবার ফিরে আসছে মানুষের হাতে হাতে। এসব টাকায় রয়েছে ‘ই-কোলাই’ ও ‘ফেকাল কলিফর্ম’ জাতীয় ব্যাকটেরিয়া, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অনার্সের শেষ বর্ষের ছাত্রী নিশাত তাসনিমের এক গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘স্টাডি অন দ্যা ব্যাকটেরিয়াল কন্টামিনেশন অন পেপার মানি অ্যান্ড কয়েনস অব খুলনা সিটি এরিয়া’। ছয় মাস ধরে নগরীর ১৫টি উৎস থেকে টাকা ও কয়েন সংগ্রহ করে তা ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় মাংস, মাছ ও মুরগি বিক্রেতার কাছ থেকে নেয়া টাকায় সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া ও মলের জীবাণু পাওয়া যায়।

অন্য ১২টি উৎস থেকে নেয়া টাকার নোট এবং কয়েনেও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের গবেষণা সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী এসব তথ্য জানিয়েছেন। এছাড়াও যেহেতু টাকা সরাসরি মানুষ হাত দিয়ে ধরে, অনেক সময় মুখের থুথু নিয়ে কাউন্ট করে। তাই এর মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এমন আশঙ্কায় চলতি বছরের মার্চ মাসে ভাইরাসে উপস্থিতি নিয়ে টাকা বা ব্যাংক নোট জীবাণুমুক্ত করার একটি উদ্যোগ দেখা যায় চীনে। দেশটিতে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সেখানে ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে বাজার থেকে ব্যাংক নোট সরিয়ে নিয়ে তা আবার জীবাণুমুক্ত করে বাজারে ছাড়ে দেশটি।

তাই এই ভাইরাস প্রতিরোধে টাকা-পয়সা হাত দিয়ে ধরার পরে দুইহাত ভালোভাবে সাবান-পানি বা হ্যান্ড-স্যানিটাইজারের মাধ্যমে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। অর্থাৎ এসব বিবেচনায় একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আমাদের নিজেদেরকে যেকোনো মূল্যে সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে স্যানিটেশন ও হাইজিনের মান সারাদেশেই এখনো নিম্নপর্যায়ে রয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলের মনুষ্য বর্জ্য নিষ্কাশনে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বটে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব এখনো ব্যাপক।

গৃহস্থালির স্যানিটেশন ও হাইজিনের বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা "ইউনিসেফ" এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যগত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বছরে ৪২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। এই অর্থ বাংলাদেশের জিডিপির ৬ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। পাশাপাশি বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর ৫ বছরের নিচে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন শিশু ডায়রিয়ায় বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, যার শতকরা বেশিরভাগ শিশুই উন্নয়নশীল দেশগুলোর। অথচ নিয়মিত দিনে অন্তত পাঁচবার সঠিক নিয়মে হাত ধুয়ে এই মৃত্যুর হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

এছাড়াও খাবার গ্রহণ করার আগে দেশের মাত্র ৪০ ভাগ মানুষ সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে থাকে। খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে হাত ধুতে মাত্র ৩৬ ভাগ মানুষ সাবান ব্যবহার করছে। মলত্যাগের পর হাত ধোয়ায় সাবান ব্যবহার করছে ৫৫ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ন্যাশনাল হাইজেনিস সার্ভে-২০১৯’ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এই ধরনের সমীক্ষা ও গবেষণাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে নিঃসন্দেহে অনুধাবন করতে পারবো যে, শুধুমাত্র করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নয় বরং প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে সুস্থ থাকতে হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুবই জরুরি।

কিন্তু পূর্বেও যখন সার্স ও সোয়াইন ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে নানাবিধ ইতিবাচক বার্তা দিয়ে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক না কেন বাংলাদেশে অনেকাংশেই এমন বার্তায় ব্যাপকভাবে মানুষের অভ্যাসগতভাবে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা দীর্ঘ মেয়াদে পরিলক্ষিত হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আমরা বেশ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছি। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে করোনা প্রতিরোধে সর্বদা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে।

যেহেতু গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে এবং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও বড় হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। পাশাপাশি গত ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর সমগ্র বাংলাদেশকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থেকে করোনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা উচিত। যেহেতু প্রাত্যহিক জীবনেও সুস্থ থাকতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুবই জরুরি। তাই বৈশ্বিক মহামারী নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠা নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলাসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সকল অভ্যাস সামনের দিনগুলোতে নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া উচিত। এমনকি সেটা চালিয়ে যেতে হবে করোনাভাইরাস থেকে আমাদের সম্পূর্ণরূপে মুক্তি মিললেও।

লেখক: মো. শাহ জালাল মিশুক, সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত