করোনা কি চিকিৎসকদের অভিভাবকহীন করে ফেলবে?

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৬ জুন ২০২০, ১৬:৩২:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

অধ্যাপক এন আই খান ও প্রফেসর এসএএম গোলাম কিবরিয়া। ফাইল ছবি

মেডিসিনের গুরু বলে খ্যাত এন আই খান স্যারের পর চলে গেলেন আমাদের আরেক কিংবদন্তী ইউরোলজিস্ট ও শিক্ষাগুরু প্রফেসর কিবরিয়া স্যার।

কিবরিয়া স্যার আর নেই! করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেলের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

অধ্যাপক ডা. এস এ এম গোলাম কিবরিয়া স্যার ইউরোলজির অধ্যাপক, বিএসএমএমইউ ইউরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, বিসিপিএসের সাবেক সভাপতি। তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক। এমনকি আমাদের শিক্ষকদেরও শিক্ষক ছিলেন তিনি।

সবার প্রিয় এ স্যার নিজেই অসাধারণ এক প্রতিষ্ঠান। অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব আর সিংহপুরুষ ছিলেন আমাদের এই কিবরিয়া স্যার। স্যার জানতেন কিভাবে শাসন করতে হয়, কিভাবে শিষ্য তৈরি করতে হয়। মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত; যিনি নিজের জন্য কারো কাছে কিছু চাননি কিন্তু করে দেখিয়েছেন সবার জন্যে, প্রয়োজনে ভালোবাসার সবটুকু উজাড় করে। লালন করতেন ঢাকা মেডিকেলের ইতিহাস ঐতিহ্য।

মেডিসিনের গুরু এন আই খান স্যারকে আমরা ছাত্র জীবনে পাইনি, কেবল স্যারের গল্পই শুনেছি সিনিয়র ভাই এবং আমাদের স্যারদের কাছে৷ স্যার নাকি মধ্য রাতে হঠাৎ করে গাড়ি হাঁকিয়ে চলে আসতেন ওয়ার্ডে। একা একাই, ডি ও ডি (DOD) কে সাথে নিয়ে সব রোগীর খবরাখবর আবার নিতেন।

কখনও বা চেম্বারে বসেই স্যার ফোন দিতেন, "এই ওয়ার্ডের ১২ নাম্বার বেডের পেশেন্টের ইউরিন রিপোর্টটা কি এসেছে, ফাইন্ডিংস বলতো?',কেবিনের রোগীটা কেমন আছে। ওয়ার্ডে কিংবা কেবিন সব পেশেন্টের সাইন সিম্পটম স্যারদের মনে গাঁথা।

অধ্যাপক এন আই খান স্যারকে ছাত্রজীবনে না পেলেও আমি আমার নিকটাত্মীয়কে নিয়ে স্যারের চেম্বারে গিয়েছি। সিরিয়াল লম্বা থাকলেও স্যার পরিচয় পেলে আগেই ডেকে নিয়েছেন।

প্রফেসর ডা. কিবরিয়া স্যারকে আমরা (DMC, K- 52 Batch) পেয়েছি ঢাকা মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে, ফিফথ ইয়ার ও ইন্টার্ন লাইফে। সততা আর সাহসিকতার অপূর্ব সমন্বয়। স্যারকে আমরা ভয় পেতাম যেমন, সম্মান করতাম তেমন।

শুনেছি বেশ আগে এক মন্ত্রী মহোদয় ওয়ার্ডে গিয়েছেন পরিচিত রোগীকে দেখতে। স্যার তখন ওয়ার্ড সংলগ্ন তার রুমে ছাত্র পড়াচ্ছিলেন। স্যার ভাবছিলেন মন্ত্রীমহোদয়কে এটেন্ড না করায় এইবার বোধহয় চাকরিটা গেলো। কিন্তু না। স্যারকে উলটো মন্ত্রী মহোদয় বাসায় ডেকে দাওয়াত খাওয়ালেন।

সম্ভবত রোগীর কাছ থেকেই স্যার সম্পর্কে অবগত হয়ে এমন। ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীরা যেনো স্যারের পরম আত্মার আত্মীয়।

মানুষ বুক দেখায় মেরুদণ্ড দেখায় না; কিবরিয়া স্যার এমন। "ভালো ডাক্তার হবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে", এই ছিলো স্যারদের দীক্ষা। মানহীন, ডোনেশন নির্ভর ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা নাম সর্বস্ব মেডিকেল কলেজ আর তাদের সার্টিফিকেট নির্ভর গুণহীন ডাক্তার তৈরির প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিলেন প্রফেসর কিবরিয়া স্যারেরা।

অভিভাবকদের এভাবে চলে যাওয়া শুভলক্ষণ নয়। স্যারদের অভাব কোনকিছু দিয়ে পূরণ হবার নয়। আল্লাহ স্যারদের জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

বারবার শংকা জাগছে মনে এ কেমন অন্ধকার ছেয়ে যাচ্ছে চারিদিক। একে একে অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়ছি সবাই। পরম করুণাময়ের কাছে কায়মনোবাক্যে মানত করি, "হে দয়াময় আমাদের গুরু, আমাদের পরশপাথরদের তুমি আর এভাবে নিয়ে যেও না। আমাদের অভিভাবক শূন্য করোনা"।

লেখক: ডা. সাঈদ এনাম

সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
(ডিএমসি,কে-৫২)

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত