বর্ষায় বাড়ুক বৃক্ষ সংসার

  হাসান মাহমুদ গুরু ০২ জুলাই ২০২০, ২২:২৫:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

মেঘ কালো আকাশ। মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে চারিধার। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের ওপারে কালো মেঘেদের রেখা টেনে দিয়েছে সূর্যের দেখা। ক্ষেত পেরিয়ে মায়া বিলের পাড়ে, ঝিল পেরিয়ে পাখিদের সংসারে ঠায় দুপুরেই নেমেছে সাঁঝের আঁধার। শনশন বইছে উড়ানি বাতাস। মেঘ গুড়গুড় ডমরু ডাকে, নিমিষেই বাঁকে বাঁকে শীতল পরশ।

তাল,তমাল আর শাল সেগুনের বনে বাতাসের ঢেউ মৃদঙ্গ বাজায়। মেঘেদের গা বেয়ে টিনের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। তাল লয়ে বেজে চলে ঝুম বৃষ্টি অবিরাম। আবছা আঁধারে, চারিধারে টুপটাপ জল পতনের অপার্থিব সুর। নির্জন সুমধুর সে বৃষ্টিজল ধুয়ে যায় মাঠ, ঘাট, ক্ষেত বিস্তীর্ণ লোকালয়। খাল, নদী, নালা, বিলে থৈ থৈ জল তরঙ্গের খেলা। যতদূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ জলাধার। বাদল দিনের ঝরঝর মুখরতায় কদম, কেয়া, যূথিকার বনে জাগে সজীব সঞ্জীবন।

একটানা রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টি অবিরাম ঝরে। ঘন ঘাস বাঁধানো মেঠো কাদাপথ পেরিয়ে পুকুর জলে থৈ থৈ বৃষ্টির গান। ঘাটে বাধা ছিপনৌকা তিরতির ছুটে চলে জলের বুক চিরে। কিশোরের দল মাতে শাপলা শালুক সন্ধানে। বর্ষাজলে ভরে উঠে আউশের ক্ষেত, চলে বৃষ্টি ভেজা মাছ ধরা উৎসব, ব্যাঙেদের কোলাহল। জানালার ধার ঘেঁষে বেড়ে উঠা কদমের ডালে গা ভেজা পাখিদের অবসাদ। দূরের ঝিলে পোঁতা বাঁশে, বসা নিমগ্ন বক, চুপচাপ টইটুম্বুর পানিতে গা ভেজায় পানকৌড়ি।

মেঘ গুড়গুড় একটানা অঝোর শ্রাবণে ধুয়ে যায় জীর্ণতার মলিন পৃষ্ঠা। বনে বনে জেগে ওঠে গাছেদের সংসার। বনবিথীকায় লাগে প্রাণের ছোঁয়া। এমনই বর্ষা ছিল এ দেশের গাঁও গেরামে।

আদতে বৃষ্টি শুনলেই যেন কৈশোর এসে গলা জড়িয়ে ধরে। বৃষ্টিজলে সমস্ত চরাচর ভিজে উঠলে, মাটির সোঁদা ঘ্রাণে ভিজে ওঠে ভালবাসা ভরা নিত্য চপলতা। প্রতি পলে খোলতাই হয় প্রকৃতির রূপ। বাংলা সাহিত্যে তাই বর্ষা বন্দনায় কবি লেখকদের সৃষ্টিশীলতা ভরপুর। শুধু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই ঋতুভিত্তিক গান আছে ২৮৩টি, যার মধ্যে ১১৫টি বর্ষার গান। এমন বর্ষা বন্দনা হয়তো স্মৃতিকাতরতায় যুগ যুগ বাঙালিকে নষ্টালজিক করে তুলবে। কিন্তু গাঁও গেরামের বর্ষার সেই রূপ মাধুর্য্য এখন আর তেমন নেই। দিনে দিনে গ্রামে, শহরে, নগরে প্রকৃতি অপার সৌন্দর্য হারিয়েছে মানুষের রোষানলে।

নগরায়ন হয়েছে। শহুরে ইট, পাথরের জঙ্গলে তলিয়ে গেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। চলেছে ব্যাপক বৃক্ষ নিধন। অথচ এমন বরিষণে নবধারা জলে প্রকৃতি জেগে ওঠে আষাঢ় শ্রাবণে। গাছে গাছে পত্রপল্লব ধুয়ে মুছে স্নিগ্ধতা পায় সবুজের সমারোহ। শুকিয়ে যাওয়া নদী, নালা, খাল বিল বর্ষার জলে থৈ থৈ করে ভাসে। যেন শুষ্ক, রুক্ষতা শেষে প্রাণ ফিরে পাওয়া এক ভরপুর সরস জীবন। বৃষ্টিতে মাটি পায় জল, সে জলসিঞ্চনে বৃক্ষতরু জেগে উঠে লকলকিয়ে। গাছেদের সংসারে লাগে নবজীবনের দোলা। তাই বর্ষা বন্দনার সাথে যোগ আছে বৃক্ষরোপণ উৎসবের।

গাছ। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক যাদুকরী অলংকারের নাম। অক্সিজেনের অফুরন্ত ভাণ্ডার এই গাছ-গাছালি। বৃক্ষের কথা বলতেই চলে আসে বৃক্ষ জননীর নাম। পরিবেশ দূষণরোধ আর গ্রামীণ নারীদের জীবন জীবিকার জন্য গাছ লাগানো আন্দোলনের এক কিংবদন্তি বৃক্ষ জননী খ্যাত ওয়াঙ্গারি মাথাই। ১৯৭৭ সালে গড়ে তোলা ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের গ্রিনবেল্ট মুভমেন্ট কেনিয়া ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো আফ্রিকায়। তার উদ্যোগে সে সময় কেনিয়াতে সাড়ে চার কোটি গাছ লাগানো হয় যা রুখেছিল মরুময়তা। আফ্রিকার প্রথম নারী হিসেবে এই কৃষ্ণাঙ্গ ভূষিত হন নোবেল সম্মাননায়।

পৃথিবীর উষ্ণায়ন রোধে ছায়া সুনিবিড় বৃক্ষ শুধু শীতলায়নের প্রতীকই নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকার এক বিশাল অনুষঙ্গ। শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে সাম্প্রতিক অতীতে গোটা পৃথিবী জুড়ে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। জলবায়ু ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদনশীল স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যেমন- অপুষ্টি, ডায়রিয়া, সোয়াইনফ্লু, ডেঙ্গু, ইবোলা করোনা ইত্যাদি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের পরিবেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড ব্যাপক বৃদ্ধি।

পারমাণবিক চুল্লি, কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি জীবাণু জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, মিথেন, ওজোন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে। যার ফলে বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে উষ্ণতা বেড়ে তা প্রভাবিত করছে পৃথিবীর জলবায়ুকে। বিভিন্ন অঞ্চলে বদলে যাচ্ছে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের প্রকৃত পরিমাণ, বদলেছে ঋতু ছন্দও। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর উষ্ণতা প্রতি দশকে প্রায় ০.১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়ে চলেছে। গলে যাচ্ছে হিমবাহ ও মেরু প্রদেশের বরফ।

সমুদ্রতলের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। এশিয়া অঞ্চলের সমুদ্রতল ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বেড়ে যাবার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পৃথিবীর নানা অঞ্চলে বাড়ছে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া। বিশেষ করে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এই পরিবর্তনগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নানামুখী স্বাস্থ্যসমস্যা ডেকে আনছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনে গত অর্ধ শতাব্দীতে আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যাও প্রায় ৩ গুণ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এর কুফল ২০৯০ সালের মধ্যে খরাপীড়িত এলাকা অনেক বাড়িয়ে দেবে। আর খরার গড় সময়কাল বেড়ে যাবে প্রায় ৬ গুণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও পৃথিবীগ্রাসী ভয়াবহতার এমন শংকাধ্বনির বিপরীতে ধরণীকে শীতলীকরণের বিকল্প নেই। তাই বৃক্ষরোপণ অর্থাৎ সবুজ বনায়ন হতে পারে শীতলীকরণের অন্যতম এক নিয়ামক।

পৃথিবীর উষ্ণায়ন রোধে ব্যাপক হারে কার্বন নিঃসরণসহ দূষণ হ্রাসের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ দিতে পারে স্বস্তি। আর বৃক্ষের জন্য বর্ষা হল সবচে উপযুক্ত ঋতু। জলে জঙ্গলে, আপামর প্রকৃতিতে বৃক্ষরাজি, তরুলতারা বেড়ে ওঠে আপন শৃঙ্খলায়। তাই বাঙালির এই আষাঢ় শ্রাবণের রূপ সুধা পানের পাশাপাশি বাড়াতে হবে বৃক্ষের সবুজ সংসার। ফলজ, বনজ এবং ওষধি সব ধরনের গাছই লাগাতে হবে ভরা বর্ষায়। দেশে মোট ভূমির যে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল প্রয়োজন তা এখনও অর্জিত হয়নি। অবাধে বৃক্ষ নিধন ও বন উজাড়ের বিপরীতে বৃক্ষরোপণের হার অনেক কম। প্রতিবছর স্কুল, কলেজ পর্যায়সহ দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেয়া হলেও ৪-৫ বছর পর সেসব গাছের কতগুলো টিকে আছে তার তেমন তদারকি নেই।

তাই গাছ লাগানোই শেষ নয়, পরে তার পরিচর্যা ও বেড়ে উঠার বিষয়টিও বছর বছর নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে যখন বর্ষার আগমন ঘটে তখন মৌসুমি ফলেরও পসরা বসে। সেজন্য ফলের বীজ বোনা, আর জল পেয়ে মাটি ভেদ করে তার বেড়ে উঠা বেশ সহজ হয় বর্ষায়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি এমন আষাঢ় শ্রাবণে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে অধিক হারে গড়ে তুলতে হবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

বৃক্ষরোপণ করে নোবেল বিজয়ী ওয়াঙ্গারি মাথাই যেমন একটি সবুজ ধরণী রেখে যেতে চেয়েছিলেন, তেমনি অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি সুশোভিত সবুজ পৃথীবির কথা ভেবেই বাড়াতে হবে অক্সিজেনের কারখানা, অর্থাৎ বনবিথীকায় ঘেরা স্বদেশ। নিধন আর দূষণের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে আমাদের প্রিয় সুন্দরবনকেও। ছাদের আঙ্গিনায়, রাস্তার দু’ধারে কিংবা বাড়ির চারপাশে সবাইকে সবুজে ভরে তুলতে হবে বর্ষার বৃক্ষরোপণে। তবেই ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছের সমারোহে সাজানো বাগানে ঝাঁক বেঁধে কিচিরমিচির গান গাইবে পাখিরা।

তবেই হয়তো নীপবনে ছায়বিথী তলে বর্ষা স্নানের উৎসব হবে। নয়তো উষ্ণায়নের রোষানলে ধ্বংসের দিকে ধাবমান ধরণী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপতায় বারবার আক্রান্ত হবে করোনার মতো ভাইরাসের হিংস্র নখরে। প্রকৃতির শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে আগামীতেও হয়তো প্রতিশোধ নিতে পারে নতুন কোনো অণুজীব..।

হাসান মাহমুদ গুরু

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট,এনটিভি

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত