করোনাকালীন নতুন স্বাভাবিক জীবন

  অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ ২৮ জুলাই ২০২০, ২২:২৫:২১ | অনলাইন সংস্করণ

করোনার প্রতীকী ছবি

এখন বিশ্ববাসীর একটাই চাওয়া- কবে করোনার ভয়াল থাবা থেমে যাবে। কবে আবার আমরা পুরনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব। সামনে কোরবানির ঈদ। দুশ্চিন্তা হল- আবার গত ঈদের মতো করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি না পায়। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিভাবে কোরবানির ঈদ উদযাপন করব সে দিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

১৪০তম দিনে বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুবরণ করেছে ৩৮ জনসহ মোট প্রায় ৩০০০ জন। সর্বমোট আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার জন। করোনায় সারা বিশ্বে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার মারা গেছে। সারা বিশ্বে আক্রান্ত ১ কোটি ৬১ লাখ। স্পেন ও জার্মানিতে ২য় দফা করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে আক্রান্তের হার অনেক বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।

হাসপাতালগুলোতে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে সরাসরি করোনারোগী চিকিৎসা করার কারণে চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যাপকভাবে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ হিসেবে প্রথমদিকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম- মাস্ক, পিপিই নিম্নমানের হওয়ায় আক্রান্তের হার বাড়ে। এমনকি এই পিপিই ব্যবহার বিধি (Doning & Dofing)-এর Training ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা হয়।

কর্মরত চিকিৎসকগণ তার পরিবারে ফিরে আসার মাধ্যমে পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০ দিন ডিউটি করার পর পরবর্তী ১১ দিন আইসোলেশনে থাকার জন্য বাসার পরিবর্তে হোটেল বা অন্য কোনো স্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে সমন্বয়হীনতা ছিল; যার ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। আরেকটি বিষয় হল আমাদের দেশে করোনা টেস্টের ক্ষেত্রে আগ্রহী অনেকেই টেস্ট করতে না পারায় এবং টেস্টের সরঞ্জামাদি কম থাকায় শনাক্তকরণের পরিমাণ যথাযথ নয়।

এ ছাড়া আক্রান্ত অনেকেই উপসর্গহীন থাকায় অনেক স্বাভাবিক ব্যক্তি তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসা করাতে এসেও অন্যান্য স্বাভাবিক রোগী এবং চিকিৎসক-নার্সদেরকেও আক্রান্ত করছে। এই উপসর্গহীন রোগীর মাধ্যমে ফ্রন্টলাইনার চিকিৎসক, নার্স, সাংবাদিক, পুলিশরা বেশিরভাগ সংক্রমিত হচ্ছেন। শিফটিং ডিউটি এবং মাস্ক ব্যবহারের মাধ্যমে ফ্রন্টলাইনারগণ সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

যে সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী বয়স্ক এবং কো-মরবিড (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসকষ্ট রোগী)-দের অনলাইনে অফিস করা উচিত। অফিস স্টাফের সংখ্যাও কমানো উচিত। উপসর্গ নিয়ে কেউ যেন অফিসে না আসে সেই বিষয়টি অফিস প্রধানগণকে নিশ্চিত করতে হবে।

এই অচেনা রোগটি কখন কাকে অক্রমণ করবে কেউ জানে না। তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনীতি সচল করার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে হবে। বিগত ৬৬ দিনের লকডাউনে অকল্পনীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে চার লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। যদিও জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ কোটি লোককে খাদ্য প্রদান, ৫০ লাখ লোককে নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। এখন সব ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য শুধু সরকার নয়, দলমত নির্বিশেষে বিত্তবান সবাইকে মুক্তহস্তে এগিয়ে আসতে হবে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যে সমন্বয়হীনতা আছে, কৃত্যপেশাভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রশাসনের মাধ্যমে তা দূর করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুপাতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য জনশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রয়োজন।

করোনাকে ভয় নয়, বরং সচেতনতা এবং আন্তরিকভাবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা অবলম্বন করার মাধ্যমে আমরা 'নতুন' স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হব।

সামনে কোরবানি ঈদ। ঈদের আনন্দ অতীতের ন্যায় হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি, ভুলে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ ও কোরবানিতে অংশগ্রহণ করতে হবে। কোরবানির পশুর হাটে ভিড় এড়ানোর জন্য কমপক্ষে ১ মিটার বা ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পশুর হাটে ঢোকার পূর্বেই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে হাত ধৌত করার বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করবে। সঙ্গে সঙ্গে নতুন মাস্ক সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঈদের আগে সারা দেশ থেকে ঢাকা শহরে মৌসুমী কসাইদের সমাগম হয়। জ্বর, সর্দি, হাঁচি, কাশি থাকা ওই সমস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। সুতরাং সিটি কর্পোরেশন যদি নির্দিষ্ট স্থানে (স্লটার হাউজ)-এর মাধ্যমে কোরবানির ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে করোনা সংক্রমণ কমানো যাবে। সব পরিবহনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাস্ক ও গ্লাভস পরে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা উচিত ত্যাগ ও শুদ্ধি পবিত্রতা সমৃদ্ধ করে। পবিত্র ঈদুল-আজহা স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপন করতে পারলেই আমরা সবাই সুস্থ থাকব। বাংলাদেশও করোনার ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করবে।

সবাইকে অগ্রিম ঈদ শুভেচ্ছা।

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ
চেয়ারম্যান, কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা।
প্রাক্তন মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা।
প্রাক্তন উপ-উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত