পর্যটনে নারীর প্রসার
jugantor
পর্যটনে নারীর প্রসার

  পরীক্ষিৎ চৌধূরী  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০১:৫০  |  অনলাইন সংস্করণ

‘আমি আগে সমাজে কোনো বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতাম। এখন আমি মনে করি আমিও আমার সমাজে কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করি। আমি এখন বিশ্বাস করি যে কোনো বিষয়ে আমার মতামত প্রদানের অধিকার আমার আছে। ...… আমি সব মিটিংয়ে অংশ নিই এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখি।’

বিশ্বব্যাংক গ্রুপ উদ্ভাবিত ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম পথ’ প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার তিন বছর পর জর্ডানের এক নারী অংশগ্রহণকারী এই কথাগুলো বলেছিলেন।

তুরস্ক, জর্ডান, ইসরায়েল এবং পশ্চিম তীরের বিস্তৃত ১০০০ কিলোমিটার পথজুড়ে অবস্থিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভূতাত্বিক এবং ধর্মীয় স্থানে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ‘আব্রাহাম পথ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ২০১৪ সাল থেকে।

ক্ষুদ্র-পরিসরের এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি উল্লিখিত ঐ চারটি দেশের ১৩৭ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যার ৫৭% নারীদের অধিকারে। তবে কর্মসংস্থান ছাড়িয়ে যে সুবিধা ও অধিকারগুলো এই নারীরা ভোগ করছেন, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁরা এখন জড়িত হওয়া শুরু করেছেন, যা আগে ভাবতেও পারতেন না এবং ধীরে ধীরে তারা আরও ক্ষমতায়িত বোধ করছেন।

ভ্রমণ এবং পর্যটন যে নারীকে জানতে সাহায্য করে এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতায়িত করতে পারে এই প্রকল্পটি তার উজ্জ্বল প্রমাণ। পর্যটন নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখে। অন্যান্য খাতের তুলনায় পর্যটন নারীর কর্মশক্তি তৈরি, নারী উদ্যোক্তা এবং নারী নেতৃত্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি করে।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা- ইউএনডব্লিউটিওর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে বিশ্বের অনেক দেশে অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় পর্যটন ব্যবসায়, পর্যটন সমিতি ও পর্যটন প্রশাসনে নারী নেতৃত্ব বেশি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নারীদের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন ও সুবিধা প্রদান সত্ত্বেও পর্যটন খাতে নারী-পুরুষ ভেদে ব্যাপক বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। এই অসমতা দূর করার জন্য লিঙ্গ সমতার বিষয়টি শুরুতেই পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আব্রাহামের পথ প্রকল্পের মধ্যে সে অঙ্গীকার ছিল।

গত কয়েক বছরে, নারী ভ্রমণকারীদের হার অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকাল বন্ধুদের সাথে বিদেশ ভ্রমণ বা একক যেতে দেখা যাচ্ছে অনেক নারীকে। বহির্বিশ্বে আতিথেয়তা শিল্পে নারীরা সর্বদা উচ্চহারে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, এমনকি যখন পর্যটকদের পরিচালনা করা বা বুঝতে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা আসে, তখনও নারীরা অনেক বেশি পারঙ্গমতা দেখাতে সক্ষম হন বলে গবেষণায় দেখা গেছে। উন্নত দেশে ট্যুরগাইডদের সম্মানের সাথে দেখা হয়, যে মানসিকতা আমাদের মধ্যেও গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

ইউএনডব্লিউটিওর মতে, কিছু দেশে পর্যটন শিল্পে অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ নারী নিয়োগকর্তা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে হোটেলখাতে শ্রমশক্তির ৬০-৭০% নারী রয়েছে। আফ্রিকার হোটেল এবং রেস্তোঁরাগুলিতে নারীরা অর্ধেকেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করছেন। বাংলাদেশ এই হার অর্জনে অনেক পিছিয়ে আছে।

বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। যেখানে ১৯৭৪ সালে মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, তা বেড়ে ২০১৭ সালে হয়েছে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে এখনো ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ ফারাক রয়েছে, যা সার্বিক অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য এক বিশাল অন্তরায়।


-২-

তবে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কম হলেও একটি বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে, নারীরা এখন গতানুগতিক খাতগুলোর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করছেন। যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, আবাসন, প্রযুক্তি, পর্যটন, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা কাজ করছেন। গত কয়েক বছরে সরকার গৃহীত বিভিন্ন বৈপ্লবিক নীতির সুবাদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় নারীরাও বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পর্যটকদের মন কেড়েছে বহুকাল আগে থেকেই। এদেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মনের খোরাক মেটায়। খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি, বান্দরবান, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনে সারাবছর পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে। কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওর সম্প্রতি সবার মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

পর্যটন বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০১৯ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অবদান রেখেছে। পর্যটন রপ্তানির মাধ্যমে একই বছর ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে এবং এই সেক্টরে বর্তমানে নিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ লাখ কর্মী। এই কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে হোটেল ও বিমান মিলে ১০ শতাংশ ব্যবসায়ী কর্পোরেট শ্রেণির, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৮০ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ প্রান্তিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে নারীর হার কত তার পরিসংখ্যান কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।

পর্যটন বিষয়ক লিঙ্গসমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন কেমন হবে, তা দেখানোর জন্য পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক ক্ষেত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে গ্লোবাল রিপোর্ট অন উইমেন এন্ড ট্যুরিজম-এর দ্বিতীয় সংস্করণ। বিষয়গুলো হলো- কর্মসংস্থান ও শিল্পোদ্যোগ; শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ; নেতৃত্ব, নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ; এবং কমিউনিটি ও নাগরিক সমাজ।

এই রিপোর্ট কিছু অ্যাকশন প্ল্যান সুপারিশ করেছে, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের নারীর ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করবে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পর্যটনখাতে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অ্যাকশন প্ল্যানটি অনুমোদনের এবং বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

এই সুপারিশে পর্যটন ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং সমান বেতনের কাজগুলোকে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই খাতের জন্য লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার কৌশলগুলোর বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিককরণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিসহ পর্যটন ব্যবসায় আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের আসার সুযোগ বাড়িয়ে নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারলে সংশ্লিষ্ট পরিসেবাগুলোর প্রসার ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে বলে এতে বলা হয়েছে।

দেশের পর্যটন খাতে অংশ নেয়ার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কারণে আসতে পারেন না। এখাতে নারীদের অংশগ্রহণ স্থবির হওয়ার পিছনে সামাজিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সঠিক কাজ এবং স্বনিয়োজনের সুযোগের অভাবও বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

পর্যটন শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তাদের যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। পর্যটনের ডিজিটালাইজেশন এক্ষত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তা নারীর উদ্ভাবন এবং ক্ষমতায়নের জন্য আকর্ষণীয় নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। ডিজিটাল ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্মগুলোতে নারীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সর্বোপরি, প্রয়োজন পর্যটন খাতের নারীদের জন্য সমান সুযোগের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা।

পর্যটন একটি বহুমাত্রিক এবং শ্রমঘন শিল্প। এ শিল্পে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াও পরোক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সার্বিকভাবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক উন্নতির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করে সরকার। তাই পর্যটন শিল্প বিকাশে নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশে পর্যটন কেন্দ্র ও পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তার আশেপাশে বসবাসরত নারীরা তাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য পর্যটকদের নিকট বিক্রয় করছে, এ দৃশ্য সারাদেশেই। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এর বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীসহ স্থানীয় নারীদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তাদের ডিউটি ফ্রি শপেও নারীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় হয়। হোটেল ও মোটেলগুলোতে রিসিপশন, হাউজ কিপিং, কিচেন, এমনকি হোটেল ব্যবস্থাপক হিসেবেও নারীকর্মীগণ কাজ করছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি হোটেল-মোটেলেও নারীকর্মীদের সংখ্যা দিন দিন উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সামাজিক ইকোট্যুরিজম শিল্পে নারীদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে করপোরেশন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পর্যটকদের জন্য পল্লী আবাসের মাধ্যমে সামাজিক ইকো-ট্যুারিজম শিল্প নারীদের সেবা প্রদানের বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। বিশেষত পাহাড়, হাওড় ও বন এলাকায় এমন সম্ভাবনা বেশি। এ কারণে ইকো-ট্যুারিজম বিকাশে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে পর্যটন মন্ত্রণালয়।

কমিউনিটি ট্যুরিজম-এর বিকাশের ফলে নারীরা সরাসরি এ সেক্টরের সাথে অধিকহারে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে নারীদের বিশেষভাবে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বছরব্যাপী পর্যটন বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও রয়েছেন। নারীদের জন্য স্পেশাল কুকারি এন্ড বেকারি, ফুড হাইজিন এন্ড সেনিটেশন, স্পেশাল বেকারি কোর্সে মোট প্রায় ৩৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতায়িত করছেন।

দেশের বিদ্যমান ও সম্ভাবনাময় পর্যটনস্পটগুলোর উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। এখাতে প্রশিক্ষিত নারী ট্যুরিস্ট গাইডসহ হোটেল ও মোটেলসমূহে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ছে। নারীদের তৈরি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পপণ্য বিপণনের সুযোগও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

পর্যটন খাতের ব্যাপক প্রচার কার্যক্রমে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন তথ্য ও প্রামান্যচিত্র নির্মাণ এবং বিজ্ঞাপন কার্যক্রমে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে অন্যান্য সংযোগ শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। এর মধ্যে হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ সকল শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণই বেশি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এসব কাজের সাথে সম্পৃক্ত নারীদের স্বাবলম্বী করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারিভাবে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিমানের কেবিন ক্রু, হোটেল ও হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনা, পেশাদার ট্যুর গাইড ইত্যাদি পেশায় দক্ষ নারী কর্মী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইংরেজি ভাষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে নারীকর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ ক্ষমতায়িত সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। নারীর সমতার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকেই ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য সব ধরনের শিল্পে নারীর সমান অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৫, লিঙ্গ সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী পর্যটন যে ভূমিকা রাখছে, বাংলাদেশেও তার ছোঁয়া লেগেছে। একে আরো প্রসারিত করাই এখন মূখ্য দায়িত্ব। পর্যটন শিল্পের মতো দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে এমন একটি খাতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং নারীরা যাতে এ পেশায় স্বাধীনভাবে আয় করতে পারেন, সেজন্য সহায়তা করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।

পর্যটনে নারীর প্রসার

 পরীক্ষিৎ চৌধূরী 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

‘আমি আগে সমাজে কোনো বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতাম। এখন আমি মনে করি আমিও আমার সমাজে কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করি। আমি এখন বিশ্বাস করি যে কোনো বিষয়ে আমার মতামত প্রদানের অধিকার আমার আছে। ...… আমি সব মিটিংয়ে অংশ নিই এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখি।’

বিশ্বব্যাংক গ্রুপ উদ্ভাবিত ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম পথ’ প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার তিন বছর পর জর্ডানের এক নারী অংশগ্রহণকারী এই কথাগুলো বলেছিলেন।

তুরস্ক, জর্ডান, ইসরায়েল এবং পশ্চিম তীরের বিস্তৃত ১০০০ কিলোমিটার পথজুড়ে অবস্থিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভূতাত্বিক এবং ধর্মীয় স্থানে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ‘আব্রাহাম পথ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ২০১৪ সাল থেকে।

ক্ষুদ্র-পরিসরের এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি উল্লিখিত ঐ চারটি দেশের ১৩৭ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যার ৫৭% নারীদের অধিকারে। তবে কর্মসংস্থান ছাড়িয়ে যে সুবিধা ও অধিকারগুলো এই নারীরা ভোগ করছেন, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁরা এখন জড়িত হওয়া শুরু করেছেন, যা আগে ভাবতেও পারতেন না এবং ধীরে ধীরে তারা আরও ক্ষমতায়িত বোধ করছেন।

ভ্রমণ এবং পর্যটন যে নারীকে জানতে সাহায্য করে এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতায়িত করতে পারে এই প্রকল্পটি তার উজ্জ্বল প্রমাণ। পর্যটন নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখে। অন্যান্য খাতের তুলনায় পর্যটন নারীর কর্মশক্তি তৈরি, নারী উদ্যোক্তা এবং নারী নেতৃত্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি করে।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা- ইউএনডব্লিউটিওর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে বিশ্বের অনেক দেশে অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় পর্যটন ব্যবসায়, পর্যটন সমিতি ও পর্যটন প্রশাসনে নারী নেতৃত্ব বেশি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নারীদের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন ও সুবিধা প্রদান সত্ত্বেও পর্যটন খাতে নারী-পুরুষ ভেদে ব্যাপক বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। এই অসমতা দূর করার জন্য লিঙ্গ সমতার বিষয়টি শুরুতেই পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আব্রাহামের পথ প্রকল্পের মধ্যে সে অঙ্গীকার ছিল। 

গত কয়েক বছরে, নারী ভ্রমণকারীদের হার অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকাল বন্ধুদের সাথে বিদেশ ভ্রমণ বা একক যেতে দেখা যাচ্ছে অনেক নারীকে। বহির্বিশ্বে আতিথেয়তা শিল্পে নারীরা সর্বদা উচ্চহারে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, এমনকি যখন পর্যটকদের পরিচালনা করা বা বুঝতে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা আসে, তখনও নারীরা অনেক বেশি পারঙ্গমতা দেখাতে সক্ষম হন বলে গবেষণায় দেখা গেছে। উন্নত দেশে ট্যুরগাইডদের সম্মানের সাথে দেখা হয়, যে মানসিকতা আমাদের মধ্যেও গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

ইউএনডব্লিউটিওর মতে, কিছু দেশে পর্যটন শিল্পে অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ নারী নিয়োগকর্তা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে হোটেলখাতে শ্রমশক্তির ৬০-৭০% নারী রয়েছে। আফ্রিকার হোটেল এবং রেস্তোঁরাগুলিতে নারীরা অর্ধেকেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করছেন। বাংলাদেশ এই হার অর্জনে অনেক পিছিয়ে আছে।

বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। যেখানে ১৯৭৪ সালে মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, তা বেড়ে ২০১৭ সালে হয়েছে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে এখনো ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ ফারাক রয়েছে, যা সার্বিক অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য এক বিশাল অন্তরায়।


-২-

তবে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কম হলেও একটি বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে, নারীরা এখন গতানুগতিক খাতগুলোর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করছেন। যেমন হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, আবাসন, প্রযুক্তি, পর্যটন, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা কাজ করছেন। গত কয়েক বছরে সরকার গৃহীত বিভিন্ন বৈপ্লবিক নীতির সুবাদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় নারীরাও বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। 

বাংলাদেশ পর্যটকদের মন কেড়েছে বহুকাল আগে থেকেই। এদেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মনের খোরাক মেটায়। খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি, বান্দরবান, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনে সারাবছর পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে। কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওর সম্প্রতি সবার মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। 

পর্যটন বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০১৯ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অবদান রেখেছে। পর্যটন রপ্তানির মাধ্যমে একই বছর ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে এবং এই সেক্টরে বর্তমানে নিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ লাখ কর্মী। এই কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে হোটেল ও বিমান মিলে ১০ শতাংশ ব্যবসায়ী কর্পোরেট শ্রেণির, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৮০ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ প্রান্তিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে নারীর হার কত তার পরিসংখ্যান কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।

পর্যটন বিষয়ক লিঙ্গসমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন কেমন হবে, তা দেখানোর জন্য পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক ক্ষেত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে গ্লোবাল রিপোর্ট অন উইমেন এন্ড ট্যুরিজম-এর দ্বিতীয় সংস্করণ। বিষয়গুলো হলো- কর্মসংস্থান ও শিল্পোদ্যোগ; শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ; নেতৃত্ব, নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ; এবং কমিউনিটি ও নাগরিক সমাজ।

এই রিপোর্ট কিছু অ্যাকশন প্ল্যান সুপারিশ করেছে, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের নারীর ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করবে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পর্যটনখাতে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অ্যাকশন প্ল্যানটি অনুমোদনের এবং বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

এই সুপারিশে পর্যটন ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং সমান বেতনের কাজগুলোকে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই খাতের জন্য লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার কৌশলগুলোর বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিককরণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিসহ পর্যটন ব্যবসায় আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের আসার সুযোগ বাড়িয়ে নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারলে সংশ্লিষ্ট পরিসেবাগুলোর প্রসার ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে বলে এতে বলা হয়েছে।

দেশের পর্যটন খাতে অংশ নেয়ার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কারণে আসতে পারেন না। এখাতে নারীদের অংশগ্রহণ স্থবির হওয়ার পিছনে সামাজিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সঠিক কাজ এবং স্বনিয়োজনের সুযোগের অভাবও বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

পর্যটন শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তাদের যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। পর্যটনের ডিজিটালাইজেশন এক্ষত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তা নারীর উদ্ভাবন এবং ক্ষমতায়নের জন্য আকর্ষণীয় নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। ডিজিটাল ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্মগুলোতে নারীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সর্বোপরি, প্রয়োজন পর্যটন খাতের নারীদের জন্য সমান সুযোগের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা। 

পর্যটন একটি বহুমাত্রিক এবং শ্রমঘন শিল্প। এ শিল্পে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াও পরোক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সার্বিকভাবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক উন্নতির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করে সরকার। তাই পর্যটন শিল্প বিকাশে নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশে পর্যটন কেন্দ্র ও পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তার আশেপাশে বসবাসরত নারীরা তাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য পর্যটকদের নিকট বিক্রয় করছে, এ দৃশ্য সারাদেশেই। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এর বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীসহ স্থানীয় নারীদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তাদের ডিউটি ফ্রি শপেও নারীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় হয়। হোটেল ও মোটেলগুলোতে রিসিপশন, হাউজ কিপিং, কিচেন, এমনকি হোটেল ব্যবস্থাপক হিসেবেও নারীকর্মীগণ কাজ করছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি হোটেল-মোটেলেও নারীকর্মীদের সংখ্যা দিন দিন উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

সামাজিক ইকোট্যুরিজম শিল্পে নারীদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে করপোরেশন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পর্যটকদের জন্য পল্লী আবাসের মাধ্যমে সামাজিক ইকো-ট্যুারিজম শিল্প নারীদের সেবা প্রদানের বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। বিশেষত পাহাড়, হাওড় ও বন এলাকায় এমন সম্ভাবনা বেশি। এ কারণে ইকো-ট্যুারিজম বিকাশে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে পর্যটন মন্ত্রণালয়। 

কমিউনিটি ট্যুরিজম-এর বিকাশের ফলে নারীরা সরাসরি এ সেক্টরের সাথে অধিকহারে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে নারীদের বিশেষভাবে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বছরব্যাপী পর্যটন বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও রয়েছেন। নারীদের জন্য স্পেশাল কুকারি এন্ড বেকারি, ফুড হাইজিন এন্ড সেনিটেশন, স্পেশাল বেকারি কোর্সে মোট প্রায় ৩৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতায়িত করছেন। 

দেশের বিদ্যমান ও সম্ভাবনাময় পর্যটনস্পটগুলোর উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। এখাতে প্রশিক্ষিত নারী ট্যুরিস্ট গাইডসহ হোটেল ও মোটেলসমূহে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ছে। নারীদের তৈরি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পপণ্য বিপণনের সুযোগও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

পর্যটন খাতের ব্যাপক প্রচার কার্যক্রমে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন তথ্য ও প্রামান্যচিত্র নির্মাণ এবং বিজ্ঞাপন কার্যক্রমে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। 

পর্যটন শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে অন্যান্য সংযোগ শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। এর মধ্যে হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ সকল শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণই বেশি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এসব কাজের সাথে সম্পৃক্ত নারীদের স্বাবলম্বী করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারিভাবে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিমানের কেবিন ক্রু, হোটেল ও হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনা, পেশাদার ট্যুর গাইড ইত্যাদি পেশায় দক্ষ নারী কর্মী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইংরেজি ভাষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে নারীকর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ ক্ষমতায়িত সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। নারীর সমতার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকেই ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য সব ধরনের শিল্পে নারীর সমান অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। 

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৫, লিঙ্গ সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী পর্যটন যে ভূমিকা রাখছে, বাংলাদেশেও তার ছোঁয়া লেগেছে। একে আরো প্রসারিত করাই এখন মূখ্য দায়িত্ব। পর্যটন শিল্পের মতো দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে এমন একটি খাতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং নারীরা যাতে এ পেশায় স্বাধীনভাবে আয় করতে পারেন, সেজন্য সহায়তা করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।