তালগাছে প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই
jugantor
তালগাছে প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই

  এম. আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:১২:৪৬  |  অনলাইন সংস্করণ

তালগাছ

ঘন সবুজে আবৃত বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, মাঝখানে কর্দমাক্ত মেঠোপথ, তার দু'পাশে মাথা উঁচু তালগাছ আমাদের উপকূল ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। এমন সুন্দর ও নৈসর্গিক দৃশ্য এখন খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বজ্রপাত থেকে রক্ষাকারী পরম বন্ধু তালগাছ। এ কারণে বজ্রপাতের (বিদ্যুৎস্পর্শ) হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ, পশু-পাখিসহ জীববৈচিত্র্য। বজ্রপাতে ২০১০-২০১৯ এক দশকে ২,৫৭১ জন মানুষ প্রাণ হারায়। প্রতি বছর গড়ে এর সংখ্যা ২৫০ এর বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন।

২০১৬ সালে আশঙ্কাজনক ভাবে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটিকে দেশের জন্য নতুন দূর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছর (২০২০) প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারায় ১৯১ জন। দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৩ শতাংশ ঘটে থাকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে; তার প্রায় ৮৪ শতাংশই পুরুষ। আবার মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশ ঘটছে উন্মুক্ত স্থানে অবস্থানের কারণে যার মূল শিকার কৃষক, জেলে ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ।

সাধারণত একটি তালগাছ ৯০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু হয়। উঁচু গাছ হওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি এ গাছের মাধ্যমে মাটিতে গিয়ে আমাদের রক্ষা করে। এ ছাড়াও ভূমিক্ষয়, ভূমিধস, ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধি ও মাটির উর্বরতা রক্ষা করে। তালগাছের আকর্ষণে বাড়ে মেঘের ঘনঘটা; ঘটে বৃষ্টিপাতও। তালগাছের শিকড় মাটির অনেক নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করায় ঝড়ে হেলে পড়ে না কিংবা ভেঙে পড়ে না। যেখানে কোনো কিছু চাষ হয় না সেখানেও তালগাছ তার শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। নতুন রাস্তার ল্যান্ডস্কেপ, বাঁধ ও নদীভাঙন ঠেকাতে এর রয়েছে সফল প্রয়োগ।

বাংলা সাহিত্যে “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে”- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এ কবিতা যেমন আমাদের উপকূল এবং গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি; তেমনি আত্মপ্রত্যয়ী এবং আত্মনির্ভরশীলতারও প্রতীক। অন্যভাবে কবি রজনীকান্তের “বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই/ কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা 'পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।/ বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তাই?; কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।/ পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা/ নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।” মানুষকে মানবিক দিক থেকে জাগ্রত করার জন্য কালজয়ী এ দুটি কবিতা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি, বাবুই পাখির বাসা ও তালগাছ। তালপাতার অন্তরালে পরিশ্রমী বাবুই পাখির শক্ত বুননে দৃশ্যমান কারুকার্যময় ঝুলন্ত ছোট্ট বাসা। প্রকৃতির ঝড়-ঝাপটাও আপন শক্ত বুননের কাছে আত্মপ্রত্যয়ী আরেক প্রতিচ্ছবি। উভয়ই আমাদের জীবনকে বারংবার আত্মনির্ভরশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী হতে আহ্বান করার মতো জাগরণ।

একটি গাছ হিসেবে তালগাছ আমাদের মনুষ্য সমাজকে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, বিবেক নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। ন্যায় ও সত্যতে অটল থাকতে বলে অবিরত। এছাড়াও খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীনের “ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ।/ ঐ খানেতে বাস করে, কানা বগীর ছা।” শিশু মননের তালগাছ কেন্দ্রিক আরেক আলোড়িত ছড়া।

তালের রস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৌখিন পিঠা আগের দিনে বিভিন্ন বাড়িতে তৈরি হতো। তালের পাতা দিয়ে তৈরি হতো নানা কারুকার্যের হাতপাখা। গরমকালে তালপাতার পাখার কদর ছিল সকলের কাছে। কিন্তু তালগাছের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যে বিশাল ভূমিকা আছে এবং পরিবেশবান্ধব; তালের উপকার সম্পর্কে না জানায় তালগাছ ইটভাটায় জ্বালানি, ঘর তৈরির উপকরণসহ নানান কাজে ব্যবহারের জন্য নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে গাছ লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এ কারণে দিন দিন প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। তালগাছ প্রকৃতির বন্ধু ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী বৃক্ষ।

এ গাছ প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও আকাশের বিজলি থেকে মানুষ ও প্রাণী জগৎকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। যে এলাকায় তালগাছের সংখ্যা বেশি, সে এলাকায় ঝড় ও বিজলিতে মানুষ ও পশু-পাখির মৃত্যুহার খুব কম। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাড়ির আঙিনার পাশে, রাস্তার ধারে, অনাবাদি ও পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ করা উচিত।

তাল ফলে ফরমালিন ব্যবহারের সুযোগ নেই। পাকা তালের অপূর্ব সুন্দর ঘ্রাণ সকলকেই মোহিত করে। পাকা তালের রস থেকে নানারকম সুস্বাদু পিঠা, মিছরি ও গুড় তৈরি হয়। সদ্য সংগৃহীত তালের রস পানীয় হিসেবে অনেক উপকারী। দেখতে সাধারণ হলেও এতে থাকা নানা রকম খনিজ উপাদান ও পুষ্টিগুণ, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। তালের শাঁস, তালসত্ত্বা, তালের পায়েশ, তালের নৌকা আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পাকা তালের রস কনফেকশনারিতে শুকনো খাবার প্রস্তুতকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে; স্মৃতিশক্তি, শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা, হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর, হাড়কে শক্তিশালী করাসহ তাল অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শারীরবৃত্তীয় কাজে অংশ নেওয়া এই তালশাঁস খুবই উপকারী, যা শরীরকে দ্রুত শীতল করে। এর বেশির ভাগ অংশ জলীয়। ফলে শরীরের পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তালশাঁস শরীরের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। এমনকি ক্ষয় হয়ে গেলে তা পূরণ করে, তারুণ্য ধরে রাখে।

তালগাছের আঁশ দিয়ে কুটির শিল্পজাত দ্রব্য তৈরি, কারখানায় বাহারি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন ছাড়াও জিও টেক্সটাইল হিসেবে তালের ছোবড়া থেকে তৈরি নেট/জালের রয়েছে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার। তালের ছোবড়ার জাল তৈরি করেছে নতুন এক সম্ভাবনা। বয়স্ক তালগাছ থেকে উৎকৃষ্ট মানের কাঠ পাওয়া যায়, যা গৃহনির্মাণ ও শৌখিন দ্রব্য প্রস্তুতে ব্যবহার করা হয়। তালপাতা চামড়ার মতো শক্ত হওয়ায় প্রাচীণকালে কাগজের বিকল্প হিসেবে হাতের লেখা শেখার জন্য পাঠশালায় এই পাতার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। পরিপক্ব একটি গাছ থেকে বছরে অন্তত ৫ হাজার টাকা আয় করা যায়। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, ঝড়ো হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় বাড়িঘর, শস্য রক্ষা করতে পরিবেশ উন্নয়নে তালগাছের ভূমিকা অনন্য। তাল এক পরম পরোপকারী বৃক্ষ। জন্মের পর বছর না পেরুতেই এই গাছ মানুষের সেবায় নিয়োজিত। তালগাছটি বড় হতে থাকে আর প্রসারিত হতে থাকে তার পাতা। গাছের কাণ্ডতে জড়িয়ে থাকা পাতা যায় গরিবের কুটির রচনায়। তালগাছটি খানিক বড় হলে ডিঙ্গি নৌকা করে একে অনেকেই ভাসায় বিলের জলে। নৌকাবাইচের কত আয়োজন কতভাবে যে চলে! মেতে ওঠে বানভাসি এলাকার মানুষ, পাড়ি দেয় এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে বর্ষাকালে।

প্রায় সব ধরনের মাটিতেই তালের আবাদ করা যায়। তবে উঁচু জমি এবং ভারী মাটি তাল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। আমাদের দেশে বাগান আকারে তালের আবাদ নেই। দুইভাবে তালগাছ লাগানো যায়। একটি হলো সরাসরি বীজ বপন করে, অন্যটি বীজতলায় চারা উৎপাদন করে চারা রোপণের মাধ্যমে। তালগাছে কোনো পোকামাকড়, রোগবালাই দেখা যায় না। নদী বা সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় এর বৃদ্ধি বেশি। তালের চাষে অনেকেরই অনীহা দেখা যায়। তালবৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যাকারীকে অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারে, সে সম্পর্কে ব্যপক গণসচেতনতা ও তথ্যের আদান-প্রদান আবশ্যক।
উপকূল ফাউন্ডেশন বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এবং সৌন্দর্য বর্ধনকাজে তালবীজ বপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের দুইটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরা ও হাতিয়ায় ১০ হাজার তালবীজ বপন করবে। সারিবদ্ধভাবে তালগাছ লাগানোর মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধিত হয়। কৃষি অর্থনীতিতে তালগাছের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। রাস্তার দু'পাশের পতিত জমি, অনাবাদি জমি, জমির আইল, বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে তালগাছ রোপণ করে গ্রামীণ জনগণের বাড়তি আয়ের উৎস সৃষ্টি করা ছাড়াও চিনি এবং গুড়ের ঘাটতি অনেকাংশ মেটানো সম্ভব।

পরিকল্পনা করে ঝুঁকিবিহীনভাবে তালগাছভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত। গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ উন্নয়নে তালগাছ হবে আগামী দিনের কৃষি, কৃষক ও পরিবেশের পরম বান্ধব। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আইলা, সিডর, নার্গিস, আম্ফান মোকাবেলায় তালগাছ মাথা উঁচু করে বুক পেতে দেবে মানব আর মানব বসতি রক্ষায়। শুধু এতেই শেষ না; পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়বে তালগাছের নিবিড় বনায়ন। তালগাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্যই তো বাবুই পাখিরা পৃথিবীর এত গাছ থাকতে একমাত্র তালগাছকে বেছে নিয়ে নান্দনিকতার বুননে শিল্পের গাঁথুনি দিয়ে নকশীজালের নীড় তৈরি করে।

বজ্রপাত থেকে জীবন রক্ষায় উঁচু তালগাছের বিকল্প নেই। বেশি করে তালগাছ লাগাই, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাই। গ্রামীণ ও উপকূলীয় জনপদে তালগাছের পরিকল্পিত চাষে নান্দনিক সৌন্দর্যরুপ তুলে ধরে তালগাছে প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই। আসুন, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাই অন্তত একটি তালবীজ বপন করি। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকগণ একটু উদ্যোগ নিলেই বদলে যাবে আমাদের চিরপরিচিত পরিবেশ ও প্রতিবেশ। এটাই হোক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানের নতুন উদ্যোগ। সারাদেশে গড়ে উঠুক তালগাছে প্রকৃতির সবুজ বেষ্টনী।

লেখক: পিএইচ.ডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন।
ই-মেইল: [email protected]

তালগাছে প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই

 এম. আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:১২ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
তালগাছ
ফাইল ছবি

ঘন সবুজে আবৃত বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, মাঝখানে কর্দমাক্ত মেঠোপথ, তার দু'পাশে মাথা উঁচু তালগাছ আমাদের উপকূল ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। এমন সুন্দর ও নৈসর্গিক দৃশ্য এখন খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বজ্রপাত থেকে রক্ষাকারী পরম বন্ধু তালগাছ। এ কারণে বজ্রপাতের (বিদ্যুৎস্পর্শ) হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ, পশু-পাখিসহ জীববৈচিত্র্য। বজ্রপাতে ২০১০-২০১৯ এক দশকে ২,৫৭১ জন মানুষ প্রাণ হারায়। প্রতি বছর গড়ে এর সংখ্যা ২৫০ এর বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন। 

২০১৬ সালে আশঙ্কাজনক ভাবে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটিকে দেশের জন্য নতুন দূর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছর (২০২০) প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারায় ১৯১ জন। দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৩ শতাংশ ঘটে থাকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে; তার প্রায় ৮৪ শতাংশই পুরুষ। আবার মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশ ঘটছে উন্মুক্ত স্থানে অবস্থানের কারণে যার মূল শিকার কৃষক, জেলে ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। 

সাধারণত একটি তালগাছ ৯০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু হয়। উঁচু গাছ হওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি এ গাছের মাধ্যমে মাটিতে গিয়ে আমাদের রক্ষা করে। এ ছাড়াও ভূমিক্ষয়, ভূমিধস, ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধি ও মাটির উর্বরতা রক্ষা করে। তালগাছের আকর্ষণে বাড়ে মেঘের ঘনঘটা; ঘটে বৃষ্টিপাতও। তালগাছের শিকড় মাটির অনেক নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করায় ঝড়ে হেলে পড়ে না কিংবা ভেঙে পড়ে না। যেখানে কোনো কিছু চাষ হয় না সেখানেও তালগাছ তার শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। নতুন রাস্তার ল্যান্ডস্কেপ, বাঁধ ও নদীভাঙন ঠেকাতে এর রয়েছে সফল প্রয়োগ।

বাংলা সাহিত্যে “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে”- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এ কবিতা যেমন আমাদের উপকূল এবং গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি; তেমনি আত্মপ্রত্যয়ী এবং আত্মনির্ভরশীলতারও প্রতীক। অন্যভাবে কবি রজনীকান্তের “বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই/ কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা 'পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।/ বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তাই?; কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।/ পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা/ নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।” মানুষকে মানবিক দিক থেকে জাগ্রত করার জন্য কালজয়ী এ দুটি কবিতা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি, বাবুই পাখির বাসা ও তালগাছ। তালপাতার অন্তরালে পরিশ্রমী বাবুই পাখির শক্ত বুননে দৃশ্যমান কারুকার্যময় ঝুলন্ত ছোট্ট বাসা। প্রকৃতির ঝড়-ঝাপটাও আপন শক্ত বুননের কাছে আত্মপ্রত্যয়ী আরেক প্রতিচ্ছবি। উভয়ই আমাদের জীবনকে বারংবার আত্মনির্ভরশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী হতে আহ্বান করার মতো জাগরণ।

একটি গাছ হিসেবে তালগাছ আমাদের মনুষ্য সমাজকে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, বিবেক নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। ন্যায় ও সত্যতে অটল থাকতে বলে অবিরত। এছাড়াও খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীনের “ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ।/ ঐ খানেতে বাস করে, কানা বগীর ছা।” শিশু মননের তালগাছ কেন্দ্রিক আরেক আলোড়িত ছড়া।

তালের রস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৌখিন পিঠা আগের দিনে বিভিন্ন বাড়িতে তৈরি হতো। তালের পাতা দিয়ে তৈরি হতো নানা কারুকার্যের হাতপাখা। গরমকালে তালপাতার পাখার কদর ছিল সকলের কাছে। কিন্তু তালগাছের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যে বিশাল ভূমিকা আছে এবং পরিবেশবান্ধব; তালের উপকার সম্পর্কে না জানায় তালগাছ ইটভাটায় জ্বালানি, ঘর তৈরির উপকরণসহ নানান কাজে ব্যবহারের জন্য নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে গাছ লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এ কারণে দিন দিন প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। তালগাছ প্রকৃতির বন্ধু ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী বৃক্ষ। 

এ গাছ প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও আকাশের বিজলি থেকে মানুষ ও প্রাণী জগৎকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। যে এলাকায় তালগাছের সংখ্যা বেশি, সে এলাকায় ঝড় ও বিজলিতে মানুষ ও পশু-পাখির মৃত্যুহার খুব কম। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাড়ির আঙিনার পাশে, রাস্তার ধারে, অনাবাদি ও পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ করা উচিত।

তাল ফলে ফরমালিন ব্যবহারের সুযোগ নেই। পাকা তালের অপূর্ব সুন্দর ঘ্রাণ সকলকেই মোহিত করে। পাকা তালের রস থেকে নানারকম সুস্বাদু পিঠা, মিছরি ও গুড় তৈরি হয়। সদ্য সংগৃহীত তালের রস পানীয় হিসেবে অনেক উপকারী। দেখতে সাধারণ হলেও এতে থাকা নানা রকম খনিজ উপাদান ও পুষ্টিগুণ, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। তালের শাঁস, তালসত্ত্বা, তালের পায়েশ, তালের নৌকা আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পাকা তালের রস কনফেকশনারিতে শুকনো খাবার প্রস্তুতকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে; স্মৃতিশক্তি, শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা, হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর, হাড়কে শক্তিশালী করাসহ  তাল অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। শারীরবৃত্তীয় কাজে অংশ নেওয়া এই তালশাঁস খুবই উপকারী, যা শরীরকে দ্রুত শীতল করে। এর বেশির ভাগ অংশ জলীয়। ফলে শরীরের পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তালশাঁস শরীরের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। এমনকি ক্ষয় হয়ে গেলে তা পূরণ করে, তারুণ্য ধরে রাখে।

তালগাছের আঁশ দিয়ে কুটির শিল্পজাত দ্রব্য তৈরি, কারখানায় বাহারি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন ছাড়াও জিও টেক্সটাইল হিসেবে তালের ছোবড়া থেকে তৈরি নেট/জালের রয়েছে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার। তালের ছোবড়ার জাল তৈরি করেছে নতুন এক সম্ভাবনা। বয়স্ক তালগাছ থেকে উৎকৃষ্ট মানের কাঠ পাওয়া যায়, যা গৃহনির্মাণ ও শৌখিন দ্রব্য প্রস্তুতে ব্যবহার করা হয়। তালপাতা চামড়ার মতো শক্ত হওয়ায় প্রাচীণকালে কাগজের বিকল্প হিসেবে হাতের লেখা শেখার জন্য পাঠশালায় এই পাতার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। পরিপক্ব একটি গাছ থেকে বছরে অন্তত ৫ হাজার টাকা আয় করা যায়। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, ঝড়ো হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় বাড়িঘর, শস্য রক্ষা করতে পরিবেশ উন্নয়নে তালগাছের ভূমিকা অনন্য। তাল এক পরম পরোপকারী বৃক্ষ। জন্মের পর বছর না পেরুতেই এই গাছ মানুষের সেবায় নিয়োজিত। তালগাছটি বড় হতে থাকে আর প্রসারিত হতে থাকে তার পাতা। গাছের কাণ্ডতে জড়িয়ে থাকা পাতা যায় গরিবের কুটির রচনায়। তালগাছটি খানিক বড় হলে ডিঙ্গি নৌকা করে একে অনেকেই ভাসায় বিলের জলে। নৌকাবাইচের কত আয়োজন কতভাবে যে চলে! মেতে ওঠে বানভাসি এলাকার মানুষ, পাড়ি দেয় এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে বর্ষাকালে।

প্রায় সব ধরনের মাটিতেই তালের আবাদ করা যায়। তবে উঁচু জমি এবং ভারী মাটি তাল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। আমাদের দেশে বাগান আকারে তালের আবাদ নেই। দুইভাবে তালগাছ লাগানো যায়। একটি হলো সরাসরি বীজ বপন করে, অন্যটি বীজতলায় চারা উৎপাদন করে চারা রোপণের মাধ্যমে। তালগাছে কোনো পোকামাকড়, রোগবালাই দেখা যায় না। নদী বা সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় এর বৃদ্ধি বেশি। তালের চাষে অনেকেরই অনীহা দেখা যায়। তালবৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যাকারীকে অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারে, সে সম্পর্কে ব্যপক গণসচেতনতা ও তথ্যের আদান-প্রদান আবশ্যক। 
উপকূল ফাউন্ডেশন বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এবং সৌন্দর্য বর্ধনকাজে তালবীজ বপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের দুইটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরা ও হাতিয়ায় ১০ হাজার তালবীজ বপন করবে। সারিবদ্ধভাবে তালগাছ লাগানোর মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধিত হয়। কৃষি অর্থনীতিতে তালগাছের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। রাস্তার দু'পাশের পতিত জমি, অনাবাদি জমি, জমির আইল, বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে তালগাছ রোপণ করে গ্রামীণ জনগণের বাড়তি আয়ের উৎস সৃষ্টি করা ছাড়াও চিনি এবং গুড়ের ঘাটতি অনেকাংশ মেটানো সম্ভব। 

পরিকল্পনা করে ঝুঁকিবিহীনভাবে তালগাছভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত। গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ উন্নয়নে তালগাছ হবে আগামী দিনের কৃষি, কৃষক ও পরিবেশের পরম বান্ধব। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আইলা, সিডর, নার্গিস, আম্ফান মোকাবেলায় তালগাছ মাথা উঁচু করে বুক পেতে দেবে মানব আর মানব বসতি রক্ষায়। শুধু এতেই শেষ না; পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়বে তালগাছের নিবিড় বনায়ন। তালগাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্যই তো বাবুই পাখিরা পৃথিবীর এত গাছ থাকতে একমাত্র তালগাছকে বেছে নিয়ে নান্দনিকতার বুননে শিল্পের গাঁথুনি দিয়ে নকশীজালের নীড় তৈরি করে।

বজ্রপাত থেকে জীবন রক্ষায় উঁচু তালগাছের বিকল্প নেই। বেশি করে তালগাছ লাগাই, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাই। গ্রামীণ ও উপকূলীয় জনপদে তালগাছের পরিকল্পিত চাষে নান্দনিক সৌন্দর্যরুপ তুলে ধরে তালগাছে প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই। আসুন, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাই অন্তত একটি তালবীজ বপন করি। প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকগণ একটু উদ্যোগ নিলেই বদলে যাবে আমাদের চিরপরিচিত পরিবেশ ও প্রতিবেশ। এটাই হোক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানের নতুন উদ্যোগ। সারাদেশে গড়ে উঠুক তালগাছে প্রকৃতির সবুজ বেষ্টনী। 

লেখক: পিএইচ.ডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন।
ই-মেইল: [email protected]