করোনার চাইতেও ভয়াবহ যে ভাইরাসের সংক্রমণ
jugantor
করোনার চাইতেও ভয়াবহ যে ভাইরাসের সংক্রমণ

  মর্তুজা হাসান সৈকত   

১০ অক্টোবর ২০২০, ১৯:২৫:১৯  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনার সংক্রমণের ভেতরে আরেক ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে দেশে। এর নাম নারী নির্যাতনের ভাইরাস। করোনার চাইতেও শক্তিশালী এ ভাইরাস। কারণ, করোনাভাইরাসকে দমনের কৌশল আস্তে আস্তে মানুষ আয়ত্ত করতে শিখলেও নারী নির্যাতনের ভাইরাস দমনে কোন কৌশলই কাজে আসছে না।

এই ভাইরাসের সংক্রমণ আগেও ছিল, তবে করোনাকালে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ফলে একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। কক্সবাজারে মা-মেয়েকে রশিতে বেঁধে নির্যাতন ও সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের মতো বর্বরোচিত ঘটনার রেশ না কাটতেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যদিও নির্যাতনের এক মাসেরও বেশি সময় পরে সামনে এসেছে এ ঘটনা।

এরকম কতশত ঘটনা যে লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সেটা আমরা কেউ জানি না। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার নারী, যে দেশের নারীরা পড়াশোনায় ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে, নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য যে দেশের সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ নানা মর্যাদাকর সম্মাননা অর্জন করছে; সে দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমে নারী নির্যাতনের অসংখ্য ছবি ভেসে বেড়াবে এটা খুবই দুঃখজনক। যদিও যে খবরগুলো এখানে আসছে তা অনেক কম। ১০০ জন নারী নির্যাতিত হলে সামনে আসছে হয়ত ১০ জনের খবর।

নারী নির্যাতন বলতে আমরা কেবল শারীরিক নির্যাতনকেই হিসেবে নিচ্ছি, কিন্তু এর বাইরেও আরেক রকমের নির্যাতন আছে যা প্রায় সব পরিবারেই কম বেশি সহ্য করতে হচ্ছে নারীদের। এর নাম হচ্ছে, মানসিক নির্যাতন। বিয়ের আগে ও পরে কম বেশি সব পরিবারেই এই নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় মেয়েদের। যদি এসব নির্যাতনকে হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে নারী নির্যাতনের ভাইরাস কতটা যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা কল্পনাও করা যাবে না। এটা দৃশ্যমান কোনো নির্যাতন নয় বলে প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থাও নেই।

নারীর প্রতি মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে কোনো আইন না থাকলেও শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ শক্ত আইন আছে দেশে। যদিও তা সত্ত্বেও নারী নির্যাতনের ভাইরাস কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র উল্লেখ করেছে, গত ৯ মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন আরও ৪৩ জন। যে ঘটনাগুলো দৃশ্যমান হয়েছে এটা হচ্ছে কেবল তার হিসেব। এতেই চিত্রটা ভয়াবহ লাগছে। প্রকৃত পরিসংখ্যানটা সামনে আসলে কেমন লাগবে একবার ভাবুন।

আবার নারী নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটছে, তার সবক্ষেত্রেই যে সোচ্চার প্রতিবাদ হচ্ছে তা কিন্তু না। যে ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমের বদৌলতে সামনে চলে আসছে, সেখানেই কেবল প্রতিবাদ হয়। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় দায়সারা প্রতিবাদের পর তা আবার তা থেমেও যায় দ্রুত। অন্যদিকে, নতুন ইস্যু চলে আসলে পত্র-পত্রিকার দৃষ্টিও অন্যদিকে ঘুরে যায়। ফলে দেখা যায়, নারী নির্যাতন যে কারণে হচ্ছে, তা উৎপাটনের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত হয় না।

তাছাড়া, নির্যাতনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থা এমন হয় যে, নির্যাতনকারী নির্যাতিতার তুলনায় আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী থাকে। কখনো কখনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়া থাকে, ফলে অপরাধী অপরাধ ঘটিয়ে নির্যাতিতাকে বা তার পরিবারকে হুমকি দেয়, ভয়ভীতি দেখায়।

ছোট একটি ঘটনা তুলে ধরছি, সিলেটে ঘটনায় অভিযুক্তদের যেদিন প্রথম আদালতে তোলা হয়েছিল সেদিন তারা প্রকাশ্যে হম্বিতম্বি, দম্ভোক্তি করে বলেছে, কেউ তাদের কিচ্ছু করতে পারবে না! যে সমাজে নারী নির্যাতনকারী, ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, নির্যাতিতাকে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, নারী নির্যাতনের ভাইরাস সে সমাজে কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে একবার ভাবুন।

অপরাধীর সাজা না হলে অপরাধ করার প্রবণতা বাড়তে থাকবে, এটি অবধারিত। আমাদের দেশেও এটি হয়েছে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ নারী নির্যাতনকারী রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে, কখনো আবার নির্যাতিতার প্রান্তিক অবস্থানের কারণে আপসরফা করে বেড়িয়ে আসছে। আবার দেখা যায়, আইনের আইনি প্রক্রিয়াতেও পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকে।

মূলত, এ কারণে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বাড়ছে, সাজা না হওয়াই তার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই নারী নির্যাতনের এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সকল প্রকার নারী নির্যাতনকারীসহ ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে- এমন দাবিই উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আনাচে কানাচে থেকে।

কারণ, নির্যাতনকারী, ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে এমন খবর যখন ব্যাপকভাবে আসতে থাকবে তখন ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা ভেবে হলেও নারীকে নির্যাতন করার আগে কয়েকবার চিন্তা করবে ধর্ষক, নির্যাতনকারীর দল।

তাই, জন দাবির প্রেক্ষিতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশের প্রচলিত কঠোর আইনকে আরও কঠোর ও শক্তিশালী করতে সরকার উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থ-হীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, ধর্ষণের প্রচলিত আইনকে সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হবে।

বলা হয়ে থাকে, একটি সমাজ যত বেশি নারী ও শিশুবান্ধব সে সমাজ ততবেশি উন্নত। তাই নারী নির্যাতনের লাগামহীন ঘোড়াকে এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। যদি তা না আনা যায় তবে তার প্রভাব সমগ্র সমাজ কাঠামোর উপরেই পড়তে থাকবে। তাছাড়া নারীকে নির্যাতন ও যৌন হয়রানি জনস্বাস্থের উপরেও বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

এ প্রসঙ্গে, লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি আর্টিকেল থেকে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার নারীরা হৃদরোগ, আন্ত্রিক ও যৌন রোগ, মাথা ও মেরুদণ্ডে ব্যথা, গর্ভধারণে জটিলতা, গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চরম বিষন্নতার মতো নানা রোগে ভোগেন। বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে এমন সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মতে, নারীরা মাথা, মুখ, ঘাড়, বুক এবং তলপেটে আঘাত নিয়ে তাদের কাছে আসে। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি ও হতাশাবোধ কাজ করে।

নারী নির্যাতনের ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুধু সরকারকে নয়, প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্যাতনকারীকে সম্মিলিতভাবে সমাজ থেকে বয়কট করতে হবে। সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার, এটা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে, এবং নির্যাতনকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে অপরাধভেদে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সমাজ থেকে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা কমিয়ে আনা যাবে। এটা যদি সম্ভব না হয় তাহলে, নারীর ক্ষমতায়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন ভূমিকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে তেমনই নারীকে নির্যাতন ও নিপীড়নে আরও নতুন নতুন মাত্রা যোগ হতে থাকবে।


লেখক: কবি, কলামিস্ট, mortuza.hasan.sh[email protected]

করোনার চাইতেও ভয়াবহ যে ভাইরাসের সংক্রমণ

 মর্তুজা হাসান সৈকত  
১০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:২৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনার সংক্রমণের ভেতরে আরেক ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে দেশে। এর নাম নারী নির্যাতনের ভাইরাস। করোনার চাইতেও শক্তিশালী এ ভাইরাস। কারণ, করোনাভাইরাসকে দমনের কৌশল আস্তে আস্তে মানুষ আয়ত্ত করতে শিখলেও নারী নির্যাতনের ভাইরাস দমনে কোন কৌশলই কাজে আসছে না। 

এই ভাইরাসের সংক্রমণ আগেও ছিল, তবে করোনাকালে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ফলে একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। কক্সবাজারে মা-মেয়েকে রশিতে বেঁধে নির্যাতন ও সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের মতো বর্বরোচিত ঘটনার রেশ না কাটতেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যদিও নির্যাতনের এক মাসেরও বেশি সময় পরে সামনে এসেছে এ ঘটনা। 

এরকম কতশত ঘটনা যে লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সেটা আমরা কেউ জানি না। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার নারী, যে দেশের নারীরা পড়াশোনায় ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে, নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য যে দেশের সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ নানা মর্যাদাকর সম্মাননা অর্জন করছে; সে দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমে নারী নির্যাতনের অসংখ্য ছবি ভেসে বেড়াবে এটা খুবই দুঃখজনক। যদিও যে খবরগুলো এখানে আসছে তা অনেক কম। ১০০ জন নারী নির্যাতিত হলে সামনে আসছে হয়ত ১০ জনের খবর। 

নারী নির্যাতন বলতে আমরা কেবল শারীরিক নির্যাতনকেই হিসেবে নিচ্ছি, কিন্তু এর বাইরেও আরেক রকমের নির্যাতন আছে যা প্রায় সব পরিবারেই কম বেশি সহ্য করতে হচ্ছে নারীদের। এর নাম হচ্ছে, মানসিক নির্যাতন। বিয়ের আগে ও পরে কম বেশি সব পরিবারেই এই নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় মেয়েদের। যদি এসব নির্যাতনকে হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে নারী নির্যাতনের ভাইরাস কতটা যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা কল্পনাও করা যাবে না। এটা দৃশ্যমান কোনো নির্যাতন নয় বলে প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থাও নেই।  

নারীর প্রতি মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে কোনো আইন না থাকলেও শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ শক্ত আইন আছে দেশে। যদিও তা সত্ত্বেও নারী নির্যাতনের ভাইরাস কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র উল্লেখ করেছে, গত ৯ মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন আরও ৪৩ জন। যে ঘটনাগুলো দৃশ্যমান হয়েছে এটা হচ্ছে কেবল তার হিসেব। এতেই চিত্রটা ভয়াবহ লাগছে। প্রকৃত পরিসংখ্যানটা সামনে আসলে কেমন লাগবে একবার ভাবুন। 

আবার নারী নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটছে, তার সবক্ষেত্রেই যে সোচ্চার প্রতিবাদ হচ্ছে তা কিন্তু না। যে ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমের বদৌলতে সামনে চলে আসছে, সেখানেই কেবল প্রতিবাদ হয়। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় দায়সারা প্রতিবাদের পর তা আবার তা থেমেও যায় দ্রুত। অন্যদিকে, নতুন ইস্যু চলে আসলে পত্র-পত্রিকার দৃষ্টিও অন্যদিকে ঘুরে যায়। ফলে দেখা যায়, নারী নির্যাতন যে কারণে হচ্ছে, তা উৎপাটনের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত হয় না। 

তাছাড়া, নির্যাতনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থা এমন হয় যে, নির্যাতনকারী নির্যাতিতার তুলনায় আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী থাকে। কখনো কখনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়া থাকে, ফলে অপরাধী অপরাধ ঘটিয়ে নির্যাতিতাকে বা তার পরিবারকে হুমকি দেয়, ভয়ভীতি দেখায়। 

ছোট একটি ঘটনা তুলে ধরছি, সিলেটে ঘটনায় অভিযুক্তদের যেদিন প্রথম আদালতে তোলা হয়েছিল সেদিন তারা প্রকাশ্যে হম্বিতম্বি, দম্ভোক্তি করে বলেছে, কেউ তাদের কিচ্ছু করতে পারবে না! যে সমাজে নারী নির্যাতনকারী, ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, নির্যাতিতাকে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে,  নারী নির্যাতনের ভাইরাস সে সমাজে কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে একবার ভাবুন। 

অপরাধীর সাজা না হলে অপরাধ করার প্রবণতা বাড়তে থাকবে, এটি অবধারিত। আমাদের দেশেও এটি হয়েছে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ নারী নির্যাতনকারী রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে, কখনো আবার নির্যাতিতার প্রান্তিক অবস্থানের কারণে আপসরফা করে বেড়িয়ে আসছে। আবার দেখা যায়, আইনের আইনি প্রক্রিয়াতেও পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকে। 

মূলত, এ কারণে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।  বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বাড়ছে, সাজা না হওয়াই তার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই নারী নির্যাতনের এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সকল প্রকার নারী নির্যাতনকারীসহ ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে- এমন দাবিই উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আনাচে কানাচে থেকে। 

কারণ, নির্যাতনকারী, ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে এমন খবর যখন ব্যাপকভাবে আসতে থাকবে তখন ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা ভেবে হলেও নারীকে নির্যাতন করার আগে কয়েকবার চিন্তা করবে ধর্ষক, নির্যাতনকারীর দল। 

তাই, জন দাবির প্রেক্ষিতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশের প্রচলিত কঠোর আইনকে আরও কঠোর ও শক্তিশালী করতে সরকার উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থ-হীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, ধর্ষণের প্রচলিত আইনকে সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হবে। 

বলা হয়ে থাকে, একটি সমাজ যত বেশি নারী ও শিশুবান্ধব সে সমাজ ততবেশি উন্নত। তাই নারী নির্যাতনের লাগামহীন ঘোড়াকে এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। যদি তা না আনা যায় তবে তার প্রভাব সমগ্র সমাজ কাঠামোর উপরেই পড়তে থাকবে। তাছাড়া নারীকে নির্যাতন ও যৌন হয়রানি জনস্বাস্থের উপরেও বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

এ প্রসঙ্গে, লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি আর্টিকেল থেকে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার নারীরা হৃদরোগ, আন্ত্রিক ও যৌন রোগ, মাথা ও মেরুদণ্ডে ব্যথা, গর্ভধারণে জটিলতা, গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চরম বিষন্নতার মতো নানা রোগে ভোগেন। বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে এমন সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মতে, নারীরা মাথা, মুখ, ঘাড়, বুক এবং তলপেটে আঘাত নিয়ে তাদের কাছে আসে। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি ও হতাশাবোধ কাজ করে।

নারী নির্যাতনের ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুধু সরকারকে নয়, প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্যাতনকারীকে সম্মিলিতভাবে সমাজ থেকে বয়কট করতে হবে। সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার, এটা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে, এবং নির্যাতনকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে অপরাধভেদে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সমাজ থেকে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা কমিয়ে আনা যাবে। এটা যদি সম্ভব না হয় তাহলে, নারীর ক্ষমতায়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন ভূমিকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে তেমনই নারীকে নির্যাতন ও নিপীড়নে আরও নতুন নতুন মাত্রা যোগ হতে থাকবে।


লেখক: কবি, কলামিস্ট, [email protected]