‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ অন্তহীন দুর্দশার পথ
jugantor
‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ অন্তহীন দুর্দশার পথ

  মোহাম্মদ তৌহিদ, চীন (বেইজিং) থেকে  

১৩ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৩৭:৪৮  |  অনলাইন সংস্করণ

‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনও অপরাধ নয়। এ অপকর্মটি অন্যান্য ‘সহিংস অপরাধের’ অংশমাত্র। হতে পারে তা গৃহকর্মী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, বয়স্ক নির্যাতন বা এরকম অনেক কিছুর মতই গর্হিত অপরাধ।

ভেবে দেখুন, ঘর্মাক্ত-দরিদ্র বাবার বয়সী বা ছেলের বয়সী রিকশাওয়ালার ওপর চড়াও হয়েছেন কখনও? তার গায়ে হাত তুলেছে কি কেউ? রিকশাওয়ালাই তো; তাকে চড়-থাপ্পড়-লাথি দিলে কেউ এগিয়ে আসে না। দেশের আইন এখানে কাজ করে না। একে বিবেকের আইন বা মানবিক আইন দিয়ে শাসন করতে হয়। যখন বিবেক লোপ পায়, তখন আইনের আওতায় আনতে আনতে বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।

ছেলেবেলায় এক ধনী প্রতিবেশী পেয়েছিলাম। গৃহিণীর ছিল কাজের মেয়ে নির্যাতনের স্বভাব। মহল্লার উঁচু দালানের সর্বোচ্চ তলাতে তিনি যখন ব্যাপক উৎসাহে কাজের মেয়ে পেটাতেন, তখন বাসার নিচে লোক জমে যেত। বিশেষ করে, যখন গরম খুন্তি দিয়ে শিশু গৃহকর্মীর বিভিন্ন অঙ্গের চামড়া ঝলসে দিতেন, তখন মৃত্যুবৎ আর্ত-চিৎকারে আমরা শিউরে উঠতাম, নিচে জমে থাকা লোকজনও নড়ে চড়ে উঠত! ব্যাস, এ পর্যন্তই! বলাই বাহুল্য, কাজের মেয়েরা বেশিদিন টিকত না সে বাসায়। কারণ সহজেই অনুমেয়।

তারই সুযোগ্য পুত্র ছিল আমার খেলার সাথী। দৌড়ঝাঁপের সময় খপ করে এক বেড়াল ছানার লেজ ধরে এক টানে মাথার উপর তুলে দে আছাড়! সচরাচর ২/১ তলা থেকে আছড়ে পড়ে বেড়ালের কিছু হয় না। তবে পৈশাচিক সে আছাড় বিড়ালছানা সইতে পারেনি। নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে বীভৎস এক অবস্থা। আর ওই মৃত বিড়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটির সে কী পৈশাচিক উল্লাস! পিচ্চি-পাচ্চা আমরাও স্তম্ভিত এবং আজ পর্যন্ত তা ভোলার নয়।

ঘটনার শিক্ষা হলো, ছেলেটির পৈশাচিকতা তার পারিবারিক (সহিংসতার) শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন কেউ যদি ছেলেটিকে বেড়ালের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও উপকারিতা বোঝায় এবং বেড়াল মারা থেকে সফলভাবে বিরত রাখে, তাহলে পরদিন সে পাখি মারবে বা কুকুর মারবে। এক্ষেত্রে করণীয় একটাই, তার সহিংস মানসিকতার পরিবর্তন করা। বেড়ালের গুরুত্ব নয়, বরং হত্যাযজ্ঞের মানসিকতা রোধের জ্ঞান দেওয়া জরুরি। গাছের বিবর্ণ হলুদ পাতায় নয়, বরং গোঁড়ায় পানি দেওয়ার জ্ঞান ও শিক্ষাটা জরুরি।

অসহায় দরিদ্র রিকশাওয়ালার গায়ে হাত তোলার মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি। কোনও কাজই ছোট নয়— এমন মানসিকতা তৈরি করাও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কত মেধাবী ছাত্র মুখে গামছা পেঁচিয়ে পরিচয় গোপন করে সন্ধ্যার অন্ধকার ক্যাম্পাসে রিকশা চালায়, কিংবা চটপটি-ফুচকা বেচে সে খবর রেখেছেন কখনও? সৎ কর্ম করেও এ দেশে মানুষ ছোট হয়। তবে অপকর্মে সেঞ্চুরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিদ ছাত্র বুক ফুলিয়ে হাঁটে— এটাই কি বাস্তবতা নয়?

শুনেছি চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক অবসর সময়ে ক্যাম্পাসে বাদাম বিক্রি করেন। তার শিক্ষার্থীরাও কোন হীনমন্যতা ছাড়াই সে কথা প্রকাশ করে। এতে শিক্ষকতার মর্যাদাও কমে না, ব্যক্তি মর্যাদাও কমে না, শ্রমের মর্যাদা বরং বাড়ে। উপরন্তু শিক্ষার্থীরা সৎ-শ্রমে উৎসাহিত হয়। যা কোনোদিন বই পড়ে অর্জন করা যায় না। বই পড়েই যদি হতো তবে ভিনদেশে গিয়ে হোটেল-মোটেলে বাঙ্গালি যে কাজ করে, তা নিজ দেশে করলে ইজ্জত হারানোর ভয় থাকতো না! নিজ দেশের উন্নয়নের চেয়ে ভিনদেশের উন্নয়নে জান দিতে পারায় আমাদের ইজ্জত বাড়ে! কী করুণ দশা আমাদের! এ জাতির মানসিক মুক্তির সব পথ যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

সিলেট এমসি কলেজের দুঃখজনক ঘটনা বা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বেদনাদায়ক ঘটনা প্রবহমান অপরাধ সমুদ্রের ঢেউ মাত্র। অপরাধের ঢল রুখতে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? সেটাই বড় বিষয়। কারণ, এই একটি ধর্ষণের বিচারেই সফলতা আসতে পারে না। দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর— এই নয় মাসে প্রতিদিন গড়ে তিনটির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এ তথ্য জানিয়েছে। নয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। প্রতিটি ঘটনাই সমান অপরাধ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের প্রতিবাদ কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ, কিছুটা দায় প্রকাশ আবার কারও জনপ্রিয়তা (হিট বা পয়সা) কামাইয়ের চেষ্টা। প্রতিকার করতে হবে সরকার বা বিচার ব্যবস্থাকেই। পদক্ষেপ নিতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীকেই। আমজনতা সরকারের কাছেই প্রতিকারের দাবি ও আবদার জানায়। কারণ এটা নিয়ম। কিন্তু আমাদের অবস্থা যেন অন্ধের হাতি দেখা বা শিশুর সমুদ্র দেখার মতো।

চোখের সামনে সমুদ্রের গভীর ও বিশালতা দেখা যায় না, কিন্তু শতগুণে আকর্ষণীয় মনে হয় বড় বড় ঢেউগুলোকে। একটার পর একটা ঢেউ এগিয়ে আসে, শিশুর আনন্দ-উত্তেজনা যেন তত বেড়ে যায়। শিশুর মনে হয়— ঢেউগুলোই যেন সমুদ্র। ঢেউ যেন অতল সমুদ্রের জলধারার চেয়েও বেশি ও শক্তিশালী। ঢেউয়ের নিচে গভীর সমুদ্রের অস্তিত্বজ্ঞান শিশুর থাকে না। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই দুনিয়াজোড়া ওয়াটার-ওয়ার্ল্ডে (অ্যমিউজমেন্ট পার্কে) কৃত্রিম স্রোত বা ঢেউয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানুষ তাতে গিয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করে।

এরকম একটি, দুইটি, বিশটি, ত্রিশটি ঘটনা সরকার-যন্ত্রকেই আমলে নিতে হয়। আর গণতান্ত্রিক দেশের সরকার গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে সর্বাধিক ভোট পাওয়া একটি দল বা একটি জোট। ক্ষমতাসীন দল আইনের প্রয়োগ করে দেশের সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ দমন করে; তা নাহলে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দলটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আমজনতার রোষে পড়ে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ক্ষমতা হারায়।

মূলত বিরোধীদলগুলো সরকারি দলকে তার (প্রকৃত) দায়িত্ব পালনে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলে। যার সুফল ভোগ করে দেশ ও জাতি। এটাই প্রচলিত গণতন্ত্রের লক্ষ্য ও সফলতার দিক। তবে বিরোধীদলগুলোর অনুপস্থিতিতে জনরোষের কোন মূল্য থাকে না, সরকার বদলেরও কোন ভয় থাকে না। চমৎকার এ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা আধুনিক গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্রের প্রাণ। এখন সত্যি করে বলুন, আমরা কি এ পথের ওপর টিকে আছি? নাকি ছিটকে পড়েছি বহু দূর?

আজ আমরা এমন একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করেছি যারা রাজনীতি বা দেশনীতি তীব্রভাবে অপছন্দ করে। যারা কোন রকম একটা ডিগ্রী নিয়ে উন্নত বিশ্বে গিয়ে ভাগ্য গঠন করা ছাড়া ভিন্ন কোন স্বপ্ন দেখে না। তারা অর্থোপার্জনকেই জীবনের লক্ষ্য বলে মনে করে। মূল্যবোধের মূল্য তারা বোঝে না। আর এটা অবশ্যই তাদের দোষ নয়। এটা আমাদেরই কর্মপদ্ধতির ফল। আমাদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থা গলধকরণ করেই তারা এমনতর বেড়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে আরেকটি সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণী। দেশের তরুণ-তরুণীদের (০-২৫ বছর বয়সী) সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ। প্রতি ১০০ জনের মধ্যে এই ৬০টি শিশু-কিশোর-তরুণের সবাই প্রকৃত মানুষ হয়ে বড় হবার সুযোগ পায় না। এদের কেউ থাকে শহরের অট্টালিকায়, কেউ থাকে বস্তিতে, কেউ থাকে অবহেলিত পল্লীগ্রামে। সুবিধাবঞ্চিতের সংখ্যাই বেশি। তারা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার।

স্নেহ-মায়া-ভালোবাসাহীন পরিবেশে তারা ধুকে ধুকে বেড়ে ওঠে। সময় ও নিষ্ঠুরতার কষাঘাতে তাদের মনুষ্যত্ব মরে যায়; জেগে ওঠে ভেতরের পশু। সুযোগ পাওয়া মাত্র তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষেরই ওপর। যা করে বনের পশু। সমাজের ওপর তলার একটি শ্রেণী এদের লালন-পালন করে, সময়-অসময়ে কাজে লাগায়। এ অবস্থা থেকে দেশ-জাতিকে উদ্ধার করার পথ আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। আপনার-আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ তৈরির দায়িত্বটাই আমাদের এর বেশি কিছু নয়।

‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ অন্তহীন দুর্দশার পথ

 মোহাম্মদ তৌহিদ, চীন (বেইজিং) থেকে 
১৩ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৩৭ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনও অপরাধ নয়। এ অপকর্মটি অন্যান্য ‘সহিংস অপরাধের’ অংশমাত্র। হতে পারে তা গৃহকর্মী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, বয়স্ক নির্যাতন বা এরকম অনেক কিছুর মতই গর্হিত অপরাধ। 

ভেবে দেখুন, ঘর্মাক্ত-দরিদ্র বাবার বয়সী বা ছেলের বয়সী রিকশাওয়ালার ওপর চড়াও হয়েছেন কখনও? তার গায়ে হাত তুলেছে কি কেউ? রিকশাওয়ালাই তো; তাকে চড়-থাপ্পড়-লাথি দিলে কেউ এগিয়ে আসে না। দেশের আইন এখানে কাজ করে না। একে বিবেকের আইন বা মানবিক আইন দিয়ে শাসন করতে হয়। যখন বিবেক লোপ পায়, তখন আইনের আওতায় আনতে আনতে বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। 

ছেলেবেলায় এক ধনী প্রতিবেশী পেয়েছিলাম। গৃহিণীর ছিল কাজের মেয়ে নির্যাতনের স্বভাব। মহল্লার উঁচু দালানের সর্বোচ্চ তলাতে তিনি যখন ব্যাপক উৎসাহে কাজের মেয়ে পেটাতেন, তখন বাসার নিচে লোক জমে যেত। বিশেষ করে, যখন গরম খুন্তি দিয়ে শিশু গৃহকর্মীর বিভিন্ন অঙ্গের চামড়া ঝলসে দিতেন, তখন মৃত্যুবৎ আর্ত-চিৎকারে আমরা শিউরে উঠতাম, নিচে জমে থাকা লোকজনও নড়ে চড়ে উঠত! ব্যাস, এ পর্যন্তই! বলাই বাহুল্য, কাজের মেয়েরা বেশিদিন টিকত না সে বাসায়। কারণ সহজেই অনুমেয়।

তারই সুযোগ্য পুত্র ছিল আমার খেলার সাথী। দৌড়ঝাঁপের সময় খপ করে এক বেড়াল ছানার লেজ ধরে এক টানে মাথার উপর তুলে দে আছাড়! সচরাচর ২/১ তলা থেকে আছড়ে পড়ে বেড়ালের কিছু হয় না। তবে পৈশাচিক সে আছাড় বিড়ালছানা সইতে পারেনি। নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে বীভৎস এক অবস্থা। আর ওই মৃত বিড়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটির সে কী পৈশাচিক উল্লাস! পিচ্চি-পাচ্চা আমরাও স্তম্ভিত এবং আজ পর্যন্ত তা ভোলার নয়।
 
ঘটনার শিক্ষা হলো, ছেলেটির পৈশাচিকতা তার পারিবারিক (সহিংসতার) শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন কেউ যদি ছেলেটিকে বেড়ালের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও উপকারিতা বোঝায় এবং বেড়াল মারা থেকে সফলভাবে বিরত রাখে, তাহলে পরদিন সে পাখি মারবে বা কুকুর মারবে। এক্ষেত্রে করণীয় একটাই, তার সহিংস মানসিকতার পরিবর্তন করা। বেড়ালের গুরুত্ব নয়, বরং হত্যাযজ্ঞের মানসিকতা রোধের জ্ঞান দেওয়া জরুরি। গাছের বিবর্ণ হলুদ পাতায় নয়, বরং গোঁড়ায় পানি দেওয়ার জ্ঞান ও শিক্ষাটা জরুরি।

অসহায় দরিদ্র রিকশাওয়ালার গায়ে হাত তোলার মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি। কোনও কাজই ছোট নয়— এমন মানসিকতা তৈরি করাও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কত মেধাবী ছাত্র মুখে গামছা পেঁচিয়ে পরিচয় গোপন করে সন্ধ্যার অন্ধকার ক্যাম্পাসে রিকশা চালায়, কিংবা চটপটি-ফুচকা বেচে সে খবর রেখেছেন কখনও? সৎ কর্ম করেও এ দেশে মানুষ ছোট হয়। তবে অপকর্মে সেঞ্চুরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিদ ছাত্র বুক ফুলিয়ে হাঁটে— এটাই কি বাস্তবতা নয়?

শুনেছি চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক অবসর সময়ে ক্যাম্পাসে বাদাম বিক্রি করেন। তার শিক্ষার্থীরাও কোন হীনমন্যতা ছাড়াই সে কথা প্রকাশ করে। এতে শিক্ষকতার মর্যাদাও কমে না, ব্যক্তি মর্যাদাও কমে না, শ্রমের মর্যাদা বরং বাড়ে। উপরন্তু শিক্ষার্থীরা সৎ-শ্রমে উৎসাহিত হয়। যা কোনোদিন বই পড়ে অর্জন করা যায় না। বই পড়েই যদি হতো তবে ভিনদেশে গিয়ে হোটেল-মোটেলে বাঙ্গালি যে কাজ করে, তা নিজ দেশে করলে ইজ্জত হারানোর ভয় থাকতো না! নিজ দেশের উন্নয়নের চেয়ে ভিনদেশের উন্নয়নে জান দিতে পারায় আমাদের ইজ্জত বাড়ে! কী করুণ দশা আমাদের! এ জাতির মানসিক মুক্তির সব পথ যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।    

সিলেট এমসি কলেজের দুঃখজনক ঘটনা বা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বেদনাদায়ক ঘটনা প্রবহমান অপরাধ সমুদ্রের ঢেউ মাত্র। অপরাধের ঢল রুখতে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? সেটাই বড় বিষয়। কারণ, এই একটি ধর্ষণের বিচারেই সফলতা আসতে পারে না। দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর— এই নয় মাসে প্রতিদিন গড়ে তিনটির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এ তথ্য জানিয়েছে। নয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। প্রতিটি ঘটনাই সমান অপরাধ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের প্রতিবাদ কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ, কিছুটা দায় প্রকাশ আবার কারও জনপ্রিয়তা (হিট বা পয়সা) কামাইয়ের চেষ্টা। প্রতিকার করতে হবে সরকার বা বিচার ব্যবস্থাকেই। পদক্ষেপ নিতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীকেই। আমজনতা সরকারের কাছেই প্রতিকারের দাবি ও আবদার জানায়। কারণ এটা নিয়ম। কিন্তু আমাদের অবস্থা যেন অন্ধের হাতি দেখা বা শিশুর সমুদ্র দেখার মতো। 

চোখের সামনে সমুদ্রের গভীর ও বিশালতা দেখা যায় না, কিন্তু শতগুণে আকর্ষণীয় মনে হয় বড় বড় ঢেউগুলোকে। একটার পর একটা ঢেউ এগিয়ে আসে, শিশুর আনন্দ-উত্তেজনা যেন তত বেড়ে যায়। শিশুর মনে হয়—  ঢেউগুলোই যেন সমুদ্র। ঢেউ যেন অতল সমুদ্রের জলধারার চেয়েও বেশি ও শক্তিশালী। ঢেউয়ের নিচে গভীর সমুদ্রের অস্তিত্বজ্ঞান শিশুর থাকে না। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই দুনিয়াজোড়া ওয়াটার-ওয়ার্ল্ডে (অ্যমিউজমেন্ট পার্কে) কৃত্রিম স্রোত বা ঢেউয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানুষ তাতে গিয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করে। 

এরকম একটি, দুইটি, বিশটি, ত্রিশটি ঘটনা সরকার-যন্ত্রকেই আমলে নিতে হয়। আর গণতান্ত্রিক দেশের সরকার গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে সর্বাধিক ভোট পাওয়া একটি দল বা একটি জোট। ক্ষমতাসীন দল আইনের প্রয়োগ করে দেশের সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ দমন করে; তা নাহলে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দলটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আমজনতার রোষে পড়ে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ক্ষমতা হারায়। 

মূলত বিরোধীদলগুলো সরকারি দলকে তার (প্রকৃত) দায়িত্ব পালনে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলে। যার সুফল ভোগ করে দেশ ও জাতি। এটাই প্রচলিত গণতন্ত্রের লক্ষ্য ও সফলতার দিক। তবে বিরোধীদলগুলোর অনুপস্থিতিতে জনরোষের কোন মূল্য থাকে না, সরকার বদলেরও কোন ভয় থাকে না। চমৎকার এ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা আধুনিক গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্রের প্রাণ। এখন সত্যি করে বলুন, আমরা কি এ পথের ওপর টিকে আছি? নাকি ছিটকে পড়েছি বহু দূর?

আজ আমরা এমন একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করেছি যারা রাজনীতি বা দেশনীতি তীব্রভাবে অপছন্দ করে। যারা কোন রকম একটা ডিগ্রী নিয়ে উন্নত বিশ্বে গিয়ে ভাগ্য গঠন করা ছাড়া ভিন্ন কোন স্বপ্ন দেখে না। তারা অর্থোপার্জনকেই জীবনের লক্ষ্য বলে মনে করে। মূল্যবোধের মূল্য তারা বোঝে না। আর এটা অবশ্যই তাদের দোষ নয়। এটা আমাদেরই কর্মপদ্ধতির ফল। আমাদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থা গলধকরণ করেই তারা এমনতর বেড়ে উঠেছে।
 
এর পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে আরেকটি সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণী। দেশের তরুণ-তরুণীদের (০-২৫ বছর বয়সী) সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ। প্রতি ১০০ জনের মধ্যে এই ৬০টি শিশু-কিশোর-তরুণের সবাই প্রকৃত মানুষ হয়ে বড় হবার সুযোগ পায় না। এদের কেউ থাকে শহরের অট্টালিকায়, কেউ থাকে বস্তিতে, কেউ থাকে অবহেলিত পল্লীগ্রামে। সুবিধাবঞ্চিতের সংখ্যাই বেশি। তারা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার।

স্নেহ-মায়া-ভালোবাসাহীন পরিবেশে তারা ধুকে ধুকে বেড়ে ওঠে। সময় ও নিষ্ঠুরতার কষাঘাতে তাদের মনুষ্যত্ব মরে যায়; জেগে ওঠে ভেতরের পশু। সুযোগ পাওয়া মাত্র তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষেরই ওপর। যা করে বনের পশু। সমাজের ওপর তলার একটি শ্রেণী এদের লালন-পালন করে, সময়-অসময়ে কাজে লাগায়। এ অবস্থা থেকে দেশ-জাতিকে উদ্ধার করার পথ আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। আপনার-আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ তৈরির দায়িত্বটাই আমাদের এর বেশি কিছু নয়।