লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস ও তার ‘অচিন পাখি’ সমাচার
jugantor
লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস ও তার ‘অচিন পাখি’ সমাচার

  রুবেল সাইদুল আলম  

১২ অক্টোবর ২০২০, ১৬:২৬:২১  |  অনলাইন সংস্করণ

যে খোঁজে মানুষে খোদা, সেই তো বাউল; অথবা মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি- এমন দর্শনেই জীবন পার করছেন ফকির লালন সাঁই। তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে চেনা এবং মানুষকে সাধন-ভজন করার জন্য জীবনভর যুদ্ধ করে গিয়েছেন। আগামী ১৮ অক্টোবর, ২০২০ তার ১৩০তম তিরোধান দিবস। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারীর কারণে এ বছর লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে তার আখড়া বাড়িতে অন্যান্য বছরের ন্যায় ভক্ত-অনুরাগী-সাধকদের কোন মিলনমেলা হবে না মর্মে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন।

১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির ছেঁউরিয়ায় তিনি দেহ রাখেন। তার কর্ম আমাদের সবার জানা কিন্তু তার ধর্ম আজও অজানা। তার জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোন কোন গবেষক ধারণা করছেন তিনি অবিভক্ত বাংলার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কুষ্টিয়া তখন জেলা ছিল না, অবিভক্ত ভারতবর্ষে নদীয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা ছিল। কুমারখালী ছিল তখন ইউনিয়ন। লালন গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাড়ারা গ্রামের হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন শ্রী মাধব কর আর মা ছিলেন শ্রীমতি পদ্মাবতী।

লালন ছিলেন নিরক্ষর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ তার হয়নি। কিন্তু তার সঙ্গীতের বানীর সৌকর্য, সুরের বিস্তার, ভাবের গভীরতা আর শিল্পের নৈপুণ্য লক্ষ্য করে তাকে শিক্ষা-বঞ্চিত নিরক্ষর সাধক বলে মানতে দ্বিধা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, লালন ছিলেন স্বশিক্ষিত; দীর্ঘ শতবছর ধরে তিনি জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন। ভাবের সীমাবদ্ধতা, বিষয়ের পৌনঃপুনিকতা, উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বৈচিত্রহীনতা ও সুরের গতানুগতিকতা থেকে লালন ফকির বাউল গানকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তার সমকালেই তার গান লৌকিক ভক্তমণ্ডলীর গণ্ডি অতিক্রম করে শিক্ষিত সমাজকেও স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে।

লালন সাঁই তার গানে ‘অচিন পাখি’ শব্দটি খুব খেয়ালে ব্যবহার করেছেন। তিনি আলেক সাঁই, মনের মানুষ শব্দগুলোও ব্যবহার করেছেন তার কথায় ও গানে। কৌতূহলের ব্যাপার হলো লালনের এই গান থেকেই রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত হিবার্ট বক্তৃতায় উদ্ধৃতি দেন লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটির অংশবিশেষ অনুবাদ করেন এবং লালন দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

লালনের ‘অচিন পাখি’ কিংবা 'মনের মানুষ' আসলে জীবদেহে জীবাত্মা রুপী পরমাত্মা। দেহ ভুবনে তার আসা-যাওয়ার পরম রহস্যই তার সৃষ্টিলীলা। অচিন পাখি এমন এক ধারণা যাতে সীমা ও অসীমের কোন দ্বন্দ নাই, সীমার মাঝে তিনি অসীম, অসীমে তিনি সীমাহীন। অচিন পাখি কিংবা মনের মানুষ ত্রিবেণীতে মধু খান। এ ত্রিবেণী কী তা জানা দরকার আগে। মানব দেহে ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না- এই তিন নাড়ির সংযোগস্থলকে ত্রিবেণী বলে।

বাউল গবেষক মনসুর উদ্দিন, কবি জসিম উদ্দিন, ড. হরেন্দ্র নাথ পালসহ অনেক বাউল গবেষক মনে করেন, অন্তর্নিহিত ভাব না জানলে বাউল গানের আস্বাদ পাওয়া অসম্ভব। একই মন তিনটি মনে, একই প্রেম রস বা রতি তিনটি রতি রসে রূপান্তর লাভ করে। তেমনি একই স্রোত প্রেম সমুদ্রে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়। এ ত্রিবেণী যে বস্তুত: একই ধারা হতে আসে এবং আবার একই ধারায় মিলিত হয় তা জানতে পারলেই মানব মনের ত্রিবেণী সঙ্গম বুঝা যায়। স্রষ্টাতে সহজ আত্মসমর্পণ, স্রষ্টার স্মরণ ও সেবা- এই তিনের যোগে হয় ত্রিবেণী। এটি নিছক জড়বাদী ধ্যান নয় বরং দেহাতীত মানব জীবনে উন্নীত হওয়ার সাধনা।

লালন বলেন,
"করি কেমনে সহজ শুদ্ধ প্রেম সাধন
প্রেম সাধিতে ফাঁপরে উঠে কাম নদীর তুফান"
প্রেম লাভ করতে হলে কামকে বাদ দিয়ে নয়, বরং কাম হতে প্রেম আলাদা করে প্রেম সাধন করতে হয়। অমঙ্গলের মধ্যেই মঙ্গলের জন্ম, তেমনি কামের মধ্যে প্রেমের জন্ম। আবার কখনো প্রেমের মধ্যেই কামের জন্ম হয়। লালন বিভিন্ন রূপকে গান রচনা করেছেন।

লালন বলেন,
"অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়
শুভ যোগ সেই চন্দ্রের উদয়..."
দেহ ভুবনে অমাবস্যা-পূর্ণিমা ও চন্দ্রের উদয়, অস্ত, ক্ষয়, বৃদ্ধি জেনে চন্দ্র সাধন করতে হয়। ড. হরেন্দ্র চন্দ্র পাল এ বিষয়ে বলেন, একই চন্দ্র বা মনই চার রূপে প্রকাশিত। প্রেমিক মনকে যেমন কামুক মন ঢেকে রাখে তেমনি লীলা খেলার মধ্য দিয়ে প্রেমের সুধা ঝরে পড়ে, এক্ষণে মনো দৃষ্টিকে সজাগ রেখে অশুভকে ত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করলে আত্মদৃষ্টি লাভ করা যায়। এই আত্মদৃষ্টিই অচিন পাখিতে মন মজায়।

ফকির লালন সাঁই বলেন, "সাধকের নূরের পেয়ালা/খুলে যাবে রাগের তালা"। সাধকরা নূর সাধনা করে অচিন পাখির খেলা দেখেন। বৌদ্ধ সহজিয়া ও তান্ত্রিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নাথ- পন্থী সাধকদের দ্বারা এ অঞ্চলে চর্যাগীতি ও বাউল সাধনার উদ্ভব হয়। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলে পারস্য উদ্ভূত ও কোরআন ভিত্তিক ইসলামী সূফী ও মরমীবাদের দ্বারা ভারতীয় ভূখণ্ডে এক নতুন সুফিবাদের জন্ম হয়। এদের মূলে রয়েছে সূফী সাধক হাজ্জাজ মনসুর, গাজ্জালী, রুমী, জামী, হাফিজ প্রমুখ মরমী সাধক বৃন্দ।

এখানে তারা শুরু করেন ভাববাদ বা আধ্যাত্মবাদ। ইতিহাসের দিকে খেয়াল করলে পাওয়া যায় যে, পরবর্তীতে খাজা মঈনুদ্দিন আজমেরী, খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার, শেখ ফরিদ উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া প্রমুখসহ আহলে বাইয়াতগণ অর্থাৎ ওলী-আল্লাহ, পীর-পয়গম্বর, গাউস-কুতুব , ফকির-দরবেশ এবং তাদের শিষ্যগণ সূফী মত প্রচার করেন। লালন তার গানে শ্রেষ্ঠ আউলিয়া সুলতানে হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী, নিজাম উদ্দিন আউলিয়াসহ অনেক সূফী সাধকদের কথা উল্লেখ করেছেন।

যাই হোক, আলোচনা আসলে ইতিহাসের পথ ধরে বিভিন্ন বাঁকে চলে যাচ্ছে। বলছিলাম মূলত: লালন সাঁইজির অচিন পাখি ও মনের মানুষ তত্ত্ব নিয়ে। সাঁই তার গানে নিজেকে নাড়ার ফকির হিসেবে পরিচয় দেন। আবার নাড়া বলতে তিনি আল্লাহ, পরমাত্মা বা ঈশ্বরকে বুঝেছেন। লালন বলেন,
"তিল পরিমাণ জায়গাতে কী কুদরতিময়!
জগতজোড়া নাড়া সেথায় বারাম দেয়
বলবো কী সেই নাড়ার গুন বিচার
অমাবস্যা পূর্ণিমা সদায় দীপ্তকার...
সাধক যারা বুঝে তারা পীড়ার খবর নেয়
লালন বলে, তিনটি তারে অনন্ত রূপ কল খাটায়..."

এই নাড়া রুপী অচিন পাখি কিংবা মনের মানুষ বলতে তিনি আল্লাহ বা পরমাত্মাকে বুঝান; যিনি জীবদেহে আসীন এবং জীবাত্মা রূপে বাস করে। হাদিসে বলা হয়, "কুলবিল মুমিনীন আরশে আল্লাহ- অর্থাৎ, মুমিন বা বিশ্বাসীর হৃদয়েই আল্লাহর আরশ অবস্থিত।" লালন তার গানে "আল্লার আরশ"কে 'অধর চাঁদের স্বর্ণপুরী, লা-মোকাম' নামেও উল্লেখ করেন।

লালন শাহের চিন্তাধারার ওপর মধ্যযুগের ধৰ্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও কবিদের প্রভাব আছ। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগ্রহের কারণে ও প্রচেষ্টাতেই লালনের গান প্রথম সম্প্রচারিত হয়। লালন দর্শনে শুধু এই উপমহাদেশই নয়, মজে ছিলেন মার্কিন কবি এলেন গিন্সবার্গও। লালনের দর্শন তাকে এতটাই মোহিত করেছিল যে তার রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। লালন-প্রেমে এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছিলেন যে 'আফটার লালন' নামে একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের ওপরে লালনের প্রভাব আজ সর্বজনবিদিত। এ প্রভাব এতদূর কার্যকর হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজেকে 'রবীন্দ্র বাউল' বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলী, গীতিমালা ও গিতালী সংগীত কাব্যগুলোতে লালনের গানের ছন্দ শৈলীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। শিক্ষিত বাঙালি সমাজে, দেশ ও বিদেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে লালনকে পরিচিত করার ও জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথের। লালন সাঁইয়ের জীবদ্দশায় তার রচনা কিংবা সৃষ্টিতে শিল্প-সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস ছিল অনুপস্থিত এবং লালনও তাই বিশুদ্ধ শিল্প প্রেরণায় তার গান রচনা করেননি, বিশেষ উদ্দেশ্য সংলগ্ন হয়েই তার গানের জন্ম।

তবে উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনকে অতিক্রম করে লালনের গান অনায়াসে শিল্পের সাজানো বাগানে প্রবেশ করেছে স্বমহিমায় এবং এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক শিল্পগুরু ঋদ্ধিমান লিয়াকত আলী লাকী লালন সংগীত চর্চা, সাধনা, গবেষণাসহ লালন/বাউল শিল্পী-সাধক-গবেষকদের আন্তরিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে যাচ্ছেন। বাংলা একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রখ্যাত লালন গবেষক বাউল শফি মণ্ডল লালন সাঁইয়ের প্রায় সাড়ে তিনশত গানের সুর করেছেন; যেগুলো পাণ্ডুলিপিতে ছিল কিন্তু কোন সুর করা ছিল না।

ধারাবাহিকভাবে এখন প্রতিমাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বটমূলে লালনমেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সব লালন সাধক, গবেষক, ভক্ত-অনুরাগীগণ মুখরিত করছে এই প্রান্তর। করোনাকালীন এই মহামারীর সময়েও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাঙালির সংগীত চর্চা, সংগীত সৃজন ও আগামীর সংগীতধারা শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় বাংলা গানের রথী-মহারথীদের নিয়ে অনলাইন আলোচনা, গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। সুর, সংগীত, শিল্প ও সাধনা- এই বিষয়গুলোর ওপর আন্তরিকতা ও বোধ এর জায়গাতে যত্নশীল বিধায়ই শিল্পগুরু ঋদ্ধিমান লিয়াকত আলী লাকী ও তার দপ্তরের কর্মকর্তা সরদার হীরক রাজাসহ সবাই বাংলাদেশে লালন সংগীত ও সাধনাকে আরও উচ্চতর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

তথ্যসূত্র:
১) মহাত্মা লালন ফকির, বসন্ত কুমার পাল, শান্তিপুর (১৯৫৬), ঢাকা।
২) ব্রাত্য লোকায়ত লালন, সুধীর চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, কলকাতা।
৩) লালন শাহ, আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৪) মরমি কবি লালন শাহ: জীবন ও সংগীত, ড. খোন্দকার রিয়াজুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৫) লালন শাহ: জীবন ও গান, এস এম লুৎফর রহমান, বিকাশ মুদ্রণ, ঢাকা।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম, ডেপুটি কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস ও তার ‘অচিন পাখি’ সমাচার

 রুবেল সাইদুল আলম 
১২ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যে খোঁজে মানুষে খোদা, সেই তো বাউল; অথবা মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি- এমন দর্শনেই জীবন পার করছেন ফকির লালন সাঁই। তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে চেনা এবং মানুষকে সাধন-ভজন করার জন্য জীবনভর যুদ্ধ করে গিয়েছেন। আগামী ১৮ অক্টোবর, ২০২০ তার ১৩০তম তিরোধান দিবস। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারীর কারণে এ বছর লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে তার আখড়া বাড়িতে অন্যান্য বছরের ন্যায় ভক্ত-অনুরাগী-সাধকদের কোন মিলনমেলা হবে না মর্মে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন।  

১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির ছেঁউরিয়ায় তিনি দেহ রাখেন। তার কর্ম আমাদের সবার জানা কিন্তু তার ধর্ম আজও অজানা। তার জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোন কোন গবেষক ধারণা করছেন তিনি অবিভক্ত বাংলার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কুষ্টিয়া তখন জেলা ছিল না, অবিভক্ত ভারতবর্ষে নদীয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা ছিল। কুমারখালী ছিল তখন ইউনিয়ন। লালন গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাড়ারা গ্রামের হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন শ্রী মাধব কর আর মা ছিলেন শ্রীমতি পদ্মাবতী।

লালন ছিলেন নিরক্ষর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ তার হয়নি। কিন্তু তার সঙ্গীতের বানীর সৌকর্য, সুরের বিস্তার, ভাবের গভীরতা আর শিল্পের নৈপুণ্য লক্ষ্য করে তাকে শিক্ষা-বঞ্চিত নিরক্ষর সাধক বলে মানতে দ্বিধা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, লালন ছিলেন স্বশিক্ষিত; দীর্ঘ শতবছর ধরে তিনি জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন। ভাবের সীমাবদ্ধতা, বিষয়ের পৌনঃপুনিকতা, উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বৈচিত্রহীনতা ও সুরের গতানুগতিকতা থেকে লালন ফকির বাউল গানকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তার সমকালেই তার গান লৌকিক ভক্তমণ্ডলীর গণ্ডি অতিক্রম করে শিক্ষিত সমাজকেও স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে।

লালন সাঁই তার গানে ‘অচিন পাখি’ শব্দটি খুব খেয়ালে ব্যবহার করেছেন। তিনি আলেক সাঁই, মনের মানুষ শব্দগুলোও ব্যবহার করেছেন তার কথায় ও গানে। কৌতূহলের ব্যাপার হলো লালনের এই গান থেকেই রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত হিবার্ট বক্তৃতায় উদ্ধৃতি দেন  লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটির অংশবিশেষ অনুবাদ করেন এবং লালন দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

লালনের ‘অচিন পাখি’ কিংবা 'মনের মানুষ' আসলে জীবদেহে জীবাত্মা রুপী পরমাত্মা। দেহ ভুবনে তার আসা-যাওয়ার পরম রহস্যই তার সৃষ্টিলীলা। অচিন পাখি এমন এক ধারণা যাতে সীমা ও অসীমের কোন দ্বন্দ নাই, সীমার মাঝে তিনি অসীম, অসীমে তিনি সীমাহীন। অচিন পাখি কিংবা মনের মানুষ ত্রিবেণীতে মধু খান। এ ত্রিবেণী কী তা জানা দরকার আগে। মানব দেহে ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না- এই তিন নাড়ির সংযোগস্থলকে ত্রিবেণী বলে। 

বাউল গবেষক মনসুর উদ্দিন, কবি জসিম উদ্দিন, ড. হরেন্দ্র নাথ পালসহ অনেক বাউল গবেষক মনে করেন, অন্তর্নিহিত ভাব না জানলে বাউল গানের আস্বাদ পাওয়া অসম্ভব। একই মন তিনটি মনে, একই প্রেম রস বা রতি তিনটি রতি রসে রূপান্তর লাভ করে। তেমনি একই স্রোত প্রেম সমুদ্রে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়। এ ত্রিবেণী যে বস্তুত: একই ধারা হতে আসে এবং আবার একই ধারায় মিলিত হয় তা জানতে পারলেই মানব মনের ত্রিবেণী সঙ্গম বুঝা যায়। স্রষ্টাতে সহজ আত্মসমর্পণ, স্রষ্টার স্মরণ ও সেবা- এই তিনের যোগে হয় ত্রিবেণী। এটি নিছক জড়বাদী ধ্যান নয় বরং দেহাতীত মানব জীবনে উন্নীত হওয়ার সাধনা। 

লালন বলেন, 
"করি কেমনে সহজ শুদ্ধ প্রেম সাধন 
প্রেম সাধিতে ফাঁপরে উঠে কাম নদীর তুফান"
প্রেম লাভ করতে হলে কামকে বাদ দিয়ে নয়, বরং কাম হতে প্রেম আলাদা করে প্রেম সাধন করতে হয়। অমঙ্গলের মধ্যেই মঙ্গলের জন্ম, তেমনি কামের মধ্যে প্রেমের জন্ম। আবার কখনো প্রেমের মধ্যেই কামের জন্ম হয়। লালন বিভিন্ন রূপকে গান রচনা করেছেন। 

লালন বলেন,
"অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয় 
শুভ যোগ সেই চন্দ্রের উদয়..." 
দেহ ভুবনে অমাবস্যা-পূর্ণিমা ও চন্দ্রের উদয়, অস্ত, ক্ষয়, বৃদ্ধি জেনে চন্দ্র সাধন করতে হয়। ড. হরেন্দ্র চন্দ্র পাল এ বিষয়ে বলেন, একই চন্দ্র বা মনই চার রূপে প্রকাশিত। প্রেমিক মনকে যেমন কামুক মন ঢেকে রাখে তেমনি লীলা খেলার মধ্য দিয়ে প্রেমের সুধা ঝরে পড়ে, এক্ষণে মনো দৃষ্টিকে সজাগ রেখে অশুভকে ত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করলে আত্মদৃষ্টি লাভ করা যায়। এই আত্মদৃষ্টিই অচিন পাখিতে মন মজায়। 

ফকির লালন সাঁই বলেন, "সাধকের নূরের পেয়ালা/খুলে যাবে রাগের তালা"। সাধকরা নূর সাধনা করে অচিন পাখির খেলা দেখেন। বৌদ্ধ সহজিয়া ও তান্ত্রিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নাথ- পন্থী সাধকদের দ্বারা এ অঞ্চলে চর্যাগীতি ও বাউল সাধনার উদ্ভব হয়। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলে পারস্য উদ্ভূত ও কোরআন ভিত্তিক ইসলামী সূফী ও মরমীবাদের দ্বারা ভারতীয় ভূখণ্ডে এক নতুন সুফিবাদের জন্ম হয়। এদের মূলে রয়েছে সূফী সাধক হাজ্জাজ মনসুর, গাজ্জালী, রুমী, জামী, হাফিজ প্রমুখ মরমী সাধক বৃন্দ।

এখানে তারা শুরু করেন ভাববাদ বা আধ্যাত্মবাদ। ইতিহাসের দিকে খেয়াল করলে পাওয়া যায় যে, পরবর্তীতে খাজা মঈনুদ্দিন আজমেরী, খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার, শেখ ফরিদ উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া প্রমুখসহ আহলে বাইয়াতগণ অর্থাৎ ওলী-আল্লাহ, পীর-পয়গম্বর, গাউস-কুতুব , ফকির-দরবেশ এবং তাদের শিষ্যগণ সূফী মত প্রচার করেন। লালন তার গানে শ্রেষ্ঠ আউলিয়া সুলতানে হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী, নিজাম উদ্দিন আউলিয়াসহ অনেক সূফী সাধকদের কথা উল্লেখ করেছেন। 

যাই হোক, আলোচনা আসলে ইতিহাসের পথ ধরে বিভিন্ন বাঁকে চলে যাচ্ছে। বলছিলাম মূলত: লালন সাঁইজির অচিন পাখি ও মনের মানুষ তত্ত্ব নিয়ে। সাঁই তার গানে নিজেকে নাড়ার ফকির হিসেবে পরিচয় দেন। আবার নাড়া বলতে তিনি আল্লাহ, পরমাত্মা বা ঈশ্বরকে বুঝেছেন। লালন বলেন, 
"তিল পরিমাণ জায়গাতে কী কুদরতিময়!
জগতজোড়া নাড়া সেথায় বারাম দেয়
বলবো কী সেই নাড়ার গুন বিচার 
অমাবস্যা পূর্ণিমা সদায় দীপ্তকার...
সাধক যারা বুঝে তারা পীড়ার খবর নেয় 
লালন বলে, তিনটি তারে অনন্ত রূপ কল খাটায়..."

এই নাড়া রুপী অচিন পাখি কিংবা মনের মানুষ বলতে তিনি আল্লাহ বা পরমাত্মাকে বুঝান; যিনি জীবদেহে আসীন এবং জীবাত্মা রূপে বাস করে। হাদিসে বলা হয়, "কুলবিল মুমিনীন আরশে আল্লাহ- অর্থাৎ, মুমিন বা বিশ্বাসীর হৃদয়েই আল্লাহর আরশ অবস্থিত।" লালন তার গানে "আল্লার আরশ"কে 'অধর চাঁদের স্বর্ণপুরী, লা-মোকাম' নামেও উল্লেখ করেন।

লালন শাহের চিন্তাধারার ওপর মধ্যযুগের ধৰ্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও কবিদের প্রভাব আছ। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগ্রহের কারণে ও প্রচেষ্টাতেই লালনের গান প্রথম সম্প্রচারিত হয়। লালন দর্শনে শুধু এই উপমহাদেশই নয়, মজে ছিলেন মার্কিন কবি এলেন গিন্সবার্গও। লালনের দর্শন তাকে এতটাই মোহিত করেছিল যে তার রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। লালন-প্রেমে এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছিলেন যে 'আফটার লালন' নামে একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন তিনি। 

রবীন্দ্রনাথের ওপরে লালনের প্রভাব আজ সর্বজনবিদিত। এ প্রভাব এতদূর কার্যকর হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজেকে 'রবীন্দ্র বাউল' বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলী, গীতিমালা ও গিতালী সংগীত কাব্যগুলোতে লালনের গানের ছন্দ শৈলীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। শিক্ষিত বাঙালি সমাজে, দেশ ও বিদেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে লালনকে পরিচিত করার ও জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথের। লালন সাঁইয়ের  জীবদ্দশায় তার রচনা কিংবা সৃষ্টিতে শিল্প-সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস ছিল অনুপস্থিত এবং লালনও তাই বিশুদ্ধ শিল্প প্রেরণায় তার গান রচনা করেননি, বিশেষ উদ্দেশ্য সংলগ্ন হয়েই তার গানের জন্ম। 

তবে উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনকে অতিক্রম করে লালনের গান অনায়াসে শিল্পের সাজানো বাগানে প্রবেশ করেছে স্বমহিমায় এবং এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক শিল্পগুরু ঋদ্ধিমান লিয়াকত আলী লাকী লালন সংগীত চর্চা, সাধনা, গবেষণাসহ লালন/বাউল শিল্পী-সাধক-গবেষকদের আন্তরিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে যাচ্ছেন। বাংলা একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রখ্যাত লালন গবেষক বাউল শফি মণ্ডল লালন সাঁইয়ের প্রায় সাড়ে তিনশত গানের সুর করেছেন; যেগুলো পাণ্ডুলিপিতে ছিল কিন্তু কোন সুর করা ছিল না।   

ধারাবাহিকভাবে এখন প্রতিমাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বটমূলে লালনমেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সব লালন সাধক, গবেষক, ভক্ত-অনুরাগীগণ মুখরিত করছে এই প্রান্তর। করোনাকালীন এই মহামারীর সময়েও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাঙালির সংগীত চর্চা, সংগীত সৃজন ও আগামীর সংগীতধারা শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় বাংলা গানের রথী-মহারথীদের নিয়ে অনলাইন আলোচনা, গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। সুর, সংগীত, শিল্প ও সাধনা- এই বিষয়গুলোর ওপর আন্তরিকতা ও বোধ এর জায়গাতে যত্নশীল বিধায়ই শিল্পগুরু ঋদ্ধিমান লিয়াকত আলী লাকী ও তার দপ্তরের কর্মকর্তা সরদার হীরক রাজাসহ সবাই বাংলাদেশে লালন সংগীত ও সাধনাকে আরও উচ্চতর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

তথ্যসূত্র:
১) মহাত্মা লালন ফকির, বসন্ত কুমার পাল, শান্তিপুর (১৯৫৬), ঢাকা।
২) ব্রাত্য লোকায়ত লালন, সুধীর চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, কলকাতা।
৩) লালন শাহ, আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৪) মরমি কবি লালন শাহ: জীবন ও সংগীত, ড. খোন্দকার রিয়াজুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৫) লালন শাহ: জীবন ও গান, এস এম লুৎফর রহমান, বিকাশ মুদ্রণ, ঢাকা।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম, ডেপুটি কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস