সত্য-মিথ্যার পার্থক্য আমরা কতটা বুঝতে পারি?
jugantor
সত্য-মিথ্যার পার্থক্য আমরা কতটা বুঝতে পারি?

  রেহানা রহমান  

২৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৯:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

মিথ্যা যখন সত্যের মত দেখা যায়। ছবি: তুলি

পৃথিবীর সব মানুষ পুরোপুরি খাঁটি নয়, আবার সব মানুষ পুরোপুরি ফেইকও নয়। অধিকাংশ মানুষই এই দুয়ের মাঝামাঝি। যারা খাঁটি তারা ৯০% খাঁটি। আবার যারা ফেইক বা মিথ্যা তারাও ৯০% মিথ্যা। যারা বিশুদ্ধ মানুষ, খাঁটি মানুষ তারা হচ্ছে খোলা বইয়ের মতো। তারা ভেতরে যা, বাইরেও তা। অন্তরে যা ধারণ করে, মুখেও তাই বলে। কাউকে পছন্দ না হলে, মুখের ওপরে বলে দেবে সে কথা। হয়ত তারা ভালো করে কথাও বলবে না সেই ব্যক্তির সাথে।

মিথ্যে মানুষগুলো মুখে কৃত্রিম হাসি আর মেকি উচ্ছ্বাস ধরে রাখে। আর মানুষের সাথে অভিনয় করে যায়। সোনা যেমন পুড়ে খাঁটি হয়, মনও তেমনি পুড়ে পুড়েই খাঁটি হয়। এ জন্যই মেকি মানুষগুলো যখন সবকিছুতে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখায়, খাঁটি বা সাদা মনের মানুষেরা সবসময় অতটা উচ্ছ্বসিত হতে পারে না। অর্থাৎ দেখাতে পারে না।

আমরা এমন এক অস্থির সময়ে আছি যে আমরা আসল ও নকল চিনতে পারি না। সত্য মিথ্যা ধরতে পারি না। কোনটা মেকি কোনটা খাঁটি তা বুঝতে পারি না। একদমই পারি না। আমরা তা চেনার চেষ্টাও কি করি? করলেও কতটুকু? আমরা আদতে খুব একটা চেনার, বোঝার বা ধরার চেষ্টাও করি না। আমাদের সময় নেই। আমাদের মনোযোগ নেই। কীভাবে থাকবে? আসল-নকল চেনার জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি। তা কি আমাদের আছে? থাকলেও ক'জনের ই বা আছে! এটা অর্জনের জন্যযে মেধা ও মননের প্রয়োজন আমাদের তা নেই এমনটি নয়। আছে, কিন্তু আমরা আমাদের মেধা ও চিন্তাশক্তি ব্যয় করি পার্থিব বস্তু অর্জনের জন্য। ব্যক্তিগত লাভের জন্য।

মানুষকে অর্জন করতে হলেও অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন হয় একথা আমরা কজনে জানি বা মানি? আমরা আসল চিনি না। প্রকৃতকে অগ্রাহ্য করি। সত্যকে উচ্চারণ করতে ভয় পাই। নকলকে ভালবাসি আমরা। কৃত্রিমতাকে উদযাপন করি। মেকিকে আলিঙ্গন করি। হীরা ফেলে কাঁচ তুলে নিই। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য জানতে জানতে আমরা নিজেদেরকে আর চিনতে পারি না। দুঃখ হয় যে কথায়, কর্মে আর চিন্তায় খাঁটি মানুষের দেখা আর পাই না এই মোহগ্রস্ত সময়ে। সবাই মুখোশ পরা। বিশুদ্ধ অন্তর এখন দুর্লভ।

মিথ্যা হচ্ছে ধোঁকা। মিথ্যা কাঁচের মতো জ্বলজ্বল করে। কৃত্রিম হাসি ও মেকি সৌন্দর্যে ঢাকা মানুষের মুখগুলো কত ঝলমল করে! দামী আর চমকদার পোশাকের আড়ালে মানুষটাকে আমরা চিনতে পারি না সত্য না মেকি! হীরা প্রথম অবস্থায় অতটা ঝলমল করে না। যতটা করে কাঁচ। আমরা যদি অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে পারি, সত্য চর্চার মাধ্যমে, আমাদের হৃদয় বিশুদ্ধ হবে। সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। চেহারায় তখন তা ফুটে উঠবে।

মেকিকে প্রদর্শন করতে আমরা স্বস্তি অনুভব করি সত্যকে আড়ালে রেখে। সত্য স্বীকার করার মধ্যে ভয় থাকে। সত্য অনুচ্চারিত থাকে। কেন? কারণ তা এত শক্তিশালী আর ভারী, সবাই তা বইবার সাহস ও শক্তি রাখে না। আমিও পারি না মাঝে মাঝে। আর মিথ্যের কোনো শক্তি নেই। কোনো ভার নেই। তবে হ্যাঁ, একটি মিথ্যে সাজানো জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে আবার একটি সত্যও। কখন পারে? বিন্দু বিন্দু শিশির জমে যেমন মহাসমুদ্র হতে পারে। ছোট ছোট মিথ্যে জমতে জমতে মিথ্যের পাহাড় হয়ে যায় যখন, তখন কোনো মানুষের পক্ষেই তার ভার সইবার কথা না। আর তখনই সত্যকে ভীষণ ভারী মনে হয়। এ জন্যই সত্য উন্মোচিত হলে মিথ্যে দিয়ে সাজানো জীবন সত্যের একটু আঘাতেই নড়বড়ে হয়ে যায়। সুতরাং মিথ্যে দিয়ে জীবন নয়, সত্যই জীবনের ভিত হওয়া প্রয়োজন এবং তা আমৃত্যু আজীবন।

আমরা কীভাবে আসলকে চিনবো যেখানে নিজেরাই মেকি, কৃত্রিম আর মুখোশধারী! আমাদের চিন্তা বিশুদ্ধ নয়। আমাদের মুখের কথা সত্য নয়। কর্মে প্রকৃত নই। আমরা যে খাদ্য খাচ্ছি তা নির্ভেজাল নয়। আমরা যে অক্সিজেন নিচ্ছি তাও দূষিত। আমাদের চারপাশ জুড়ে আছে মেকি।

আমরা সবকিছুতে খাঁটি খুঁজি, আসল খুঁজি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত যা যা আমাদের ব্যবহার করতে হয়, সবকিছুই চাই খাঁটি হোক, নির্ভেজাল হোক। কিন্তু কখনো নিজেদের অন্তরের দিকে তাকাই না। কখনো ভাবি না যে, সর্বাগ্রে অন্তরকে বিশুদ্ধ করতে হবে। নিজেরা শুদ্ধ কিনা তা জানি না। ভেবে দেখি না। আপন-পর চিনি না। সত্যিকারের বন্ধুকে জানি না। প্রকৃত বন্ধু কীভাবে চিনবো তা আমরা কম বেশি সবাই জানি।

আমরা জানি যে, আমি যেমনই হই না কেন, বিপদে যে পাশে দাঁড়ায়, সহযোগিতার হাত বাড়ায়, সেই প্রকৃত বন্ধু। সে আমার অন্যায় ধরিয়ে দিয়ে আমাকে শুধরিয়ে দেয়। আমাকে ঘৃণা করে দূরে সরে যায় না। কিন্তু যে বন্ধু আমার অন্যায় কাজকে প্রশ্রয় দেয়, গোপন করে রাখে, ভুল-ত্রুটি শুধরিয়ে দেয় না, পাপ কর্মের খাদে পড়ে যেতে দেখেও বাঁচাতে এগিয়ে আসে না বা প্রয়োজন বোধ করে না, সে কি সত্যিই বন্ধু? বন্ধুত্বের ডেফিনেশন অনুযায়ী সে প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। হতে পারে সে কিছু সময়ের জন্য বন্ধু। আমি নিজে যখন সাদা মনের হতে পারবো, খাঁটি মানুষ হতে পারবো, তখনই কেবল আমি সাদা মনের মানুষ তথা খাঁটি মানুষ চিনে নিতে পারবো। প্রকৃত বন্ধু চিনে নিতে পারবো।

আমাদের এই নীতিহীনতার কারণ আমাদের শৈশবের ভুল শিক্ষা। আমাদের এই নীতি নৈতিকতাহীন জীবন যাপনের কারণ শৈশবে ভুল শিক্ষা গ্রহণ। সততা, নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে শেখানো হয় ভোগবাদী শিক্ষা, পুঁথিগত শিক্ষা যা সঠিকভাবে সততা, নৈতিকতা শেখাতে পারে না। তখন মনুষ্যত্ব অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনই শিক্ষার এবং শেখানোর মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায়।

একসময় ছোটদের শিক্ষা জীবনের প্রথম পড়া শুরু হতো "আদর্শ লিপি" বই পাঠের মাধ্যমে। পুরোটা বই জুড়ে ছিল সততা আর নৈতিকতার শিক্ষা। এই বইয়ের অস্তিত্ব এখন নেই। জানি না হয়ত জাদুঘরে থাকতে পারে। শৈশব থেকেই সত্য বলার শিক্ষা দেয়া জরুরি। আফসোস যে আমরা তা দিই না। ছোটবেলায় অবুঝ শিশুদের বশে আনার জন্য তাদের সাথে ছোট ছোট মিথ্যা বলা হয়। নানা ধোঁকা দেওয়া হয়। এটা ওটার বায়না ধরলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ অজান্তেই তাদের সাথে নানাভাবে মিথ্যা বলি। আমরা ক্রমাগত মিথ্যা বলাটাকে সমস্যা মনেই করি না। আর তাই এটার সমাধান করার চিন্তাও কারো মাথায় আসে না। এভাবেই শিশুর উর্বর হৃদয়ে মিথ্যার বিষবৃক্ষের বীজ বপন করা হয়। শিশু বড় হতে হতে বৃক্ষের শেকড় মজবুত হতে থাকে। অজান্তে সে মিথ্যাকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে ফেলে। তখন তার কাছে মিথ্যাকে মিথ্যা মনে হয় না আর।

মিথ্যা আচরণ দেখে সে বড় হতে থাকে এবং একসময় সে অন্যের সাথেও সত্য বিবর্জিত অর্থাৎ মিথ্যা আচরণ করে। আর এভাবেই সত্য আমাদের অন্তর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হয় সমাজ থেকেও। আমরা অন্তর্দৃষ্টি অর্জন থেকে বঞ্চিত হই। শৈশবে মিথ্যার সাথে পরিচয় এবং সখ্যতা গড়ে ওঠার কারণে বড় হয়ে বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে সত্যকে চিনতে পারলেও ভালোবাসতে পারি না। সত্য শুনতে ভয়। সত্য স্বীকার করতেও ভয়। আসল-নকল চিনতে পারি না। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারি না। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তির জন্যই,আমাদের শান্তির জন্যই সত্যনিষ্ঠ পরিবেশ আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে।

জীবনে কখনো কখনো হয়ত আমরা সত্যকে বাদ দিয়ে মিথ্যাকে গ্রহণ করি। অথচ আমরা একবারও ভেবে দেখিনা যে, এর ফলে ক্ষতিটা আমাদেরই হচ্ছে। সত্য মানে বিশুদ্ধ, প্রকৃত, নির্ভেজাল। সত্য মুক্তি দেয়। সত্য আলো। সত্য মনের প্রশান্তি। সত্য ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। সত্যই সুন্দর। সত্য একটি শক্তি। সত্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর মিথ্যা মানে মেকি, ধোঁকা, নকল। মিথ্যা অন্ধকার। মিথ্যা অন্যায়ের পথ দেখায়। মিথ্যা ধ্বংস করে। মিথ্যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যে হয়ত জীবনে কখনো কখনো সুখ আনে কিন্তু স্বস্তি আনে না। মিথ্যার সুখ স্থায়ী হয় না।

সত্যি বলে শাস্তি পেতে হলেও সত্যই বলা উচিত। নিজের কাছে মুক্তি মিলবে। কিছু কিছু সত্য স্বীকার হয়ত জীবনে ঝড় বয়ে আনতে পারে। অশান্তির কারণ হতে পারে। তখন হয়ত সত্য স্বীকার করতে সময়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবুও সত্যই সর্বদা গ্রহণীয়। মিথ্যা সর্বদাই বর্জনীয়। মিথ্যা নিজে অন্ধকার তাই হৃদয়কেও অন্ধকার করে দেয়। আমরা তখন সত্য-মিথ্যার প্রভেদ করতে পারি না। পৃথিবীর সব মহা মনীষীরা সর্বদা সত্য বলে গেছেন। সত্য বলার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। সত্যকে বরন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন- এমন মহান ব্যক্তিত্বের উদাহরণ এ পৃথিবীতে রয়েছে।

সত্যের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন যিশুখ্রিস্ট। সত্যাশ্রয়ী জোয়ান অব আর্ক যাকে ‘ডাইনি’ বলে মিথ্যা অভিযুক্ত করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। জ্ঞানপ্রেমিক দার্শনিক সক্রেটিসকে সত্যকে সমুন্নত করতে ‘হেমলক বিষ’ পান করে জীবন দিতে হয়েছে। এরাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরঞ্জীব। আর সত্যবাদীতার মহান এক দৃষ্টান্ত হযরত মুহাম্মদ (সা:); যাকে তার চিরশত্রুরা পর্যন্ত 'আল আমীন' নামে ডাকতেন। মিথ্যাশ্রয়ীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যেমন ফেরাউন, হিটলার, মুসোলিনী। সবাই তাদেরকে ঘৃণা করে। তাদের নামে কেউ সন্তানের নাম রাখেন না। তাই সমাজকে, দেশকে সঠিক ও সুন্দর পথে চালাতে- আমাদের সত্যের পথে হেঁটে সামনে অগ্রসর হতে হবে।

সত্য যেহেতু আলো, সত্য তাই হৃদয়কে আলোকিত করে। সেই আলোয় আমরা নিজেকে চিনতে পারি। আসল-নকল চিনতে পারি। আমরা সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারি। "সত্যের ওপর সুদৃঢ় থাকা উচিত। ভয়ের কারণ হলেও এর মধ্যেই মুক্তি। মিথ্যার দ্বারা অর্জিত নিরাপত্তা এবং আভিজাত্য পরিণামে ধ্বংসের কারণ হয়"। আমি জানি এবং বিশ্বাস করি, আজ হোক কাল হোক, সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। আর মিথ্যাকে পরাজিত হতেই হয়।

লেখক: রেহানা রহমান, শিক্ষক ও কলামিস্ট

সত্য-মিথ্যার পার্থক্য আমরা কতটা বুঝতে পারি?

 রেহানা রহমান 
২৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
মিথ্যা যখন সত্যের মত দেখা যায়। ছবি: তুলি
মিথ্যা যখন সত্যের মত দেখা যায়। ছবি: তুলি

পৃথিবীর সব মানুষ পুরোপুরি খাঁটি নয়, আবার সব মানুষ পুরোপুরি ফেইকও নয়। অধিকাংশ মানুষই এই দুয়ের মাঝামাঝি। যারা খাঁটি তারা ৯০% খাঁটি। আবার যারা ফেইক বা মিথ্যা তারাও ৯০% মিথ্যা। যারা বিশুদ্ধ মানুষ, খাঁটি মানুষ তারা হচ্ছে খোলা বইয়ের মতো। তারা ভেতরে যা, বাইরেও তা। অন্তরে যা ধারণ করে, মুখেও তাই বলে। কাউকে পছন্দ না হলে, মুখের ওপরে বলে দেবে সে কথা। হয়ত তারা ভালো করে কথাও বলবে না সেই ব্যক্তির সাথে।

মিথ্যে মানুষগুলো মুখে কৃত্রিম হাসি আর মেকি উচ্ছ্বাস ধরে রাখে। আর মানুষের সাথে অভিনয় করে যায়। সোনা যেমন পুড়ে খাঁটি হয়, মনও তেমনি পুড়ে পুড়েই খাঁটি হয়। এ জন্যই মেকি মানুষগুলো যখন সবকিছুতে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখায়, খাঁটি বা সাদা মনের মানুষেরা সবসময় অতটা উচ্ছ্বসিত হতে পারে না। অর্থাৎ দেখাতে পারে না।

আমরা এমন এক অস্থির সময়ে আছি যে আমরা আসল ও নকল চিনতে পারি না। সত্য মিথ্যা ধরতে পারি না। কোনটা মেকি কোনটা খাঁটি তা বুঝতে পারি না। একদমই পারি না। আমরা তা চেনার চেষ্টাও কি করি? করলেও কতটুকু? আমরা আদতে খুব একটা চেনার, বোঝার বা ধরার চেষ্টাও করি না। আমাদের সময় নেই। আমাদের মনোযোগ নেই। কীভাবে থাকবে? আসল-নকল চেনার জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি। তা কি আমাদের আছে? থাকলেও ক'জনের ই বা আছে! এটা অর্জনের জন্য যে মেধা ও মননের প্রয়োজন আমাদের তা নেই এমনটি নয়। আছে, কিন্তু আমরা আমাদের মেধা ও চিন্তাশক্তি ব্যয় করি পার্থিব বস্তু অর্জনের জন্য। ব্যক্তিগত লাভের জন্য।

মানুষকে অর্জন করতে হলেও অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন হয় একথা আমরা কজনে জানি বা মানি? আমরা আসল চিনি না। প্রকৃতকে অগ্রাহ্য করি। সত্যকে উচ্চারণ করতে ভয় পাই। নকলকে ভালবাসি আমরা। কৃত্রিমতাকে উদযাপন করি। মেকিকে আলিঙ্গন করি। হীরা ফেলে কাঁচ তুলে নিই। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য জানতে জানতে আমরা নিজেদেরকে আর চিনতে পারি না। দুঃখ হয় যে কথায়, কর্মে আর চিন্তায় খাঁটি মানুষের দেখা আর পাই না এই মোহগ্রস্ত সময়ে। সবাই মুখোশ পরা। বিশুদ্ধ অন্তর এখন দুর্লভ।

মিথ্যা হচ্ছে ধোঁকা। মিথ্যা কাঁচের মতো জ্বলজ্বল করে। কৃত্রিম হাসি ও মেকি সৌন্দর্যে ঢাকা মানুষের মুখগুলো কত ঝলমল করে! দামী আর চমকদার পোশাকের আড়ালে মানুষটাকে আমরা চিনতে পারি না সত্য না মেকি! হীরা প্রথম অবস্থায় অতটা ঝলমল করে না। যতটা করে কাঁচ। আমরা যদি অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে পারি, সত্য চর্চার মাধ্যমে, আমাদের হৃদয় বিশুদ্ধ হবে। সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। চেহারায় তখন তা ফুটে উঠবে।

মেকিকে প্রদর্শন করতে আমরা স্বস্তি অনুভব করি সত্যকে আড়ালে রেখে। সত্য স্বীকার করার মধ্যে ভয় থাকে। সত্য অনুচ্চারিত থাকে। কেন? কারণ তা এত শক্তিশালী আর ভারী, সবাই তা বইবার সাহস ও শক্তি রাখে না। আমিও পারি না মাঝে মাঝে। আর মিথ্যের কোনো শক্তি নেই। কোনো ভার নেই। তবে হ্যাঁ, একটি মিথ্যে সাজানো জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে আবার একটি সত্যও। কখন পারে? বিন্দু বিন্দু শিশির জমে যেমন মহাসমুদ্র হতে পারে। ছোট ছোট মিথ্যে জমতে জমতে মিথ্যের পাহাড় হয়ে যায় যখন, তখন কোনো মানুষের পক্ষেই তার ভার সইবার কথা না। আর তখনই সত্যকে ভীষণ ভারী মনে হয়। এ জন্যই সত্য উন্মোচিত হলে মিথ্যে দিয়ে সাজানো জীবন সত্যের একটু আঘাতেই নড়বড়ে হয়ে যায়। সুতরাং মিথ্যে দিয়ে জীবন নয়, সত্যই জীবনের ভিত হওয়া প্রয়োজন এবং তা আমৃত্যু আজীবন।

আমরা কীভাবে আসলকে চিনবো যেখানে নিজেরাই মেকি, কৃত্রিম আর মুখোশধারী! আমাদের চিন্তা বিশুদ্ধ নয়। আমাদের মুখের কথা সত্য নয়। কর্মে প্রকৃত নই। আমরা যে খাদ্য খাচ্ছি তা নির্ভেজাল নয়। আমরা যে অক্সিজেন নিচ্ছি তাও দূষিত। আমাদের চারপাশ জুড়ে আছে মেকি।

আমরা সবকিছুতে খাঁটি খুঁজি, আসল খুঁজি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত যা যা আমাদের ব্যবহার করতে হয়, সবকিছুই চাই খাঁটি হোক, নির্ভেজাল হোক। কিন্তু কখনো নিজেদের অন্তরের দিকে তাকাই না। কখনো ভাবি না যে, সর্বাগ্রে অন্তরকে বিশুদ্ধ করতে হবে। নিজেরা শুদ্ধ কিনা তা জানি না। ভেবে দেখি না। আপন-পর চিনি না। সত্যিকারের বন্ধুকে জানি না। প্রকৃত বন্ধু কীভাবে চিনবো তা আমরা কম বেশি সবাই জানি। 

আমরা জানি যে, আমি যেমনই হই না কেন, বিপদে যে পাশে দাঁড়ায়, সহযোগিতার হাত বাড়ায়, সেই প্রকৃত বন্ধু। সে আমার অন্যায় ধরিয়ে দিয়ে আমাকে শুধরিয়ে দেয়। আমাকে ঘৃণা করে দূরে সরে যায় না। কিন্তু যে বন্ধু আমার অন্যায় কাজকে প্রশ্রয় দেয়, গোপন করে রাখে, ভুল-ত্রুটি শুধরিয়ে দেয় না, পাপ কর্মের খাদে পড়ে যেতে দেখেও বাঁচাতে এগিয়ে আসে না বা প্রয়োজন বোধ করে না, সে কি সত্যিই বন্ধু? বন্ধুত্বের ডেফিনেশন অনুযায়ী সে প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। হতে পারে সে কিছু সময়ের জন্য বন্ধু। আমি নিজে যখন সাদা মনের হতে পারবো, খাঁটি মানুষ হতে পারবো, তখনই কেবল আমি সাদা মনের মানুষ তথা খাঁটি মানুষ চিনে নিতে পারবো। প্রকৃত বন্ধু চিনে নিতে পারবো।

আমাদের এই নীতিহীনতার কারণ আমাদের শৈশবের ভুল শিক্ষা। আমাদের এই নীতি নৈতিকতাহীন জীবন যাপনের কারণ শৈশবে ভুল শিক্ষা গ্রহণ। সততা, নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে শেখানো হয় ভোগবাদী শিক্ষা, পুঁথিগত শিক্ষা যা সঠিকভাবে সততা, নৈতিকতা শেখাতে পারে না। তখন মনুষ্যত্ব অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনই শিক্ষার এবং শেখানোর মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায়।

একসময় ছোটদের শিক্ষা জীবনের প্রথম পড়া শুরু হতো "আদর্শ লিপি" বই পাঠের মাধ্যমে। পুরোটা বই জুড়ে ছিল সততা আর নৈতিকতার শিক্ষা। এই বইয়ের অস্তিত্ব এখন নেই। জানি না হয়ত জাদুঘরে থাকতে পারে। শৈশব থেকেই সত্য বলার শিক্ষা দেয়া জরুরি। আফসোস যে আমরা তা দিই না। ছোটবেলায় অবুঝ শিশুদের বশে আনার জন্য তাদের সাথে ছোট ছোট মিথ্যা বলা হয়। নানা ধোঁকা দেওয়া হয়। এটা ওটার বায়না ধরলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ অজান্তেই তাদের সাথে নানাভাবে মিথ্যা বলি। আমরা ক্রমাগত মিথ্যা বলাটাকে সমস্যা মনেই করি না। আর তাই এটার সমাধান করার চিন্তাও কারো মাথায় আসে না। এভাবেই শিশুর উর্বর হৃদয়ে মিথ্যার বিষবৃক্ষের বীজ বপন করা হয়। শিশু বড় হতে হতে বৃক্ষের শেকড় মজবুত হতে থাকে। অজান্তে সে মিথ্যাকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে ফেলে। তখন তার কাছে মিথ্যাকে মিথ্যা মনে হয় না আর।

মিথ্যা আচরণ দেখে সে বড় হতে থাকে এবং একসময় সে অন্যের সাথেও সত্য বিবর্জিত অর্থাৎ মিথ্যা আচরণ করে। আর এভাবেই সত্য আমাদের অন্তর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হয় সমাজ থেকেও। আমরা অন্তর্দৃষ্টি অর্জন থেকে বঞ্চিত হই। শৈশবে মিথ্যার সাথে পরিচয় এবং সখ্যতা গড়ে ওঠার কারণে বড় হয়ে বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে সত্যকে চিনতে পারলেও ভালোবাসতে পারি না। সত্য শুনতে ভয়। সত্য স্বীকার করতেও ভয়। আসল-নকল চিনতে পারি না। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারি না। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তির জন্যই,আমাদের শান্তির জন্যই সত্যনিষ্ঠ পরিবেশ আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে।

জীবনে কখনো কখনো হয়ত আমরা সত্যকে বাদ দিয়ে মিথ্যাকে গ্রহণ করি। অথচ আমরা একবারও ভেবে দেখিনা যে, এর ফলে ক্ষতিটা আমাদেরই হচ্ছে। সত্য মানে বিশুদ্ধ, প্রকৃত, নির্ভেজাল। সত্য মুক্তি দেয়। সত্য আলো। সত্য মনের প্রশান্তি। সত্য ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। সত্যই সুন্দর। সত্য একটি শক্তি। সত্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর মিথ্যা মানে মেকি, ধোঁকা, নকল। মিথ্যা অন্ধকার। মিথ্যা অন্যায়ের পথ দেখায়। মিথ্যা ধ্বংস করে। মিথ্যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যে হয়ত জীবনে কখনো কখনো সুখ আনে কিন্তু স্বস্তি আনে না। মিথ্যার সুখ স্থায়ী হয় না।

সত্যি বলে শাস্তি পেতে হলেও সত্যই বলা উচিত। নিজের কাছে মুক্তি মিলবে। কিছু কিছু সত্য স্বীকার হয়ত জীবনে ঝড় বয়ে আনতে পারে। অশান্তির কারণ হতে পারে। তখন হয়ত সত্য স্বীকার করতে সময়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবুও সত্যই সর্বদা গ্রহণীয়। মিথ্যা সর্বদাই বর্জনীয়। মিথ্যা নিজে অন্ধকার তাই হৃদয়কেও অন্ধকার করে দেয়। আমরা তখন সত্য-মিথ্যার প্রভেদ করতে পারি না। পৃথিবীর সব মহা মনীষীরা সর্বদা সত্য বলে গেছেন। সত্য বলার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। সত্যকে বরন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন- এমন মহান ব্যক্তিত্বের উদাহরণ এ পৃথিবীতে রয়েছে। 

সত্যের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন যিশুখ্রিস্ট। সত্যাশ্রয়ী জোয়ান অব আর্ক যাকে ‘ডাইনি’ বলে মিথ্যা অভিযুক্ত করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। জ্ঞানপ্রেমিক দার্শনিক সক্রেটিসকে সত্যকে সমুন্নত করতে ‘হেমলক বিষ’ পান করে জীবন দিতে হয়েছে। এরাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরঞ্জীব। আর সত্যবাদীতার মহান এক দৃষ্টান্ত হযরত মুহাম্মদ (সা:); যাকে তার চিরশত্রুরা পর্যন্ত 'আল আমীন' নামে ডাকতেন। মিথ্যাশ্রয়ীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যেমন ফেরাউন, হিটলার, মুসোলিনী। সবাই তাদেরকে ঘৃণা করে। তাদের নামে কেউ সন্তানের নাম রাখেন না। তাই সমাজকে, দেশকে সঠিক ও সুন্দর পথে চালাতে- আমাদের সত্যের পথে হেঁটে সামনে অগ্রসর হতে হবে।
 
সত্য যেহেতু আলো, সত্য তাই হৃদয়কে আলোকিত করে। সেই আলোয় আমরা নিজেকে চিনতে পারি। আসল-নকল চিনতে পারি। আমরা সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারি। "সত্যের ওপর সুদৃঢ় থাকা উচিত। ভয়ের কারণ হলেও এর মধ্যেই মুক্তি। মিথ্যার দ্বারা অর্জিত নিরাপত্তা এবং আভিজাত্য পরিণামে ধ্বংসের কারণ হয়"। আমি জানি এবং বিশ্বাস করি, আজ হোক কাল হোক, সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। আর মিথ্যাকে পরাজিত হতেই হয়।

লেখক: রেহানা রহমান, শিক্ষক ও কলামিস্ট