সঙ্গীতের আকাশে ধুমকেতু আব্দুল হালিম বয়াতী
jugantor
সঙ্গীতের আকাশে ধুমকেতু আব্দুল হালিম বয়াতী

  ডা. তুহিন বিনতে হালিম  

২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৮:০৮:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

সুফি সাধক শিল্পী আব্দুল হালিম মিয়া

মাত্র বছর বয়সে শিশু হালিম সঙ্গীতের আকাশে ধুমকেতুর মত আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হয়ে ধ্রুবতারার ন্যায় স্থায়ী আসন করে নেয় এক শিশু। পরে বঙ্গ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সঙ্গীত পরিবেশন করে বেড়ান। তিনি কারও কাছে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেননি, স্বয়ং শিক্ষিত এই শিল্পী সক্রিয়তায় সমুজ্জ্বল চিরবিজয়ী শিল্পী হিসেবে জনমনে শ্রদ্ধাসনে সমাসীন।

তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন বাংলা লোক সঙ্গীতের প্রবাদ পুরুষ আব্দুল হালিম মিয়া। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাধীন বড়দোয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ হরেন।

শিক্ষকবিহীন শিল্পীর এই অপরিসীম সার্থকতা, সফলতা জনপ্রিয়তায় তার সম্পর্কে অনেক প্রবাদ-প্রবচন, অনেক কথা-কথকতা জনমনে ধ্রুব সত্যে প্রতিষ্ঠিত। ঐশ্বরিক প্রতিভায় প্রদীপ্ত এই সঙ্গীতজ্ঞ লোক সঙ্গীতের জগতে মহান মিথ মন্ডিত ব্যক্তিত্ব।

সঙ্গীতকে তিনি ধর্ম সঙ্গীতে পরিণত করে মানবতার মুক্তির পথ আবিষ্কার করেছেন। তার আধ্যাত্মিক গানে মানুষের আত্মিক স্বাধীনতা সার্বভৌমত্তের স্বীকৃতি মেলে। তার গানের বিষয় বস্তু বহুবিচিত্র। লোক সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারাবিচার গানতারই এক অভিনব সৃষ্টি। আদর্শ প্রচার মাধ্যম ছাড়াও সঙ্গীতকে তিনি শিক্ষামূলক শিল্পে পরিণত করেছেন।

সাধক হালিম বলতেনমহাবিশ্ব স্রষ্টা সৃষ্টির লীলা নিকেতন। পার্থিব-অপার্থিব, লৌকিক-অলৌকিক, দৃশ্য-অদৃশ্য, সবকিছু যিনি সৃজন করেছেন তিনিই স্রষ্টা । স্রষ্টাকে চেনা-জানা মানব জীবনের চরম পরম লক্ষ্য। আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেনতিনি সর্বত্র বিরাজিততাকে ধ্যানে-জ্ঞানে আবিষ্কার করতে হয়।

আমি কে ? কোথা হতে এলাম ? কেমন করে এলাম ? কেন এলাম ? আবার কোথায় যাব ? মানব মনে প্রশ্ন জন্ম জন্মান্তরের। জীবনের জন্যই জীবনকে জানা প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজন পরিপূর্ণ একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

ধর্মের পথে জ্ঞানের রথে পাড়ি দিয়ে আমি সৃষ্টিকে, স্রষ্টাকে যেভাবে যতটুকু জানতে বুঝতে সক্ষম হয়েছি ঠিক সেইভাবেই সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করেছি। আমার ধ্যানের ছবি জ্ঞানের সীমায় যতটুকু দর্শনে সক্ষম হয়েছি ততটুকুই যথাযথ রূপে রূপায়নের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি

সঙ্গীতের মাধ্যমে দেশ জাতি তথা মানবসেবায় ব্রতী এই সঙ্গীতজ্ঞ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাহাযার্থ্যে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। সমাজসেবা সমাজ সংস্করণে তার সঙ্গীতে অসামান্য অবদান রেখেছে।

আব্দুল হালিম মিয়ার রচিত গানহালিম সঙ্গীতনামে প্রচলিত।তিনি অসংখ্য (/ হাজার) গান রচনা করেছেন। এই পর্যন্ত তার ৭টি সঙ্গীত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

গ্রন্থগুলো হচ্ছে-

► হালিম সঙ্গীত (১৯৪৭)

► হালিম সঙ্গীত তর্কযুদ্ধ (১৯৬৩)

► জ্ঞান দর্পন (১৯৫৭)

► মুসুল্লী ফকিরের তর্কযুদ্ধ (১৯৫৮)

► প্রেম সূধা (১৯৬৫)

► পরশ রতন (১৯৭৬)

► সৃষ্টি তত্ব (১৯৯১)

বাংলা একাডেমি থেকে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় আব্দুল হালিম বয়াতী, জীবন সঙ্গীত নামক একটি জীবনী গ্রন্থ। তিনি বাংলা একাডেমির একজন সম্মানিত ফেলো।

জননন্দিত শিল্পী আব্দুল হালিম মিয়া জাতীয় সম্প্রচার গণমাধ্যমের প্রতিটি বিভাগে সার্থকতার সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশ করেছেন। তিনি জাতীয় সম্প্রচার গণমাধ্যমের বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার সঙ্গীত শিল্পী এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন।

১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ থেকে রেডিওতে, ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দে চলচ্চিত্রে(আসিয়া ছবিতে সচিত্র), ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দ থেকে গ্রামোফোন রেকর্ডে, ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দ থেকে বিটিভিতে, ১৯৮২ খৃষ্টাব্দ থেকে ক্যাসেট এবং বাংলা একাডেমি শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে অপরিসীম জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (আবু) এর ন্যায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তার গান পুরস্কৃত হয়েছে।

আব্দুল হালিম মিয়া একজন সিদ্ধার্থ কবি সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। এই মহান সুফি সাধক ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন।

লেখক: ডা. তুহিন বিনতে হালিম, আবদুল হালিম বয়াতীর কন্যা

সঙ্গীতের আকাশে ধুমকেতু আব্দুল হালিম বয়াতী

 ডা. তুহিন বিনতে হালিম 
২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৬:০৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সুফি সাধক শিল্পী আব্দুল হালিম মিয়া
সুফি সাধক শিল্পী আব্দুল হালিম মিয়া। ফাইল ছবি

মাত্র বছর বয়সে শিশু হালিম সঙ্গীতের আকাশে ধুমকেতুর মত আকস্মিকভাবে আবির্ভূত হয়ে ধ্রুবতারার ন্যায় স্থায়ী আসন করে নেয় এক শিশু।  পরে বঙ্গ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সঙ্গীত পরিবেশন করে বেড়ান। তিনি কারও কাছে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেননি, স্বয়ং শিক্ষিত এই শিল্পী সক্রিয়তায় সমুজ্জ্বল চিরবিজয়ী শিল্পী হিসেবে জনমনে শ্রদ্ধাসনে সমাসীন।

তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন বাংলা লোক সঙ্গীতের প্রবাদ পুরুষ আব্দুল হালিম মিয়া।  ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাধীন বড়দোয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ হরেন।  

শিক্ষকবিহীন শিল্পীর এই অপরিসীম সার্থকতা, সফলতা জনপ্রিয়তায় তার সম্পর্কে অনেক প্রবাদ-প্রবচন, অনেক কথা-কথকতা জনমনে ধ্রুব সত্যে প্রতিষ্ঠিত। ঐশ্বরিক প্রতিভায় প্রদীপ্ত এই সঙ্গীতজ্ঞ লোক সঙ্গীতের জগতে মহান মিথ মন্ডিত ব্যক্তিত্ব।

সঙ্গীতকে তিনি ধর্ম সঙ্গীতে পরিণত করে মানবতার মুক্তির পথ আবিষ্কার করেছেন। তার আধ্যাত্মিক গানে মানুষের আত্মিক স্বাধীনতা সার্বভৌমত্তের স্বীকৃতি মেলে। তার গানের বিষয় বস্তু বহুবিচিত্র। লোক সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারাবিচার গানতারই এক অভিনব সৃষ্টি। আদর্শ প্রচার মাধ্যম ছাড়াও সঙ্গীতকে তিনি শিক্ষামূলক শিল্পে পরিণত করেছেন। 

সাধক হালিম বলতেনমহাবিশ্ব স্রষ্টা সৃষ্টির লীলা নিকেতন। পার্থিব-অপার্থিব, লৌকিক-অলৌকিক, দৃশ্য-অদৃশ্য, সবকিছু যিনি সৃজন করেছেন তিনিই স্রষ্টা ।  স্রষ্টাকে চেনা-জানা মানব জীবনের চরম পরম লক্ষ্য।  আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেনতিনি সর্বত্র বিরাজিততাকে ধ্যানে-জ্ঞানে আবিষ্কার করতে হয়।

আমি কে ? কোথা হতে এলাম ? কেমন করে এলাম ? কেন এলাম ? আবার কোথায় যাব ? মানব মনে প্রশ্ন জন্ম জন্মান্তরের। জীবনের জন্যই জীবনকে জানা প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজন পরিপূর্ণ একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

ধর্মের পথে জ্ঞানের রথে পাড়ি দিয়ে আমি সৃষ্টিকে,  স্রষ্টাকে যেভাবে যতটুকু জানতে বুঝতে সক্ষম হয়েছি ঠিক সেইভাবেই সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করেছি। আমার ধ্যানের ছবি জ্ঞানের সীমায় যতটুকু দর্শনে সক্ষম হয়েছি ততটুকুই যথাযথ রূপে রূপায়নের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি

সঙ্গীতের মাধ্যমে দেশ জাতি তথা মানবসেবায় ব্রতী এই সঙ্গীতজ্ঞ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাহাযার্থ্যে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।  সমাজসেবা সমাজ সংস্করণে তার সঙ্গীতে অসামান্য অবদান রেখেছে।

আব্দুল হালিম মিয়ার রচিত গানহালিম সঙ্গীতনামে প্রচলিত।  তিনি অসংখ্য (/ হাজার) গান রচনা করেছেন। এই পর্যন্ত তার ৭টি সঙ্গীত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

গ্রন্থগুলো হচ্ছে-

► হালিম সঙ্গীত (১৯৪৭)

► হালিম সঙ্গীত তর্কযুদ্ধ (১৯৬৩)

► জ্ঞান দর্পন (১৯৫৭)

► মুসুল্লী ফকিরের তর্কযুদ্ধ (১৯৫৮)

► প্রেম সূধা (১৯৬৫)

► পরশ রতন (১৯৭৬)

► সৃষ্টি তত্ব (১৯৯১)

বাংলা একাডেমি থেকে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় আব্দুল হালিম বয়াতী, জীবন সঙ্গীত নামক একটি জীবনী গ্রন্থ। তিনি বাংলা একাডেমির একজন সম্মানিত ফেলো।

জননন্দিত শিল্পী আব্দুল হালিম মিয়া জাতীয় সম্প্রচার গণমাধ্যমের প্রতিটি বিভাগে সার্থকতার সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশ করেছেন। তিনি জাতীয় সম্প্রচার গণমাধ্যমের বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার সঙ্গীত শিল্পী এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন।

১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ থেকে রেডিওতে, ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দে চলচ্চিত্রে (আসিয়া ছবিতে সচিত্র), ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দ থেকে গ্রামোফোন রেকর্ডে, ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দ থেকে বিটিভিতে, ১৯৮২ খৃষ্টাব্দ থেকে ক্যাসেট এবং বাংলা একাডেমি শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে অপরিসীম জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (আবু) এর ন্যায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তার গান পুরস্কৃত হয়েছে।

আব্দুল হালিম মিয়া একজন সিদ্ধার্থ কবি সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। এই মহান সুফি সাধক ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন।

লেখক: ডা. তুহিন বিনতে হালিম, আবদুল হালিম বয়াতীর কন্যা