ট্রাম্প হারলেও হারেনি ‘ট্রাম্পইজম’
jugantor
ট্রাম্প হারলেও হারেনি ‘ট্রাম্পইজম’

  মামুন ফরাজী  

২৬ নভেম্বর ২০২০, ২০:০৭:৩৬  |  অনলাইন সংস্করণ

মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেনের জয়ের পর আমেরিকাজুড়ে উচ্ছ্বাস ও আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। অন্ধ ট্রাম্পভক্ত ছাড়া মোটামুটি সবাই বাইডেনের জয়ে খুশি। পাশাপাশি তার জয়ে বিশ্বের উদার, গণতন্ত্রী, কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও সংবেদনশীল মানুষেরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন। তবে এ উচ্ছ্বাস ও খুশির পেছনে বাইডেনের জয়ের চেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের হেরে যাওয়াই বেশি কাজ করছে। কারণ বর্ণবাদ তথা বিভেদের উন্মাদনা ছড়িয়ে মার্কিন সমাজে যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ট্রাম্প সৃষ্টি করেছিলেন; আপাতত সেখান থেকে মুক্তি মিলেছে। তাছাড়া আগামী চার বছর অন্তত এ ধরনের একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পাগলামি দেখতে হবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল- ট্রাম্প হারলেও কি তার দর্শন (যাকে অনেকে ‘ট্রাম্পইজম’ বলে থাকেন) হেরে গেছে? বিগত চার বছর ধরে ট্রাম্প আমেরিকার সমাজে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা সাদাদের শ্রেষ্ঠত্বের নামে সমাজে যে বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছেন, উগ্র-জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চালু করেছেন, নারীবিদ্বেষী ও অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ছড়িয়েছেন- সেসব কি এই ভোটের মধ্য দিয়ে পরাজয় বরণ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর হল- না।

চার বছরে আমেরিকার দুই-তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সফলতা খুবই কম। সর্বশেষ করোনা মহামারীর সময় তিনি যা করলেন ও দেখালেন- তা সত্যিই লজ্জাকর। আচার-আচারণ, কথাবার্তা ও প্রশাসন পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশ ও বিশ্বের কাছে বিকৃত মানসিকতার লোক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অভিবাসনবিরোধী নানা পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। তারপরও এত ভোট প্রাপ্তি বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই- এটা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি ৭ কোটি পপুলার ভোট পেয়েছেন। আর নির্বাচনের ফল গণনা নিয়ে তার সমর্থকরা যা করলেন তাতে স্পষ্ট ট্রাম্পইজম বা ট্রাম্পবাদ মার্কিন সমাজে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

৮ নভেম্বর ব্রিটের দৈনিক গার্ডিয়ানে- Trumpism isn't dead. The battle for free democracies just got harder (By-Simon Tisdal); Donald Trump has been defeated : But Trumpism Could be here to stay (By Geoffery Kabaservice) শিরোনামে প্রকাশিত দু’টি নিবন্ধেও এমনটাই বলা হয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দর্শন মরে যায়নি বরং এটা বেঁচে থাকবে।

বিভিন্ন সময় ট্রাম্পের দেয়া বক্তৃতা, কথাবার্তা এবং দেশ পরিচালনায় নেয়া কিছু নীতি থেকেই ট্রাম্পইজমের ধারণা পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন- আমেরিকাই ফার্স্ট। নিজ দেশের শিল্প সংরক্ষণে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক দায়-দায়িত্ব পালন করে অর্থ খরচ করা উচিত না। অভিবাসীরা আমেরিকায় নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে, কাজেই অভিবাসী আগমনে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। মুখে প্রকাশ না করলেও তিনি সাদাদের অধিপত্য আরও মজবুত ও পাকাপোক্ত করার নীতিতে বিশ্বাসী।

মার্কিন সমাজে এখন দুই ধারার মানুষের বসবাস। একটি হল- শিক্ষিত মধ্যবিত্ত; যারা উদার ও বহুত্ববাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইনক্লুসিভ জীবনাচারে অভ্যস্ত। এরা বহির্বিশ্বে আমেরিকাকে শক্তিশালী দেখতে চান। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও ফোরামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পক্ষে। এ জনগোষ্ঠীটি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মেট্রোপলিটন বা শহর এলাকায় বাস করে। আর অন্যটি হল- অত্যন্ত রক্ষণশীল। এরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম শিক্ষিত এবং শহরের চিন্তার ধার ধারেন না। গ্রামের এ মানুষগুলোর মধ্যেই ট্রাম্পের চিন্তাধারা খুবই জনপ্রিয়। আর এ জন্যই ট্রাম্প এত ভোট পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা সমাজের এই দ্বিধা-বিভক্ত জনগোষ্ঠীর দুই বলয়কে কেন্দ্র করেই তাদের রাজনৈতিক দর্শনচর্চা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মার্কিন সমাজের রক্ষণশীল ধারাটির মধ্যে ট্রাম্প জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে পেরেছেন এবং তার চিন্তাকে রাষ্ট্রীয়নীতি ও কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্প তাদের কাছে প্রেরণার পাত্র হয়ে গেছেন। সামনে ট্রাম্প রাজনীতিতে না থাকলেও মার্কিন সমাজে তার দর্শনচর্চা হবে। ট্রাম্পের মতো নেতার জন্ম নেবে এবং এর মধ্য দিয়ে ‘শুভ্র জাতীয়তাবাদ’ আরও প্রবল হবে উঠবে। বাইডেন ভক্ত তথা ডেমোক্র্যাটরা হয়তো আগামী নির্বাচনেই এর প্রমাণ পাবেন।

আর বাইডেনের জয় নিয়ে বহির্বিশ্বের যারা আনন্দ উল্লাস করছেন, তাদের মোহ হয়তো শিগগিরই ভাঙবে। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্বে আমেরিকার মাতুব্বরি বাড়বে। ট্রাম্পের সময় অবহেলার মুখে পড়া ন্যাটোসহ বিভিন্ন জোট আবার শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। ভারতকে ভর করে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। এতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো নানামুখী সমস্যায় পড়বে।

মামুন ফরাজী, সাংবাদিক

ট্রাম্প হারলেও হারেনি ‘ট্রাম্পইজম’

 মামুন ফরাজী 
২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৮:০৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেনের জয়ের পর আমেরিকাজুড়ে উচ্ছ্বাস ও আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। অন্ধ ট্রাম্পভক্ত ছাড়া মোটামুটি সবাই বাইডেনের জয়ে খুশি। পাশাপাশি তার জয়ে বিশ্বের উদার, গণতন্ত্রী, কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও সংবেদনশীল মানুষেরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন। তবে এ উচ্ছ্বাস ও খুশির পেছনে বাইডেনের জয়ের চেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের হেরে যাওয়াই বেশি কাজ করছে। কারণ বর্ণবাদ তথা বিভেদের উন্মাদনা ছড়িয়ে মার্কিন সমাজে যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ট্রাম্প সৃষ্টি করেছিলেন; আপাতত সেখান থেকে মুক্তি মিলেছে। তাছাড়া আগামী চার বছর অন্তত এ ধরনের একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পাগলামি দেখতে হবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল- ট্রাম্প হারলেও কি তার দর্শন (যাকে অনেকে ‘ট্রাম্পইজম’ বলে থাকেন) হেরে গেছে? বিগত চার বছর ধরে ট্রাম্প আমেরিকার সমাজে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা সাদাদের শ্রেষ্ঠত্বের নামে সমাজে যে বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছেন, উগ্র-জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চালু করেছেন, নারীবিদ্বেষী ও অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ছড়িয়েছেন- সেসব কি এই ভোটের মধ্য দিয়ে পরাজয় বরণ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর হল- না।

চার বছরে আমেরিকার দুই-তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সফলতা খুবই কম। সর্বশেষ করোনা মহামারীর সময় তিনি যা করলেন ও দেখালেন- তা সত্যিই লজ্জাকর। আচার-আচারণ, কথাবার্তা ও প্রশাসন পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশ ও বিশ্বের কাছে বিকৃত মানসিকতার লোক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অভিবাসনবিরোধী নানা পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। তারপরও এত ভোট প্রাপ্তি বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই- এটা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি ৭ কোটি পপুলার ভোট পেয়েছেন। আর নির্বাচনের ফল গণনা নিয়ে তার সমর্থকরা যা করলেন তাতে স্পষ্ট ট্রাম্পইজম বা ট্রাম্পবাদ মার্কিন সমাজে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

৮ নভেম্বর ব্রিটের দৈনিক গার্ডিয়ানে- Trumpism isn't dead. The battle for free democracies just got harder (By-Simon Tisdal);  Donald Trump has been defeated : But Trumpism Could be here to stay (By Geoffery Kabaservice) শিরোনামে প্রকাশিত দু’টি নিবন্ধেও এমনটাই বলা হয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দর্শন মরে যায়নি বরং এটা বেঁচে থাকবে।

বিভিন্ন সময় ট্রাম্পের দেয়া বক্তৃতা, কথাবার্তা এবং দেশ পরিচালনায় নেয়া কিছু নীতি থেকেই ট্রাম্পইজমের ধারণা পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন- আমেরিকাই ফার্স্ট। নিজ দেশের শিল্প সংরক্ষণে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক দায়-দায়িত্ব পালন করে অর্থ খরচ করা উচিত না। অভিবাসীরা আমেরিকায় নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে, কাজেই অভিবাসী আগমনে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। মুখে প্রকাশ না করলেও তিনি সাদাদের অধিপত্য আরও মজবুত ও পাকাপোক্ত করার নীতিতে বিশ্বাসী।

মার্কিন সমাজে এখন দুই ধারার মানুষের বসবাস। একটি হল- শিক্ষিত মধ্যবিত্ত; যারা উদার ও বহুত্ববাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইনক্লুসিভ জীবনাচারে অভ্যস্ত। এরা বহির্বিশ্বে আমেরিকাকে শক্তিশালী দেখতে চান। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও ফোরামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পক্ষে। এ জনগোষ্ঠীটি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মেট্রোপলিটন বা শহর এলাকায় বাস করে। আর অন্যটি হল- অত্যন্ত রক্ষণশীল। এরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম শিক্ষিত এবং শহরের চিন্তার ধার ধারেন না। গ্রামের এ মানুষগুলোর মধ্যেই ট্রাম্পের চিন্তাধারা খুবই জনপ্রিয়। আর এ জন্যই ট্রাম্প এত ভোট পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা সমাজের এই দ্বিধা-বিভক্ত জনগোষ্ঠীর দুই বলয়কে কেন্দ্র করেই তাদের রাজনৈতিক দর্শনচর্চা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মার্কিন সমাজের রক্ষণশীল ধারাটির মধ্যে ট্রাম্প জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে পেরেছেন এবং তার চিন্তাকে রাষ্ট্রীয়নীতি ও কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্প তাদের কাছে প্রেরণার পাত্র হয়ে গেছেন। সামনে ট্রাম্প রাজনীতিতে না থাকলেও মার্কিন সমাজে তার দর্শনচর্চা হবে। ট্রাম্পের মতো নেতার জন্ম নেবে এবং এর মধ্য দিয়ে ‘শুভ্র জাতীয়তাবাদ’ আরও প্রবল হবে উঠবে। বাইডেন ভক্ত তথা ডেমোক্র্যাটরা হয়তো আগামী নির্বাচনেই এর প্রমাণ পাবেন।

আর বাইডেনের জয় নিয়ে বহির্বিশ্বের যারা আনন্দ উল্লাস করছেন, তাদের মোহ হয়তো শিগগিরই ভাঙবে। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্বে আমেরিকার মাতুব্বরি বাড়বে। ট্রাম্পের সময় অবহেলার মুখে পড়া ন্যাটোসহ বিভিন্ন জোট আবার শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। ভারতকে ভর করে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। এতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো নানামুখী সমস্যায় পড়বে।

মামুন ফরাজী, সাংবাদিক