যে কারণে বাড়ছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব
jugantor
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা
যে কারণে বাড়ছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব

  মামুন ফরাজী  

০১ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২১:৪৩  |  অনলাইন সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা

ধর্মভিত্তিক দল ও গ্রুপগুলো ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করছে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় শোডাউনসহ সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনার মধ্যদিয়ে বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে।

এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। ধর্মীয় ইস্যু ছাড়াও রাজনৈতিক স্পর্শকাতর অনেক বিষয় নিয়ে দলগুলো কথা বলছে।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের দাবি তুলেছে তারা, যা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েছে।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর এ ধরনের তৎপরতায় বিএনপিসহ বড় দলগুলোও চাপের মুখে। কারণ বিভিন্ন ইস্যুতে তারাও এভাবে শোডাউন করতে পারছে না।

কিন্তু কি কারণে বাড়ছে অতি রক্ষণশীলদের প্রভাব? এই প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে। কেউ বলছেন- রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে কট্টর ডানপন্থার উত্থান হচ্ছে।

বামপন্থী তথা প্রগতিশীদের আগের মতো তৎপরতা নেই। বিএনপিসহ বিরোধী অন্যান্য দলগুলোর তৎপরতাও সেভাবে নেই। এই সুযোগে ডানপন্থীদের তৎপরতা বেড়েছে শহর-গ্রাম সর্বত্র। তারাই এখন শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে।

রক্ষণশীলরা এখন আর ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। কর্মসূচিও পালন করছে।

আবার কেউ মনে করছেন- আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে শুধুই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থী দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে।

বিএনপি ও জামায়াতকে ঠেকানোর নামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মাদ্রাসাভিত্তিক কিছু দল ও গ্রুপকে নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আস্কারা দিয়ে চলছে। এর মধ্যদিয়ে আসলে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের কবর নিজেরাই খনন করছেন।

তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা। মাদ্রাসাভিত্তিক এই দল ও গ্রুপগুলো যদি কোনোদিন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তারা সব ভাস্কর্য তো গুড়িয়ে দেবেই, এ দেশ থেকে মুছে ফেলবে বঙ্গবন্ধুর নাম।

অনেকের মতে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এবং পীরদের দলগুলোর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জামায়াতে ইসলামী। নানা কারণে জামায়াতের এখন প্রকাশ্য তৎপরতা নেই।

এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছে দলটি। আর সেই স্পেসটি নেয়ার চেষ্টা করছে অতি রক্ষণশীলরা। তাছাড়া ধর্মভিত্তিক দলগুলো জনগণের মধ্যে ছোট পরিসরে হলেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে এবং এর ভিত্তিতেই দেশের প্রচলিত রাজনীতিতে তাদের একটা প্রভাব তৈরি হয়েছে।

ধর্মভিত্তিক শক্তির সর্বপ্রথম ব্যাপক শক্তি প্রদর্শন দেখা যায় ২০১৩ সালের ৫ মে। ওইদিন রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, দৈনিক বংলাসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজত ইসলামী। তারা দোকানপাট, ব্যাংকের বুথসহ নানা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেয়।

রাস্তার মাঝের শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়। দিনভর তাণ্ডবের পর রাতে তারা অবস্থান নেয় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। বিবৃতি দিয়ে হেফাজত কর্মীদের এই কাজে উৎসাহ যোগায় বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল। যদিও রাতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সর্বাত্মক অ্যাকশানে হেফাজত নেতাকর্মীরা শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই রাতে হেফাজত কর্মীদের সরানো না গেলো তারা শেখ হাসিনার সরকারকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিত। তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগ দিত বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। হয়তো এর মধ্যদিয়ে সরকারের পতনও হতে পারত।

মজার ব্যাপার হলো- এই ঘটনার কিছুদিন পরই অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে হেফাজতের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব কমে যায়। শুধু দূরত্ব কমা নয়, হেফজতের সঙ্গে তাদের একটা সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এরপর সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে হেফাজত নেতারা চুপ হয়ে

এ নিয়ে সংগঠনটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দেয়। সরকারবিরোধী কট্টর একটি অংশ আপসকামীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এরপর নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে সম্প্রতি এই গ্রুপটি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।

ইতিমধ্যে তারা নতুন কমিটিও করেছে। শুধু কমিটি নয়, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা, ‘মুরতাদ-নাস্তিকদের’ শাস্তির বিধান রেখে আইন পাসসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে নতুন নেতৃত্ব।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে যেসব গ্রুপ ও দল বিরোধিতা করছে তারমধ্যে হেফাজত অন্যতম। হেফাজত ছাড়াও ধর্মভিত্তিক আরেকটি বড় গ্রুপ বা দল হলো ইসলামী আন্দোলন। এই গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন চরমোনাইয়ের মরহুম পীরের ছেলে।

তার মুখেও প্রায়ই সরকারবিরোধী কথাবার্তা শোনা যায়। এই গ্রুপটিও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধী।

নানা ইস্যুতে তৎপর এমন কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, ক্রমেই তারা শক্তি সঞ্চয় করছেন এবং সমাজে তাদের প্রভাব পড়ছে। তাদের একটা ভাল অবস্থান তৈরির সুযোগও তৈরি হয়েছে। সরকারবিরোধী বিভিন্ন শক্তির নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করার চেষ্টা করছেন।

তারা আরও জানান, রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকার তাদের বাঁধা দিলেও অরাজনৈতিক বিষয়ে বাঁধা দিচ্ছে না। এটা একটা ইতিবাচক দিক। সরকার হয়তো ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছে না- এ কারণেই অরাজনৈতিক ইস্যুতে বাধা দিচ্ছে না।

কট্টর একটি মৌলবাদী দলের কয়েকজন নেতা জানান, এক দশক ধরেই তাদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে।

এর কারণ হলো- মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের জন্য বাংলাদেশিদের যাওয়ার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ফলে ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটা প্রভাব একেবারে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মাঝে পড়েছে।

এছাড়া দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারও হচ্ছে। যারা মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নেয়, তারা সাধারণত ধর্মভিত্তিক দলছাড়া অন্যদলকে সমর্থন করে না। প্রতি বছরই মাদ্রাসাগুলো থেকে লাখ লাখ ছাত্র বের হচ্ছে। এরা সমাজের বিভিন্ন স্থানে জায়গা করে নিচ্ছে।

যেখানেই তারা যাচ্ছে, মানুষকে ধর্মের কথা বলছে। অনেকে সরাসরি ধর্মীয় রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করছে। আর এভাবেই তাদের শক্তি বাড়ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের মতে, ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জোটবব্ধ হয়ে রাজনীতি করার প্রবণতা। জোটের রাজনীতি মেরুকরণ হয়ে আসছে দুই দলের নেতৃত্বেই।

ক্ষমতার স্বার্থে প্রধান দুই দলই ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাক্ষিণপন্থীরা রাষ্ট্রের অনেক সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে। এভাবেই বাড়ছে তাদের শক্তি ও সামর্থ।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো- অতি রক্ষণশীল চিন্তার মানুষও আওয়ামী লীগে জায়গা করে নিচ্ছে। এই লোকগুলো দলীয় নীতি আদর্শের তোয়াক্কা করেন না।

তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পক্ষে নয়, ধর্মীয় রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করার পক্ষে। এই অংশটি দলীয় আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতারও ধার ধারে না।

মামুন ফরাজী
সাংবাদিক

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা

যে কারণে বাড়ছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব

 মামুন ফরাজী 
০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:২১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা
ফাইল ছবি

ধর্মভিত্তিক দল ও গ্রুপগুলো ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করছে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় শোডাউনসহ সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনার মধ্যদিয়ে বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। 

এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। ধর্মীয় ইস্যু ছাড়াও রাজনৈতিক স্পর্শকাতর অনেক বিষয় নিয়ে দলগুলো কথা বলছে। 

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের দাবি তুলেছে তারা, যা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েছে। 

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর এ ধরনের তৎপরতায় বিএনপিসহ বড় দলগুলোও চাপের মুখে। কারণ বিভিন্ন ইস্যুতে তারাও এভাবে শোডাউন করতে পারছে না।

কিন্তু কি কারণে বাড়ছে অতি রক্ষণশীলদের প্রভাব? এই প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে। কেউ বলছেন- রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে কট্টর ডানপন্থার উত্থান হচ্ছে। 

বামপন্থী তথা প্রগতিশীদের আগের মতো তৎপরতা নেই। বিএনপিসহ বিরোধী অন্যান্য দলগুলোর তৎপরতাও সেভাবে নেই। এই সুযোগে ডানপন্থীদের তৎপরতা বেড়েছে শহর-গ্রাম সর্বত্র। তারাই এখন শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। 

রক্ষণশীলরা এখন আর ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। কর্মসূচিও পালন করছে।

আবার কেউ মনে করছেন- আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে শুধুই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থী দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। 

বিএনপি ও জামায়াতকে ঠেকানোর নামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মাদ্রাসাভিত্তিক কিছু দল ও গ্রুপকে নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আস্কারা দিয়ে চলছে। এর মধ্যদিয়ে আসলে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের কবর নিজেরাই খনন করছেন। 

তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা। মাদ্রাসাভিত্তিক এই দল ও গ্রুপগুলো যদি কোনোদিন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তারা সব ভাস্কর্য তো গুড়িয়ে দেবেই, এ দেশ থেকে মুছে ফেলবে বঙ্গবন্ধুর নাম।

অনেকের মতে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এবং পীরদের দলগুলোর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জামায়াতে ইসলামী। নানা কারণে জামায়াতের এখন প্রকাশ্য তৎপরতা নেই। 

এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছে দলটি। আর সেই স্পেসটি নেয়ার চেষ্টা করছে অতি রক্ষণশীলরা। তাছাড়া ধর্মভিত্তিক দলগুলো জনগণের মধ্যে ছোট পরিসরে হলেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে এবং এর ভিত্তিতেই দেশের প্রচলিত রাজনীতিতে তাদের একটা প্রভাব তৈরি হয়েছে।

ধর্মভিত্তিক শক্তির সর্বপ্রথম ব্যাপক শক্তি প্রদর্শন দেখা যায় ২০১৩ সালের ৫ মে। ওইদিন রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, দৈনিক বংলাসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজত ইসলামী। তারা দোকানপাট, ব্যাংকের বুথসহ নানা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেয়। 

রাস্তার মাঝের শত শত গাছ কেটে ফেলা হয়। দিনভর তাণ্ডবের পর রাতে তারা অবস্থান নেয় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। বিবৃতি দিয়ে হেফাজত কর্মীদের এই কাজে উৎসাহ যোগায় বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল। যদিও রাতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সর্বাত্মক অ্যাকশানে হেফাজত নেতাকর্মীরা শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই রাতে হেফাজত কর্মীদের সরানো না গেলো তারা শেখ হাসিনার সরকারকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিত। তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগ দিত বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। হয়তো এর মধ্যদিয়ে সরকারের পতনও হতে পারত।

মজার ব্যাপার হলো- এই ঘটনার কিছুদিন পরই অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে হেফাজতের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব কমে যায়। শুধু দূরত্ব কমা নয়, হেফজতের সঙ্গে তাদের একটা সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এরপর সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে হেফাজত নেতারা চুপ হয়ে 

এ নিয়ে সংগঠনটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দেয়। সরকারবিরোধী কট্টর একটি অংশ আপসকামীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এরপর নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে সম্প্রতি এই গ্রুপটি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। 

ইতিমধ্যে তারা নতুন কমিটিও করেছে। শুধু কমিটি নয়, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা, ‘মুরতাদ-নাস্তিকদের’ শাস্তির বিধান রেখে আইন পাসসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে নতুন নেতৃত্ব।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে যেসব গ্রুপ ও দল বিরোধিতা করছে তারমধ্যে হেফাজত অন্যতম। হেফাজত ছাড়াও ধর্মভিত্তিক আরেকটি বড় গ্রুপ বা দল হলো ইসলামী আন্দোলন। এই গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন চরমোনাইয়ের মরহুম পীরের ছেলে। 

তার মুখেও প্রায়ই সরকারবিরোধী কথাবার্তা শোনা যায়। এই গ্রুপটিও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধী।

নানা ইস্যুতে তৎপর এমন কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, ক্রমেই তারা শক্তি সঞ্চয় করছেন এবং সমাজে তাদের প্রভাব পড়ছে। তাদের একটা ভাল অবস্থান তৈরির সুযোগও তৈরি হয়েছে। সরকারবিরোধী বিভিন্ন শক্তির নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করার চেষ্টা করছেন। 

তারা আরও জানান, রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকার তাদের বাঁধা দিলেও অরাজনৈতিক বিষয়ে বাঁধা দিচ্ছে না। এটা একটা ইতিবাচক দিক। সরকার হয়তো ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছে না- এ কারণেই অরাজনৈতিক ইস্যুতে বাধা দিচ্ছে না।

কট্টর একটি মৌলবাদী দলের কয়েকজন নেতা জানান, এক দশক ধরেই তাদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে। 

এর কারণ হলো- মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের জন্য বাংলাদেশিদের যাওয়ার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ফলে ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটা প্রভাব একেবারে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মাঝে পড়েছে। 

এছাড়া দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারও হচ্ছে। যারা মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নেয়, তারা সাধারণত ধর্মভিত্তিক দলছাড়া অন্যদলকে সমর্থন করে না। প্রতি বছরই মাদ্রাসাগুলো থেকে লাখ লাখ ছাত্র বের হচ্ছে। এরা সমাজের বিভিন্ন স্থানে জায়গা করে নিচ্ছে। 

যেখানেই তারা যাচ্ছে, মানুষকে ধর্মের কথা বলছে। অনেকে সরাসরি ধর্মীয় রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করছে। আর এভাবেই তাদের শক্তি বাড়ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের মতে, ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জোটবব্ধ হয়ে রাজনীতি করার প্রবণতা। জোটের রাজনীতি মেরুকরণ হয়ে আসছে দুই দলের নেতৃত্বেই। 

ক্ষমতার স্বার্থে প্রধান দুই দলই ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাক্ষিণপন্থীরা রাষ্ট্রের অনেক সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে। এভাবেই বাড়ছে তাদের শক্তি ও সামর্থ।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো- অতি রক্ষণশীল চিন্তার মানুষও আওয়ামী লীগে জায়গা করে নিচ্ছে। এই লোকগুলো দলীয় নীতি আদর্শের তোয়াক্কা করেন না। 

তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পক্ষে নয়, ধর্মীয় রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করার পক্ষে। এই অংশটি দলীয় আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতারও ধার ধারে না।

মামুন ফরাজী
সাংবাদিক