গণপিটুনি: আইন কী বলে
jugantor
গণপিটুনি: আইন কী বলে

  শেখ সাদী রহমান  

০২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:৪৫:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

গণপিটুনি: আইন কী বলে

এই নিয়েছে এই নিল যা! কান নিয়েছে চিলে। চিলের পিছে ঘুরছি মরে আমরা সবাই মিলে। চিলে কান নিয়েছে শুনে, কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে ছুটে চলেন অতিউৎসাহী কিছু মানুষ।

এই অতিউৎসাহী জনতা গুজবে বিশ্বাস করে মানুষ হত্যা করে ফেলে। কখনও ধর্ম অবমাননার গুজব, কখনও ‘কল্লাকাটা’ আবার কখনও ‘ছেলেধরা’। হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন।

বলছি– গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধের কথা।

সর্বশেষ কিছু দিন আগে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে মর্মে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়। পরে গণপিটুনির ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

এভাবে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যার কোনোটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে বলছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ৯ জন। ২০১৮ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৫ জন।

গত বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রথম সাত মাসেই নিহত হয়েছেন ৫৩ জন। গত বছর গণপিটুনিতে হত্যার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। ২৫ জন মারা গেছেন সেখানে। ঢাকায় নিহত হয়েছেন ২২ জন।

অথচ ২৬০ বছরের পুরনো আইনে নেই গণপিটুনি নামক অপরাধের সংজ্ঞা। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তি। নেই কোনো এর জন্য বিশেষ আইন। যার সুযোগ কখনও কখনও নেয় সুযোগসন্ধানী কুচক্রিরা। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে একজনকে সবাই মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়। কী ভয়াবহ!

গত বছরের ২০ জুলাই সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন তাসলিমা বেগম রেণু। তার দুই সন্তানের ভর্তি বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের গেটে কয়েকজন নারী তাসলিমার নাম-পরিচয় জানতে চান। পরে লোকজন তাসলিমাকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে কয়েকশ লোক একত্র হয়ে তাসলিমাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। স্কুলের ফাঁকা জায়গায় এলোপাতাড়ি মারপিট করে গুরুতর জখম করে। পরে উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় গণপিটুনি রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে এবং গণপিটুনি রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান হাইকোর্টে রিট করেন।

অন্যদিকে তাসলিমা বেগম রেণুর বোনের ছেলে সৈয়দ নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ মানুষকে আসামি করে মামলা করেন, যা এখন বিচারাধীন।

অন্যদিকে আইনজীবী ইশরাত হাসানের দায়ের করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত গণপিটুনি রোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। পাঁচ দফা নির্দেশনা হলো–

১. পুলিশের প্রত্যেক সার্কেল অফিসার তার অধীনের প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে ছয় মাসে অন্তত একবার গণপিটুনি প্রবণতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বৈঠক করবেন

২. গণপিটুনির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রচার কার্যক্রম গণমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রাখবে

৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কোনো ধরনের অডিও, ভিডিও, মেসেজ যা গুজব সৃষ্টি বা গণপিটুনিতে মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যে দুষ্কৃতকারীরা এ কাজে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে

৪. যখনই গণপিটুনির কোনো ঘটনা ঘটবে, কোনো রকম দেরি না করে তখনই থানার ওসি এফআইআর নিতে বাধ্য থাকবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে অবহিত করবেন

৫. গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম হত্যার ঘটনায় ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার উত্তর বাড্ডা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অবহেলার ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন

এ ক্ষেত্রে পঞ্চম দফার নির্দেশনা শুধু তাসলিমা বেগম রেণু হত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বাকি চারটি নির্দেশনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যার তিনটি প্রতিরোধমূলক হিসেবে এবং একটি প্রতিকারমূলক।

এই নির্দেশনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে গণপিটুনি সংক্রান্ত বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হলে প্রতিরোধ, প্রতিকার ও বিচারকাজ আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অসংখ্য গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। ভারতে ২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশে যেভাবে এক মহিলাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, মনে হয়েছে তার ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ঠিক পরের বছর আমাদের বাংলাদেশে উত্তর বাড্ডায়। দুটি ঘটনাতেই ভিকটিম মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিল।

তাদের স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে। তার পর ছেলেধরা গুজব তুলে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ভারতে গণপিটুনি বিষয়ে কয়েকজন ব্যক্তির করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ জানায়, ‘দেশের বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। জনগণের বিচারকে কখনই আইন সিদ্ধ করা যায় না। শক্ত হাতেই এ প্রবণতার মোকাবেলা করতে হবে’ (সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা) এ ছাড়া দেশটির রাজ্যগুলোকেও একইভাবে পৃথক আইন আনার পরামর্শ দিয়েছেন শীর্ষ আদালত।

এরই ধারাবাহিকতায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে গণপিটুনি রোধে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল (প্রিভেনশন অব লিঞ্চিং) বিল-২০১৯’ নামের বিলটি পাস করা হয়েছে। মূলত ধর্ম-বর্ণ, জাতিগত বিভেদ ও বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে ভারতে যেভাবে পিটিয়ে মারার প্রবণতা বাড়ছে, তা রোধ করার জন্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এ বিল পাস করেছে।

আমাদের দেশেও গণপিটুনি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা জরুরি। প্রস্তাবিত আইনে গণপিটুনি সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় বিস্তারিত আকারে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে গণপিটুনির প্রত্যেকটি ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত শেষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। প্রস্তাবিত আইনে গুজব, গণপিটুনি ও ভিকটিমের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি।

গণপিটুনি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয় দায়িত্ব বিস্তারিত থাকতে হবে। ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষার যাবতীয় বিধানাবলি সন্নিবেশ করতে হবে। এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠা করে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সংক্ষিপ্ত সময় নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে যাতে মামলাজটের জালে গণপিটুনির মামলা হারিয়ে না যায়।

এ ছাড়া একটি সার্ভেইল্যান্স টিম গঠনের বিধান করা যেতে পারে, যাতে অনলাইনে গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্য যারা ছড়ায় বা ছড়ানোর চেষ্টা করে তাদের প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে গণপিটুনি অপরাধের ভয়াবহ দিকগুলো তুলে ধরে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

জনগণ নিজেদের হাতে আইন তুলে নেবে না। এটি কোনো রাষ্ট্রেই কাম্য নয়। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত আইনই হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি।

তথ্যসূত্র: ১. দৈনিক যুগান্তর, ২. দৈনিক প্রথম আলো, ৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪. আনন্দবাজার পত্রিকা

লেখক: শেখ সাদী রহমান, সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা।

গণপিটুনি: আইন কী বলে

 শেখ সাদী রহমান 
০২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:৪৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
গণপিটুনি: আইন কী বলে
ফাইল ছবি

এই নিয়েছে এই নিল যা! কান নিয়েছে চিলে। চিলের পিছে ঘুরছি মরে আমরা সবাই মিলে। চিলে কান নিয়েছে শুনে, কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে ছুটে চলেন অতিউৎসাহী কিছু মানুষ।

এই অতিউৎসাহী জনতা গুজবে বিশ্বাস করে মানুষ হত্যা করে ফেলে। কখনও ধর্ম অবমাননার গুজব, কখনও ‘কল্লাকাটা’ আবার কখনও ‘ছেলেধরা’। হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন। 

বলছি– গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধের কথা। 

সর্বশেষ কিছু দিন আগে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে মর্মে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়। পরে গণপিটুনির ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

এভাবে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যার কোনোটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে বলছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ৯ জন। ২০১৮ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৫ জন। 

গত বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রথম সাত মাসেই নিহত হয়েছেন ৫৩ জন। গত বছর গণপিটুনিতে হত্যার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। ২৫ জন মারা গেছেন সেখানে। ঢাকায় নিহত হয়েছেন ২২ জন। 

অথচ ২৬০ বছরের পুরনো আইনে নেই গণপিটুনি নামক অপরাধের সংজ্ঞা। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তি। নেই কোনো এর জন্য বিশেষ আইন। যার সুযোগ কখনও কখনও নেয় সুযোগসন্ধানী কুচক্রিরা। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে একজনকে সবাই মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়। কী ভয়াবহ! 

গত বছরের ২০ জুলাই সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন তাসলিমা বেগম রেণু। তার দুই সন্তানের ভর্তি বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের গেটে কয়েকজন নারী তাসলিমার নাম-পরিচয় জানতে চান। পরে লোকজন তাসলিমাকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নেন। 

কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে কয়েকশ লোক একত্র হয়ে তাসলিমাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। স্কুলের ফাঁকা জায়গায় এলোপাতাড়ি মারপিট করে গুরুতর জখম করে। পরে উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন তিনি মারা যান। 

এ ঘটনায় গণপিটুনি রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে এবং গণপিটুনি রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান হাইকোর্টে রিট করেন। 

অন্যদিকে তাসলিমা বেগম রেণুর বোনের ছেলে সৈয়দ নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ মানুষকে আসামি করে মামলা করেন, যা এখন বিচারাধীন। 

অন্যদিকে আইনজীবী ইশরাত হাসানের দায়ের করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত গণপিটুনি রোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। পাঁচ দফা নির্দেশনা হলো–

১. পুলিশের প্রত্যেক সার্কেল অফিসার তার অধীনের প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে ছয় মাসে অন্তত একবার গণপিটুনি প্রবণতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বৈঠক করবেন

২. গণপিটুনির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রচার কার্যক্রম গণমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রাখবে

৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কোনো ধরনের অডিও, ভিডিও, মেসেজ যা গুজব সৃষ্টি বা গণপিটুনিতে মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যে দুষ্কৃতকারীরা এ কাজে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে

৪. যখনই গণপিটুনির কোনো ঘটনা ঘটবে, কোনো রকম দেরি না করে তখনই থানার ওসি এফআইআর নিতে বাধ্য থাকবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে অবহিত করবেন

৫. গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম হত্যার ঘটনায় ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার উত্তর বাড্ডা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অবহেলার ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন

এ ক্ষেত্রে পঞ্চম দফার নির্দেশনা শুধু তাসলিমা বেগম রেণু হত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বাকি চারটি নির্দেশনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যার তিনটি প্রতিরোধমূলক হিসেবে এবং একটি প্রতিকারমূলক। 

এই নির্দেশনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে গণপিটুনি সংক্রান্ত বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হলে প্রতিরোধ, প্রতিকার ও বিচারকাজ আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। 

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অসংখ্য গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। ভারতে ২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশে যেভাবে এক মহিলাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, মনে হয়েছে তার ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ঠিক পরের বছর আমাদের বাংলাদেশে উত্তর বাড্ডায়। দুটি ঘটনাতেই ভিকটিম মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিল। 

তাদের স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে। তার পর ছেলেধরা গুজব তুলে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। 

ভারতে গণপিটুনি বিষয়ে কয়েকজন ব্যক্তির করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ জানায়, ‘দেশের বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। জনগণের বিচারকে কখনই আইন সিদ্ধ করা যায় না। শক্ত হাতেই এ প্রবণতার মোকাবেলা করতে হবে’ (সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা) এ ছাড়া দেশটির রাজ্যগুলোকেও একইভাবে পৃথক আইন আনার পরামর্শ দিয়েছেন শীর্ষ আদালত। 

এরই ধারাবাহিকতায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে গণপিটুনি রোধে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল (প্রিভেনশন অব লিঞ্চিং) বিল-২০১৯’ নামের বিলটি পাস করা হয়েছে। মূলত ধর্ম-বর্ণ, জাতিগত বিভেদ ও বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে ভারতে যেভাবে পিটিয়ে মারার প্রবণতা বাড়ছে, তা রোধ করার জন্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এ বিল পাস করেছে।

আমাদের দেশেও গণপিটুনি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা জরুরি। প্রস্তাবিত আইনে গণপিটুনি সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় বিস্তারিত আকারে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে গণপিটুনির প্রত্যেকটি ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত শেষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। প্রস্তাবিত আইনে গুজব, গণপিটুনি ও ভিকটিমের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি।

গণপিটুনি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয় দায়িত্ব বিস্তারিত থাকতে হবে। ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষার যাবতীয় বিধানাবলি সন্নিবেশ করতে হবে। এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠা করে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সংক্ষিপ্ত সময় নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে যাতে মামলাজটের জালে গণপিটুনির মামলা হারিয়ে না যায়।

এ ছাড়া একটি সার্ভেইল্যান্স টিম গঠনের বিধান করা যেতে পারে, যাতে অনলাইনে গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্য যারা ছড়ায় বা ছড়ানোর চেষ্টা করে তাদের প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে গণপিটুনি অপরাধের ভয়াবহ দিকগুলো তুলে ধরে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। 

জনগণ নিজেদের হাতে আইন তুলে নেবে না। এটি কোনো রাষ্ট্রেই কাম্য নয়। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত আইনই হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি। 

তথ্যসূত্র: ১. দৈনিক যুগান্তর, ২. দৈনিক প্রথম আলো, ৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪. আনন্দবাজার পত্রিকা

লেখক: শেখ সাদী রহমান, সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা।