সবুজ কর: পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নতুন সম্ভাবনা
jugantor
সবুজ কর: পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নতুন সম্ভাবনা

  অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই  

০৫ জুন ২০২১, ০০:৪৫:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির বিশ্ব। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শিল্পায়নের প্রসার ঘটছে। নতুন এসব প্রযুক্তিপণ্য একদিকে আমাদের জীবনকে যেমন স্বাচ্ছন্দ্যময় করছে, তেমনি না চাইতে অনেক পরিবেশগত সমস্যাও যোগ করছে আমাদের জীবনে।

শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়ে বাতাসে মিশছে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার প্রযুক্তিপণ্যের উচ্ছিষ্ট বর্জ্যগুলো মাটি, বায়ু ও পানিকে দূষিত করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক অভিঘাত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। ফলশ্রুতিতে ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি,অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে।

আমাদের এ গ্রহের প্রতি ক্ষতিকর আচরণ থেকে বিরত রাখতে মূলত সবুজ করের উদ্ভাবন করা হয়েছে। খুব সাধারণ নীতির ওপর ভিত্তি করে এটি প্রতিষ্ঠিত, ‘যারা কলুষিত করবে বা দূষণ করবে, তারা কর প্রদান করবে।’

জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলো সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকি যা বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। প্রাক-শিল্পায়নের সময় থেকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা। ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে এই মান না রাখতে পারলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। তাই আমাদের দরকার বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস করা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংস্থা এবং অনেক অর্থনীতিবিদ একমত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হতে পারে সবুজ কর।

ধারণার সূত্রপাত:
২০১২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আর্থ সামিট (UNCSD) যা রিও +২০ নামে পরিচিত, এই সম্মেলনের পর থেকে সবুজ কর টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যদিও অনেক আগে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ বিরোধী কর্মকাণ্ডের ওপর নানা ধরনের কর আরোপ শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) পরিবেশের অবনতি, জীববৈচিত্রের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ করার পাশাপাশি ‘সবুজ কর’কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমাধান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) পরিবেশের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস এবং পরিবেশগত ঘাটতি প্রশমনের ক্ষেত্রে মানবিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া হিসেবে ‘সবুজ কর’কে' অভিহিত করেছে। আর বিশ্বব্যাঙ্ক (WB) প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং দূষণ নির্গমনকে হ্রাস করার পাশাপাশি পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক বিকাশের পরিবেশ বান্ধব এবং সামগ্রিক উপায় হিসেবে সবুজ করকে গুরুত্ব দিয়েছে।

সবগুলো সংজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে অর্থনৈতিক বিকাশের গতিকে ধীর না করে সম্পদ ব্যবহারে উন্নতি করা এবং দূষণ নির্গমন হ্রাস করার ক্ষেত্রে সবুজ করকে প্রাধান্য দেয়া। মূলত এখান থেকেই বিশ্বের দেশে দেশে সবুজ কর বা পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন শুরু হয়।

সবুজ কর কী?
১৯৯৭ সালে গঠিত ইউরোস্ট্যাট, ইউরোপীয় কমিশন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA), দ্বারা যৌথভাবে বিকশিত পরিসংখ্যান কাঠামো অনুসারে- যাদের কর ভিত্তি একটি প্রাকৃতিক ইউনিট বা অনুরূপ নিয়ে গঠিত বা এমন কিছু উপাদান নিয়ে গঠিত যা পরিবেশের উপর নেতিবাচক এবং নির্দিষ্ট প্রভাব ফেলে, তাদের জন্য সবুজ কর প্রযোজ্য।

কোনো অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে কোনো সংস্থা আমাদের এই গ্রহ বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিবেচনা না করে দূষণমূলক উপায়ে পণ্য তৈরি করলে অর্থনীতিতে তাকে বহিরাগত (Externality) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সবুজ করের উদ্দেশ্য হলো দূষণকারীকে দূষকগণের জন্য প্রদত্ত নীতি অনুসারে অর্থ প্রদানে বাধ্য করা, যার দামগুলো এই বহিরাগতদের (Externalities) ব্যয়কে প্রতিফলিত করে।

সহজভাবে বলা যায়, সবুজ কর হলো পরিবেশ দূষণকারী কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্ক। সবুজ করের অর্থ- পরিবেশের উন্নয়ন করা, পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা বা পরিবেশগতভাবে টেকসই পরিবেশ (Sustainable environment) তৈরি করতে সহায়তা করা। সবুজ কর পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক টুল বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সবুজ কর আরোপের মাধ্যমে সংস্থা, সম্প্রদায় , গৃহস্থালি এবং ব্যক্তি আচরণ পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা হয়, দূষণ নির্গমনের উপর কর আরোপ করা হয় এবং দূষণকারীদের বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হয়।

এই করকে কখনো সবুজ কর (Green tax), কখনো পরিবেশগত কর (Environmental tax), কখনো দূষণ কর (Pollution tax), আবার কখনো বাস্তুসংস্থান কর (Ecological tax) বলা হয়ে থাকে। ভিন্ন নাম হলেও সবগুলো মূলত একই ধরনের অর্থ প্রকাশ করে থাকে।

সবুজ করের সুবিধাসমূহ:
ডিকার্বনাইজড অর্থনীতি তথা টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়ার মূল চাবিকাঠি হিসেবে সবুজ কর বা পরিবেশ কর ধার্যের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রায় সর্বসম্মতি রয়েছে। এই করের অস্তিত্বকে ন্যায্যতা দেয় এমন প্রধান সুবিধাগুলো নিম্নরূপ-

*এই কর এনার্জি সেভিং এবং নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে;
*এটি পরিবেশবিরোধী আচরণকে নিরুৎসাহিত করে;
*এই কর টেকসই পন্থা উদ্ভাবন করতে কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে;
*পরিবেশ করের মাধ্যমে আহরিত রাজস্ব অন্যান্য পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য বা অন্যান্য করগুলো হ্রাস করতে ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- এই কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয়কর ,কর্পোরেট ট্যাক্স এবং সামাজিক বীমা প্রিমিয়ামের কর কাটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে;
*এই কর পরিবেশগত ব্যয়কে অভ্যন্তরীণ করে (উদাহরণস্বরূপ পরিবেশের ক্ষতি করে এমন ক্রিয়াকলাপের উপর কর আরোপ করা হবে; পক্ষান্তরে পরিবেশ সংরক্ষণকারী ক্রিয়াকলাপকে কর বিরতি প্রদান করা হবে)।
পরিবেশ করগুলো ব্যাবসায়িক উদ্বেগকে এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ গুলিকে একীভূত করার জন্য ব্যক্তিকে উৎসাহ প্রদান করে এবং নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(IMF) এর প্রস্তাব হচ্ছে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন করে তাদেরকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের উপর কর দিতে হবে। আইএমএফ এর মতে এই হার ২০৩০ সালে প্রতি টন ৭৫ মার্কিন ডলার অথবা ৬৮ ইউরো হতে হবে।

সংস্থাটি মনে করে, এই হার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লার ব্যবহারে প্রভাব ফেলবে। এই ধরনের কর বেশি দূষণকারী শক্তি সম্পদ থেকে কম দূষণকারী শক্তির, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সাহায্য করবে।

সবুজ করের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হচ্ছে দ্বিগুণ লভ্যাংশ হাইপোথিসিস। সবুজ কর আরোপ একদিকে যেমন অর্থনীতিতে বোঝা বাড়াবে, তেমনি শ্রম, মূলধন বা ভোগের উপর কর হ্রাসের ফলে ক্ষতিপূরণ হবে এবং পরিবেশগত মান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দ্বিগুণ উপকার হবে।

যেসব ক্ষেত্রে সবুজ কর প্রয়োগ যোগ্য:
সাধারণত চারটি ক্ষেত্রে (শক্তি বা জ্বালানি কর, পরিবহন কর, দূষণ কর, সম্পদ বা খনিজ অনুসন্ধান সম্পর্কিত কর) পরিবেশগত করের অনুশীলন হলেও বলা যায় প্রতিটি দেশের পরিবেশগত কর সম্পর্কিত নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশগত কর আরোপের ক্ষেত্রে করযোগ্য প্রধান বিবেচ্যগুলো হলো:

*নাইট্রোজেন অক্সাইড (NO) এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এর নির্গমন যা যানবাহনের দহন থেকে উৎপাদিত হয়।
*সালফার ডাই অক্সাইডের নির্গমন যা এসিড বৃষ্টির মূল কারণ। বিশেষত পেট্রোলিয়াম পণ্যগুলোর দহন এবং কয়লা জ্বলনের ফলে যা উৎপাদিত হয়।
*বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (গার্হস্থ্য, বাণিজ্যিক, শিল্প, নির্মাণ
ইত্যাদি)।
*বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ফলে সৃষ্ট শব্দ।
*জ্বালানি পণ্যগুলি (পেট্রোল, ডিজেল,প্রাকৃতিক গ্যাস,কয়লা,জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি) এগুলো পুড়ে গেলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়।
*জ্বল দূষণের উৎস (কীটনাশক, রাসায়নিক সার, এসিড ইত্যাদি)।
*প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ ও ব্যবহার।
*কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ।
*ওজোনস্তর হ্রাসকারী পণ্য।
*পরিবহন (সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত) (দূষণকারী যানবাহনের নিবন্ধন, ব্যবহার,আমদানি বা বিক্রয়)।

যথাযথ পরিবেশগত করের জন্য নীতিমালা:
OECD-এর মতে পরিবেশগত করের ভালো বিধি-বিধান তৈরির জন্য নিম্নোক্ত নীতিমালাগুলো অনুসরণ করা উচিত-
*কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে পরিবেশগত করের লক্ষ্য হওয়া উচিত কিছু দূষক ও দূষণকারী আচরণ।
*ক্ষতির পরিমাণের চেয়ে পরিবেশগত করের সুযোগ বেশি বিস্তৃত হওয়া উচিত।
*কর হার পরিবেশগত ক্ষতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
*পরিবেশকে রক্ষা করতে সহায়তা করে এমন আচরণগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে করকে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য এবং এর হার বোধগম্য হতে হবে।
*পরিবেশগত কর রাজস্ব সংস্কারে ব্যবহৃত হতে পারে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব বা অন্যান্য কর হ্রাসে সহায়তা করতে পারে।
*পরিবেশগত করের বিষয়টি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য জনসাধারণের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
*কোন নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য পরিবেশগত করকে পরিবেশের অন্যান্য নীতি উপকরণগুলোর সাথে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিভিন্ন করের বাস্তবায়ন এবং যেভাবে পরিবেশ কর বা সবুজ করের সমন্বয় করা হয়, সেখানে প্রায়শই এই সব নীতিমালার প্রতিফলন দেখা যায় না।

বিশ্বের দেশে দেশে পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন:

আন্তর্জাতিক সমাজ সবুজ বিকাশের উন্নয়নে অসংখ্য চুক্তি ও কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল ফ্রান্স। ফ্রান্স সর্বপ্রথম ১৯৬৯ সালে বন কর আরোপ করেছিল, যা কাঁচামাল আহরণের (তেল ও গ্যাস ব্যতীত) জন্য সম্পদ বলা হলেও মূলত ছিল সবুজ কর বা পরিবেশগত কর। পরবর্তী বছরে (১৯৭০) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন এর ওপর কর আরোপ করা হয়। এটাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে বায়ুতে দূষণ নির্গমনকারী অন্যান্য গ্যাস যেমন কার্বন-মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড (কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যতীত) এবং পানি দূষক ও কঠিন দূষকের (solid pollutants) উপর কর আরোপ করা হতে থাকে।

জাপান ১৯৭২ সালে বিমান পরিবহনের ওপর জ্বালানি কর আরোপ করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ১৯৯০ সালে পরিবেশগত কর সংস্কার কর্মসূচি (ETR) প্রবর্তন করেছে।

১৯৯৩ সালে ব্রিটেনে ফুয়েল প্রাইস এসকেলেটর (FPE) প্রবর্তন করা হয় যা ১৯৯৯ সালে জ্বালানি করে রূপান্তরিত হয়। ২০০০ সালে FPE স্থগিত করা হয়। তবে ২০০৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দূষণ কমাতে বিভিন্ন ধরনের সবুজ করের প্রস্তাব করা হয়।

ফ্রান্সে ২০০৮ সালে সবুজ কর চালু হয়েছে এবং প্রতি টন গ্রিন হাউস গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ ইউরো। পরিবেশ বাঁচাতে ফ্রান্স আরও এক ধরনের অভিনব সবুজ কর চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফ্রান্স থেকে ছেড়ে যাওয়া বিমানের টিকিট কাটার সময় যাত্রীদের কাছ থেকে সবুজ কর নিবে দেশটি। ২০২০ সালে এটি কার্যকর হয়েছে। এই কর থেকে যে অর্থ আদায় হবে তা পরিবেশবান্ধব পরিবহন চালুতে ব্যয় করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রান্স ও ইউরোপের ভিতরে চলা ফ্লাইটের ইকোনমি ক্লাসের টিকেট ১.৫ ইউরো ও বিজনেস ক্লাসের টিকিটে ৯ ইউরো এবং ইউরোপের বাইরে চলাচলকারি ফাইটের ইকোনমি ক্লাসে ৩ ইউরো ও বিজনেস ক্লাসের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ ইউরো কর দিতে হবে। ফরাসি সরকার আশা করছে এটি কার্যকর হলে বছরে ১৮০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আদায় হবে।

উল্লেখ্য, এপ্রিল ২০১৮ থেকে সুইডেনে বিমান টিকিটের উপর ৪০ ইউরো পর্যন্ত সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিবেশগত কর মূলত চার ধরনের (জ্বালানি কর, দূষণ কর, সম্পদ কর ও পরিবহন কর)। ইউরোস্ট্যাটের এর মতে ২০১৭ সালে ইইউ’তে আহরিত পরিবেশগত করের পরিমাণ ছিল ৩৬৮.৮ বিলিয়ন ইউরো যা ইউরোপীয় জিডিপির ২.৪ শতাংশ এবং মোট কর রাজস্বের ৬.৩ শতাংশ। এরমধ্যে ৭৬.৯ শতাংশ রাজস্ব আসে জ্বালানি খাত থেকে, ১৯.৭ শতাংশ পরিবহন খাত থেকে এবং ৩.৪ শতাংশ আসে দূষণ ও সম্পদ আহরণ খাত থেকে। দেশভেদে আহরিত এই করের পরিমাণ নিম্নরূপ:

দেশভিত্তিক পরিবেশগত কর আহরণ (EU)
(জিডিপির শতাংশ)
__________________________________________
দেশ শতাংশ
___________________________________________
গ্রিস ৩.৯৭
স্লোভেনিয়া ৩.৭৩
ডেনমার্ক ৩.৭২
লাটভিয়া ৩.৪৮
ইতালি ৩.৩৩
ফিনল্যান্ড ২.৯৯
যুক্তরাজ্য ২.৩৯
ফ্রান্স ২.৩১
বেলজিয়াম ২.২৪
সুইডেন ২.১৬
স্পেন ১.৮৩
জার্মানি ১.৮১
আয়ারল্যান্ড ১.৭৫
___________________________________________
উৎস্য: ইউরোস্ট্যাট ২০১৭

ইউক্রেন সরকার ১৯৯৯ সাল থেকে পরিবেশগত কর আদায় করছে; যা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশ দূষণ ফি নামে পরিচিত। দূষণকারী সকল সংস্থা থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়। বলকান রাষ্ট্রগুলিতে (আলবেনিয়া, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, সার্বিয়া ) নানা ধরনের বাস্তুসংস্থান কর (Eco tax) রয়েছে। কার্বন কর ,জীবাশ্ম জ্বালানি কর, কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কর, সিএফসি কর, বিশেষ বর্জ্য প্রবাহ কর, নতুন অটোমোবাইল কর , ইকো কর, পেট্রোল ও ডিজেল কর, পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ কর (ক্ষতিকারক শিল্প বর্জ্য অপসারণের জন্য, প্যাকেজিং বর্জ্য, মোটর তেল ) ইত্যাদি। বলকান দেশগুলোর মধ্যে ক্রোয়েশিয়া কর সংস্কার, সংগ্রহ ও প্রয়োগে অনেক অগ্রগতি করেছে। সার্বিয়ায় মোট বর্জ্য প্রবাহের উপর আরোপিত ইকো কর একটি ভালো অগ্রগতি। তুলনায় আলবেনিয়া, বসনিয়া, মেসিডোনিয়া ও মন্টিনিগ্রোতে পরিবেশ কর আদায় প্রক্রিয়া তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার জুলাই-২০১২ থেকে কার্বন ট্যাক্স চালু করেছে; যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অবদান রাখছে। এটি মূলত কার্বন ভিত্তিক সামগ্রীর (কয়লা,পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ) ওপর আরোপিত একটি আবগারি শুল্ক। কার্বন ট্যাক্স অস্ট্রেলিয়ায় পরিষ্কার জ্বালানির (Clean energy) উৎসগুলোর (নবায়নযোগ্য বা সবুজ শক্তি যেমন - বায়ু, হাইড্রো এবং সৌরশক্তি) বিকাশ ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে।

অবশ্য ২০১৪ সালে কার্বন ট্যাক্সকে বিষাক্ত কর উল্লেখ করে তা বাতিল করার জন্য সংসদে বিল উত্থাপিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবুজ কর নেই তবে পেট্রোল করকে এখানে সবুজ করের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চীন ও জাপানে ও সবুজ কর চালু রয়েছে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৫ সাল থেকে সবুজ করের পাশাপাশি গ্রিন ট্যাক্স ইনসেনটিভ স্কিম বাস্তবায়ন করছে। উপমহাদেশে ভারত পাকিস্তান ও নেপালেও সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে। সবুজ কর থেকে নেপালে ১৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ শতাংশ এবং ভারতে ১২ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়। ভারতে ২০১০ সালে টনপ্রতি ৫০ টাকা হারে কয়লার ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে (মহারাষ্ট্র,অন্ধ্রপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, ও কর্নাটক প্রদেশে ) আগস্ট ২০১০ থেকে আট বছরের বেশি পুরনো বাণিজ্যিক যানবাহন এবং পনেরো বছরের বেশি পুরনো ব্যক্তিগত যানবাহনের উপর সবুজ কর প্রয়োগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে জুন ২০১৪ থেকে দূষিত কারখানা, মূলত ট্যানারিগুলোর ওপর এক শতাংশ হারে সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত করের সঙ্গে কতটা পরিবেশদূষণ করছে তার ওপর নির্ধারিত কর প্রদান করবে।

ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হবে। এনবিআরের মতে, এর ফলে এই খাত থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে পারে।

পরিবেশগত করের বিরুদ্ধে সমালোচনা:
পরিবেশগত কর আরোপ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রচলিত অভিযোগ হচ্ছে-
*কর আরোপের ফলে যেসব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, অধিকাংশ সময় সেসবের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সংযোগের অভাব থাকে।
*পরিবেশগত ক্ষতিকে ভিত্তি না ধরার কারণে অনেক সময় কর ডিজাইনে পরিবেশগত ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে না।
*করযোগ্য ইভেন্টগুলোর স্থানিক সুযোগ,ক্ষয়ক্ষতি এবং ভোগ বিবেচনার চেয়ে অনেক সময়ই প্রযুক্তির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়।
*সবুজ কর সম্পর্কে একটি সাধারণ ভীতি হচ্ছে, এর ভিত্তি প্রসারিত করলে এবং যত্রতত্র প্রয়োগ করলে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, বেকারত্বের হার বাড়বে, সামাজিক অসন্তোষ বাড়বে এবং দেশগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু পরিষ্কার শক্তির (Clean energy) ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে- এই কথাটিও প্রচার হওয়া উচিত।
*করের নিম্নহার এজেন্টদের পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করে।
*OECD এর ২০১৮ সালের এনার্জি ট্যাক্স রিপোর্টে দেখা যায়, কয়লার ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য কর বা কর রেয়াতের সুযোগ দেয়া হয়েছে যা চূড়ান্ত প্রশ্নসাপেক্ষ।
*এই কর দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত খাত হচ্ছে জ্বালানি খাত। এই করের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও জটিল দিক ও এই খাত।
*আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈচিত্র্যের অভাব পরিবেশ করের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ে অসমতা সৃষ্টি করে।

কর আরোপ প্রক্রিয়ার জটিলতা:
কর আরোপ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ জটিলতাপূর্ণ। যেমন-কর আদায়,শনাক্তকরণ, কর হার নির্ধারণ, করারোপের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, ক্রেতা বা ভোক্তার ওপর করের বোঝা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা (পরিবেশ, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়), দূষণের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে মতভেদ ইত্যাদি। ফলে পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন করা খুবই দুরূহ।

সামগ্রিক মূল্যায়ন:

সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশগত করকে জলবায়ু পরিবর্তন ধীর করার অন্যতম মূল হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর এ কারণে এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন-OECD বা ইউরোপীয় কমিশন অনেক দেশে পরিবেশ করের প্রতিশ্রুতির অভাবের সমালোচনা করে এবং তাদের প্রতি আহবান জানায় পরিবেশগত কর সংস্কার করার জন্য। ২০০০-২০১৭ সময়কালে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত কর আদায় হারের নিম্নগামীতায় বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০০৩ সালে পরিবেশ কর আদায়ের হার ছিল জিডিপির ২.৫৬ শতাংশ, যেখানে ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২.৪ শতাংশে যা খুবই হতাশাজনক। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এই খাতে কর - জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ুর লাগামহীন পরিবর্তন রোধ করে পরিবেশগতভাবে টেকসই ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে, স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নির্মল জীবনযাত্রা পেতে সবুজ কর বা পরিবেশ করের প্রয়োগ একটি উৎকৃষ্ট পন্থা হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই,বগুড়া, বাংলাদেশ।
ইমেইল: ahaigeo@gmail.com

সবুজ কর: পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নতুন সম্ভাবনা

 অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই 
০৫ জুন ২০২১, ১২:৪৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির বিশ্ব। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শিল্পায়নের প্রসার ঘটছে। নতুন এসব প্রযুক্তিপণ্য একদিকে আমাদের জীবনকে যেমন স্বাচ্ছন্দ্যময় করছে, তেমনি না চাইতে অনেক পরিবেশগত সমস্যাও যোগ করছে আমাদের জীবনে।

শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়ে বাতাসে মিশছে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার প্রযুক্তিপণ্যের উচ্ছিষ্ট বর্জ্যগুলো মাটি, বায়ু ও পানিকে দূষিত করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক অভিঘাত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। ফলশ্রুতিতে ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি,অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে।

আমাদের এ গ্রহের প্রতি ক্ষতিকর আচরণ থেকে বিরত রাখতে মূলত সবুজ করের উদ্ভাবন করা হয়েছে। খুব সাধারণ নীতির ওপর ভিত্তি করে এটি প্রতিষ্ঠিত, ‘যারা কলুষিত করবে বা দূষণ করবে, তারা কর প্রদান করবে।’

জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলো সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকি যা বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। প্রাক-শিল্পায়নের সময় থেকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা। ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে এই মান না রাখতে পারলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। তাই আমাদের দরকার বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস করা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংস্থা এবং অনেক অর্থনীতিবিদ একমত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হতে পারে সবুজ কর।

ধারণার সূত্রপাত:
২০১২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আর্থ সামিট (UNCSD) যা রিও +২০ নামে পরিচিত, এই সম্মেলনের পর থেকে সবুজ কর টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যদিও অনেক আগে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ বিরোধী কর্মকাণ্ডের ওপর নানা ধরনের কর আরোপ শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) পরিবেশের অবনতি, জীববৈচিত্রের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ করার পাশাপাশি ‘সবুজ কর’কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমাধান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) পরিবেশের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস এবং পরিবেশগত ঘাটতি প্রশমনের ক্ষেত্রে মানবিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া হিসেবে ‘সবুজ কর’কে' অভিহিত করেছে। আর বিশ্বব্যাঙ্ক (WB) প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং দূষণ নির্গমনকে হ্রাস করার পাশাপাশি পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক বিকাশের পরিবেশ বান্ধব এবং সামগ্রিক উপায় হিসেবে সবুজ করকে গুরুত্ব দিয়েছে।

সবগুলো সংজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে অর্থনৈতিক বিকাশের গতিকে ধীর না করে সম্পদ ব্যবহারে উন্নতি করা এবং দূষণ নির্গমন হ্রাস করার ক্ষেত্রে সবুজ করকে প্রাধান্য দেয়া। মূলত এখান থেকেই বিশ্বের দেশে দেশে সবুজ কর বা পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন শুরু হয়।

সবুজ কর কী?
১৯৯৭ সালে গঠিত ইউরোস্ট্যাট, ইউরোপীয় কমিশন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA), দ্বারা যৌথভাবে বিকশিত পরিসংখ্যান কাঠামো অনুসারে- যাদের কর ভিত্তি একটি প্রাকৃতিক ইউনিট বা অনুরূপ নিয়ে গঠিত বা এমন কিছু উপাদান নিয়ে গঠিত যা পরিবেশের উপর নেতিবাচক এবং নির্দিষ্ট প্রভাব ফেলে, তাদের জন্য সবুজ কর প্রযোজ্য।

কোনো অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে কোনো সংস্থা আমাদের এই গ্রহ বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিবেচনা না করে দূষণমূলক উপায়ে পণ্য তৈরি করলে অর্থনীতিতে তাকে বহিরাগত (Externality) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সবুজ করের উদ্দেশ্য হলো দূষণকারীকে দূষকগণের জন্য প্রদত্ত নীতি অনুসারে অর্থ প্রদানে বাধ্য করা, যার দামগুলো এই বহিরাগতদের (Externalities) ব্যয়কে প্রতিফলিত করে।

সহজভাবে বলা যায়, সবুজ কর হলো পরিবেশ দূষণকারী কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্ক। সবুজ করের অর্থ- পরিবেশের উন্নয়ন করা, পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা বা পরিবেশগতভাবে টেকসই পরিবেশ (Sustainable environment) তৈরি করতে সহায়তা করা। সবুজ কর পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক টুল বা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সবুজ কর আরোপের মাধ্যমে সংস্থা, সম্প্রদায় , গৃহস্থালি এবং ব্যক্তি আচরণ পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা হয়, দূষণ নির্গমনের উপর কর আরোপ করা হয় এবং দূষণকারীদের বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হয়।

এই করকে কখনো সবুজ কর (Green tax), কখনো পরিবেশগত কর (Environmental tax), কখনো দূষণ কর (Pollution tax), আবার কখনো বাস্তুসংস্থান কর (Ecological tax) বলা হয়ে থাকে। ভিন্ন নাম হলেও সবগুলো মূলত একই ধরনের অর্থ প্রকাশ করে থাকে।

সবুজ করের সুবিধাসমূহ:
ডিকার্বনাইজড অর্থনীতি তথা টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়ার মূল চাবিকাঠি হিসেবে সবুজ কর বা পরিবেশ কর ধার্যের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রায় সর্বসম্মতি রয়েছে। এই করের অস্তিত্বকে ন্যায্যতা দেয় এমন প্রধান সুবিধাগুলো নিম্নরূপ-

 *এই কর এনার্জি সেভিং এবং নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে;
 *এটি পরিবেশবিরোধী আচরণকে নিরুৎসাহিত করে;
 *এই কর টেকসই পন্থা উদ্ভাবন করতে কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে;
 *পরিবেশ করের মাধ্যমে আহরিত রাজস্ব অন্যান্য পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য বা অন্যান্য করগুলো হ্রাস করতে ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- এই কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয়কর ,কর্পোরেট ট্যাক্স এবং সামাজিক বীমা প্রিমিয়ামের কর কাটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে;
 *এই কর পরিবেশগত ব্যয়কে অভ্যন্তরীণ করে (উদাহরণস্বরূপ পরিবেশের ক্ষতি করে এমন ক্রিয়াকলাপের উপর কর আরোপ করা হবে; পক্ষান্তরে পরিবেশ সংরক্ষণকারী ক্রিয়াকলাপকে কর বিরতি প্রদান করা হবে)। 
পরিবেশ করগুলো ব্যাবসায়িক উদ্বেগকে এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ গুলিকে একীভূত করার জন্য ব্যক্তিকে উৎসাহ প্রদান করে এবং নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(IMF) এর প্রস্তাব হচ্ছে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন করে তাদেরকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের উপর কর দিতে হবে। আইএমএফ এর মতে এই হার ২০৩০ সালে প্রতি টন ৭৫ মার্কিন ডলার অথবা ৬৮ ইউরো হতে হবে।

সংস্থাটি মনে করে, এই হার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লার ব্যবহারে প্রভাব ফেলবে। এই ধরনের কর বেশি দূষণকারী শক্তি সম্পদ থেকে কম দূষণকারী শক্তির, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সাহায্য করবে।

সবুজ করের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হচ্ছে দ্বিগুণ লভ্যাংশ হাইপোথিসিস। সবুজ কর আরোপ একদিকে যেমন অর্থনীতিতে বোঝা বাড়াবে, তেমনি শ্রম, মূলধন বা ভোগের উপর কর হ্রাসের ফলে ক্ষতিপূরণ হবে এবং পরিবেশগত মান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দ্বিগুণ উপকার হবে।

যেসব ক্ষেত্রে সবুজ কর প্রয়োগ যোগ্য:
সাধারণত চারটি ক্ষেত্রে (শক্তি বা জ্বালানি কর, পরিবহন কর, দূষণ কর, সম্পদ বা খনিজ অনুসন্ধান সম্পর্কিত কর) পরিবেশগত করের অনুশীলন হলেও বলা যায় প্রতিটি দেশের পরিবেশগত কর সম্পর্কিত নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশগত কর আরোপের ক্ষেত্রে করযোগ্য প্রধান বিবেচ্যগুলো হলো:

 *নাইট্রোজেন অক্সাইড (NO) এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এর নির্গমন যা যানবাহনের দহন থেকে উৎপাদিত হয়।
 *সালফার ডাই অক্সাইডের নির্গমন যা এসিড বৃষ্টির মূল কারণ। বিশেষত পেট্রোলিয়াম পণ্যগুলোর দহন এবং কয়লা জ্বলনের ফলে যা উৎপাদিত হয়।
 *বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (গার্হস্থ্য, বাণিজ্যিক, শিল্প, নির্মাণ
 ইত্যাদি)।
 *বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ফলে সৃষ্ট শব্দ।
 *জ্বালানি পণ্যগুলি (পেট্রোল, ডিজেল,প্রাকৃতিক গ্যাস,কয়লা,জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি) এগুলো পুড়ে গেলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়।
 *জ্বল দূষণের উৎস (কীটনাশক, রাসায়নিক সার, এসিড ইত্যাদি)।
 *প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ ও ব্যবহার।
 *কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ।
 *ওজোনস্তর হ্রাসকারী পণ্য।
 *পরিবহন (সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত) (দূষণকারী যানবাহনের নিবন্ধন, ব্যবহার,আমদানি বা বিক্রয়)।

যথাযথ পরিবেশগত করের জন্য নীতিমালা:
OECD-এর মতে পরিবেশগত করের ভালো বিধি-বিধান তৈরির জন্য নিম্নোক্ত নীতিমালাগুলো অনুসরণ করা উচিত-
 *কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে পরিবেশগত করের লক্ষ্য হওয়া উচিত কিছু দূষক ও দূষণকারী আচরণ।
 *ক্ষতির পরিমাণের চেয়ে পরিবেশগত করের সুযোগ বেশি বিস্তৃত হওয়া উচিত।
 *কর হার পরিবেশগত ক্ষতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
 *পরিবেশকে রক্ষা করতে সহায়তা করে এমন আচরণগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে করকে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য এবং এর হার বোধগম্য হতে হবে।
 *পরিবেশগত কর রাজস্ব সংস্কারে ব্যবহৃত হতে পারে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব বা অন্যান্য কর হ্রাসে সহায়তা করতে পারে।
 *পরিবেশগত করের বিষয়টি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য জনসাধারণের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
 *কোন নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য পরিবেশগত করকে পরিবেশের অন্যান্য নীতি উপকরণগুলোর সাথে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিভিন্ন করের বাস্তবায়ন এবং যেভাবে পরিবেশ কর বা সবুজ করের সমন্বয় করা হয়, সেখানে প্রায়শই এই সব নীতিমালার প্রতিফলন দেখা যায় না।

বিশ্বের দেশে দেশে পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন:

আন্তর্জাতিক সমাজ সবুজ বিকাশের উন্নয়নে অসংখ্য চুক্তি ও কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল ফ্রান্স। ফ্রান্স সর্বপ্রথম ১৯৬৯ সালে বন কর আরোপ করেছিল, যা কাঁচামাল আহরণের (তেল ও গ্যাস ব্যতীত) জন্য সম্পদ বলা হলেও মূলত ছিল সবুজ কর বা পরিবেশগত কর। পরবর্তী বছরে (১৯৭০) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন এর ওপর কর আরোপ করা হয়। এটাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে বায়ুতে দূষণ নির্গমনকারী অন্যান্য গ্যাস যেমন কার্বন-মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড (কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যতীত) এবং পানি দূষক ও কঠিন দূষকের (solid pollutants) উপর কর আরোপ করা হতে থাকে।

জাপান ১৯৭২ সালে বিমান পরিবহনের ওপর জ্বালানি কর আরোপ করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ১৯৯০ সালে পরিবেশগত কর সংস্কার কর্মসূচি (ETR) প্রবর্তন করেছে।

১৯৯৩ সালে ব্রিটেনে ফুয়েল প্রাইস এসকেলেটর (FPE) প্রবর্তন করা হয় যা ১৯৯৯ সালে জ্বালানি করে রূপান্তরিত হয়। ২০০০ সালে FPE স্থগিত করা হয়। তবে ২০০৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দূষণ কমাতে বিভিন্ন ধরনের সবুজ করের প্রস্তাব করা হয়।

ফ্রান্সে ২০০৮ সালে সবুজ কর চালু হয়েছে এবং প্রতি টন গ্রিন হাউস গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ ইউরো। পরিবেশ বাঁচাতে ফ্রান্স আরও এক ধরনের অভিনব সবুজ কর চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফ্রান্স থেকে ছেড়ে যাওয়া বিমানের টিকিট কাটার সময় যাত্রীদের কাছ থেকে সবুজ কর নিবে দেশটি। ২০২০ সালে এটি কার্যকর হয়েছে। এই কর থেকে যে অর্থ আদায় হবে তা পরিবেশবান্ধব পরিবহন চালুতে ব্যয় করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রান্স ও ইউরোপের ভিতরে চলা ফ্লাইটের ইকোনমি ক্লাসের টিকেট ১.৫ ইউরো ও বিজনেস ক্লাসের টিকিটে ৯ ইউরো এবং ইউরোপের বাইরে চলাচলকারি ফাইটের ইকোনমি ক্লাসে ৩ ইউরো ও বিজনেস ক্লাসের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ ইউরো কর দিতে হবে। ফরাসি সরকার আশা করছে এটি কার্যকর হলে বছরে ১৮০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আদায় হবে।

উল্লেখ্য, এপ্রিল ২০১৮ থেকে সুইডেনে বিমান টিকিটের উপর ৪০ ইউরো পর্যন্ত সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিবেশগত কর মূলত চার ধরনের (জ্বালানি কর, দূষণ কর, সম্পদ কর ও পরিবহন কর)। ইউরোস্ট্যাটের এর মতে ২০১৭ সালে ইইউ’তে আহরিত পরিবেশগত করের পরিমাণ ছিল ৩৬৮.৮ বিলিয়ন ইউরো যা ইউরোপীয় জিডিপির ২.৪ শতাংশ এবং মোট কর রাজস্বের ৬.৩ শতাংশ। এরমধ্যে ৭৬.৯ শতাংশ রাজস্ব আসে জ্বালানি খাত থেকে, ১৯.৭ শতাংশ পরিবহন খাত থেকে এবং ৩.৪ শতাংশ আসে দূষণ ও সম্পদ আহরণ খাত থেকে। দেশভেদে আহরিত এই করের পরিমাণ নিম্নরূপ:

দেশভিত্তিক পরিবেশগত কর আহরণ (EU)
 (জিডিপির শতাংশ)
__________________________________________
দেশ শতাংশ
___________________________________________
গ্রিস ৩.৯৭
স্লোভেনিয়া ৩.৭৩
ডেনমার্ক ৩.৭২
লাটভিয়া ৩.৪৮
ইতালি ৩.৩৩
ফিনল্যান্ড ২.৯৯
যুক্তরাজ্য ২.৩৯
ফ্রান্স ২.৩১
বেলজিয়াম ২.২৪
সুইডেন ২.১৬
স্পেন ১.৮৩
জার্মানি ১.৮১
আয়ারল্যান্ড ১.৭৫
___________________________________________
উৎস্য: ইউরোস্ট্যাট ২০১৭ 

ইউক্রেন সরকার ১৯৯৯ সাল থেকে পরিবেশগত কর আদায় করছে; যা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশ দূষণ ফি নামে পরিচিত। দূষণকারী সকল সংস্থা থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়। বলকান রাষ্ট্রগুলিতে (আলবেনিয়া, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, সার্বিয়া ) নানা ধরনের বাস্তুসংস্থান কর (Eco tax) রয়েছে। কার্বন কর ,জীবাশ্ম জ্বালানি কর, কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কর, সিএফসি কর, বিশেষ বর্জ্য প্রবাহ কর, নতুন অটোমোবাইল কর , ইকো কর, পেট্রোল ও ডিজেল কর, পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ কর (ক্ষতিকারক শিল্প বর্জ্য অপসারণের জন্য, প্যাকেজিং বর্জ্য, মোটর তেল ) ইত্যাদি। বলকান দেশগুলোর মধ্যে ক্রোয়েশিয়া কর সংস্কার, সংগ্রহ ও প্রয়োগে অনেক অগ্রগতি করেছে। সার্বিয়ায় মোট বর্জ্য প্রবাহের উপর আরোপিত ইকো কর একটি ভালো অগ্রগতি। তুলনায় আলবেনিয়া, বসনিয়া, মেসিডোনিয়া ও মন্টিনিগ্রোতে পরিবেশ কর আদায় প্রক্রিয়া তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার জুলাই-২০১২ থেকে কার্বন ট্যাক্স চালু করেছে; যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অবদান রাখছে। এটি মূলত কার্বন ভিত্তিক সামগ্রীর (কয়লা,পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ) ওপর আরোপিত একটি আবগারি শুল্ক। কার্বন ট্যাক্স অস্ট্রেলিয়ায় পরিষ্কার জ্বালানির (Clean energy) উৎসগুলোর (নবায়নযোগ্য বা সবুজ শক্তি যেমন - বায়ু, হাইড্রো এবং সৌরশক্তি) বিকাশ ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে।

অবশ্য ২০১৪ সালে কার্বন ট্যাক্সকে বিষাক্ত কর উল্লেখ করে তা বাতিল করার জন্য সংসদে বিল উত্থাপিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবুজ কর নেই তবে পেট্রোল করকে এখানে সবুজ করের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চীন ও জাপানে ও সবুজ কর চালু রয়েছে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৫ সাল থেকে সবুজ করের পাশাপাশি গ্রিন ট্যাক্স ইনসেনটিভ স্কিম বাস্তবায়ন করছে। উপমহাদেশে ভারত পাকিস্তান ও নেপালেও সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে। সবুজ কর থেকে নেপালে ১৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ শতাংশ এবং ভারতে ১২ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়। ভারতে ২০১০ সালে টনপ্রতি ৫০ টাকা হারে কয়লার ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে (মহারাষ্ট্র,অন্ধ্রপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, ও কর্নাটক প্রদেশে ) আগস্ট ২০১০ থেকে আট বছরের বেশি পুরনো বাণিজ্যিক যানবাহন এবং পনেরো বছরের বেশি পুরনো ব্যক্তিগত যানবাহনের উপর সবুজ কর প্রয়োগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে জুন ২০১৪ থেকে দূষিত কারখানা, মূলত ট্যানারিগুলোর ওপর এক শতাংশ হারে সবুজ কর আরোপ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত করের সঙ্গে কতটা পরিবেশদূষণ করছে তার ওপর নির্ধারিত কর প্রদান করবে।

ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হবে। এনবিআরের মতে, এর ফলে এই খাত থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে পারে।

পরিবেশগত করের বিরুদ্ধে সমালোচনা:
পরিবেশগত কর আরোপ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রচলিত অভিযোগ হচ্ছে-
 *কর আরোপের ফলে যেসব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, অধিকাংশ সময় সেসবের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সংযোগের অভাব থাকে।
 *পরিবেশগত ক্ষতিকে ভিত্তি না ধরার কারণে অনেক সময় কর ডিজাইনে পরিবেশগত ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে না।
 *করযোগ্য ইভেন্টগুলোর স্থানিক সুযোগ,ক্ষয়ক্ষতি এবং ভোগ বিবেচনার চেয়ে অনেক সময়ই প্রযুক্তির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়।
 *সবুজ কর সম্পর্কে একটি সাধারণ ভীতি হচ্ছে, এর ভিত্তি প্রসারিত করলে এবং যত্রতত্র প্রয়োগ করলে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, বেকারত্বের হার বাড়বে, সামাজিক অসন্তোষ বাড়বে এবং দেশগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু পরিষ্কার শক্তির (Clean energy) ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে- এই কথাটিও প্রচার হওয়া উচিত।
 *করের নিম্নহার এজেন্টদের পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করে।
 *OECD এর ২০১৮ সালের এনার্জি ট্যাক্স রিপোর্টে দেখা যায়, কয়লার ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য কর বা কর রেয়াতের সুযোগ দেয়া হয়েছে যা চূড়ান্ত প্রশ্নসাপেক্ষ।
 *এই কর দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত খাত হচ্ছে জ্বালানি খাত। এই করের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও জটিল দিক ও এই খাত।
 *আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈচিত্র্যের অভাব পরিবেশ করের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ে অসমতা সৃষ্টি করে।

কর আরোপ প্রক্রিয়ার জটিলতা:
কর আরোপ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ জটিলতাপূর্ণ। যেমন-কর আদায়,শনাক্তকরণ, কর হার নির্ধারণ, করারোপের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, ক্রেতা বা ভোক্তার ওপর করের বোঝা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা (পরিবেশ, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়), দূষণের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে মতভেদ ইত্যাদি। ফলে পরিবেশগত করের বাস্তবায়ন করা খুবই দুরূহ।

সামগ্রিক মূল্যায়ন:

সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশগত করকে জলবায়ু পরিবর্তন ধীর করার অন্যতম মূল হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর এ কারণে এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন-OECD বা ইউরোপীয় কমিশন অনেক দেশে পরিবেশ করের প্রতিশ্রুতির অভাবের সমালোচনা করে এবং তাদের প্রতি আহবান জানায় পরিবেশগত কর সংস্কার করার জন্য। ২০০০-২০১৭ সময়কালে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত কর আদায় হারের নিম্নগামীতায় বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০০৩ সালে পরিবেশ কর আদায়ের হার ছিল জিডিপির ২.৫৬ শতাংশ, যেখানে ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২.৪ শতাংশে যা খুবই হতাশাজনক। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এই খাতে কর - জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ুর লাগামহীন পরিবর্তন রোধ করে পরিবেশগতভাবে টেকসই ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে, স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নির্মল জীবনযাত্রা পেতে সবুজ কর বা পরিবেশ করের প্রয়োগ একটি উৎকৃষ্ট পন্থা হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই,বগুড়া, বাংলাদেশ।
ইমেইল: ahaigeo@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন