সুনীল মহাসমুদ্র: জীবনের বিকাশে ও জীবনধারণের প্রয়োজনে  
jugantor
বিশ্ব মহাসাগর দিবস আজ
সুনীল মহাসমুদ্র: জীবনের বিকাশে ও জীবনধারণের প্রয়োজনে  

  ড. মোহন কুমার দাশ  

০৮ জুন ২০২১, ১৬:৩৫:২৯  |  অনলাইন সংস্করণ

জীবনের বিকাশে ও জীবনধারণের প্রয়োজনে সমুদ্রের অবদান ও আবেদনকে বিশ্ব মানসে তুলে ধরার প্রয়োজনে এ বছর পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব মহাসাগর দিবস - ২০২১। বিশ্বের অনেক দেশ ১৯৯২ সাল থেকে এ দিবস পালন করে আসলে ও ২০০৯ সাল থেকে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ জুন বিশ্ব মহাসাগর দিবস – ২০২১ পালিত হয়ে আসছে।

মানুষের বসবাসযোগ্য এই সুনীল গ্রহ পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও একভাগ স্থল। এ গ্রহের প্রায় ১০০ কোটি মানুষের প্রোটিনের প্রধানতম উৎস এ মহাসাগর। শুধু তা নয়, সুনীল অর্থনীতির মূল উৎস এ মহাসমুদ্র। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে বিশ্বের প্রায় ৪ কোটি মানুষ সংযুক্ত থাকবে। বিশ্বের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ভাগ সম্পাদিত হয় ৭০ শতাংশ জলবেষ্টিত সুনীল গ্রহের মহাসমুদ্র পথে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় সুনীল গ্রহের সুনীল অর্থনীতির অবদানে মহাসমুদ্রের ভূমিকা।

বিশাল জলরাশি দিয়ে ঘেরা উপকূলীয় অঞ্চলের নানাবিধ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর মানুষের সমূহ নির্ভরশীলতা আছে। যে উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষায় মানুষের সহযোগী হতে পারতো কিন্তু বিভিন্ন মানবেতর কর্মকাণ্ড উপকূলীয় অঞ্চলকে করে তুলছে বিপন্ন। শুধু তা নয়, অমানবিক, অসচেতন কর্মকাণ্ডে প্রায় ৫০ শতাংশ কোরাল রীফ ধ্বংসের সম্মুখীন। মাছের বিভিন্ন প্রজাতি বিপন্ন ও বিলুপ্ত।

মানুষের বেঁচে থাকা ও জীবপনধারণের অতি অবশ্য মৌলিক চাহিদার অন্যতম খাদ্য, ওষুধের জন্য আমাদের নির্ভরশীলতা রয়েছে সমুদ্রের প্রতি। তাছাড়া সভ্যতার উন্নতি উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ ব্যাপক ব্যবহার সেগুলোর ও অন্যতম উৎস মহাসাগর। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বসবাস করে। আর, বঙ্গোপসাগরের উপর নির্ভরশীল পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা সম্পাদিত করে এমন জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি।

ওষুধের জন্য সমুদ্র নির্ভরশীলতা

বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে সি-উইড (মেরিন ম্যাক্রোঅ্যালজি)। এ সমুদ্র সম্পদ খাদ্য ও শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হলে এর ওষধি মূল্য আছে অনেক। ওষুধ হিসাবে সি উডের সরাসরি ব্যবহার রয়েছে।

চীন দেশের ভেষজ ইতিহাসের সুপ্রাচীন (২৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব) গ্রন্থে সি উডের সরাসরি ব্যবহার এর কথা উল্লেখ আছে। তাছাড়া ১৭০০ সাল থেকে প্রকাশিত গ্রিক, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভূমধ্যসাগরীয় প্রভৃতি অঞ্চলের অনেক বইতে পেটের অসুস্থতা, টিউমার নিরোধক, ক্ষত, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি নিরাময়ে সি উডের ব্যবহার বর্ণনা করা হয়েছে। সি উডের ওষধি ব্যবহারের বিস্তারিত উল্লেখ আছে চ্যাপম্যান এবং চ্যাপম্যান (১৯৮০) প্রকাশিত আর্টিকেল। দন্ত চিকিৎসায় দাঁতের প্রস্তুতিতে অ্যালগিনের বিশদ ব্যবহার রয়েছে। অঞ্চলভিত্তিতে সি উডের ওষধি ব্যবহারের সমন্বিত গবেষণা অতি আবশ্যক।

এমনকি এ যে বায়ুমণ্ডল, যেখান থেকে প্রতি শ্বাসে প্রশ্বাসে শক্তি যোগান দিয়ে ফুসফুসকে সচল ও দেহকে কর্মক্ষম রাখছি সে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে এ মহাসাগরগুলো। পৃথিবীতে বসবাসরত প্রাণীজগতের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের প্রায় ৫০% সরবরাহকারী কারখানা হলো এ জলবেষ্টিত মহাসমুদ্র।

প্রয়োজনসমন্বিত প্রস্তুতি

মানবেতর অন্যায্য আচরণ শুধু উপকূলীয় অঞ্চলকে নয় মহাসমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে। ফলতঃ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। কিন্তু মানবেতর লোভ, লিপ্সা, সভ্যতার নামে অনায্য আগ্রাসন এ সুনীল গ্রহকে বিপন্নতা থেকে রক্ষা করা ও প্রজন্ম পরম্পরায় এটিকে সুস্থ রাখা প্রতিটি প্রজন্মের সুদীপ্ত অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং এদের টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে সমুদ্র দশক। আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত ঘোষিত সমুদ্র দশকে শিক্ষা, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ সিস্টেম, গবেষণা ও সুনীল অর্থনীতিতে বিশ্বমানে পৌঁছাতে আমাদের সমন্বিত প্রস্তুতি আছে কী?


লেখক: ড. মোহন কুমার দাশ
নির্বাহী পরিচালক, ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউট (নোয়ামি),
mohan.smrc@gmail.com

বিশ্ব মহাসাগর দিবস আজ

সুনীল মহাসমুদ্র: জীবনের বিকাশে ও জীবনধারণের প্রয়োজনে  

 ড. মোহন কুমার দাশ 
০৮ জুন ২০২১, ০৪:৩৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

জীবনের বিকাশে ও জীবনধারণের প্রয়োজনে সমুদ্রের অবদান ও আবেদনকে বিশ্ব মানসে তুলে ধরার প্রয়োজনে এ বছর পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব মহাসাগর দিবস - ২০২১। বিশ্বের অনেক দেশ ১৯৯২ সাল থেকে এ দিবস পালন করে আসলে ও ২০০৯ সাল থেকে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ জুন বিশ্ব মহাসাগর দিবস – ২০২১ পালিত হয়ে আসছে। 

মানুষের বসবাসযোগ্য এই সুনীল গ্রহ পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও একভাগ স্থল। এ গ্রহের প্রায় ১০০ কোটি মানুষের প্রোটিনের প্রধানতম উৎস এ মহাসাগর। শুধু তা নয়, সুনীল অর্থনীতির মূল উৎস এ মহাসমুদ্র। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে বিশ্বের প্রায় ৪ কোটি মানুষ সংযুক্ত থাকবে। বিশ্বের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ভাগ সম্পাদিত হয় ৭০ শতাংশ জলবেষ্টিত সুনীল গ্রহের মহাসমুদ্র পথে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় সুনীল গ্রহের সুনীল অর্থনীতির অবদানে মহাসমুদ্রের ভূমিকা। 

বিশাল জলরাশি দিয়ে ঘেরা উপকূলীয় অঞ্চলের নানাবিধ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর মানুষের সমূহ নির্ভরশীলতা আছে। যে উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষায় মানুষের সহযোগী হতে পারতো কিন্তু বিভিন্ন মানবেতর কর্মকাণ্ড উপকূলীয় অঞ্চলকে করে তুলছে বিপন্ন।  শুধু তা নয়, অমানবিক, অসচেতন কর্মকাণ্ডে প্রায় ৫০ শতাংশ কোরাল রীফ ধ্বংসের সম্মুখীন। মাছের বিভিন্ন প্রজাতি বিপন্ন ও বিলুপ্ত।  

মানুষের বেঁচে থাকা ও জীবপনধারণের অতি অবশ্য মৌলিক চাহিদার অন্যতম খাদ্য, ওষুধের জন্য আমাদের নির্ভরশীলতা রয়েছে সমুদ্রের প্রতি। তাছাড়া সভ্যতার উন্নতি উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ ব্যাপক ব্যবহার সেগুলোর ও অন্যতম উৎস মহাসাগর। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বসবাস করে। আর, বঙ্গোপসাগরের উপর নির্ভরশীল পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা সম্পাদিত করে এমন জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। 

ওষুধের জন্য সমুদ্র নির্ভরশীলতা

বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে  সি-উইড (মেরিন ম্যাক্রোঅ্যালজি)। এ সমুদ্র সম্পদ খাদ্য ও শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হলে এর ওষধি মূল্য আছে অনেক। ওষুধ হিসাবে সি উডের সরাসরি ব্যবহার রয়েছে। 

চীন দেশের ভেষজ ইতিহাসের সুপ্রাচীন (২৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব) গ্রন্থে সি উডের সরাসরি ব্যবহার এর কথা উল্লেখ আছে।  তাছাড়া ১৭০০ সাল থেকে প্রকাশিত গ্রিক, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভূমধ্যসাগরীয় প্রভৃতি অঞ্চলের অনেক বইতে পেটের অসুস্থতা, টিউমার নিরোধক, ক্ষত, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি  নিরাময়ে সি উডের ব্যবহার বর্ণনা করা হয়েছে। সি উডের ওষধি ব্যবহারের বিস্তারিত উল্লেখ আছে চ্যাপম্যান এবং চ্যাপম্যান (১৯৮০) প্রকাশিত আর্টিকেল। দন্ত চিকিৎসায় দাঁতের প্রস্তুতিতে অ্যালগিনের বিশদ ব্যবহার রয়েছে। অঞ্চলভিত্তিতে সি উডের ওষধি ব্যবহারের সমন্বিত গবেষণা অতি আবশ্যক।

এমনকি এ যে বায়ুমণ্ডল, যেখান থেকে প্রতি শ্বাসে প্রশ্বাসে শক্তি যোগান দিয়ে ফুসফুসকে সচল ও দেহকে কর্মক্ষম রাখছি সে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে এ মহাসাগরগুলো। পৃথিবীতে বসবাসরত প্রাণীজগতের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের প্রায় ৫০% সরবরাহকারী কারখানা হলো এ জলবেষ্টিত মহাসমুদ্র।  

প্রয়োজন সমন্বিত প্রস্তুতি 

মানবেতর অন্যায্য আচরণ শুধু উপকূলীয় অঞ্চলকে নয় মহাসমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে। ফলতঃ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। কিন্তু মানবেতর লোভ, লিপ্সা, সভ্যতার নামে অনায্য আগ্রাসন এ সুনীল গ্রহকে বিপন্নতা থেকে রক্ষা করা ও প্রজন্ম পরম্পরায় এটিকে সুস্থ রাখা প্রতিটি প্রজন্মের সুদীপ্ত অঙ্গীকার হওয়া উচিত। 

মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং এদের টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে সমুদ্র দশক। আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত ঘোষিত সমুদ্র দশকে শিক্ষা, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ সিস্টেম, গবেষণা ও সুনীল অর্থনীতিতে বিশ্বমানে পৌঁছাতে আমাদের সমন্বিত প্রস্তুতি আছে কী?


লেখক: ড. মোহন কুমার দাশ
নির্বাহী পরিচালক, ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউট (নোয়ামি), 
mohan.smrc@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন