ম্যারাডোনা কি আমার আংকেল? 
jugantor
বাবা দিবসের বিশেষ লেখা
ম্যারাডোনা কি আমার আংকেল? 

  ডা. সুস্মিতা জাফর রুমু  

২০ জুন ২০২১, ১৭:১০:০৭  |  অনলাইন সংস্করণ

ম্যারাডোনা। ফাইল ছবি

মেজো ফুপাকে কবর দিয়ে এসে আব্বু মাত্র বাসায় ঢুকল। ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহটা এলিয়ে দিলো ড্রইং রুমের সোফায়। কালো চুলের অনেকখানিই পেকে সাদা হয়ে গেছে,লাল টকটকে চোখের নিচে পুরু হয়ে জমেছে কালি।

আব্বুকে দেখে চমকে উঠলাম—একদিনেই যেন তার বয়স বেড়ে গিয়েছে ১০ বছর!

মনে মনে প্রশ্ন করলাম, আমার আব্বু কি তাহলে বুড়ো হয়ে গেল?

প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল আমার। মনে পড়ে গেল, বহু বছর আগে আব্বুর এক সিনিয়র কলিগের বেশি বয়সে জন্ম নেয়া একমাত্র মেয়ে বিপাশার আকুতি, “তোমরা আমার আব্বুকে বুড়ো বলবে না, আমার ভালো লাগে না”। সেদিন হয়তো আমার মতো বিপাশার বুকের ভেতরটাও থেকে থেকে মুচড়ে উঠেছিল তার বয়স্ক বাবার জন্য।

আমার সবসময়ই মনে হয় আমার বাবা একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ; যার বেশিরভাগ স্বপ্ন তার বড়ো সন্তান- তার বড়মেয়েকে ঘিরে। আম্মুকে দিনের অনেকটা সময় কাটাতে হতো দেড় বছরের ছোট বোন শতরুপাকে নিয়ে, আর তাই আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম আমার আব্বুর শক্ত হাতটা ধরে। খুব ছোটবেলায়, তখন ধামরাই এর কলোনিতে থাকতাম, মাত্র আড়াই কি তিন বছর বয়স আমার, প্রতিদিন সকালের শুরুটা হতো আব্বুর সাথে মাঠে খেলা করে কিংবা মোটরসাইকেলে আব্বুর সামনে বসে; পুরো কলোনিটা চক্কর মেরে।

ছোটবেলায় আব্বুর পেছন পেছন চলে যেতাম তার অফিসে। সেই তিন বছর বয়সেই কী মেলা, কী মঞ্চ নাটক- সব জায়গায় ছিলাম আব্বুর নিত্য সঙ্গী!

ধামরাইয়ে কিছুদিন পর পরই মেলা বসতো অথবা থিয়েটারে নাটক, জাদু, গানের আসর। কিছু বুঝতাম কি না, জানি না। পরে আব্বুর কাছে শুনেছি, আমাকে যেভাবে বসিয়ে রাখা হতো, কোনরকম বিরক্ত করা ছাড়াই আড়াই বছর বয়সের আমি, ঠিক এক মনে বসে অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করতাম। আমার শুধু মনে আছে সব কিছুতে, সকল অনুষ্ঠানেই আব্বুর সঙ্গী হওয়া ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় শখ!

সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলে আব্বুর কোলে উঠে মাঠে চলে যেতাম, হলুদ ল্যাম্প পোস্টের আলোয় হাজারো ঝিঁ ঝিঁ পোকার উড়াউড়ি কিংবা থপ থপ শব্দে আব্বুর পায়ের নিচ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া ভীতু ব্যাঙগুলোকে অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে অবলোকন করতাম!

রাতের অন্ধকারে আম্মু যখন বোনকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গাইতো, আমি তখন বারান্দায় বসে আব্বুর কোলে লুঙ্গিকে দোলনা বানিয়ে নিশ্চিন্তে ঝুলতে ঝুলতে আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার রূপ মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করতাম আর নিশ্চুপে আব্বুর হেড়ে গলায় গান শুনতাম- “আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে"!

কনকনে শীতের ভোরে আব্বুর কাঁধে চেপে চার বছর বয়সে প্রথম যেদিন ধানমণ্ডিপাবলিক স্কুলে ভর্তি হলাম।

ক্লাস ওয়ানে প্রথম যেদিন ভিকারুন নিসা নূন স্কুলে পা রাখলাম, যেদিন প্রথম গান শেখার জন্য লাল-সবুজ পোশাক পরে শিশু একাডেমিতেএলাম।প্রথম যেদিন দুরু দুরু বুকে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম, এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার দিন কিংবা যেদিন মেডিকেল এডমিশন টেস্ট দিতে কলা ভবনে এলাম- প্রতিটা দিনই শুরু হয়েছিল আব্বুর হাত ধরে! পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েই দেখতে পেতাম সব অভিভাবকেরসামনে অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে এক বুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গেটের কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আমার আব্বু, অত্যন্ত গর্বিত ভঙ্গিতে!

১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ছোট্ট আমাকে সাথে নিয়ে আজাদ প্রোডাক্টসে ঘুরে ঘুরে ফুটবল তারকাদের বেশ কিছু ছবি কিনছিল আব্বু । বড় করে বাঁধাই করল ম্যারাডোনার ছবিটা। এত আড়ম্বর দেখে ছোট্ট আমি আব্বুকে আচমকা প্রশ্ন করে বসলাম, ম্যারাডোনাকি আমার আংকেল?

দুই.

আব্বু-আম্মু তো হেসেই খুন! আমার অভ্যাস ছিল আব্বুকে অনুকরণ করা এবং একই সাথে প্রতিযোগিতা করা! যেমন, তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, খুব ভোরে আব্বু যখন morning walk এ যাওয়ার জন্যে তৈরি হতো; আমিও সেসময় আম্মুর ঘুম যেন না ভেঙ্গে যায়, সেরকম নিঃশব্দে ঘুম থেকে উঠে নিজে নিজে ফ্রেশ হয়ে, নিজের ড্রয়ার খুঁজে ঠিক আব্বুর মত সাদা গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে আব্বুর পিছে বেরিয়ে পড়তাম!

কিন্তু খেলাধূলায় সাপোর্টকরার ব্যাপারে কেন যেন সবসময় আব্বুর উল্টো দলটাকেই বেছে নিতাম! অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম- কে জেতে,আব্বু নাকি আমি? 1994 এ বুঝতাম না world cup মানে কী? জানতাম না ফুটবল মানে কী? এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে আব্বুর পছন্দের খেলোয়াড় ম্যারাডোনা আর পছন্দের দল আর্জেন্টিনা।

যতদূর মনে পড়ে সেবার ফাইনালখেলেছিল ইতালিআর ব্রাজিল।

আব্বু আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি আজ ইতালি, আর তুমি?’

আমি স্বভাবসুলভ চট করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম যে, আমি ব্রাজিল! সেই থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলে এসেছি, আমি ব্রাজিলের সাপোর্টার।

পরে বড় হয়ে দেখলাম আমি তো ফুটবল খেলাই দেখি না, ক্রিকেট নিয়ে যেমন ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করে যেতে পারি সেরকম কিছু এই ফুটবল নিয়ে তো পারি না! ফুটবল বিশ্বকাপ আসার কতদিন আগে থেকে আমাদের দেশের মানুষ কত জল্পনা-কল্পনা করে, কত উত্তেজনায় থাকে, পতাকা ওড়ায়। শুধু আমিই মনে হয় নীরব থাকি,একেবারে চুপ! কেউ জিজ্ঞেস করলে সেই ছোটবেলার মত আব্বুর বিপক্ষ দল সাপোর্ট করার জন্য অভ্যেস বশত মুখ দিয়ে বের হয়ে যায় –ব্রাজিল! কিন্তু মন বলে, না, ব্রাজিল না!

রিকশায় চড়ে কোথাও বেড়াতে গেলে ছোট বোন আম্মুর কোলে বসলেও, আমি বসতাম আব্বুর কোলে। তখন ভাবতাম রিকশার সিটে বসতে পারাটা নিজেকে ‘বড়ো’ প্রমাণ করার একটা অন্যতম উপায়! আমি সবসময় ভাবতাম, কবে বড়ো হব? আব্বুকেও ছাড়িয়ে যাব?

আমার প্রবল ইচ্ছে দেখে চার বছর বয়সেই আব্বু আমাকে তার পাশে প্রথমবারের মত রিকশার সিটে বসালেন। সে কী উত্তেজনা আমার!

মনের আনন্দে ভাবছিলাম, কখন বাসায় ফিরব,আর আম্মুকে শোনাব রিকশার সিটে বসতে পারার আনন্দানুভূতির কথা, ছোট বোনকে শোনাব আমার ‘বড়ো হয়ে ওঠার’ গল্প! এমনটা ভেবে ভেবে যখন উত্তেজিত হচ্ছিলাম, আচমকা পেছন হতে অপর এক রিকশার প্রবল ধাক্কায় এমনভাবে ঝুঁকে পড়লাম যেন মনে হলো, রিকশা থেকে ছিটকে পড়ব আমি! ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। চোখ খুলে দেখি আব্বু মিটিমিটি হাসছে,তার ডান হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে আমাকে। হাসতে হাসতে তিনি বললেন, “ভয় নেই, আমি আছি না?” সেটাইতো আসল কথা। ভয় কী আমার, আব্বু পাশে আছে না?

এভাবে দিন যায়, বছর যায়, আমি বড়ো হতে থাকি একটু একটু করে। ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম মেডিকেল কলেজে। মেডিকেল কলেজ থেকে অতিষ্ট হয়ে হুটহাট যখন ফরিদপুর থেকে ঢাকা চলে যেতাম, তখন বাস থামার বেশ আগে, জানালা দিয়েই দেখতে পেতাম, পরম আগ্রহে আব্বু বাসের ঠিক সামনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে!

একেক সময় বাস একেক জায়গায় থামে, বাস নাম্বার কখনোই বলে দেয়া হয় না তাঁকে। অথচ কীভাবে কীভাবে যেন প্রতিবারই আমি পৌঁছানোর আগেই নির্দিষ্ট বাসটার সামনে আব্বুর স্বপ্নালু হাসিমুখ দেখতে পাই!

তিন.

ছুটি শেষ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে হবে আবার! আমার ভয় কী? সাথে যাচ্ছে আব্বু। বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে বিশাল স্যুটকেসটা আব্বুর কাঁধে চাপিয়ে দিলাম। আর হালকা দু’টো ব্যাগ নিয়ে পড়িমরি করে ছুট লাগালাম আমি। বাস প্রায় ছেড়ে দিচ্ছে এমন অবস্থা, মনে হলো আমাকে রেখেই বুঝি চলে যাবে! আমি ছুটছি তো ছুটছি। ছোট মানুষ আমি, আর একটু বয়স হলে না হয় আরও দ্রুত ছোটা যেত! একসময় বাসের কাছাকাছি পৌঁছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

শ্বশুরালয়ে যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে প্রিয় মুহূর্ত

যাক, বাবা! শেষ পর্যন্ত বাসটা ধরতে পারলাম তাহলে। আমার কচ্ছপের গতিতে ছোটা দেখে নিশ্চয়ই আব্বু ঝারি মারার জন্য তৈরি হয়ে আছে? আব্বুর কথা মনে হতেই আশেপাশে তাকালাম। খুব ভাল করে চোখ বুলিয়েও কাছে ধারে আব্বুকে খুঁজে পেলাম না। তাহলে কি আব্বু আগেই বাসে উঠে পড়েছে? বাসের ভেতর উঁকি মারতে যেয়ে কী মনে করে পেছনে তাকালাম। আর তাকিয়েই সেদিনকার মত বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আব্বু এখনও সেই কত্ত পেছনে পড়ে রয়েছে!

স্যুটকেসটা সামলাবে কী, নিজে হেঁটে আসতেই যেন হিমশিম খাচ্ছে! কেমন যেন কুঁজো হয়ে আছে তাঁর পিঠ। দূর থেকে এক সময়কার আমার স্মার্ট আব্বুকে একটা বাচ্চা ছেলের মতই অসহায় লাগছিল!

আমার চোখ দুটো কেন যেন আস্তে আস্তে জলে ভরে গেল, ঝাপসা হয়ে এল পুরো বাস স্ট্যান্ড। কেউ যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমি বড়ো হয়ে গেছি, অনেক বড়ো হয়ে গেছি!

পরম নির্ভরতার প্রতীক বাবার থেকেও অনেক বয়স বেড়ে গেছে আমার!

সময় এসেছে এখন বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর, সময় এসেছে বাবার আঙুল আকড়ে ধরে বলার, “ভয় নেই, আমি আছি না?”

লেখক: ডা. সুস্মিতা জাফর

চিকিৎসক ও গল্পকার

বাবা দিবসের বিশেষ লেখা

ম্যারাডোনা কি আমার আংকেল? 

 ডা. সুস্মিতা জাফর রুমু 
২০ জুন ২০২১, ০৫:১০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ম্যারাডোনা। ফাইল ছবি
ম্যারাডোনা। ফাইল ছবি

মেজো ফুপাকে কবর দিয়ে এসে আব্বু মাত্র বাসায় ঢুকল। ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহটা এলিয়ে দিলো ড্রইং রুমের সোফায়। কালো চুলের অনেকখানিই পেকে সাদা হয়ে গেছে,লাল টকটকে চোখের নিচে পুরু হয়ে জমেছে কালি।

আব্বুকে দেখে চমকে উঠলাম—একদিনেই যেন তার বয়স বেড়ে গিয়েছে ১০ বছর!

মনে মনে প্রশ্ন করলাম, আমার আব্বু কি তাহলে বুড়ো হয়ে গেল?

প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল আমার। মনে পড়ে গেল, বহু বছর আগে আব্বুর এক সিনিয়র কলিগের বেশি বয়সে জন্ম নেয়া একমাত্র মেয়ে বিপাশার আকুতি, “তোমরা আমার আব্বুকে বুড়ো বলবে না, আমার ভালো লাগে না”। সেদিন হয়তো আমার মতো বিপাশার বুকের ভেতরটাও থেকে থেকে মুচড়ে উঠেছিল তার বয়স্ক বাবার জন্য।

আমার সবসময়ই মনে হয় আমার বাবা একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ; যার বেশিরভাগ স্বপ্ন তার বড়ো সন্তান- তার বড় মেয়েকে ঘিরে। আম্মুকে দিনের অনেকটা সময় কাটাতে হতো দেড় বছরের ছোট বোন শতরুপাকে নিয়ে, আর তাই আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম আমার আব্বুর শক্ত হাতটা ধরে। খুব ছোটবেলায়, তখন ধামরাই এর কলোনিতে থাকতাম, মাত্র আড়াই কি তিন বছর বয়স আমার, প্রতিদিন সকালের শুরুটা হতো আব্বুর সাথে মাঠে খেলা করে কিংবা মোটরসাইকেলে আব্বুর সামনে বসে; পুরো কলোনিটা চক্কর মেরে। 

ছোটবেলায় আব্বুর পেছন পেছন চলে যেতাম তার অফিসে। সেই তিন বছর বয়সেই কী মেলা, কী মঞ্চ নাটক- সব জায়গায় ছিলাম আব্বুর নিত্য সঙ্গী!

ধামরাইয়ে কিছুদিন পর পরই মেলা বসতো অথবা থিয়েটারে নাটক, জাদু, গানের আসর। কিছু বুঝতাম কি না, জানি না। পরে আব্বুর কাছে শুনেছি, আমাকে যেভাবে বসিয়ে রাখা হতো, কোনরকম বিরক্ত করা ছাড়াই আড়াই বছর বয়সের আমি, ঠিক এক মনে বসে অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করতাম। আমার শুধু মনে আছে সব কিছুতে, সকল অনুষ্ঠানেই আব্বুর সঙ্গী হওয়া ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় শখ! 

সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলে আব্বুর কোলে উঠে মাঠে চলে যেতাম, হলুদ ল্যাম্প পোস্টের আলোয় হাজারো ঝিঁ ঝিঁ পোকার উড়াউড়ি কিংবা থপ থপ শব্দে আব্বুর পায়ের নিচ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া ভীতু ব্যাঙগুলোকে অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে অবলোকন করতাম!

রাতের অন্ধকারে আম্মু যখন বোনকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গাইতো, আমি তখন বারান্দায় বসে আব্বুর কোলে লুঙ্গিকে দোলনা বানিয়ে নিশ্চিন্তে ঝুলতে ঝুলতে আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার রূপ মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করতাম আর নিশ্চুপে আব্বুর হেড়ে গলায় গান শুনতাম- “আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে"! 

কনকনে শীতের ভোরে আব্বুর কাঁধে চেপে চার বছর বয়সে প্রথম যেদিন ধানমণ্ডি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হলাম। 

ক্লাস ওয়ানে প্রথম যেদিন ভিকারুন নিসা নূন স্কুলে পা রাখলাম, যেদিন প্রথম গান শেখার জন্য লাল-সবুজ পোশাক পরে শিশু একাডেমিতে এলাম। প্রথম যেদিন দুরু দুরু বুকে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম, এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার দিন কিংবা যেদিন মেডিকেল এডমিশন টেস্ট দিতে কলা ভবনে এলাম- প্রতিটা দিনই শুরু হয়েছিল আব্বুর হাত ধরে! পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েই দেখতে পেতাম সব অভিভাবকের সামনে অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে এক বুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গেটের কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আমার আব্বু, অত্যন্ত গর্বিত ভঙ্গিতে!

১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ছোট্ট আমাকে সাথে নিয়ে আজাদ প্রোডাক্টসে ঘুরে ঘুরে ফুটবল তারকাদের বেশ কিছু ছবি কিনছিল আব্বু । বড় করে বাঁধাই করল ম্যারাডোনার ছবিটা। এত আড়ম্বর দেখে ছোট্ট আমি আব্বুকে আচমকা প্রশ্ন করে বসলাম, ম্যারাডোনা কি আমার আংকেল? 

দুই.

আব্বু-আম্মু তো হেসেই খুন! আমার অভ্যাস ছিল আব্বুকে অনুকরণ করা এবং একই সাথে প্রতিযোগিতা করা! যেমন, তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, খুব ভোরে আব্বু যখন morning walk এ যাওয়ার জন্যে তৈরি হতো; আমিও সেসময় আম্মুর ঘুম যেন না ভেঙ্গে যায়, সেরকম নিঃশব্দে ঘুম থেকে উঠে নিজে নিজে ফ্রেশ হয়ে, নিজের ড্রয়ার খুঁজে ঠিক আব্বুর মত সাদা গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে আব্বুর পিছে বেরিয়ে পড়তাম! 

কিন্তু খেলাধূলায় সাপোর্ট করার ব্যাপারে কেন যেন সবসময় আব্বুর উল্টো দলটাকেই বেছে নিতাম! অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম- কে জেতে,আব্বু নাকি আমি? 1994 এ বুঝতাম না world cup মানে কী? জানতাম না ফুটবল মানে কী? এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে আব্বুর পছন্দের খেলোয়াড় ম্যারাডোনা আর পছন্দের দল আর্জেন্টিনা।

যতদূর মনে পড়ে সেবার ফাইনাল খেলেছিল ইতালি আর ব্রাজিল।

আব্বু আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি আজ ইতালি, আর তুমি?’

আমি স্বভাবসুলভ চট করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম যে, আমি ব্রাজিল! সেই থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলে এসেছি, আমি ব্রাজিলের সাপোর্টার। 

পরে বড় হয়ে দেখলাম আমি তো ফুটবল খেলাই দেখি না, ক্রিকেট নিয়ে যেমন ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করে যেতে পারি সেরকম কিছু এই ফুটবল নিয়ে তো পারি না! ফুটবল বিশ্বকাপ আসার কতদিন আগে থেকে আমাদের দেশের মানুষ কত জল্পনা-কল্পনা করে, কত উত্তেজনায় থাকে, পতাকা ওড়ায়। শুধু আমিই মনে হয় নীরব থাকি,একেবারে চুপ! কেউ জিজ্ঞেস করলে সেই ছোটবেলার মত আব্বুর বিপক্ষ দল সাপোর্ট করার জন্য অভ্যেস বশত মুখ দিয়ে বের হয়ে যায় –ব্রাজিল! কিন্তু মন বলে, না, ব্রাজিল না! 

রিকশায় চড়ে কোথাও বেড়াতে গেলে ছোট বোন আম্মুর কোলে বসলেও, আমি বসতাম আব্বুর কোলে। তখন  ভাবতাম  রিকশার সিটে বসতে পারাটা নিজেকে ‘বড়ো’ প্রমাণ করার একটা অন্যতম উপায়! আমি সবসময়  ভাবতাম, কবে বড়ো হব? আব্বুকেও ছাড়িয়ে যাব?

আমার প্রবল ইচ্ছে দেখে চার বছর বয়সেই আব্বু আমাকে তার পাশে প্রথমবারের মত রিকশার সিটে বসালেন। সে কী উত্তেজনা আমার!

মনের আনন্দে ভাবছিলাম, কখন বাসায় ফিরব,আর আম্মুকে শোনাব রিকশার সিটে বসতে পারার আনন্দানুভূতির কথা, ছোট বোনকে শোনাব আমার ‘বড়ো হয়ে ওঠার’ গল্প! এমনটা ভেবে ভেবে যখন উত্তেজিত হচ্ছিলাম, আচমকা পেছন হতে অপর এক রিকশার প্রবল ধাক্কায় এমনভাবে ঝুঁকে পড়লাম যেন মনে হলো, রিকশা থেকে ছিটকে পড়ব আমি! ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। চোখ খুলে দেখি আব্বু মিটিমিটি হাসছে,তার ডান হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে আমাকে। হাসতে হাসতে তিনি বললেন, “ভয় নেই, আমি আছি না?” সেটাইতো আসল কথা। ভয় কী আমার, আব্বু পাশে আছে না? 

এভাবে দিন যায়, বছর যায়, আমি বড়ো হতে থাকি একটু একটু করে। ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম মেডিকেল কলেজে। মেডিকেল কলেজ থেকে অতিষ্ট হয়ে হুটহাট যখন  ফরিদপুর থেকে ঢাকা চলে যেতাম, তখন বাস থামার বেশ আগে, জানালা দিয়েই দেখতে পেতাম, পরম আগ্রহে আব্বু বাসের ঠিক সামনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে!

একেক সময় বাস একেক জায়গায় থামে, বাস নাম্বার কখনোই বলে দেয়া হয় না তাঁকে। অথচ কীভাবে কীভাবে যেন প্রতিবারই আমি পৌঁছানোর আগেই নির্দিষ্ট বাসটার সামনে আব্বুর স্বপ্নালু হাসিমুখ দেখতে পাই!

তিন.

ছুটি শেষ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে হবে আবার! আমার ভয় কী? সাথে যাচ্ছে আব্বু। বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে বিশাল স্যুটকেসটা আব্বুর কাঁধে চাপিয়ে দিলাম। আর হালকা দু’টো ব্যাগ নিয়ে পড়িমরি করে ছুট লাগালাম আমি। বাস প্রায় ছেড়ে দিচ্ছে এমন অবস্থা, মনে হলো আমাকে রেখেই বুঝি চলে যাবে! আমি ছুটছি তো ছুটছি। ছোট মানুষ আমি, আর একটু বয়স হলে না হয় আরও দ্রুত ছোটা যেত! একসময় বাসের কাছাকাছি পৌঁছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। 

শ্বশুরালয়ে যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে প্রিয় মুহূর্ত

যাক, বাবা! শেষ পর্যন্ত বাসটা ধরতে পারলাম তাহলে। আমার কচ্ছপের গতিতে ছোটা দেখে নিশ্চয়ই আব্বু ঝারি মারার জন্য তৈরি হয়ে আছে? আব্বুর কথা মনে হতেই আশেপাশে তাকালাম। খুব ভাল করে চোখ বুলিয়েও কাছে ধারে আব্বুকে খুঁজে পেলাম না। তাহলে কি আব্বু আগেই বাসে উঠে পড়েছে? বাসের ভেতর উঁকি মারতে যেয়ে কী মনে করে পেছনে তাকালাম। আর তাকিয়েই সেদিনকার মত বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আব্বু এখনও সেই কত্ত পেছনে পড়ে রয়েছে!

স্যুটকেসটা সামলাবে কী, নিজে হেঁটে আসতেই যেন হিমশিম খাচ্ছে! কেমন যেন কুঁজো হয়ে আছে তাঁর পিঠ। দূর থেকে এক সময়কার আমার স্মার্ট আব্বুকে একটা বাচ্চা ছেলের মতই অসহায় লাগছিল!

আমার চোখ দুটো কেন যেন আস্তে আস্তে জলে ভরে গেল, ঝাপসা হয়ে এল পুরো বাস স্ট্যান্ড। কেউ যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমি বড়ো হয়ে গেছি, অনেক বড়ো হয়ে গেছি!

পরম নির্ভরতার প্রতীক বাবার থেকেও অনেক বয়স বেড়ে গেছে আমার!

সময় এসেছে এখন বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর, সময় এসেছে বাবার আঙুল আকড়ে ধরে বলার, “ভয় নেই, আমি আছি না?”

লেখক: ডা. সুস্মিতা জাফর

চিকিৎসক ও গল্পকার 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন