উন্নত দেশে অভিবাসন শুধুই কি প্রশান্তির?
jugantor
উন্নত দেশে অভিবাসন শুধুই কি প্রশান্তির?

  মো. মাহমুদ হাসান, কানাডা থেকে  

২২ জুন ২০২১, ০১:১৯:৩৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর সকল অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ থেকেই কানাডায় অভিবাসনের আগ্রহ ব্যাপক। উন্নত জীবনমান, মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা, সর্বোৎকৃষ্ট মানের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল মানবিক, নাগরিক মৌলিক চাহিদা পূরণে যে সমাজে কোনো কার্পণ্য নেই, বাহারি পদ-পদবি, ক্ষমতার দাপট আর অতিরিক্ত অর্থ বিত্তের জৌলুশে যে সমাজে মর্যাদা নির্ধারিত হয় না, গণভোটে নেতা-মন্ত্রী হয়েও যে সমাজে বাড়তি আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন আর সেবার মানে আনুকূল্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেই রাষ্ট্রে স্থায়ী অভিবাসনের আগ্রহ তো মোটেও অমূলক নয়। অভিবাসন নির্ভর কানাডায় গত এক দশকে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের স্থায়ী অভিবাসী হওয়ার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে দেশটির প্রতি অভিবাসী হওয়ার আগ্রহ কতটা প্রবল।

কানাডার অভিবাসনে বাংলাদেশিরাও আজ পিছিয়ে নেই। প্রতি বছরই দক্ষ পেশাদার, গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে কানাডায় আসা বহু সংখ্যক বাংলাদেশি কানাডার স্থায়ী অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে থাকেন। এছাড়া কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি বিনিয়োগ ক্যাটাগরীতেও অভিবাসী হয়ে থাকেন, যদিও এই সংখ্যাটি খুবই নগণ্য।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেখভালে নিয়োজিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য না থাকলেও পরিসংখ্যান কানাডার হিসেবে ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে স্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা এক লাখেরও বেশি।

অভিবাসী এই বাংলাদেশিরা একদিকে যেমন কানাডার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন জীবনমানের সুবিধাও ভোগ করছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে হাজার হাজার মেধাবী বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে কানাডায় স্থায়ী হচ্ছেন, পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের আড়ালে কোন সামাজিক সংকট কি তাদের তাড়া করছে? যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় জন্মভুমি আর আত্মীয় পরিজনের বাঁধনকে ছিন্ন করে প্রতিনিয়ত অগনিত মেধাবী বাংলাদেশিরা প্রবাসী হচ্ছেন, উত্তরাধিকারী সেই প্রজন্মের সংগে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনটি কি ক্রমেই ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে?

কানাডা সমতা, সাম্য আর মানবতায় কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। লিঙ্গ বৈষম্য আর যে কোনো ধরনের বর্ণবাদী প্রবণতা কঠোর বিধি-বিধান ও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। আর এর সুফল হিসেবে বিশেষ করে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত সমাজ ব্যবস্থা থেকে আসা নারী অভিবাসীরা এখানকার সমাজ ব্যবস্থায় নিজেকে অত্যন্ত নিরাপদ বিবেচনা করতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করে। সিঙ্গেল মা, তালাক বা বিচ্ছেদপ্রাপ্ত মহিলা ও সন্তানদের জন্য সরকারের বিভিন্ন রকম অতি আকর্ষণীয় অব্যাহত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নারীদেরকে অধিক নিরাপদ ভাবতেই দারুণভাবে সাহায্য করে। তদুপরি যে কোনো ধরনের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধে তাৎক্ষনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাসমুহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য বেশি সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিধায় নারীসমাজ এখানে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায়ই থাকে।

বিভিন্ন রকম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাসমুহের আড়ালে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে কিছু অভ্যন্তরীণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংঘাত যার চুড়ান্ত পরিণতিতে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, শিশুসন্তানরা বেড়ে উঠছে বন্ধনমুক্ত পারিবারিক পরিবেশে যা তাদেরকে পিতা-মাতা তথা পূর্ব পুরুষের পারিবারিক,ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আর এই ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধে একদিকে শিশুমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি সুখের সন্ধানে অভিবাসী হওয়া মানুষগুলোকেও আচ্ছন্ন করছে এক বিভীষিকাময় চরম হতাশায়, কখনো কখনো চরম মূল্য দিয়েও সমাধান রয়ে যাচ্ছে নাগালেরই বাহিরে।

প্রতিটি সমাজেরই রয়েছে কিছু নিজস্ব রীতি নীতি ও মূল্যবোধ। শিশুকাল থেকে মধ্যবয়স অবধি একরকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হওয়ার পর অভিবাসী জীবনে ভিন্ন রকম সমাজ-সংস্কৃতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানো মোটেও সহজসাধ্য বিষয় নয়। অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম বাদে পলিসিগত কারণে বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলকভাবে অতি মেধাবী, আকর্ষণীয় পদে চাকুরীরত, দক্ষ পেশাজীবি ছাড়া কানাডায় স্থায়ী অভিবাসনের কোন সুযোগ নেই। তাই সংগত কারনেই আকর্ষণীয় পদ-পদবী ও ব্যক্তিগত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শুভ প্রত্যাশা নিয়ে যারা অভিবাসী হয়েছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নিজেকে সেরকম স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন না, তাই এক ধরনের হারানোর বেদনায় প্রতিনিয়তই তারা দগ্ধ হন।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠা মানুষ। পরিবার সন্তানসন্ততি আর সংসারের ব্যয় নির্বাহে পুরুষ সদস্যদেরকে অভিবাসী জীবনেও অর্থনৈতিক দায়িত্বের চাপে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্তই থাকতে হয়। মানানসই সম্মানজনক চাকুরী না পেলেও শারিরীক ও মানসিক চাহিদাকে অবজ্ঞা করে প্রতিকূলতাকেই মেনে নিতে হয়। অপরদিকে বাঙালি সমাজে পরিবার, আত্নীয় স্বজন, শশুর শাশুড়ী, দেবর, ননদসহ কুল-বংশের চাপহীন অভিবাসী জীবনে নারীরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানেই থাকেন। নিঃসঙ্গতা পরিহারে চাকরিটা একটা উপায় হলেও মানসিক চাপে তারা বেশ সুবিধাই ভোগ করেন।

আবার অধিকার আদায়ে তারা সোচ্চার হলেও দায়িত্ব গ্রহণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমতা ভিত্তিক সমাজের নীতি-কৌশল মানতে রাজী নয়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ভুত সাংস্কৃতিক সংঘাতের পরিণতি দাঁড়ায় হয়তো বা বিবাহ বিচ্ছেদ অথবা পরিস্থিতির কাছে নিজের আত্মসমর্পণ।

তাহলে সুখের প্রত্যাশায় অভিবাসী জীবনের প্রশান্তি কোথায়? স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারে প্রশান্তি যেমন আছে, পরিবেশসম্মত, দূর্নীতিমুক্ত, দ্রুততম নাগরিক সেবায়ও প্রশান্তির কোন ঘাটতি নেই। অর্থনৈতিক দৈন্যতায় শিক্ষা জীবন আটকে যাবারও কোন সম্ভাবনা নেই। উচ্চ বেতনের পেশাজীবির সাথে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীর জীবন যাত্রায়ও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন তফাৎ নেই। তবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় পিতা- মাতারা অভিবাসী হন, সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য সেক্ষেত্রেও অনেক নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয়।

বাঙালি আর বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক, সেটি পিতা-মাতার নিয়ত প্রত্যাশা হলেও অধিকাংশ সময় ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠা পরবর্তী প্রজন্ম পিতা-মাতার সামাজিক সংস্কৃতির রীতিনীতিকে ধারণ করতে সক্ষম হয় না, পরিণতিতে তৈরি হয় ভয়াবহ এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ। যদিও বা নতুন প্রজন্ম উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে গড়ে উঠার সুযোগ পায়,তবুও পূর্ববর্তী প্রজন্মের সংগে পরবর্তী প্রজন্মের ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতির বৈপরীত্যের কারণে এক সময়ে আদরের সন্তানসন্ততি নিজ পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অভিবাসীদের জীবনের অনেক আকাঙ্খা পূরণ হলেও সামাজিক সাংস্কৃতিক রীতিনীতির বৈপরীত্যের কারণে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, অভিবাসী জীবনের এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনসহ নানা বাংলাদেশি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর পাশাপাশি সন্তানদের শিশুকাল থেকেই পারিবারিক বন্ধনের প্রতি আগ্রহী করে তোলার অন্য কোন বিকল্প নেই। কানাডার জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করতে না পারলে, যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অভিবাসী জীবনকে বেছে নিতে হয়েছিল, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় আদূরে এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হারিয়েই হয়তো বা একদিন অভিবাসী জীবনের নিষ্ঠুরতম পরিণতকেই বরণ করতে হবে।

মো. মাহমুদ হাসান
লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

উন্নত দেশে অভিবাসন শুধুই কি প্রশান্তির?

 মো. মাহমুদ হাসান, কানাডা থেকে 
২২ জুন ২০২১, ০১:১৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর সকল অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ থেকেই কানাডায় অভিবাসনের আগ্রহ ব্যাপক। উন্নত জীবনমান, মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা, সর্বোৎকৃষ্ট মানের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল মানবিক, নাগরিক মৌলিক চাহিদা পূরণে যে সমাজে কোনো কার্পণ্য নেই, বাহারি পদ-পদবি, ক্ষমতার দাপট আর অতিরিক্ত অর্থ বিত্তের জৌলুশে যে সমাজে মর্যাদা নির্ধারিত হয় না, গণভোটে নেতা-মন্ত্রী হয়েও যে সমাজে বাড়তি আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন আর সেবার মানে আনুকূল্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেই রাষ্ট্রে স্থায়ী অভিবাসনের আগ্রহ তো মোটেও অমূলক নয়। অভিবাসন নির্ভর কানাডায় গত এক দশকে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের স্থায়ী অভিবাসী হওয়ার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে দেশটির প্রতি অভিবাসী হওয়ার আগ্রহ কতটা প্রবল।

কানাডার অভিবাসনে বাংলাদেশিরাও আজ পিছিয়ে নেই। প্রতি বছরই দক্ষ পেশাদার, গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে কানাডায় আসা বহু সংখ্যক বাংলাদেশি কানাডার স্থায়ী অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে থাকেন। এছাড়া কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি বিনিয়োগ ক্যাটাগরীতেও অভিবাসী হয়ে থাকেন, যদিও এই সংখ্যাটি খুবই নগণ্য।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেখভালে নিয়োজিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য না থাকলেও পরিসংখ্যান কানাডার হিসেবে ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে স্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা এক লাখেরও বেশি।

অভিবাসী এই বাংলাদেশিরা একদিকে যেমন কানাডার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন জীবনমানের সুবিধাও ভোগ করছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে হাজার হাজার মেধাবী বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে কানাডায় স্থায়ী হচ্ছেন, পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের আড়ালে কোন সামাজিক সংকট কি তাদের তাড়া করছে? যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় জন্মভুমি আর আত্মীয় পরিজনের বাঁধনকে ছিন্ন করে প্রতিনিয়ত অগনিত মেধাবী বাংলাদেশিরা প্রবাসী হচ্ছেন, উত্তরাধিকারী সেই প্রজন্মের সংগে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনটি কি ক্রমেই ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে?

কানাডা সমতা, সাম্য আর মানবতায় কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। লিঙ্গ বৈষম্য আর যে কোনো ধরনের বর্ণবাদী প্রবণতা কঠোর বিধি-বিধান ও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। আর এর সুফল হিসেবে বিশেষ করে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত সমাজ ব্যবস্থা থেকে আসা নারী অভিবাসীরা এখানকার সমাজ ব্যবস্থায় নিজেকে অত্যন্ত নিরাপদ বিবেচনা করতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করে। সিঙ্গেল মা, তালাক বা বিচ্ছেদপ্রাপ্ত মহিলা ও সন্তানদের জন্য সরকারের বিভিন্ন রকম অতি আকর্ষণীয় অব্যাহত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নারীদেরকে অধিক নিরাপদ ভাবতেই দারুণভাবে সাহায্য করে। তদুপরি যে কোনো ধরনের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধে তাৎক্ষনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাসমুহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য বেশি সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিধায় নারীসমাজ এখানে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায়ই থাকে।

বিভিন্ন রকম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাসমুহের আড়ালে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে কিছু অভ্যন্তরীণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংঘাত যার চুড়ান্ত পরিণতিতে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, শিশুসন্তানরা বেড়ে উঠছে বন্ধনমুক্ত পারিবারিক পরিবেশে যা তাদেরকে পিতা-মাতা তথা পূর্ব পুরুষের পারিবারিক,ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আর এই ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধে একদিকে শিশুমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি সুখের সন্ধানে অভিবাসী হওয়া মানুষগুলোকেও আচ্ছন্ন করছে এক বিভীষিকাময় চরম হতাশায়, কখনো কখনো চরম মূল্য দিয়েও সমাধান রয়ে যাচ্ছে নাগালেরই বাহিরে।

প্রতিটি সমাজেরই রয়েছে কিছু নিজস্ব রীতি নীতি ও মূল্যবোধ। শিশুকাল থেকে মধ্যবয়স অবধি একরকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হওয়ার পর অভিবাসী জীবনে ভিন্ন রকম সমাজ-সংস্কৃতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানো মোটেও সহজসাধ্য বিষয় নয়। অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম বাদে পলিসিগত কারণে বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলকভাবে অতি মেধাবী, আকর্ষণীয় পদে চাকুরীরত, দক্ষ পেশাজীবি ছাড়া কানাডায় স্থায়ী অভিবাসনের কোন সুযোগ নেই। তাই সংগত কারনেই আকর্ষণীয় পদ-পদবী ও ব্যক্তিগত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শুভ প্রত্যাশা নিয়ে যারা অভিবাসী হয়েছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নিজেকে সেরকম স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন না, তাই এক ধরনের হারানোর বেদনায় প্রতিনিয়তই তারা দগ্ধ হন।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠা মানুষ। পরিবার সন্তানসন্ততি আর সংসারের ব্যয় নির্বাহে পুরুষ সদস্যদেরকে অভিবাসী জীবনেও অর্থনৈতিক দায়িত্বের চাপে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্তই থাকতে হয়। মানানসই সম্মানজনক চাকুরী না পেলেও শারিরীক ও মানসিক চাহিদাকে অবজ্ঞা করে প্রতিকূলতাকেই মেনে নিতে হয়। অপরদিকে বাঙালি সমাজে পরিবার, আত্নীয় স্বজন, শশুর শাশুড়ী, দেবর, ননদসহ কুল-বংশের চাপহীন অভিবাসী জীবনে নারীরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানেই থাকেন। নিঃসঙ্গতা পরিহারে চাকরিটা একটা উপায় হলেও মানসিক চাপে তারা বেশ সুবিধাই ভোগ করেন।

আবার অধিকার আদায়ে তারা সোচ্চার হলেও দায়িত্ব গ্রহণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমতা ভিত্তিক সমাজের নীতি-কৌশল মানতে রাজী নয়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ভুত সাংস্কৃতিক সংঘাতের পরিণতি দাঁড়ায় হয়তো বা বিবাহ বিচ্ছেদ অথবা পরিস্থিতির কাছে নিজের আত্মসমর্পণ।

তাহলে সুখের প্রত্যাশায় অভিবাসী জীবনের প্রশান্তি কোথায়? স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারে প্রশান্তি যেমন আছে, পরিবেশসম্মত, দূর্নীতিমুক্ত, দ্রুততম নাগরিক সেবায়ও প্রশান্তির কোন ঘাটতি নেই। অর্থনৈতিক দৈন্যতায় শিক্ষা জীবন আটকে যাবারও কোন সম্ভাবনা নেই। উচ্চ বেতনের পেশাজীবির সাথে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীর জীবন যাত্রায়ও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন তফাৎ নেই। তবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় পিতা- মাতারা অভিবাসী হন, সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য সেক্ষেত্রেও অনেক নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয়।

বাঙালি আর বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক, সেটি পিতা-মাতার নিয়ত প্রত্যাশা হলেও অধিকাংশ সময় ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠা পরবর্তী প্রজন্ম পিতা-মাতার সামাজিক সংস্কৃতির রীতিনীতিকে ধারণ করতে সক্ষম হয় না, পরিণতিতে তৈরি হয় ভয়াবহ এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ। যদিও বা নতুন প্রজন্ম উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে গড়ে উঠার সুযোগ পায়,তবুও পূর্ববর্তী প্রজন্মের সংগে পরবর্তী প্রজন্মের ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতির বৈপরীত্যের কারণে এক সময়ে আদরের সন্তানসন্ততি নিজ পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অভিবাসীদের জীবনের অনেক আকাঙ্খা পূরণ হলেও সামাজিক সাংস্কৃতিক রীতিনীতির বৈপরীত্যের কারণে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, অভিবাসী জীবনের এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনসহ নানা বাংলাদেশি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর পাশাপাশি সন্তানদের শিশুকাল থেকেই পারিবারিক বন্ধনের প্রতি আগ্রহী করে তোলার অন্য কোন বিকল্প নেই। কানাডার জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করতে না পারলে, যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অভিবাসী জীবনকে বেছে নিতে হয়েছিল, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় আদূরে এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হারিয়েই হয়তো বা একদিন অভিবাসী জীবনের নিষ্ঠুরতম পরিণতকেই বরণ করতে হবে।

মো. মাহমুদ হাসান
লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন