এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট নিশ্চিতে অভিবাসন বিষয়ে সাংবাদিকতার ভূমিকা
jugantor
এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট নিশ্চিতে অভিবাসন বিষয়ে সাংবাদিকতার ভূমিকা

  মাসুদ করিম  

১৬ জুলাই ২০২১, ১৯:১৯:৪৬  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি সাংবাদিকতা জীবনে বাংলাদেশিদের কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। বিদেশে বাংলাদেশিরা কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে যান। তারা তাদের সংসারে হাসি ফোটাতে যান। কিন্তু তাদের স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রে পূরণ হয় না।

তাদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। নির্যাতিত হচ্ছেন অনেকে। কেউবা ফিরছেন লাশ হয়ে। বাংলাদেশের কর্মীদের চিত্র যতটা ভয়াবহ আশপাশের দেশগুলোর চিত্র এতটা খারাপ না হলেও বঞ্চনার ধরনে মিল পাওয়া যায়। আমি আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) আয়োজিত এক কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। ঢাকার কাছে রাজেন্দ্রপুরে অনুষ্ঠিত ওই প্রশিক্ষণে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক অভিবাসন নিয়ে রিপোর্টিং করার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জায়গা চিহ্নিত করেন। তার প্রেজেন্টেশনে অনেক প্রশ্ন ছিল। অনেক কথা ছিল। আমাদের সাংবাদিকতায় কাজে লাগতে পারে।

বাংলাদেশের একজন পুরুষ কর্মী যার কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সৌদি আরব যাবার কথা তিনি কীভাবে ইতালি গিয়ে অবতরণ করলেন? তিনি কোন রুট ধরে গিয়েছেন? কারা তাকে এই জার্নিতে এভাবে যেতে সহায়তা করল? যে নারী দুবাইয়ের উদ্দেশে কলম্বো ত্যাগ করলেন; তিনি কীভাবে ভারতে এক যৌন দাসি হিসেবে পরিসমাপ্তি ঘটালেন? কী এক বন্ধন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আবদ্ধ করছে? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধান করতে হবে। এমন অনুসন্ধান একটা ভালো সংবাদ হতে পারে।

নারী কর্মীরা বিদেশে গিয়ে অহরহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শ্রীলঙ্কার ওই সাংবাদিক দারিদ্র্যের সঙ্গে অদক্ষতাকেও যুক্ত করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার এক নারী কর্মীর সৌদি আরবে শিরñেদের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেছেন। ২০১২ সালের ঘটনা। রিজানা নাফিক নামের ২২ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কার ওই গৃহকর্মীকে শিরñেদ করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনা শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। তারা বিষয়টাকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়। ওই কর্মীর ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় লক্ষ্যনীয়। প্রথমত তিনি ছিলেন অদক্ষ। বিদেশে গিয়ে কাজ করার জন্যে নারী কর্মীদের জন্য নির্ধারিত বয়সের চেয়ে তার বয়স কম ছিল।

ট্রাভেল ডকুমেন্টে মিথ্যা তথ্য ছিল। নিবন্ধন নেই এমন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার আইনি সুরক্ষার তেমন কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। কলম্বো মেয়েটির জীবন বাঁচাতে ব্লাড মানি দেবার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু যে পরিবারে খুনের দায়ে তার শিরñেদ ওই পরিবার তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। সৌদি আরবের আইনে খুনের শিকার পরিবার ক্ষমা না করলে মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য। তাই শিরñেদ । তিনি নিবন্ধিত ছিলেন না তাই শ্রীলঙ্কার কর্মীটি কোনো ক্ষতিপূরণ পেলেন না।

এমন অনেক অনাকাংখিত ঘটনা পরিহারে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং সঠিক পদ্ধতিতে নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। এমন নিয়োগকে বলা হচ্ছে এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট্ প্র্যাকটিস। অভিবাসী কর্মী সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক কিছু দলিল আছে। এগুলোর মধ্যে আছে, সকল অভিবাসী কর্মী এবং তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন (১৯৯০), কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অভিবাসন সংক্রান্ত কনভেনশন (সংশোধিত) কনভেনশন নম্বর ১০০ (১৯৫২), নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য বিলুপ্তির লক্ষ্যে কনভেনশন। এসব বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন জরুরি।

কর্মীর অভিবাসনের জায়গা খুব বৈষম্যমূলক। কারণ যেসব দেশ কর্মী নিয়োগ করে ওই সব দেশগুলো খুব ধনী। সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বেশি। এই সব দেশগুলির সঙ্গে কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর দরকষাকষির সক্ষমতা খুবই কম। এসব কারণে প্রেরণকারী দেশগুলো জোট বেঁধে আলোচনা শুরু করে। কলম্বো প্রসেস নামের এমন অলোচনা এক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। ২০০৩ সালে কলম্বো প্রসেস শুরু হয়। এতে শ্রমিক প্রেরণকারী ১১ দেশ অংশ নেয়। তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশ অন্তর্ভুক্ত।

কলম্বো প্রসেস হলো কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিষয়ে আঞ্চলিক আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়া। এশিয়ার প্রায় ২৫ লাখ কর্মী প্রতিবছর চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশ ত্যাগ করেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ কর্মী উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজের জন্য যান। এছাড়াও উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশীয় দেশগুলিতেও যান কেউ কেউ।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে থাকা এবং দক্ষ ও সেবা খাতের লোকের চাহিদা বাড়তে থাকায় মহামারির পরে ২০২২ সাল নাগাদ বিদেশে এশীয় কর্মীদের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সেখানে অভ্যন্তরীণ আইনসমূহ এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে করণীয় অনুধাবনের বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। এথিক্যাল রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভূমিকাও আলোচিত হয়।

কলম্বো প্রসেসের পর কর্মী গ্রহণকারী দেশগুলো আবুধাবি ডায়লগ করেছে। তারা কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর ইস্যু সমূহ আলোচনা করেছে। অনেকে মনে করেন, কলম্বো প্রসেসের কবর রচনা করতে আবুধাবি ডায়লগ করা হয়। পরবর্তিতে কর্মীদের সমস্যা দূর করতে গ্লোবার কম্প্যাক্ট নামের নতুন একটি বৈশ্বিক চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তি আইনগত বাধ্যতামূলক নয়। ফলে তার কার্যকারিতা তেমন নেই।

এথিক্যাল রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে মূল কয়েকটি বিষয় রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে যেখানে যে নিয়োগকারী সংস্থা কাজ করে সেখানে তাদের ওই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও ফিস নেয়া যাবে না। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কর্মীর বেতনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। চাকুরির নিরাপত্তা থাকতে হবে। রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি স্টাফ এবং তাদের দালালদের আচরণের একটা মান থাকতে হবে। কর্মীকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সবকিছু খোলাখুলিভাবে জানাতে হবে। রিক্রুটারগণ মনোপলি পেলে কর্মীদের বঞ্চনার সুযোগ সৃষ্টি করে।

স্পেনের জাতীয় পুলিশ ২০১৯ সালে ১১ জন বাংলাদেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করে যারা ৩৫০ জন অভিবাসীর কাছ থেকে তাদের স্পেনে পাচার করে দেয়ার চুক্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছিল। পুলিশ তাদের তল্লাশি করে ২০০ ভুয়া ডকুমেন্ট উদ্ধার করে। পাচারকারীরা বাংলাদেশ থেকে কর্মীদের নিয়ে নয়াদিল্লি যায়। সেখান থেকে আলজেরিয় ভিসার জন্য আবেদন করে। বাংলাদেশে ফিরে তারা আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়। পর্বতের ভেতর নিয়ে আলজেরিয়া-মরক্কো সীমান্ত অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত অপরাধীদের ভাড়া করা বাড়িতে কর্মীদের রাখা হয়। মরক্কোতে অপরাধীরা তাদের চক্রের বাড়িতে কর্মীদের পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেয় যাতে তারা ভ্রমণ করতে না পারেন। তারা কাঠের তৈরি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে প্রবেশ করে। তবে তাদের কাছে কোনো ডকুমেন্ট রাখেনি যাতে তাদের স্পেনের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে না পারে। স্পেনে তাদের অবস্থান বৈধ করতে নানা ধরনের ভুয়া কাগজপত্র জমা দেয়। এসব নিয়ে হইচই হয়।

বৈশ্বিক অভিবাসন ইস্যুতে আমরা অনেক কিছুই কাভার করতে পারি। গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার বিষয়ে আমরা প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারি। কর্মী নিয়োগের চুক্তিতে প্রতারণা নিয়ে স্টোরি করতে পারি। কর্মীদের বেতন না দেয়া কিংবা বেতন দিতে বিলম্ব নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। সেফ হাউস এবং সাধারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রতিবেদন করা যেতে পারে। কর্মীদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া নিয়ে প্রতিবেদন হতে পারে। নিয়োগকারীর নিষ্ঠুরতা নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। কর্মীকে যে চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে ওই চুক্তির লংঘন নিয়েও রিপোর্ট হতে পারে। প্রত্যেক দেশের নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতার ভিত্তিতে রিপোর্ট হতে পারে। আন্তঃদেশীয় সহযোগিতামূলক সাংবাদিকতার দল গঠন করা যায়। এছাড়াও মানবিক স্টোরি করা যায়।

আইওএমের কর্মশালায় শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকের প্রেজেন্টেশন আমার খুব ভালো লেগেছে।

লেখক : প্রধান প্রতিবেদক, যুগান্তর

এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট নিশ্চিতে অভিবাসন বিষয়ে সাংবাদিকতার ভূমিকা

 মাসুদ করিম 
১৬ জুলাই ২০২১, ০৭:১৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমি সাংবাদিকতা জীবনে বাংলাদেশিদের কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। বিদেশে বাংলাদেশিরা কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে যান। তারা তাদের সংসারে হাসি ফোটাতে যান। কিন্তু তাদের স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রে পূরণ হয় না।

তাদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। নির্যাতিত হচ্ছেন অনেকে। কেউবা ফিরছেন লাশ হয়ে। বাংলাদেশের কর্মীদের চিত্র যতটা ভয়াবহ আশপাশের দেশগুলোর চিত্র এতটা খারাপ না হলেও বঞ্চনার ধরনে মিল পাওয়া যায়। আমি আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) আয়োজিত এক কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। ঢাকার কাছে রাজেন্দ্রপুরে অনুষ্ঠিত ওই প্রশিক্ষণে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক অভিবাসন নিয়ে রিপোর্টিং করার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জায়গা চিহ্নিত করেন। তার প্রেজেন্টেশনে অনেক প্রশ্ন ছিল। অনেক কথা ছিল। আমাদের সাংবাদিকতায় কাজে লাগতে পারে।

বাংলাদেশের একজন পুরুষ কর্মী যার কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সৌদি আরব যাবার কথা তিনি কীভাবে ইতালি গিয়ে অবতরণ করলেন? তিনি কোন রুট ধরে গিয়েছেন? কারা তাকে এই জার্নিতে এভাবে যেতে সহায়তা করল? যে নারী দুবাইয়ের উদ্দেশে কলম্বো ত্যাগ করলেন; তিনি কীভাবে ভারতে এক যৌন দাসি হিসেবে পরিসমাপ্তি ঘটালেন? কী এক বন্ধন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আবদ্ধ করছে? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধান করতে হবে। এমন অনুসন্ধান একটা ভালো সংবাদ হতে পারে।

নারী কর্মীরা বিদেশে গিয়ে অহরহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শ্রীলঙ্কার ওই সাংবাদিক দারিদ্র্যের সঙ্গে অদক্ষতাকেও যুক্ত করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার এক নারী কর্মীর সৌদি আরবে শিরñেদের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেছেন। ২০১২ সালের ঘটনা। রিজানা নাফিক নামের ২২ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কার ওই গৃহকর্মীকে শিরñেদ করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনা শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। তারা বিষয়টাকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়। ওই কর্মীর ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় লক্ষ্যনীয়। প্রথমত তিনি ছিলেন অদক্ষ। বিদেশে গিয়ে কাজ করার জন্যে নারী কর্মীদের জন্য নির্ধারিত বয়সের চেয়ে তার বয়স কম ছিল।

ট্রাভেল ডকুমেন্টে মিথ্যা তথ্য ছিল। নিবন্ধন নেই এমন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার আইনি সুরক্ষার তেমন কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। কলম্বো মেয়েটির জীবন বাঁচাতে ব্লাড মানি দেবার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু যে পরিবারে খুনের দায়ে তার শিরñেদ ওই পরিবার তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। সৌদি আরবের আইনে খুনের শিকার পরিবার ক্ষমা না করলে মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য। তাই শিরñেদ । তিনি নিবন্ধিত ছিলেন না তাই শ্রীলঙ্কার কর্মীটি কোনো ক্ষতিপূরণ পেলেন না।

এমন অনেক অনাকাংখিত ঘটনা পরিহারে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং সঠিক পদ্ধতিতে নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। এমন নিয়োগকে বলা হচ্ছে এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট্ প্র্যাকটিস। অভিবাসী কর্মী সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক কিছু দলিল আছে। এগুলোর মধ্যে আছে, সকল অভিবাসী কর্মী এবং তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন (১৯৯০), কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অভিবাসন সংক্রান্ত কনভেনশন (সংশোধিত) কনভেনশন নম্বর ১০০ (১৯৫২), নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য বিলুপ্তির লক্ষ্যে কনভেনশন। এসব বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন জরুরি।

কর্মীর অভিবাসনের জায়গা খুব বৈষম্যমূলক। কারণ যেসব দেশ কর্মী নিয়োগ করে ওই সব দেশগুলো খুব ধনী। সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বেশি। এই সব দেশগুলির সঙ্গে কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর দরকষাকষির সক্ষমতা খুবই কম। এসব কারণে প্রেরণকারী দেশগুলো জোট বেঁধে আলোচনা শুরু করে। কলম্বো প্রসেস নামের এমন অলোচনা এক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। ২০০৩ সালে কলম্বো প্রসেস শুরু হয়। এতে শ্রমিক প্রেরণকারী ১১ দেশ অংশ নেয়। তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশ অন্তর্ভুক্ত।

কলম্বো প্রসেস হলো কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিষয়ে আঞ্চলিক আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়া। এশিয়ার প্রায় ২৫ লাখ কর্মী প্রতিবছর চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশ ত্যাগ করেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ কর্মী উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজের জন্য যান। এছাড়াও উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশীয় দেশগুলিতেও যান কেউ কেউ।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে থাকা এবং দক্ষ ও সেবা খাতের লোকের চাহিদা বাড়তে থাকায় মহামারির পরে ২০২২ সাল নাগাদ বিদেশে এশীয় কর্মীদের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সেখানে অভ্যন্তরীণ আইনসমূহ এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে করণীয় অনুধাবনের বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। এথিক্যাল রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভূমিকাও আলোচিত হয়।

কলম্বো প্রসেসের পর কর্মী গ্রহণকারী দেশগুলো আবুধাবি ডায়লগ করেছে। তারা কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলোর ইস্যু সমূহ আলোচনা করেছে। অনেকে মনে করেন, কলম্বো প্রসেসের কবর রচনা করতে আবুধাবি ডায়লগ করা হয়। পরবর্তিতে কর্মীদের সমস্যা দূর করতে গ্লোবার কম্প্যাক্ট নামের নতুন একটি বৈশ্বিক চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তি আইনগত বাধ্যতামূলক নয়। ফলে তার কার্যকারিতা তেমন নেই।

এথিক্যাল রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে মূল কয়েকটি বিষয় রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে যেখানে যে নিয়োগকারী সংস্থা কাজ করে সেখানে তাদের ওই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও ফিস নেয়া যাবে না। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কর্মীর বেতনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। চাকুরির নিরাপত্তা থাকতে হবে। রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি স্টাফ এবং তাদের দালালদের আচরণের একটা মান থাকতে হবে। কর্মীকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সবকিছু খোলাখুলিভাবে জানাতে হবে। রিক্রুটারগণ মনোপলি পেলে কর্মীদের বঞ্চনার সুযোগ সৃষ্টি করে।

স্পেনের জাতীয় পুলিশ ২০১৯ সালে ১১ জন বাংলাদেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করে যারা ৩৫০ জন অভিবাসীর কাছ থেকে তাদের স্পেনে পাচার করে দেয়ার চুক্তিতে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছিল। পুলিশ তাদের তল্লাশি করে ২০০ ভুয়া ডকুমেন্ট উদ্ধার করে। পাচারকারীরা বাংলাদেশ থেকে কর্মীদের নিয়ে নয়াদিল্লি যায়। সেখান থেকে আলজেরিয় ভিসার জন্য আবেদন করে। বাংলাদেশে ফিরে তারা আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়। পর্বতের ভেতর নিয়ে আলজেরিয়া-মরক্কো সীমান্ত অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত অপরাধীদের ভাড়া করা বাড়িতে কর্মীদের রাখা হয়। মরক্কোতে অপরাধীরা তাদের চক্রের বাড়িতে কর্মীদের পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেয় যাতে তারা ভ্রমণ করতে না পারেন। তারা কাঠের তৈরি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে প্রবেশ করে। তবে তাদের কাছে কোনো ডকুমেন্ট রাখেনি যাতে তাদের স্পেনের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে না পারে। স্পেনে তাদের অবস্থান বৈধ করতে নানা ধরনের ভুয়া কাগজপত্র জমা দেয়। এসব নিয়ে হইচই হয়।

বৈশ্বিক অভিবাসন ইস্যুতে আমরা অনেক কিছুই কাভার করতে পারি। গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার বিষয়ে আমরা প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারি। কর্মী নিয়োগের চুক্তিতে প্রতারণা নিয়ে স্টোরি করতে পারি। কর্মীদের বেতন না দেয়া কিংবা বেতন দিতে বিলম্ব নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। সেফ হাউস এবং সাধারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রতিবেদন করা যেতে পারে। কর্মীদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া নিয়ে প্রতিবেদন হতে পারে। নিয়োগকারীর নিষ্ঠুরতা নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে রিপোর্ট হতে পারে। কর্মীকে যে চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে ওই চুক্তির লংঘন নিয়েও রিপোর্ট হতে পারে। প্রত্যেক দেশের নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতার ভিত্তিতে রিপোর্ট হতে পারে। আন্তঃদেশীয় সহযোগিতামূলক সাংবাদিকতার দল গঠন করা যায়। এছাড়াও মানবিক স্টোরি করা যায়।

আইওএমের কর্মশালায় শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকের প্রেজেন্টেশন আমার খুব ভালো লেগেছে।

লেখক : প্রধান প্রতিবেদক, যুগান্তর
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন