অর্থনৈতিক অঞ্চল: প্রসঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার
jugantor
অর্থনৈতিক অঞ্চল: প্রসঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার

  শেখ মনোয়ার হোসেন  

০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:৩৭:৩৩  |  অনলাইন সংস্করণ

যেকোনো প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করে বাংলাদেশ বিগত এক দশক থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের প্রমাণ রেখেছে তা এককথায় নজিরবিহীন। বলাই বাহুল্য যে, এই অগ্রগতির পেছনের চালিকাশক্তি হচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এদেশের আপামর জনগণের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠিত হয়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলো ইতোমধ্যেই উৎপাদন ও আমদানি রপ্তানি শুরু করে দিয়েছে। অনেকগুলো খুব শীঘ্রই উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করবে। আধুনিক বিশ্বে পণ্যের চাহিদার গুরুত্ব তার সহজলভ্যতার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। পণ্যের সহজলভ্যতা নির্ভর করে যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈচিত্রের উপর। অর্থাৎ যোগাযোগ তথা পণ্য পরিবহণের একাধিক বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা থাকলে তবেই তা ভোক্তা পর্যায়ে সর্বাপেক্ষা কম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব। প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক বিপণন ব্যবস্থাপনায় এই কারণেই যাতায়াত ব্যবস্থাকে এত বেশি গুরত্ব এবং মূল্যায়ন করা হয়।

আমাদের পণ্য রপ্তানির প্রধানতম উপায় হল নৌপথ। নৌপথের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, মংলা ও পায়রা বন্দরই এখন পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি ও আমদানির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে পোশাক রপ্তানিতে একমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরই এখন পর্যন্ত এককভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পণ্য জাহাজীকরণের পর সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী গন্তব্যে পৌঁছাতে নির্ধারিত সময় প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে কাভার্ড ভ্যানে চট্টগ্রাম বন্দরে সড়কপথে পণ্য পৌঁছাতে যানজট ও রাস্তার অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অস্বাভাবিক রকম অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। ফলে দেখা যায় যে, পণ্য শিপমেন্ট হতে হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও মূলের উঠানামা তৈরি হয়ে যায়। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন সড়ক তৈরি হওয়ার পর যানজট বহুল পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম সময়ে পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে পারছে - একথা অনস্বীকার্য। তবে একযোগে যখন শতাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হয়ে যাবে তখন বন্দর পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে আবার সেই যানজটের চিরাচরিতর দৃশ্যের অবতারণা হবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে রপ্তানিযোগ্য পণ্য ‘টাইম-বাউন্ড’ পরিবহণের অন্যবিধ বিকল্প পন্থা তৈরির এখনই উপযুক্ত সময়। এই বিষয়ে কালক্ষেপণ হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা সমূহের মধ্যে অন্যতম প্রতিবন্ধক। সে ক্ষেত্রে রেলপথ এবং নদীপথ কে দ্রুত বিবেচনার মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের সিঙ্গেল লাইন রেলপথকে ডাবল লাইন করা এখন সময়ের দাবি। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন করে বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনৈতিক দেশের সারিতে উত্তরণের জন্য যাতায়াত তথা যোগাযোগ ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। হিসাব করে দেখা যায় যে, চারটি কাভার্ডভ্যানের পরিবহণযোগ্য মোট পণ্যসামগ্রী শুধু মাত্র একটি কন্টেইনারে সংকুলান করা যায়। এই হিসাবে প্রতিটি রেল ট্রিপে যদি পঞ্চাশটি কনটেইনার পরিবহন করা যায় তাহলে প্রায় দুইশটি কাভার্ডভ্যানের সমান পণ্য অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব। এতে করে আর্থিক সামাজিক এবং পরিবেশগতভাবে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। কেননা, বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসসহ সড়কপথের অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব, যানজট হ্রাস ও পরিবেশের দূষণের হারও এর ফলে অনেকাংশে কমে যাবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, কনটেইনার হ্যান্ডলিং কিংবা তাদের মালিকপক্ষ পোর্টের বাইরে অর্থাৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যেই আইসিডি করে সেখানে কাস্টমসের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে সরাসরি জাহাজিকরনের ব্যবস্থা করতে পারলেই উল্লেখিত সুফল ভোগ করা যাবে।


এবার আসি নদীর কথায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশ। নদী এদেশের মানচিত্রে জালের মতো বিস্তৃত। বিগত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত নদীই ছিল আমাদের আর্থসামাজিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কালের পরিক্রমায় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক জীবন থেকে নদীও ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। এই নদীর পুনরুজ্জীবন এখন আবার অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- আমাদের অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহে, এমনকি মানবিক বোধ ও মনোজাগতিক বিকাশের ক্ষেত্রেও। তার কারণ, যান্ত্রিকতা জীবনকে বেগবান করলেও আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে আবেগ। ফলে মমতাহীন যে রোবটিক সময় আমরা পার করছি তা যদি চলতে থাকে তাহলে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মিছিলে পরিণত হবে আগামী দিনের পৃথিবী। মূলত আমরা কেউই মনপ্রাণে তা চাই না।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের অদূর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যের দিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার একের পর এক সমুদ্র বন্দর স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রাম, মংলা এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে পতঙ্গা বে-টার্মিনাল।

কিন্তু কথা হচ্ছে, পণ্য রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সি-পোর্ট এবং বে-টার্মিনাল থাকাই কী যথেষ্ট? নিশ্চয়ই নয়। সময়মতো বন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পৌঁছানোর জন্য বহুমাত্রিক ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেখা যাবে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সড়ক নির্ভর একেন্দ্রিক সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বন্দরমুখী হাজার হাজার ট্রাক, লরী, কাভার্ডভ্যান ইত্যাদির তালবেতাল জট সৃষ্টি হয়ে আদতে শিপমেন্টের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নদীর মতো উত্তম দ্বিতীয় কোনো পরিবহণ বান্ধব ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। নদীপথে সমুদ্রগামী জাহাজের বন্দরে পণ্য পরিবহণের আরও কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধাও রয়েছে। এখানে সড়ক ও রেলপথের ন্যায় পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপের প্রয়োজন নেই। ফ্যাক্টরি থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য লোডিং এর পর সমুদ্র বন্দরের মাদার ভেসেলে সরাসরি আনলোডিং করা হলে সময় এবং পরিবহণ খরচ দু’টোই সাশ্রয় হবে। এজন্য আমাদের নদীসমূহকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যথাযথ নাব্যতাসহ আনুষঙ্গিক রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ সিরাজগঞ্জ ইকোনোমিক জোনসহ সরকারি, বেসরকারি, জি টু জি পর্যায়ে অনেকগুলো ইকোনোমিক জোন বিভিন্ন নদী তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নদী তীরবর্তী এসকল ইকোনোমিক জোনে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী নদী পথে সরাসরি জাহাজীকরণের করা গেলে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সুস্থির ও সুশৃঙ্খল হবে-একথা বলতেই পারি। সর্বোপরি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্মপ্রবাহকে সহজীকরণের জন্য বিশ্বমানের বহুমুখী আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

লেখক:
উদ্যোক্তা ও পরিচালক, সিরাজগঞ্জ ইকনোমিক জোন,
সিনেট সদস্য জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়

অর্থনৈতিক অঞ্চল: প্রসঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার

 শেখ মনোয়ার হোসেন 
০৬ আগস্ট ২০২১, ১২:৩৭ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যেকোনো প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করে বাংলাদেশ বিগত এক দশক থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের প্রমাণ রেখেছে তা এককথায় নজিরবিহীন। বলাই বাহুল্য যে, এই অগ্রগতির পেছনের চালিকাশক্তি হচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এদেশের আপামর জনগণের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা। 

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠিত হয়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলো ইতোমধ্যেই উৎপাদন ও আমদানি রপ্তানি শুরু করে দিয়েছে। অনেকগুলো খুব শীঘ্রই উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করবে। আধুনিক বিশ্বে পণ্যের চাহিদার গুরুত্ব তার সহজলভ্যতার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। পণ্যের সহজলভ্যতা নির্ভর করে যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈচিত্রের উপর। অর্থাৎ যোগাযোগ তথা পণ্য পরিবহণের একাধিক বিকল্প  যাতায়াত ব্যবস্থা থাকলে তবেই তা ভোক্তা পর্যায়ে সর্বাপেক্ষা কম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব। প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক বিপণন ব্যবস্থাপনায় এই কারণেই যাতায়াত ব্যবস্থাকে এত বেশি গুরত্ব এবং মূল্যায়ন করা হয়। 

আমাদের পণ্য রপ্তানির প্রধানতম উপায় হল নৌপথ। নৌপথের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, মংলা ও পায়রা বন্দরই এখন পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি ও আমদানির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে পোশাক রপ্তানিতে একমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরই এখন পর্যন্ত এককভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পণ্য জাহাজীকরণের পর সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী গন্তব্যে পৌঁছাতে নির্ধারিত সময় প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে কাভার্ড ভ্যানে চট্টগ্রাম বন্দরে সড়কপথে পণ্য পৌঁছাতে যানজট ও রাস্তার অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অস্বাভাবিক রকম অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। ফলে দেখা যায় যে, পণ্য শিপমেন্ট হতে হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও মূলের উঠানামা তৈরি হয়ে যায়। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন সড়ক তৈরি হওয়ার পর যানজট বহুল পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কম সময়ে পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে পারছে - একথা অনস্বীকার্য। তবে একযোগে যখন শতাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হয়ে যাবে তখন বন্দর পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে আবার সেই যানজটের চিরাচরিতর দৃশ্যের অবতারণা হবে।
 
অর্থনৈতিক অঞ্চলে রপ্তানিযোগ্য পণ্য ‘টাইম-বাউন্ড’ পরিবহণের অন্যবিধ বিকল্প পন্থা তৈরির এখনই উপযুক্ত সময়। এই বিষয়ে কালক্ষেপণ হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা সমূহের মধ্যে অন্যতম প্রতিবন্ধক। সে ক্ষেত্রে রেলপথ এবং নদীপথ কে দ্রুত বিবেচনার মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের সিঙ্গেল লাইন রেলপথকে ডাবল লাইন করা এখন সময়ের দাবি। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন করে বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনৈতিক দেশের সারিতে উত্তরণের জন্য যাতায়াত তথা যোগাযোগ ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। হিসাব করে দেখা যায় যে, চারটি কাভার্ডভ্যানের পরিবহণযোগ্য মোট পণ্যসামগ্রী শুধু মাত্র একটি কন্টেইনারে সংকুলান করা যায়। এই হিসাবে প্রতিটি রেল ট্রিপে যদি পঞ্চাশটি কনটেইনার পরিবহন করা যায় তাহলে প্রায় দুইশটি কাভার্ডভ্যানের সমান পণ্য অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব। এতে করে আর্থিক সামাজিক এবং পরিবেশগতভাবে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। কেননা, বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসসহ সড়কপথের অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব, যানজট হ্রাস ও পরিবেশের দূষণের হারও এর ফলে অনেকাংশে কমে যাবে। 

এখানে উল্লেখ্য যে, কনটেইনার হ্যান্ডলিং কিংবা তাদের মালিকপক্ষ পোর্টের বাইরে অর্থাৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যেই আইসিডি করে সেখানে কাস্টমসের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে সরাসরি জাহাজিকরনের ব্যবস্থা করতে পারলেই উল্লেখিত সুফল ভোগ করা যাবে।


এবার আসি নদীর কথায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশ। নদী এদেশের মানচিত্রে জালের মতো বিস্তৃত। বিগত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত নদীই ছিল আমাদের আর্থসামাজিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কালের পরিক্রমায় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক জীবন থেকে নদীও ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। এই নদীর পুনরুজ্জীবন এখন আবার অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- আমাদের অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহে, এমনকি মানবিক বোধ ও মনোজাগতিক বিকাশের ক্ষেত্রেও। তার কারণ, যান্ত্রিকতা জীবনকে বেগবান করলেও আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে আবেগ। ফলে মমতাহীন যে রোবটিক সময় আমরা পার করছি তা যদি চলতে থাকে তাহলে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মিছিলে পরিণত হবে আগামী দিনের পৃথিবী। মূলত আমরা কেউই মনপ্রাণে তা চাই না। 
 
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের অদূর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যের দিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার একের পর এক সমুদ্র বন্দর স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রাম, মংলা এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে পতঙ্গা বে-টার্মিনাল। 

কিন্তু কথা হচ্ছে, পণ্য রপ্তানির জন্য  পর্যাপ্ত সংখ্যক সি-পোর্ট এবং বে-টার্মিনাল থাকাই কী যথেষ্ট? নিশ্চয়ই নয়। সময়মতো বন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পৌঁছানোর জন্য বহুমাত্রিক ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেখা যাবে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সড়ক নির্ভর একেন্দ্রিক সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বন্দরমুখী হাজার হাজার ট্রাক, লরী, কাভার্ডভ্যান ইত্যাদির তালবেতাল জট সৃষ্টি হয়ে আদতে শিপমেন্টের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব তৈরি করছে।

 এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নদীর মতো উত্তম দ্বিতীয় কোনো পরিবহণ বান্ধব ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। নদীপথে সমুদ্রগামী জাহাজের বন্দরে পণ্য পরিবহণের আরও কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধাও রয়েছে। এখানে সড়ক ও রেলপথের ন্যায় পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে একাধিক ধাপের প্রয়োজন নেই। ফ্যাক্টরি থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য লোডিং এর পর সমুদ্র বন্দরের মাদার ভেসেলে সরাসরি আনলোডিং করা  হলে সময় এবং পরিবহণ খরচ দু’টোই সাশ্রয় হবে। এজন্য আমাদের নদীসমূহকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যথাযথ নাব্যতাসহ আনুষঙ্গিক রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ সিরাজগঞ্জ ইকোনোমিক জোনসহ সরকারি, বেসরকারি, জি টু জি পর্যায়ে অনেকগুলো ইকোনোমিক জোন বিভিন্ন নদী তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নদী তীরবর্তী এসকল ইকোনোমিক জোনে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী নদী পথে সরাসরি জাহাজীকরণের করা গেলে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সুস্থির ও সুশৃঙ্খল হবে-একথা বলতেই পারি। সর্বোপরি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্মপ্রবাহকে সহজীকরণের জন্য বিশ্বমানের বহুমুখী আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

লেখক: 
উদ্যোক্তা ও পরিচালক, সিরাজগঞ্জ ইকনোমিক  জোন,
সিনেট সদস্য জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন