সময় পরাজিত হলেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ হারেনি
jugantor
সময় পরাজিত হলেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ হারেনি

  প্রতীক মাহমুদ  

১৫ আগস্ট ২০২১, ১৬:৩৪:০৮  |  অনলাইন সংস্করণ

ইতিহাস কখনো কখনো বাঁক নিতে গিয়ে থেমে যায়। কখনোবা সোজা যেতে যেতে বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে পারে না। সময়ের খোপে খোপে কেউ কেউ বারুদ জ্বালিয়ে সংগ্রাম শানিয়ে তোলে। সেই সংগ্রাম কখনো কখনো সফল আবার কখনও বিফল হয়। তবে যারা সংগ্রাম শানিয়ে তোলে তারা একেকজন ইতিহাসের সন্তান।

এই বাংলায়ও কালে কালে ইতিহাসের অনেক সন্তান এসেছেন। বাংলায় এসেছেন ক্ষুদিরাম-তিতুমীর-সুভাষ-সূর্যসেন। এসেছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত। এরা ইতিহাসের পরতে পরতে বাংলাকে মুক্ত করার সংগ্রাম শানিয়ে গেছেন।

কারও কারও লেখনিতে উঠে এসেছে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। কারও কারও কথায় জেগেছে আন্দোলন। তবে সংগ্রাম শানিয়ে তুলে সেটাকে পূর্ণতা দিয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ দুটো আলাদা নাম হলেও ইতিহাস কিন্তু একটিই। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক, এক ও অভিন্ন। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় তিনিই অবিসংবাদিত মহানায়ক, রাজনীতির মহাকবি। তিনি যুক্ত ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, ভূমিকা রেখেছেন চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠনে, আটান্নর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার হাত দিয়ে আসে ছেষট্টির ছয় দফা। গ্রেফতার হন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়। সেই মামলার জন্য বাঙালি নামে রাজপথে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে মামলা থেকে অব্যাহতি পান শেখ মুজিব। এর পর সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে তার দল আওয়ামী লীগ। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো দমে যাওয়ার পাত্র নন। তারই নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আর এই আন্দোলন যাত্রা করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে। তিনি এক পর্যায়ে নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি পায় স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড, যে স্বাধীনতার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে বাঙালিকে দেখিয়ে আসছিলেন।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলির অধিকারী না হলে কেউ সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না। এক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর ছিল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দূরদর্শিতা। আর এ জন্যই ভারতবর্ষ ভাগের পর থেকেই তিনি বাঙালির জন্য স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখছিলেন। কর্মনিষ্ঠা, ধৈর্য, সংগ্রামী চেতনা, আপসহীনতা আর অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন যুগস্রষ্টা নেতা।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে বাঙালির নবজাগরণের মহানায়ক। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রাণপুরুষ তিনি। তার নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই বিশ্ব দরবারে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচন হয়। এই মহানায়ক নিজেকে গড়েছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির পরিপূরক করে। ঐতিহ্যের চলমান ধারায় রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সন্তান। এ জন্যই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের চেতনার ভেতর। তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার কাছে মূলমন্ত্র ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদে মানুষকে দীক্ষা দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধুই আমাদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন একটি শব্দ ও চেতনার সঙ্গে। সেটি হলো ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। অর্থাৎ সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন রাষ্ট্রগঠন। তবে সেই রাষ্ট্রগঠনে প্রাধান্য পায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন। তার নেতৃত্বে একটি যৌক্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন শানিয়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড। এখানে তিনি সব ধর্মের মানুষকে একটি তত্ত্ব অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এক পতাকাতলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে শাসিত ও শোষিত বাঙালিকে মুক্ত করার একমাত্র ও প্রধান হাতিয়ার হলো সব ধর্মের মানুষকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা। কারণ এরা একই নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। যদিও তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মনস্তাত্তিক দিকটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলন। বুঝতে পেরেছিলেন মাটির উপরে ভিন্ন ভিন্ন শাখা-প্রশাখা বা গাছে পরিচিত হলেও বাঙালির শিকর মূলত এক জায়গায় প্রোথিত। তাই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ডাক দেওয়ার সাহস পেয়েছিলেন। আর এই সাহসের কারণেই একই সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। বলতে গেলে সাংস্কৃতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্বের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ইতিহাস মানেই অতীত। তা অনেকটাই দূর এবং অপ্রত্যক্ষ। তাই ইতিহাসের কিংবদন্তিদের জীবনের সঙ্গে অন্যকালের মানুষের আবেগময় যোগ উপলদ্ধি করানো বেশ কঠিন। কিন্তু বাংলার কিংবদন্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। তার জীবনের সঙ্গে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে আবেগময় যোগ উপলব্ধি আছে তা অনন্তকাল থেকে যাবে। কারণ বাঙালি মানেই বঙ্গবন্ধু, স্বাধীন-সার্বভৌম এই ব-দ্বীপের মুক্তির নায়ক বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নাম বঙ্গবন্ধু, একটি জাতিরাষ্ট্রের ধমনীতে যে ন্যায্য সংগ্রামের স্রোত বয়ে যায় সবসময়- তার নামও বঙ্গবন্ধু।
শেখ মুজিব একটি নামের পাশাপাশি একজন মানুষও। তারও দেহ ছিল। ছিল সুস্থতা-অসুস্থতা, আত্মজন, বৃদ্ধ পিতা-মাতা, অবোধ সন্তান। কিন্তু এগুলোকে পাশ কাটিয়ে তিনি কেবল দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে গেছেন। আর তাই তিনি বাংলাদেশের দুর্জয় সংগ্রাম ও সাহসের প্রতীক। যে প্রতীক ব্যক্তি শেখ মুজিবকে অতিক্রম করে গেছে। এই প্রতীক ১৯৭১ সালে বাংলার শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, বন্দি, মুক্ত সব মানুষের কাছে পবিত্র আশা ও স্বপ্নের রূপ হয়ে ধরা দিয়েছিল।

অধিকার থেকে স্বাধিকার- সব জায়গায়ই ছিল বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সংগ্রামী উচ্চারণ। আর এ জন্যই তিনি ঘোষণা দিয়ে বসলেন পূর্ব পাকিস্তানে শতভাগ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। নামতো উনি দিয়েই দিলেন। এবার সেই নামে একটি স্বাধীন জাতিসত্তার তিলক এঁকে দিতে দিলেন যুদ্ধের ডাক। মুক্তিকামী বাঙালি যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনল স্বাধীনতা ও অধিকার।

নেতৃত্ব মানেই জনআকাঙ্ক্ষার অভীপ্সা বুঝতে পারা। সেই অভীপ্সা বুঝতে পেরে মানুষের জন্য স্বপ্ন রচনা করা এবং জনগণকে সেই স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম করে নেওয়া। এর মধ্য দিয়েই একজন নেতা হয়ে ওঠেন জনতালগ্ন। নেতার জনতালগ্নতা মানেই জনগণ ও নিজের স্বপ্ন একাকার হয়ে যাওয়া। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনতালগ্ন নন্দিত নেতা। আর জন্যই তিনি জনগণের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করেননি।

ইতিহাসে তিনিই অমর হয়ে ওঠেন যিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। ইতিহাস তারই পক্ষে যায়, যিনি সময়ের বিচারে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক। এই ইতিহাস কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তৈরি করেনি। বরং তিনি বাঙালির ইতিহাসের নির্মাতা। ইতিহাসকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন হাতের করতলে।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ওপর অধিকারের চাপ। সেটা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই তৈরি করেছিলেন। সেদিন শোষণ ও শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির নেশা তৈরি হয়েছিল সাতকোটি বাঙালির। একদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের তাক করা অস্ত্র, আরেক দিকে সাত কোটি বাঙালির রক্তমাখা চোখ। সেই রক্তমাখা চোখ চেয়েছিল তাদের মহানায়কের দিকে। মহানায়ক উচ্চারণ করলেন একটি শব্দ ‘স্বাধীনতা’। মুক্তি ও স্বাধীনতা তখন বাঙালি জাতির জন্য অনিবার্য। বাঙালির আন্দোলন টগবগ করে ফুটতে থাকল। শেখ মুজিব নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, বলতে গেলে ১৯৭১ সালের পুরো মার্চ তার নির্দেশই হয়ে ওঠে সরকারি নির্দেশ। মানুষ সেই নির্দেশ মানতে থাকে। এমনকি সরকারি প্রশাসনও। বঙ্গবন্ধু এই নির্দেশ দেওয়ার অমিত তেজ, আস্থা ও প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে।

বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতা যতটা রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক, মুক্তি ততটাই অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। বাঙালি ৪৭-এ দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে অপরিকল্পিত ভৌগলিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে তথাকথিত স্বাধীনতা পেলেও মুক্তি পায়নি। তারা তাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চাইলেন বাঙালির মুক্তি, যা একটি জাতির স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে। মুক্তি মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সবধরনের শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি। একটি প্রকৃত স্বাধীন দেশই পূরণ করতে পারে এইসব মুক্তির প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধু তাই ঘোষণা করলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালি সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জীবন বাজি রেখে অনিবার্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি পেল স্বাধীন ভূখণ্ড ও সার্বভৌম অধিকার। বঙ্গবন্ধু একটি চেতনা, বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন। মহানায়কের এই দর্শনের মধ্য দিয়েই আসে বাংলাদেশের অনিবার্য মুক্তি ও স্বাধীনতা।
কিন্তু এই মুক্তি ও স্বাধীনতা বেশিদিন ভোগ করতে পারেনি বাংলার আপামর মানুষ।

৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেই হত্যা কেবল মুজিবকে নয়, পুরো বাঙালিকে জাতিকে করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির কলঙ্কিত এক ট্রাজেডির জন্ম দেয় বিপথগামী কিছু বাঙালিই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা মানেই বাঙালির ইতিহাসের ট্রাজিক পরিণতি। যে পরিণতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি অনেক বছর পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনাই শেষ পর্যন্ত আমাদের পথে ফিরিয়েছে। সময় পরাজিত হলেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশহারেনি।

লেখক: সাংবাদিক

সময় পরাজিত হলেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ হারেনি

 প্রতীক মাহমুদ 
১৫ আগস্ট ২০২১, ০৪:৩৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ইতিহাস কখনো কখনো বাঁক নিতে গিয়ে থেমে যায়। কখনোবা সোজা যেতে যেতে বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে পারে না। সময়ের খোপে খোপে কেউ কেউ বারুদ জ্বালিয়ে সংগ্রাম শানিয়ে তোলে। সেই সংগ্রাম কখনো কখনো সফল আবার কখনও বিফল হয়। তবে যারা সংগ্রাম শানিয়ে তোলে তারা একেকজন ইতিহাসের সন্তান। 

এই বাংলায়ও কালে কালে ইতিহাসের অনেক সন্তান এসেছেন। বাংলায় এসেছেন ক্ষুদিরাম-তিতুমীর-সুভাষ-সূর্যসেন। এসেছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত। এরা ইতিহাসের পরতে পরতে বাংলাকে মুক্ত করার সংগ্রাম শানিয়ে গেছেন। 

কারও কারও লেখনিতে উঠে এসেছে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। কারও কারও কথায় জেগেছে আন্দোলন। তবে সংগ্রাম শানিয়ে তুলে সেটাকে পূর্ণতা দিয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ দুটো আলাদা নাম হলেও ইতিহাস কিন্তু একটিই। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক, এক ও অভিন্ন। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় তিনিই অবিসংবাদিত মহানায়ক, রাজনীতির মহাকবি। তিনি যুক্ত ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, ভূমিকা রেখেছেন চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠনে, আটান্নর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার হাত দিয়ে আসে ছেষট্টির ছয় দফা। গ্রেফতার হন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়। সেই মামলার জন্য বাঙালি নামে রাজপথে। 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে মামলা থেকে অব্যাহতি পান শেখ মুজিব। এর পর সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে তার দল আওয়ামী লীগ। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো দমে যাওয়ার পাত্র নন। তারই নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আর এই আন্দোলন যাত্রা করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে। তিনি এক পর্যায়ে নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি পায় স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড, যে স্বাধীনতার  স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে বাঙালিকে দেখিয়ে আসছিলেন।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলির অধিকারী না হলে কেউ সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না। এক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর ছিল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দূরদর্শিতা। আর এ জন্যই ভারতবর্ষ ভাগের পর থেকেই তিনি বাঙালির জন্য স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখছিলেন। কর্মনিষ্ঠা, ধৈর্য, সংগ্রামী চেতনা, আপসহীনতা আর অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন যুগস্রষ্টা নেতা। 

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে বাঙালির নবজাগরণের মহানায়ক। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রাণপুরুষ তিনি। তার নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই বিশ্ব দরবারে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচন হয়। এই মহানায়ক নিজেকে গড়েছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির পরিপূরক করে। ঐতিহ্যের চলমান ধারায় রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সন্তান। এ জন্যই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের চেতনার ভেতর। তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার কাছে মূলমন্ত্র ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদে মানুষকে দীক্ষা দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধুই আমাদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন একটি শব্দ ও চেতনার সঙ্গে। সেটি হলো ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। অর্থাৎ সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন রাষ্ট্রগঠন। তবে সেই রাষ্ট্রগঠনে প্রাধান্য পায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন। তার নেতৃত্বে একটি যৌক্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন শানিয়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড। এখানে তিনি সব ধর্মের মানুষকে একটি তত্ত্ব অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এক পতাকাতলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে শাসিত ও শোষিত বাঙালিকে মুক্ত করার একমাত্র ও প্রধান হাতিয়ার হলো সব ধর্মের মানুষকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা। কারণ এরা একই নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। যদিও তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মনস্তাত্তিক দিকটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলন। বুঝতে পেরেছিলেন মাটির উপরে ভিন্ন ভিন্ন শাখা-প্রশাখা বা গাছে পরিচিত হলেও বাঙালির শিকর মূলত এক জায়গায় প্রোথিত। তাই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ডাক দেওয়ার সাহস পেয়েছিলেন। আর এই সাহসের কারণেই একই সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। বলতে গেলে সাংস্কৃতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্বের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

ইতিহাস মানেই অতীত। তা অনেকটাই দূর এবং অপ্রত্যক্ষ। তাই ইতিহাসের কিংবদন্তিদের জীবনের সঙ্গে অন্যকালের মানুষের আবেগময় যোগ উপলদ্ধি করানো বেশ কঠিন। কিন্তু বাংলার কিংবদন্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। তার জীবনের সঙ্গে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে আবেগময় যোগ উপলব্ধি আছে তা অনন্তকাল থেকে যাবে। কারণ বাঙালি মানেই বঙ্গবন্ধু, স্বাধীন-সার্বভৌম এই ব-দ্বীপের মুক্তির নায়ক বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নাম বঙ্গবন্ধু, একটি জাতিরাষ্ট্রের ধমনীতে যে ন্যায্য সংগ্রামের স্রোত বয়ে যায় সবসময়- তার নামও বঙ্গবন্ধু।
শেখ মুজিব একটি নামের পাশাপাশি একজন মানুষও। তারও দেহ ছিল। ছিল সুস্থতা-অসুস্থতা, আত্মজন, বৃদ্ধ পিতা-মাতা, অবোধ সন্তান। কিন্তু এগুলোকে পাশ কাটিয়ে তিনি কেবল দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে গেছেন। আর তাই তিনি বাংলাদেশের দুর্জয় সংগ্রাম ও সাহসের প্রতীক। যে প্রতীক ব্যক্তি শেখ মুজিবকে অতিক্রম করে গেছে। এই প্রতীক ১৯৭১ সালে বাংলার শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, বন্দি, মুক্ত সব মানুষের কাছে পবিত্র আশা ও স্বপ্নের রূপ হয়ে ধরা দিয়েছিল।

অধিকার থেকে স্বাধিকার- সব জায়গায়ই ছিল বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সংগ্রামী উচ্চারণ। আর এ জন্যই তিনি ঘোষণা দিয়ে বসলেন পূর্ব পাকিস্তানে শতভাগ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। নামতো উনি দিয়েই দিলেন। এবার সেই নামে একটি স্বাধীন জাতিসত্তার তিলক এঁকে দিতে দিলেন যুদ্ধের ডাক। মুক্তিকামী বাঙালি যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনল স্বাধীনতা ও অধিকার। 

নেতৃত্ব মানেই জনআকাঙ্ক্ষার অভীপ্সা বুঝতে পারা। সেই অভীপ্সা বুঝতে পেরে মানুষের জন্য স্বপ্ন রচনা করা এবং জনগণকে সেই স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম করে নেওয়া। এর মধ্য দিয়েই একজন নেতা হয়ে ওঠেন জনতালগ্ন। নেতার জনতালগ্নতা মানেই জনগণ ও নিজের স্বপ্ন একাকার হয়ে যাওয়া। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনতালগ্ন নন্দিত নেতা। আর জন্যই তিনি জনগণের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করেননি।

ইতিহাসে তিনিই অমর হয়ে ওঠেন যিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। ইতিহাস তারই পক্ষে যায়, যিনি সময়ের বিচারে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক। এই ইতিহাস কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তৈরি করেনি। বরং তিনি বাঙালির ইতিহাসের নির্মাতা। ইতিহাসকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন হাতের করতলে।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ওপর অধিকারের চাপ। সেটা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই তৈরি করেছিলেন। সেদিন শোষণ ও শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির নেশা তৈরি হয়েছিল সাতকোটি বাঙালির। একদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের তাক করা অস্ত্র, আরেক দিকে সাত কোটি বাঙালির রক্তমাখা চোখ। সেই রক্তমাখা চোখ চেয়েছিল তাদের মহানায়কের দিকে। মহানায়ক উচ্চারণ করলেন একটি শব্দ ‘স্বাধীনতা’। মুক্তি ও স্বাধীনতা তখন বাঙালি জাতির জন্য অনিবার্য। বাঙালির আন্দোলন টগবগ করে ফুটতে থাকল। শেখ মুজিব নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, বলতে গেলে ১৯৭১ সালের পুরো মার্চ তার নির্দেশই হয়ে ওঠে সরকারি নির্দেশ। মানুষ সেই নির্দেশ মানতে থাকে। এমনকি সরকারি প্রশাসনও। বঙ্গবন্ধু এই নির্দেশ দেওয়ার অমিত তেজ, আস্থা ও প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে।

বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতা যতটা রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক, মুক্তি ততটাই অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। বাঙালি ৪৭-এ দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে অপরিকল্পিত ভৌগলিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে তথাকথিত স্বাধীনতা পেলেও মুক্তি পায়নি। তারা তাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চাইলেন বাঙালির মুক্তি, যা একটি জাতির স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে। মুক্তি মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সবধরনের শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি। একটি প্রকৃত স্বাধীন দেশই পূরণ করতে পারে এইসব মুক্তির প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধু তাই ঘোষণা করলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালি সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জীবন বাজি রেখে অনিবার্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি পেল স্বাধীন ভূখণ্ড ও সার্বভৌম অধিকার। বঙ্গবন্ধু একটি চেতনা, বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন। মহানায়কের এই দর্শনের মধ্য দিয়েই আসে বাংলাদেশের অনিবার্য মুক্তি ও স্বাধীনতা।
কিন্তু এই মুক্তি ও স্বাধীনতা বেশিদিন ভোগ করতে পারেনি বাংলার আপামর মানুষ।

৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেই হত্যা কেবল মুজিবকে নয়, পুরো বাঙালিকে জাতিকে করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির কলঙ্কিত এক ট্রাজেডির জন্ম দেয় বিপথগামী কিছু বাঙালিই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা মানেই বাঙালির ইতিহাসের ট্রাজিক পরিণতি। যে পরিণতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি অনেক বছর পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনাই শেষ পর্যন্ত আমাদের পথে ফিরিয়েছে। সময় পরাজিত হলেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশহারেনি।

লেখক: সাংবাদিক
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট