শিল্পীর কণ্ঠে ও কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু
jugantor
শিল্পীর কণ্ঠে ও কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু

  মো. খলিলুর রহমান  

১৭ আগস্ট ২০২১, ১৮:০২:৫৭  |  অনলাইন সংস্করণ

“যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই/যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই……” গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের লেখায় সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলীর সুরে শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন যেভাবে আবেগ দিয়ে গানটি গেয়েছেন, অন্য কোন গানে এমন দরদ আছে বলে মনে হয়নি। বছরের নানা সময়, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীতে অলিগলি-রাজপথ কিংবা মানুষের বাসাবাড়িতে বেজে উঠে বারবার। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত গান,কবিতা,গল্প লেখা হয়েছে বিশ্বের আর কোন রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে এর কিয়দংশও লেখা হয়নি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গান তৈরির প্রয়াস শুরু হয় ১৯৭১ সাল থেকে। সেই সময়ে “স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের পরিত্রাতা কে?/ সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর আজ ভাগ্য বিধাতা কে?/ একটি সুরেতে কে দিয়েছে বেঁধে বাঙালির অন্তর?/ সেতো শেখ মুজিবুর! ধন্য হে মুজিবুর।” শিরোনামে গান লিখেছেন ওপার বাংলার কবি, ছড়াকার, কাহিনীকার এবং গীতিকার লক্ষ্মীকান্ত রায়।

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব…” শিরোনামে গান লিখেছেন গীতিকার নাসিমা বেগম, সুরকার অশোক পালের সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন সুমন রাহাত,সালমা জাহান,শঙ্কর কুমার পাওল, সুস্মিতা সেন, বাবুল রেজা এবং শাহীনা আক্তার পাপিয়া। গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের ১৯৯০ সালে লিখেন বিখ্যাত গান “যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই…” গানটিতে সুর করেন সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলী। প্রথমে তিনি গানটিতে কণ্ঠও দিয়েছিলেন,পরবর্তীতে গানটিতে কণ্ঠ দেন শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।

হুমায়ূন কবিরের কথায় মইনুল ইসলাম খানের সুরে বিখ্যাত গান “বঙ্গবন্ধু তুমি আমার সোনার বাংলাদেশ…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন একালের শিল্পী এস আই টুটুল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া “ বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে…” গানটি লিখেছেন মো. আবিদুর রহমান, গানটিতে সুর করেছেন সুধীনদাস গুপ্ত। ১৯৭১ সালে অন্যতম জনপ্রিয় গান “শোন একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠ ধ্বনি…” গানটি লিখেছিলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার। সেই সময় গানটিতে সুর দিয়ে কণ্ঠ দিয়েছিলেন অংশুমান রায়। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের আরও একটি জনপ্রিয় গান “বাংলার হিন্দু,বাংলার বৌদ্ধ …”। এই গানটি সুর করেছেন শ্যামল মিত্র এবং কণ্ঠ দিয়েছেন সুরকার নিজেই। বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে “সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিল…” গানটি লিখেছেন অধ্যাপক আবু সাঈদ। গানটিতে সুর করে কণ্ঠ দিয়েছেন সাদি মোহাম্মদ। জাহিদুল হকের কথায় সত্য সাহার সুরে “তুমি চলে গেছো থেকে যাবে…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শাম্মী আক্তার।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একই সাথে গান লেখা, সুর করা এবং কণ্ঠ দিয়েছেন শিল্পী এসডি রুবেল তার “বঙ্গবন্ধু তুমি শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী…” শিরোনামের গানে। “ও মুজিব তুমি মিশে আছো …” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন অটামনাল মুন। গানটির কথা এবং সুর শিল্পীর নিজেরেই। সাম্প্রতিক সময়ে কবি সুজন হাজং-এর লেখা এবং সুরকার যাদু রিছিলের সুর করা “বঙ্গবন্ধু তুমি স্বপ্ন বাঙালির,হাজার বছর ধরে,বঙ্গবন্ধু তুমি ভোরের সূর্য,উঠুক পৃথিবী জুড়ে…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতা। কবি সুজন হাজং-এর লেখা এবং সুরকার যাদু রিছিলের সুর করা আরও একটি গান “ এখন কেমন আছে বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বর বাড়িটি/এখন কোথায় আছে বঙ্গবন্ধুর কালো ফ্রেমের চশমাটি/ এখন কোথায় আছে বঙ্গবন্ধুর সেই ইজি চেয়ারটি/এখন কোথায় আছে শেখ রাসেলের সেই ছবিটি…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দী।

শিল্পী রবি চৌধুরী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা “ বাংলার শিরোনাম…” কণ্ঠ দিয়েছেন। গানটির কথা লিখেছেন শুক্লা পঞ্চমী এবং সুর করেছেন মুরাদ নূর। সুজন হাজং-এর কথায় এবং সুমন কল্যাণের সুরে “ পিতার রক্তে রঞ্জিত…” শিরোনামের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ফাহমিদা নবী।বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে “ শোকের গান” গেয়েছেন শিল্পী শফিক তুহিন। গানটি লিখেছেন শফিক তুহিন ও আবু সায়েম চৌধুরী। সুর করেছেন কবি নিজেই। দূরবীন ব্যান্ডের গায়ক মোহাম্মদ শহীদের “ বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ” শিরোনামের গান। গানটির কথা ফয়সাল রাব্বিকীন এবং সুর করেছেন রেজোয়ান শেখ। ফিডব্যাক ব্যান্ডের লুমিন গেয়েছেন “ বঙ্গবন্ধু” শিরোনামের গান। গানটির কথা দেওয়ান লালন আহমেদ এবং সুর করেছেন সাজেদ ফাতেমী।

তাছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিল্পী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-অশোক পালের কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব”, আবুল লায়েসের কণ্ঠে “তিনি কি আসবেন?”, শেখ ফরিদের কণ্ঠে “সাত কোটি মানুষের মুক্তির জন্য”, দিলীপ রায়ের কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা দিয়েছো বাঙালির”, বেগম মমতাজ হোসেনের কণ্ঠে “মধুমতী নদীর তীরে টুঙ্গীপাড়া গ্রাম”, ওমর ফারুকের কণ্ঠে “আমার বঙ্গবন্ধুর নৌকায় চড়ে”, সায়েফ আলীর কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু ফিরে এসো”, সুভাষ দত্তের কণ্ঠে “ও মুজিব তুমি মিশে আছ”, রোজিনার কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায়”, বর্ষার কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু হে মহান নেতা”, মতিয়ার রহমানের কণ্ঠে “তুমিই বাংলাদেশ, সেই ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের খোকা,দশরত্ন” বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পীরা গেয়েছেন “শুভ জন্মদিন জাতির পিতা তোমার শুভ জন্মদিন”।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা শুধুই ব্যক্তি মুজিবকে প্রতিফলিত করেনি, কোন কোন কবিতা সময়কে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধুকে করেছে কালাতিক্রমী। ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা,এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো” জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা। তাছাড়াও ১৯৬৯ সালে “হুলিয়া”, “সুবর্ণ গোলাপের জন্য”, “শেখ মুজিব ১৯৭১”, “সেই খুনের গল্প ১৯৭৫”, “আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি”, “মুজিব মানে মুক্তি”, “শেষ দেখা”, “সেই রাত্রির কল্পকাহিনী”, “শোকগাথা”, “পুনশ্চ মুজিবকথা”, “আগস্ট শোকের মাস”, “কাঁদো”, “প্রত্যাবর্তনের আনন্দ”, “ভয় নেই”, “রাজদণ্ড” প্রভৃতি কবিতা লিখেছেন। অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা “যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা/ গৌরি যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান” বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গেছে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার “আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি” কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করেছেন এভাবে “আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি/সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা/সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ-সংগীত কবিতা/জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা/রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা/আমরা কী তার মতো কবিতার কথা বলতে পারব?/আমরা কী তার মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারব?”

সৈয়দ শামসুল হক “আমার পরিচয়” কবিতাটিতে লিখেছেন-“এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কী তোমার সন্তান?/ যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান?” শামসুর রাহমানের “ধন্য সেই পুরুষ” কবিতায় তিনি লিখেছেন-“ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে।”

এছাড়াও সুফিয়া কামালের “ডাকিছে তোমারে”, সানাউল হকের “লোকান্তর তিনি আত্মদানে”,আবুল হোসেনের “শিকারের কবিতা”, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর “স্বীকারের কবিতা”, শামসুর রহমানের “যাঁর মাথায় ইতিহাসের জ্যোতির্বলয়”,হাসান হাফিজুর রহমানের “বীর নেই আছে শহীদ”,কায়সুল হকের “সমষ্টির স্বপ্নের নির্মাতা”, সৈয়দ শামসুল হকের “পিতা তোমার কথা এখন এখানে আর”, দিলওয়ারের “বিতর্কিত এই গ্রহে”, বেলাল চৌধুরীর” রক্তমাখা চরমপত্র”, মহাদেব সাহার “আমি কী বলতে পেরেছিলাম”, হেলাল হাফিজের “নাম ভূমিকায়”, শিহাব সরকারের “পিতা”, অসীম সাহার “প্রতিশোধ”, শিকদার আমিনুল হকের “আত্মজের প্রতি”,আসাদ চৌধুরীর “দিয়েছিলো অসীম আকাশ”,আবু কায়সারের “সূর্যের অনল”, শান্তিময় বিশ্বাসের “ঝড় আর মেঘের সমান”, আখতার হুসেনের “আজ থেকে তুই নিজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর”, রবীন্দ্র গোপের “আমার বুকে অর্ধনমিত পতাকা”, নাসির আহমেদের “গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ”, কামাল চৌধুরীর “এখনো দাঁড়িয়ে ভাই”, ত্রিদিব দস্তিদারের “বাঙালির ডাকনাম”, মিনার মনসুরের “কেউ কী এমন করে চলে যায়” প্রভৃতি কবিতায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় জানা যায়।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ওপার বাংলার কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন- “আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছো কাল, একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।” জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বেশ কিছু সংকলিত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গুলো হল- বেবি মওদুদের “মুজিব মঙ্গল”, কবি সুমন্ত রায়ের “ছোটদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে শ্রেষ্ঠ কবিতা”, প্রত্যয় জসিমের “দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু”।

বিদেশিদের বিভিন্ন লেখায়ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি ফুটে উঠেছে। মার্কিন কবি রবার্ট পেইনের “দি চার্টার্ড এন্ড দ্য ডেমড”, সালমান রুশদীর “মিডনাইট বিলড্রেম”, “শেইম”, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “পূর্ব-পশ্চিম” ইত্যাদি। এছাড়াও জাপানি কবি মাৎসুও শকাইয়া, গবেষক ড.কাজুও আজামা, প্রফেসর নারা, মার্কিন কবি লোরি ওয়ালশ, জার্মান কবি গিয়ার্ড লুইপকে, বসনিয়া কবি ইভিকাপিচেস্কি ও ব্রিটিশ কবি টেড হিউজসহ অনেকের কবিতায় বঙ্গবন্ধু উপস্থাপিত হয়েছে নানাভাবে।

লেখক: মো. খলিলুর রহমান, শিক্ষক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা), পিএইচডি গবেষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

শিল্পীর কণ্ঠে ও কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু

 মো. খলিলুর রহমান 
১৭ আগস্ট ২০২১, ০৬:০২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

“যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই/যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই……” গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের লেখায় সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলীর সুরে শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন যেভাবে আবেগ দিয়ে গানটি গেয়েছেন, অন্য কোন গানে এমন  দরদ আছে বলে মনে হয়নি। বছরের নানা সময়, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীতে অলিগলি-রাজপথ কিংবা মানুষের বাসাবাড়িতে বেজে উঠে বারবার। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত গান,কবিতা,গল্প লেখা হয়েছে বিশ্বের আর কোন রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে এর কিয়দংশও লেখা হয়নি। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গান তৈরির প্রয়াস শুরু হয় ১৯৭১ সাল থেকে। সেই সময়ে “স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের পরিত্রাতা কে?/ সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর আজ ভাগ্য বিধাতা কে?/ একটি সুরেতে কে দিয়েছে বেঁধে বাঙালির অন্তর?/ সেতো শেখ মুজিবুর! ধন্য হে মুজিবুর।” শিরোনামে গান লিখেছেন ওপার বাংলার কবি, ছড়াকার, কাহিনীকার এবং গীতিকার লক্ষ্মীকান্ত রায়। 

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব…” শিরোনামে গান লিখেছেন গীতিকার নাসিমা বেগম, সুরকার অশোক পালের সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন সুমন রাহাত,সালমা জাহান,শঙ্কর কুমার পাওল, সুস্মিতা সেন, বাবুল রেজা এবং শাহীনা আক্তার পাপিয়া। গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের ১৯৯০ সালে লিখেন বিখ্যাত গান “যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই…” গানটিতে সুর করেন সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলী। প্রথমে তিনি গানটিতে কণ্ঠও দিয়েছিলেন,পরবর্তীতে গানটিতে কণ্ঠ দেন শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।

হুমায়ূন কবিরের কথায় মইনুল ইসলাম খানের সুরে বিখ্যাত গান “বঙ্গবন্ধু তুমি আমার সোনার বাংলাদেশ…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন একালের শিল্পী এস আই টুটুল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া “ বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে…” গানটি লিখেছেন মো. আবিদুর রহমান, গানটিতে সুর করেছেন সুধীনদাস গুপ্ত। ১৯৭১ সালে অন্যতম জনপ্রিয় গান “শোন একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠ ধ্বনি…” গানটি লিখেছিলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার। সেই সময় গানটিতে সুর দিয়ে কণ্ঠ দিয়েছিলেন অংশুমান রায়। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের আরও একটি জনপ্রিয় গান “বাংলার হিন্দু,বাংলার বৌদ্ধ …”। এই গানটি সুর করেছেন শ্যামল মিত্র এবং কণ্ঠ দিয়েছেন সুরকার নিজেই। বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে “সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিল…” গানটি লিখেছেন অধ্যাপক আবু সাঈদ। গানটিতে সুর করে কণ্ঠ দিয়েছেন সাদি মোহাম্মদ। জাহিদুল হকের কথায় সত্য সাহার সুরে “তুমি চলে গেছো থেকে যাবে…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শাম্মী আক্তার।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একই সাথে গান লেখা, সুর করা এবং কণ্ঠ দিয়েছেন শিল্পী এসডি রুবেল তার “বঙ্গবন্ধু তুমি শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী…” শিরোনামের গানে। “ও মুজিব তুমি মিশে আছো …” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন অটামনাল মুন। গানটির কথা এবং সুর শিল্পীর নিজেরেই। সাম্প্রতিক সময়ে কবি সুজন হাজং-এর লেখা এবং সুরকার যাদু রিছিলের সুর করা “বঙ্গবন্ধু তুমি স্বপ্ন বাঙালির,হাজার বছর ধরে,বঙ্গবন্ধু তুমি ভোরের সূর্য,উঠুক পৃথিবী জুড়ে…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতা। কবি সুজন হাজং-এর লেখা এবং সুরকার যাদু রিছিলের সুর করা আরও একটি গান “ এখন কেমন আছে বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বর বাড়িটি/এখন কোথায় আছে বঙ্গবন্ধুর কালো ফ্রেমের চশমাটি/ এখন কোথায় আছে বঙ্গবন্ধুর সেই ইজি চেয়ারটি/এখন কোথায় আছে শেখ রাসেলের সেই ছবিটি…” গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দী। 

শিল্পী রবি চৌধুরী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা “ বাংলার শিরোনাম…” কণ্ঠ দিয়েছেন। গানটির কথা লিখেছেন শুক্লা পঞ্চমী এবং সুর করেছেন মুরাদ নূর। সুজন হাজং-এর কথায় এবং সুমন কল্যাণের সুরে “ পিতার রক্তে রঞ্জিত…” শিরোনামের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ফাহমিদা নবী।বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে “ শোকের গান” গেয়েছেন শিল্পী শফিক তুহিন। গানটি লিখেছেন শফিক তুহিন ও আবু সায়েম চৌধুরী। সুর করেছেন কবি নিজেই। দূরবীন ব্যান্ডের গায়ক মোহাম্মদ শহীদের “ বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ” শিরোনামের গান। গানটির কথা ফয়সাল রাব্বিকীন এবং সুর করেছেন রেজোয়ান শেখ। ফিডব্যাক ব্যান্ডের লুমিন গেয়েছেন “ বঙ্গবন্ধু” শিরোনামের গান। গানটির কথা দেওয়ান লালন আহমেদ এবং সুর করেছেন সাজেদ ফাতেমী।

তাছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিল্পী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-অশোক পালের কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব”, আবুল লায়েসের কণ্ঠে “তিনি কি আসবেন?”, শেখ ফরিদের কণ্ঠে “সাত কোটি মানুষের মুক্তির জন্য”, দিলীপ রায়ের কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা দিয়েছো বাঙালির”, বেগম মমতাজ হোসেনের কণ্ঠে “মধুমতী নদীর তীরে টুঙ্গীপাড়া গ্রাম”, ওমর ফারুকের কণ্ঠে “আমার বঙ্গবন্ধুর নৌকায় চড়ে”, সায়েফ আলীর কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু ফিরে এসো”, সুভাষ দত্তের কণ্ঠে “ও মুজিব তুমি মিশে আছ”, রোজিনার কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায়”, বর্ষার কণ্ঠে “বঙ্গবন্ধু হে মহান নেতা”, মতিয়ার রহমানের কণ্ঠে “তুমিই বাংলাদেশ, সেই ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের খোকা,দশরত্ন” বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পীরা গেয়েছেন “শুভ জন্মদিন জাতির পিতা তোমার শুভ জন্মদিন”। 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা শুধুই ব্যক্তি মুজিবকে প্রতিফলিত করেনি, কোন কোন কবিতা সময়কে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধুকে করেছে কালাতিক্রমী। ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা,এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো” জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা। তাছাড়াও ১৯৬৯ সালে “হুলিয়া”, “সুবর্ণ গোলাপের জন্য”, “শেখ মুজিব ১৯৭১”, “সেই খুনের গল্প ১৯৭৫”, “আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি”, “মুজিব মানে মুক্তি”, “শেষ দেখা”, “সেই রাত্রির কল্পকাহিনী”, “শোকগাথা”, “পুনশ্চ মুজিবকথা”, “আগস্ট শোকের মাস”, “কাঁদো”, “প্রত্যাবর্তনের আনন্দ”, “ভয় নেই”, “রাজদণ্ড” প্রভৃতি কবিতা লিখেছেন। অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা “যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা/ গৌরি যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান” বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গেছে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার “আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি” কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করেছেন এভাবে “আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি/সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা/সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ-সংগীত কবিতা/জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা/রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা/আমরা কী তার মতো কবিতার কথা বলতে পারব?/আমরা কী তার মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারব?” 

সৈয়দ শামসুল হক “আমার পরিচয়” কবিতাটিতে লিখেছেন-“এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কী তোমার সন্তান?/ যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান?” শামসুর রাহমানের “ধন্য সেই পুরুষ” কবিতায় তিনি লিখেছেন-“ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে।”   

এছাড়াও সুফিয়া কামালের “ডাকিছে তোমারে”, সানাউল হকের “লোকান্তর তিনি আত্মদানে”,আবুল হোসেনের “শিকারের কবিতা”, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর “স্বীকারের কবিতা”, শামসুর রহমানের “যাঁর মাথায় ইতিহাসের জ্যোতির্বলয়”,হাসান হাফিজুর রহমানের “বীর নেই আছে শহীদ”,কায়সুল হকের “সমষ্টির স্বপ্নের নির্মাতা”, সৈয়দ শামসুল হকের “পিতা তোমার কথা এখন এখানে আর”, দিলওয়ারের “বিতর্কিত এই গ্রহে”, বেলাল চৌধুরীর” রক্তমাখা চরমপত্র”, মহাদেব সাহার “আমি কী বলতে পেরেছিলাম”, হেলাল হাফিজের “নাম ভূমিকায়”, শিহাব সরকারের “পিতা”, অসীম সাহার “প্রতিশোধ”, শিকদার আমিনুল হকের “আত্মজের প্রতি”,আসাদ চৌধুরীর “দিয়েছিলো অসীম আকাশ”,আবু কায়সারের “সূর্যের অনল”, শান্তিময় বিশ্বাসের “ঝড় আর মেঘের সমান”, আখতার হুসেনের “আজ থেকে তুই নিজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর”, রবীন্দ্র গোপের “আমার বুকে অর্ধনমিত পতাকা”, নাসির আহমেদের “গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ”, কামাল চৌধুরীর “এখনো দাঁড়িয়ে ভাই”, ত্রিদিব দস্তিদারের “বাঙালির ডাকনাম”, মিনার মনসুরের “কেউ কী এমন করে চলে যায়” প্রভৃতি কবিতায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় জানা যায়।  

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ওপার বাংলার কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন- “আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছো কাল, একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।” জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বেশ কিছু সংকলিত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গুলো হল- বেবি মওদুদের “মুজিব মঙ্গল”, কবি সুমন্ত রায়ের “ছোটদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে শ্রেষ্ঠ কবিতা”, প্রত্যয় জসিমের “দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু”। 

বিদেশিদের বিভিন্ন লেখায়ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি ফুটে উঠেছে। মার্কিন কবি রবার্ট পেইনের “দি চার্টার্ড এন্ড দ্য ডেমড”, সালমান রুশদীর “মিডনাইট বিলড্রেম”, “শেইম”, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “পূর্ব-পশ্চিম” ইত্যাদি। এছাড়াও জাপানি কবি মাৎসুও শকাইয়া, গবেষক ড.কাজুও আজামা, প্রফেসর নারা, মার্কিন কবি লোরি ওয়ালশ, জার্মান কবি গিয়ার্ড লুইপকে, বসনিয়া কবি ইভিকাপিচেস্কি ও ব্রিটিশ কবি টেড হিউজসহ অনেকের কবিতায় বঙ্গবন্ধু উপস্থাপিত হয়েছে নানাভাবে।   

লেখক: মো. খলিলুর রহমান, শিক্ষক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা), পিএইচডি গবেষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট