গ্রামীণ খেলা গ্রামেই আছে
jugantor
গ্রামীণ খেলা গ্রামেই আছে

  হাজী মোহাম্মদ মহসীন   

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৩৯:৫২  |  অনলাইন সংস্করণ

খেলতে গেলে বলতে হয়;
কানামাছি ভোঁ ভোঁ
যারে পাবি তারে ছোঁ...
গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ঐহিত্যময় শিশু-কিশোরদের মজার খেলা কানামাছি, বৌচি, হা-ডু-ডু, পাক্ষি খেলা, গোল্লাছুট, ঢাংগুলি, মারবেল, হাঁস ধরা, রশি টানা, ইচিং বিচিং, ওপেন টু বায়োস্কোপ, মল্লযুদ্ধ, লাঠি খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, মোরগ লড়াই, কড়ি, ধাপ্পা, কুতকুত, বিস্কুট খেলা, যেমন খুশি তেমন সাজো, পুতুলের বিয়ে, চড়ুইভাতি, এলাডিং বেলাডিং, সাত চাড়া, বিয়ের গান উল্লেখযোগ্য।

এসব জনপ্রিয় খেলা দিন দিন আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে; যা নতুন প্রজন্মের কাছে একেবারেই অজানা। এই ঐহিত্যময় খেলাধুলা বইয়ের পাতায় স্থান করে হয়ত নিবে, সময়ের প্রয়োজন। তবে বৈশাখ এলেই লোকসংস্কৃতি ও আর গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজনে সোনারগাঁ লোক ও কারুমেলায় কিছুটা দেখা মিলে। যখন বয়সে ছোট ছিলাম তখন চাচাতো ভাই, চাচাতো বোন, ছোট ফুফু, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশীকে নিয়ে পড়ন্ত বিকালে, জ্যোৎস্না রাতে গোল্লাছুট, হা- ডু- ডু ও দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাগুলো নিজ এলাকায় পাশাপাশি মামার বাড়িও মজার খেলায় মেতেছি। সেই কথা মনের গহিনে এখনো নাড়া দেয়।

গাঁও-গেরামের এসব খেলাধুলা ধরে রাখতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। ওই খেলা অনেক মানুষের উপস্থিতিতে উপভোগ করা দারুণ মজা। মনে হয় আচমকা হাওয়া প্রকৃতিতে নেমে আসে! ঐতিহ্যের টানে কেউ কেউ মত্ত হয়। ওই মেলায় স্কুল ছাত্রীদের ছেলে সাজিয়ে মেয়েদের সচেতনমূলক বিয়ে দেওয়া হয়। আগে ঘটক, বিয়ের গান, সব মিলিয়ে সানাইও বাজে। কিছুকাল আগে গ্রাম-বাংলায় ছেলে-মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে উভয় বাড়ির মা, চাচিদের বিয়ের গান গাইতে দেখেছি। সেই গান মেলায় উপভোগ করা যায়; দিন বদলের পালায় গ্রামাঞ্চলে সেই প্রথা এখন আর নেই।

ঐতিহ্যপ্রেমী শিশু-কিশোর, কিশোরী যখন ঋতুর রঙ্গমঞ্চে আসন পাতে তখন পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার অজপাড়াগাঁওয়ে নবান্ন উৎসব আয়োজনে থাকে গ্রামীণ খেলা, পালাগান, ওরশ মোবারক। এ উপলক্ষে গ্রামের মানুষজন ঘরপ্রতি টাকা কালেকশন করে গরু বা মহিষ জবাই করা হয়। নিজেরা খায়, প্রতিবেশী ও ভক্তদেরও আপ্যায়ণে এলাকাবাসীর জুড়ি নেই।

নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে পল্লী অঞ্চলে কারুশিল্পীরা পসরা পেতে বসত। তাতে থাকত শোলাশিল্প, শখের হাঁড়ি, নকশিপাখা, হাতি, ঘোড়া, পুতুল, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, পিতলের কাঁসা, কারুপণ্য স্থান পেত। এতে গাঁওয়ের বধূরা পুলকিত হতো। সে কথা অতীত।

কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলেন দু’যুগ আগেও হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি হরহামেশই মত্ত ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় লোকসংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে এক সময় গ্রামীণ উৎসবগুলো সব বয়সী মানুষের প্রাণের খোরাক বলে গণ্য হতো। এই জগতে জায়গা করে নিয়েছে মোবাইল ফোনে ভিডিও গেইম, যান্ত্রিক সভ্যতায়। দেশীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে ভার্চুয়াল জগতের কু-সংস্কৃতি। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই খেলার মাঠ বাদ দিয়ে মোবাইলে গেইম খেলছে। কোথাও কোথাও খেলার মাঠ, পতিত জায়গা, বাড়ির ওঠানও আগের মতো নেই। সেই কারণে সামাজিক অবক্ষয় ও তরুণরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। জ্ঞানীজনদের ধারণা নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐহিত্যবাহী লোক-সংস্কৃতির পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। যাতে আধুনিককালে তারা এই খেলা মায়ার বাঁধনে বুকে লালন করতে পারে। মানবজীবনে শরীরচর্চা ও চিত্তবিনোদনের কথাও বাদ বা হেলাফেলা করাও যায় না।

ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা উদ্ধারে স্কুল ও কলেজের পাশাপাশি মাদ্রাসায় আগের মতো সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোগ ও নিয়ম বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন। যখন প্রকৃতি থেকে কোনো কিছু হারিয়ে বা বিলুপ্তি ঘটে তখন দারুণ কদর বাড়ে। প্রখ্যাত শিল্পী লালন শাহ্র গানটি গেয়ে দেখি “সময় গেলে সাধন হবে না”; যা আমাদের সবার ধরে রাখা প্রয়োজন।

গ্রামীণ খেলা গ্রামেই আছে

 হাজী মোহাম্মদ মহসীন  
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৩৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

খেলতে গেলে বলতে হয়;
কানামাছি ভোঁ ভোঁ
যারে পাবি তারে ছোঁ...
গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ঐহিত্যময় শিশু-কিশোরদের মজার খেলা কানামাছি, বৌচি, হা-ডু-ডু, পাক্ষি খেলা, গোল্লাছুট, ঢাংগুলি, মারবেল, হাঁস ধরা, রশি টানা, ইচিং বিচিং, ওপেন টু বায়োস্কোপ, মল্লযুদ্ধ, লাঠি খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, মোরগ লড়াই, কড়ি, ধাপ্পা, কুতকুত, বিস্কুট খেলা, যেমন খুশি তেমন সাজো, পুতুলের বিয়ে, চড়ুইভাতি, এলাডিং বেলাডিং, সাত চাড়া, বিয়ের গান উল্লেখযোগ্য।

এসব জনপ্রিয় খেলা দিন দিন আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে; যা নতুন প্রজন্মের কাছে একেবারেই অজানা। এই ঐহিত্যময় খেলাধুলা বইয়ের পাতায় স্থান করে হয়ত নিবে, সময়ের প্রয়োজন। তবে বৈশাখ এলেই লোকসংস্কৃতি ও আর গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজনে সোনারগাঁ লোক ও কারুমেলায় কিছুটা দেখা মিলে। যখন বয়সে ছোট ছিলাম তখন চাচাতো ভাই, চাচাতো বোন, ছোট ফুফু, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশীকে নিয়ে পড়ন্ত বিকালে, জ্যোৎস্না রাতে গোল্লাছুট, হা- ডু- ডু ও দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাগুলো নিজ এলাকায় পাশাপাশি মামার বাড়িও মজার খেলায় মেতেছি। সেই কথা মনের গহিনে এখনো নাড়া দেয়।
 
গাঁও-গেরামের এসব খেলাধুলা ধরে রাখতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। ওই খেলা অনেক মানুষের উপস্থিতিতে উপভোগ করা দারুণ মজা। মনে হয় আচমকা হাওয়া প্রকৃতিতে নেমে আসে! ঐতিহ্যের টানে কেউ কেউ মত্ত হয়। ওই মেলায় স্কুল ছাত্রীদের ছেলে সাজিয়ে মেয়েদের সচেতনমূলক বিয়ে দেওয়া হয়। আগে ঘটক, বিয়ের গান, সব মিলিয়ে সানাইও বাজে। কিছুকাল আগে গ্রাম-বাংলায় ছেলে-মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে উভয় বাড়ির মা, চাচিদের বিয়ের গান গাইতে দেখেছি। সেই গান মেলায় উপভোগ করা যায়; দিন বদলের পালায় গ্রামাঞ্চলে সেই প্রথা এখন আর নেই।

ঐতিহ্যপ্রেমী শিশু-কিশোর, কিশোরী যখন ঋতুর রঙ্গমঞ্চে আসন পাতে তখন পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার অজপাড়াগাঁওয়ে নবান্ন উৎসব আয়োজনে থাকে গ্রামীণ খেলা, পালাগান, ওরশ মোবারক। এ উপলক্ষে গ্রামের মানুষজন ঘরপ্রতি টাকা কালেকশন করে গরু বা মহিষ জবাই করা হয়। নিজেরা খায়, প্রতিবেশী ও ভক্তদেরও আপ্যায়ণে এলাকাবাসীর জুড়ি নেই।

নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে পল্লী অঞ্চলে কারুশিল্পীরা পসরা পেতে বসত। তাতে থাকত শোলাশিল্প, শখের হাঁড়ি, নকশিপাখা, হাতি, ঘোড়া, পুতুল, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, পিতলের কাঁসা, কারুপণ্য স্থান পেত। এতে গাঁওয়ের বধূরা পুলকিত হতো। সে কথা অতীত।
 
কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলেন দু’যুগ আগেও হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি হরহামেশই মত্ত ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় লোকসংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে এক সময় গ্রামীণ উৎসবগুলো সব বয়সী মানুষের প্রাণের খোরাক বলে গণ্য হতো। এই জগতে জায়গা করে নিয়েছে মোবাইল ফোনে ভিডিও গেইম, যান্ত্রিক সভ্যতায়। দেশীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে ভার্চুয়াল জগতের কু-সংস্কৃতি। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই খেলার মাঠ বাদ দিয়ে মোবাইলে গেইম খেলছে। কোথাও কোথাও খেলার মাঠ, পতিত জায়গা, বাড়ির ওঠানও আগের মতো নেই। সেই কারণে সামাজিক অবক্ষয় ও তরুণরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। জ্ঞানীজনদের ধারণা নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐহিত্যবাহী লোক-সংস্কৃতির পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। যাতে আধুনিককালে তারা এই খেলা মায়ার বাঁধনে বুকে লালন করতে পারে। মানবজীবনে শরীরচর্চা ও চিত্তবিনোদনের কথাও বাদ বা হেলাফেলা করাও যায় না।
 
ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা উদ্ধারে স্কুল ও কলেজের পাশাপাশি মাদ্রাসায় আগের মতো সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোগ ও নিয়ম বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন। যখন প্রকৃতি থেকে কোনো কিছু হারিয়ে বা বিলুপ্তি ঘটে তখন দারুণ কদর বাড়ে। প্রখ্যাত শিল্পী লালন শাহ্র গানটি গেয়ে দেখি “সময় গেলে সাধন হবে না”; যা আমাদের সবার ধরে রাখা প্রয়োজন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন