শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!
jugantor
শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!

  এ টি এম নিজাম  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৩২:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা সমাজ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা এবং জাতিসত্তা গঠনে অবদান রাখা লোকজন দেশ ও জাতির গৌরব-অহঙ্কার। এদের কেউ জীবন দিয়ে, কেউ সংগ্রাম-কারাবাসের মাধ্যমে আর কেউবা চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে জাতিকে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়ে যায়।

এসব ব্যক্তির কোনো দল থাকে না। তারা সব দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠা অমূল্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ। জাতিসত্তা গঠনের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা, আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায়-ই যে যার মতো করে তারা জ্বলজ্বল করে গ্রহ-নক্ষত্র হয়ে জ্বলে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মননের আকাশ তৈরি করেন। এক কথায় এরা সবাই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এখানে ত্যাগ-তিতিক্ষা, ভূমিকা-মুখ্য ভূমিকারও যার যার মতো রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি রয়েছে।

এদের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল অমূল্য অবদানের ঋণ শোধ করা যায়।

কিন্তু এদের রাজনীতির মাঠে, ক্ষমতার পালাবদলের পালায় ঘুঁটি হিসাবে কিংবা কোটারি স্বার্থে ব্যবহার-অপব্যবহার নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করে। নানা প্রশ্নের বুদ বুদ তৈরি করে। প্রশ্ন ও দায়মুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড়ায় ইতিহাস।

আর একশ্রেণির সুবিধাভোগী লোকজন-ই এ রকম পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে যার যার দল ও মতের অধিকর্তাদের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা নতুন গ্রহ-নক্ষত্রের পার্থক্যের স্তবক শেখায়। শেষ পর্যন্ত নক্ষত্রকে গ্রহ বানিয়ে তবে-ই ক্ষ্যান্ত হয় ওই চাটুকার ও অন্ধ গবেষকরা।

কিছু দিন ধরে আবারও সেই পুরনো তালে শুরু হয়েছে সেসব জাতীয় পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির রাজনীতির মাঠে নিলামে তোলার প্রতিযোগিতা।

এ প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত এমন একটি নিলাম অনুষ্ঠান এবং এর প্রতিক্রিয়া অবতারণার দাবি রাখে।

সে বছর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে সে দেশের জাতিসত্তা গঠনের পেছনে অসামান্য অবদান রাখা লোকজনের প্রোট্রেট নিলামে তোলা হয়। এসব প্রোট্র্রেট ছিল মহাত্মা গান্ধী, দাদা ভাই নওরোজি, অরবিন্দ ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ দেশবরেণ্য মনীষীদের।

ওই নিলাম অনুষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্পরসিক ধনাঢ্য নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ নিলাম ডাকে মহাত্মা গান্ধীসহ প্রায় সব প্রোট্রেটের সন্তোষজনক দাম হাঁকেন ক্রেতারা। শেষপর্যায়ে আমাদের জাতীয় কবি, যিনি বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন গোটা ভারতবাসীকে তার পালা। কিন্তু তার প্রোট্রেটের দাম ওঠে সর্বোচ্চ দুই লাখ রুপি। এ সময় সবাইকে চমকে দিয়ে নিলাম ডাকে অংশ নিতে গ্যালারিতে বসা এক ফরাসি নারী চিৎকার করে বলে উঠলেন— 'সো গ্রেট এ পয়েট'- ফাইভ লাখ রুপি। অর্থাৎ ও-ই ফরাসি নারী টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুখু মিয়া কবি নজরুলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করলেন।

এ ঘটনার কাহিনি এখানেই শেষ নয়। পরের দিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যবিষয়ক দেশ পত্রিকার কিংবদন্তি তুল্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষ এ পত্রিকায় সম্পাদকীয় করলেন, 'লজ্জা আর শ্রদ্ধার নিলাম' শিরোনামে।

তিনি এ সম্পাদকীয়তে বললেন, এসব দেশপ্রেমিক মহান ব্যক্তিত্ব-মনীষীদের চিন্তা-চেতনা, মতাদর্শ-লেখনী এবং মন ও মননে ভারতের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে।

এদের ঋণ কেবল তাদের আদর্শ বাস্তবায়ন ও লালনের মাধ্যমে-ই শোধের প্রয়াস চালানো যেতে পারে। তাদের প্রোট্রেট নিলামে তুলে অর্থের মানদণ্ডে অবদান বিচার— শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম বটে। এ ঘটনা এ দেশবরেণ্য মনীষীদের অপমানের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শামিল।

দেশ পত্রিকায় ওই মনীষীদের প্রোট্রেট নিলামের ঘটনায় সাগরময় ঘোষের— শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম সম্পাদকীয়টি সারা ভারতবর্ষে ঝড় তুলেছিল। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান— এমনকি সরকারের।

আজ আমাদের দেশের এমন সব দেশ-জাতি বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রোট্রেট নিলামে ওঠার চেয়েও ভয়ঙ্কর নিলাম ডাকের আয়োজন চলছে প্রতিদিন- প্রতি মুহূর্ত।

এ-ই ক্রান্তিলগ্নে সমাজ-রাষ্ট্রের বিবেক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি, মাধ্যম, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে গুরুদায়িত্ব পালনের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে একদিন কুৎসিত ইতিহাস বিকৃতির কাঁদাজলে হাবুডুবু খেতে হবে গোটা জাতিকে- এ প্রজন্মকে।

অতীতেও এক-ই প্রয়োজনে ইতিহাসকে দৈত্য ভেবে বোতল বন্দি করে রাখার এমন উগ্র প্রবণতা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের 'দৈত্যরা' একদিন বোতল ভেঙে বেরিয়ে এসে সব-ই লণ্ডভণ্ড ও তছনছ করে দিয়ে গেছে। এখনও অসুর মূর্তিতে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সুতরাং ইতিহাসকে আর বোতল বন্দি নয়; বরং সন্ধিতে সন্ধিতে খসে পড়া বিকৃত ইতিহাসকে স্বমহিমায় সমৃদ্ধ করার তাগিদ এখন সময়ের।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রথম চরণটি উচ্চারণের মাধ্যমে এ ছোট্ট বার্তা ও অনুভূতির সমাপ্তি টানা-ই শ্রেয় মনে করছি— 'হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!'

লেখক: এটিএম নিজাম

যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ

শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!

 এ টি এম নিজাম 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৩২ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা সমাজ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা এবং জাতিসত্তা গঠনে অবদান রাখা লোকজন দেশ ও জাতির গৌরব-অহঙ্কার। এদের কেউ জীবন দিয়ে, কেউ সংগ্রাম-কারাবাসের মাধ্যমে আর কেউবা চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে জাতিকে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়ে যায়।

এসব ব্যক্তির কোনো দল থাকে না। তারা সব দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠা অমূল্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ। জাতিসত্তা গঠনের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা, আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায়-ই যে যার মতো করে তারা জ্বলজ্বল করে গ্রহ-নক্ষত্র হয়ে জ্বলে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মননের আকাশ তৈরি করেন। এক কথায় এরা সবাই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এখানে ত্যাগ-তিতিক্ষা, ভূমিকা-মুখ্য ভূমিকারও যার যার মতো রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি রয়েছে।

এদের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল অমূল্য অবদানের ঋণ শোধ করা যায়।

কিন্তু এদের রাজনীতির মাঠে, ক্ষমতার পালাবদলের পালায় ঘুঁটি হিসাবে কিংবা কোটারি স্বার্থে ব্যবহার-অপব্যবহার নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করে। নানা প্রশ্নের বুদ বুদ তৈরি করে। প্রশ্ন ও দায়মুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড়ায় ইতিহাস। 

আর একশ্রেণির সুবিধাভোগী লোকজন-ই এ রকম পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে যার যার দল ও মতের অধিকর্তাদের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা নতুন গ্রহ-নক্ষত্রের পার্থক্যের স্তবক শেখায়। শেষ পর্যন্ত নক্ষত্রকে গ্রহ বানিয়ে তবে-ই ক্ষ্যান্ত হয় ওই চাটুকার ও অন্ধ গবেষকরা।               

কিছু দিন ধরে আবারও সেই পুরনো তালে শুরু হয়েছে সেসব জাতীয় পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির রাজনীতির মাঠে নিলামে তোলার প্রতিযোগিতা।

এ প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত এমন একটি নিলাম অনুষ্ঠান এবং এর প্রতিক্রিয়া অবতারণার দাবি রাখে। 

সে বছর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে সে দেশের জাতিসত্তা গঠনের পেছনে অসামান্য অবদান রাখা লোকজনের প্রোট্রেট নিলামে তোলা হয়। এসব প্রোট্র্রেট ছিল মহাত্মা গান্ধী, দাদা ভাই নওরোজি, অরবিন্দ ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ দেশবরেণ্য মনীষীদের। 

ওই নিলাম অনুষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্পরসিক ধনাঢ্য নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ নিলাম ডাকে মহাত্মা গান্ধীসহ প্রায় সব প্রোট্রেটের সন্তোষজনক দাম হাঁকেন ক্রেতারা। শেষপর্যায়ে আমাদের জাতীয় কবি, যিনি বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন গোটা ভারতবাসীকে তার পালা। কিন্তু তার প্রোট্রেটের দাম ওঠে সর্বোচ্চ দুই লাখ রুপি। এ সময় সবাইকে চমকে দিয়ে নিলাম ডাকে অংশ নিতে গ্যালারিতে বসা এক ফরাসি নারী চিৎকার করে বলে উঠলেন— 'সো গ্রেট এ পয়েট'- ফাইভ লাখ রুপি। অর্থাৎ ও-ই ফরাসি নারী টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুখু মিয়া কবি নজরুলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করলেন।

এ ঘটনার কাহিনি এখানেই শেষ নয়। পরের দিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যবিষয়ক দেশ পত্রিকার  কিংবদন্তি তুল্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষ এ পত্রিকায় সম্পাদকীয় করলেন, 'লজ্জা আর শ্রদ্ধার নিলাম' শিরোনামে। 

তিনি এ সম্পাদকীয়তে বললেন, এসব দেশপ্রেমিক মহান ব্যক্তিত্ব-মনীষীদের   চিন্তা-চেতনা,  মতাদর্শ-লেখনী এবং মন ও মননে ভারতের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে। 

এদের ঋণ কেবল তাদের আদর্শ বাস্তবায়ন ও লালনের মাধ্যমে-ই শোধের প্রয়াস চালানো যেতে পারে। তাদের প্রোট্রেট নিলামে তুলে অর্থের মানদণ্ডে অবদান বিচার— শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম বটে। এ ঘটনা এ দেশবরেণ্য মনীষীদের অপমানের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শামিল।

দেশ পত্রিকায় ওই মনীষীদের প্রোট্রেট নিলামের ঘটনায় সাগরময় ঘোষের— শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম সম্পাদকীয়টি সারা ভারতবর্ষে ঝড় তুলেছিল। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান— এমনকি সরকারের। 

আজ আমাদের দেশের এমন সব দেশ-জাতি বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রোট্রেট নিলামে ওঠার চেয়েও ভয়ঙ্কর নিলাম ডাকের আয়োজন চলছে প্রতিদিন- প্রতি মুহূর্ত।

এ-ই ক্রান্তিলগ্নে সমাজ-রাষ্ট্রের বিবেক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি, মাধ্যম, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে গুরুদায়িত্ব পালনের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে একদিন কুৎসিত ইতিহাস বিকৃতির কাঁদাজলে হাবুডুবু খেতে হবে গোটা জাতিকে- এ প্রজন্মকে।                    

অতীতেও এক-ই প্রয়োজনে ইতিহাসকে দৈত্য ভেবে বোতল বন্দি করে রাখার এমন উগ্র প্রবণতা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের 'দৈত্যরা' একদিন বোতল ভেঙে বেরিয়ে এসে সব-ই লণ্ডভণ্ড ও তছনছ করে দিয়ে গেছে। এখনও অসুর মূর্তিতে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।      

সুতরাং ইতিহাসকে আর বোতল বন্দি নয়; বরং সন্ধিতে সন্ধিতে খসে পড়া বিকৃত ইতিহাসকে স্বমহিমায় সমৃদ্ধ করার তাগিদ এখন সময়ের।    

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রথম চরণটি উচ্চারণের মাধ্যমে এ ছোট্ট বার্তা ও অনুভূতির সমাপ্তি টানা-ই শ্রেয় মনে করছি— 'হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!'

লেখক: এটিএম নিজাম

যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন