ওরা সাগর থেকে কেড়ে নেয় মাটি
jugantor
ওরা সাগর থেকে কেড়ে নেয় মাটি

  ড. আসমা অন্বেষা  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৩৬:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

ডাচরা মজা করে একটা কথা বলে থাকেন- ‘God created the earth and the Dutch created The Netherlands.’ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন পৃথিবী এবং ডাচরা তৈরি করেছে নেদারল্যান্ডস। ডাচদের ল্যান্ড রিক্লেমেশন প্রজেক্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রজেক্ট। ইউরোপের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ছোট্ট দেশ নেদারল্যান্ডস।

সে কারণেই ১৬০০ শতক থেকে অনেক বড় বড় ল্যান্ড সমুদ্র থেকে এবং লেক থেকে সংগ্রহ করেছে ডাচরা। পোল্ডারিং করে সাগর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি। খুবই অবাক লেগেছিল তাদের পোল্ডার ল্যান্ড দেখতে গিয়ে। পোল্ডার ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে পাশেই বাঁধের ওপাশে সমুদ্রের পানিতে চলমান জাহাজ দেখতে হয় ঘাড় অনেকটা উঁচু করে; কারণ আমরা দাঁড়িয়েছিলাম সমুদ্রের পানির লেভেল থেকে অনেক নিচে, সমুদ্রের তলদেশের লেভেলে। বর্তমানে ৯০০০ পোল্ডার জোন আছে নেদারল্যান্ডসে। এ ইউনিক ল্যান্ডস্কেপ পৃথিবীর মধ্যে সেরা।

পোল্ডার ল্যান্ড হচ্ছে একটি নিচু জমি, যা বাঁধ দিয়ে সমুদ্র থেকে পৃথক করা হয়েছে এবং যার বাঁধের বাইরের পানির সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই, ম্যানুয়ালি অপারেটেড ডিভাইস ছাড়া। তারা প্রথমে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে বাঁধ দিয়ে খানিকটা পানির এলাকা বা পানিসহ জমি পৃথক করে ফেলে মূল সমুদ্র থেকে; এরপর তারা ঘেরাও করা জমি থেকে পানি পাম্প করে সমুদ্রের ভেতর ফেলে দেয়। এক সময় ব্যাপকভাবে উইন্ডমিল ব্যবহার করা হতো এ কাজে। এরপর এ জমি তারা বহু বছর ফেলে রাখে। অনেক বছর ধরে ফেলে রাখার ফলে জমির লবণাক্ততা কমতে থাকে এবং জমির বালিমাটির উপর পলিমাটি জমতে থাকে। প্রথমদিকে ওই জমিতে ঘাসের চাষ করা হয়; পরে ধীরে ধীরে আবাদযোগ্য হয় জমিগুলো। এ জমিগুলো খুবই উর্বর হয়ে ওঠে দিনে দিনে এবং এভাবেই তারা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ ফুড এক্সপোর্টার হয়ে কাজ করছে।
তিন ধরনের পোল্ডার আছে নেদারল্যান্ডসে- ১. সাগর বা অন্য কোনো জলস্থান থেকে উদ্ধারকৃত জমি। যেমন লেক, নদী অথবা সমুদ্র; ২. বন্যার আশঙ্কাযুক্ত জমি, যা বাঁধ দিয়ে সমুদ্র বা নদী থেকে পৃথক করা হয়েছে; ৩. নিচু জলা-জমি, যা আশপাশের পানির উৎস থেকে পৃথক করা হয়েছে। একে জার্মান ভাষায় বলা হয় koogs।

নদী বা সামুদ্রিক বাঁধ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের অধিকাংশ ভূমি তলিয়ে যেত। দেশটির বেশিরভাগ অংশ সমুদ্র থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং এ জমিগুলো আসলে সমুদ্র সমতলের নিচে অবস্থান করছে। সমুদ্র উপকূলে নির্মিত বাঁধগুলো এ নিম্ন ভূমিগুলোকে বন্যা থেকে রক্ষা করছে। নেদারল্যান্ডস আসলে একটি নিচু ভূমির দেশ। নেদারল্যান্ডস শব্দটির অর্থই হলো নিচু ভূমির স্থান বা দেশ। তাদের মাত্র ৫০ শতাংশ জমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে। পোল্ডার ভূমি বা ল্যান্ডগুলো সবসময় পাশের সাগর বা লেকের পানির লেভেলের চেয়ে অনেক নিচে থাকে। নিচু পোল্ডার এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়ে বিভিন্ন কারণে; যেমন- বৃষ্টির পানি বা অন্যান্য উৎস থেকে পানি জমে যেতে পারে, যা পাম্প করে স্লুইস গেটের মাধ্যমে সমুদ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পোল্ডার ল্যান্ডগুলো সবসময় বন্যার ঝুঁকির মধ্যে আছে। কাজেই ডাইকগুলোকে খুবই যত্নের সঙ্গে দেখাশোনা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে বাঁধগুলোকে তৈরি করা হয়েছে ওই স্থানে পাওয়া জিনিস দিয়ে এবং প্রতিটি জিনিসেরই এক ধরনের রিস্ক রয়েছে। যেমন ডাইক তৈরিতে বালুর ব্যবহার হয়েছে কিছু এলাকায়, যা পানি শোষণ করে ডাইকের ক্ষতি করতে পারে অথবা শুকনো পিট ব্যবহার করা হয়েছে, যা পানির চেয়ে হালকা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধারণ করার ক্ষমতা হারাতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন পশু বা জলজ প্রাণী (muskrat) সুড়ঙ্গ খুঁড়তে পারে, যার ফলে বাঁধের তলা দিয়ে পানি চলে আসতে পারে। কিছু ইউরোপিয়ান দেশে এ কারণে muskrat-দের শিকার করা হয়।
পানি যখন সাগর থেকে উথলে ওঠে, তখন বাঁধকে দুর্বল করে দিতে পারে। ১৯৫৩ সালের বন্যায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয় নেদারল্যান্ডস। ফলে বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নতুন ধরনের উদ্যোগ নিতে শুরু করে ডাচরা। তারা নতুন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাঁধগুলোর ডিজাইন পরিবর্তন করে।

এখানে নেদারল্যান্ডসের ভূমিসংক্রান্ত কিছু তথ্য দেওয়া হলো- ২৬ শতাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে অবস্থান করছে। ২১ শতাংশ জনগোষ্ঠী সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের এলাকায় বাস করে। ৫০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক মিটার উপরে অবস্থান করছে। Flevoland হলো সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত পোল্ডার ল্যান্ড প্রোভিন্স, যা প্রস্তুত করা হয়েছে ১৯৮৬ সালে। একে সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১৯৫০ ও ১৯৬০ সালে।

ড. আসমা অন্বেষা : কানাডার টরন্টো প্রবাসী

ওরা সাগর থেকে কেড়ে নেয় মাটি

 ড. আসমা অন্বেষা 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:৩৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ডাচরা মজা করে একটা কথা বলে থাকেন- ‘God created the earth and the Dutch created The Netherlands.’ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন পৃথিবী এবং ডাচরা তৈরি করেছে নেদারল্যান্ডস। ডাচদের ল্যান্ড রিক্লেমেশন প্রজেক্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রজেক্ট। ইউরোপের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ছোট্ট দেশ নেদারল্যান্ডস।

সে কারণেই ১৬০০ শতক থেকে অনেক বড় বড় ল্যান্ড সমুদ্র থেকে এবং লেক থেকে সংগ্রহ করেছে ডাচরা। পোল্ডারিং করে সাগর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি। খুবই অবাক লেগেছিল তাদের পোল্ডার ল্যান্ড দেখতে গিয়ে। পোল্ডার ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে পাশেই বাঁধের ওপাশে সমুদ্রের পানিতে চলমান জাহাজ দেখতে হয় ঘাড় অনেকটা উঁচু করে; কারণ আমরা দাঁড়িয়েছিলাম সমুদ্রের পানির লেভেল থেকে অনেক নিচে, সমুদ্রের তলদেশের লেভেলে। বর্তমানে ৯০০০ পোল্ডার জোন আছে নেদারল্যান্ডসে। এ ইউনিক ল্যান্ডস্কেপ পৃথিবীর মধ্যে সেরা।

পোল্ডার ল্যান্ড হচ্ছে একটি নিচু জমি, যা বাঁধ দিয়ে সমুদ্র থেকে পৃথক করা হয়েছে এবং যার বাঁধের বাইরের পানির সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই, ম্যানুয়ালি অপারেটেড ডিভাইস ছাড়া। তারা প্রথমে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে বাঁধ দিয়ে খানিকটা পানির এলাকা বা পানিসহ জমি পৃথক করে ফেলে মূল সমুদ্র থেকে; এরপর তারা ঘেরাও করা জমি থেকে পানি পাম্প করে সমুদ্রের ভেতর ফেলে দেয়। এক সময় ব্যাপকভাবে উইন্ডমিল ব্যবহার করা হতো এ কাজে। এরপর এ জমি তারা বহু বছর ফেলে রাখে। অনেক বছর ধরে ফেলে রাখার ফলে জমির লবণাক্ততা কমতে থাকে এবং জমির বালিমাটির উপর পলিমাটি জমতে থাকে। প্রথমদিকে ওই জমিতে ঘাসের চাষ করা হয়; পরে ধীরে ধীরে আবাদযোগ্য হয় জমিগুলো। এ জমিগুলো খুবই উর্বর হয়ে ওঠে দিনে দিনে এবং এভাবেই তারা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ ফুড এক্সপোর্টার হয়ে কাজ করছে।
তিন ধরনের পোল্ডার আছে নেদারল্যান্ডসে- ১. সাগর বা অন্য কোনো জলস্থান থেকে উদ্ধারকৃত জমি। যেমন লেক, নদী অথবা সমুদ্র; ২. বন্যার আশঙ্কাযুক্ত জমি, যা বাঁধ দিয়ে সমুদ্র বা নদী থেকে পৃথক করা হয়েছে; ৩. নিচু জলা-জমি, যা আশপাশের পানির উৎস থেকে পৃথক করা হয়েছে। একে জার্মান ভাষায় বলা হয় koogs।

নদী বা সামুদ্রিক বাঁধ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের অধিকাংশ ভূমি তলিয়ে যেত। দেশটির বেশিরভাগ অংশ সমুদ্র থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং এ জমিগুলো আসলে সমুদ্র সমতলের নিচে অবস্থান করছে। সমুদ্র উপকূলে নির্মিত বাঁধগুলো এ নিম্ন ভূমিগুলোকে বন্যা থেকে রক্ষা করছে। নেদারল্যান্ডস আসলে একটি নিচু ভূমির দেশ। নেদারল্যান্ডস শব্দটির অর্থই হলো নিচু ভূমির স্থান বা দেশ। তাদের মাত্র ৫০ শতাংশ জমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন ফুট উঁচুতে অবস্থান করছে। পোল্ডার ভূমি বা ল্যান্ডগুলো সবসময় পাশের সাগর বা লেকের পানির লেভেলের চেয়ে অনেক নিচে থাকে। নিচু পোল্ডার এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়ে বিভিন্ন কারণে; যেমন- বৃষ্টির পানি বা অন্যান্য উৎস থেকে পানি জমে যেতে পারে, যা পাম্প করে স্লুইস গেটের মাধ্যমে সমুদ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পোল্ডার ল্যান্ডগুলো সবসময় বন্যার ঝুঁকির মধ্যে আছে। কাজেই ডাইকগুলোকে খুবই যত্নের সঙ্গে দেখাশোনা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে বাঁধগুলোকে তৈরি করা হয়েছে ওই স্থানে পাওয়া জিনিস দিয়ে এবং প্রতিটি জিনিসেরই এক ধরনের রিস্ক রয়েছে। যেমন ডাইক তৈরিতে বালুর ব্যবহার হয়েছে কিছু এলাকায়, যা পানি শোষণ করে ডাইকের ক্ষতি করতে পারে অথবা শুকনো পিট ব্যবহার করা হয়েছে, যা পানির চেয়ে হালকা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধারণ করার ক্ষমতা হারাতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন পশু বা জলজ প্রাণী (muskrat) সুড়ঙ্গ খুঁড়তে পারে, যার ফলে বাঁধের তলা দিয়ে পানি চলে আসতে পারে। কিছু ইউরোপিয়ান দেশে এ কারণে muskrat-দের শিকার করা হয়।
পানি যখন সাগর থেকে উথলে ওঠে, তখন বাঁধকে দুর্বল করে দিতে পারে। ১৯৫৩ সালের বন্যায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয় নেদারল্যান্ডস। ফলে বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নতুন ধরনের উদ্যোগ নিতে শুরু করে ডাচরা। তারা নতুন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাঁধগুলোর ডিজাইন পরিবর্তন করে।

এখানে নেদারল্যান্ডসের ভূমিসংক্রান্ত কিছু তথ্য দেওয়া হলো- ২৬ শতাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে অবস্থান করছে। ২১ শতাংশ জনগোষ্ঠী সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের এলাকায় বাস করে। ৫০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক মিটার উপরে অবস্থান করছে। Flevoland হলো সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত পোল্ডার ল্যান্ড প্রোভিন্স, যা প্রস্তুত করা হয়েছে ১৯৮৬ সালে। একে সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১৯৫০ ও ১৯৬০ সালে।

ড. আসমা অন্বেষা : কানাডার টরন্টো প্রবাসী

 

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন