এমবেডেড জার্নালিজমের সর্বগ্রাসী নাগপাশ
jugantor
এমবেডেড জার্নালিজমের সর্বগ্রাসী নাগপাশ

  এটিএম নিজাম  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:১১:০০  |  অনলাইন সংস্করণ

বলতে গেলে আমাদের দেশে এখন এমবেডেড (পরাশ্রিত) জার্নালিজমের প্রতিযোগিতা চলছে। দিনে দিনে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে ওঠেছে এ ন্যাক্কারজনক প্রতিযোগিতা।

এ প্রতিযোগিতা এবং প্রবণতা জাতির বিবেক ও আয়না হিসাবে বিবেচিত মিডিয়া আজ পাঠক-শ্রোতা সমাজের আস্থা, বিশ্বাস ও বস্তুনিষ্ঠতা সংকটের কাঠগড়ায়। পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার অভিযোগে অভিযুক্ত। এমন পরিস্থিতি সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত গণমাধ্যম কর্মীদের ভাবমূর্তিকে ভূলুণ্ঠিত করে। এ কারণে মিডিয়া সচেতন নাগরিক সমাজের আস্থা ও বিশ্বাসেও চিড় ধরছে।

আজকাল এ আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটের দোলাচালের ঘূর্ণিপাকের মুখোমুখি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া। দু-একটি উদাহরণ ব্যতীত পৃথিবীর দেশে দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজমান।

সাংবাদিকতার সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য সাক্ষ্য দেয় যে, খবরের প্রধান উপজীব্য বিষয় হচ্ছে রাজনীতি। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত - প্রকাশিত এ সংক্রান্ত বার্তা পাঠক-শ্রোতা সমাজের হৃদয় জয় করে। সৃষ্টি হয় সত্য ও সুন্দরের পক্ষে গণজাগরণ।

আর আমাদের দেশে আজকাল খবরের প্রধান উপজীব্য সেই রাজনীতি নিয়েই রাজনীতি হচ্ছে। ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এমন ঢামাঢোলের বাহন হচ্ছে মিডিয়া।

প্রকৃত অর্থে কোনটি খবর, কোনটি খবর নয়, কোনটি দল গোষ্ঠী বিশেষের প্রচারণা, বিজ্ঞাপন, কোনটি দল গোষ্ঠী বিশেষের বিরুদ্ধে বিষোদগার অথবা কোনটি কতটুকু খণ্ডিত-বিকৃত, তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ - এ সবের কোনটিই সচেতন পাঠক ও শ্রোতা সমাজের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না।

আমাদের দেশের একেকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেন এ ধরনের প্রতিযোগিতায় মেতে দল বিশেষের মুখপাত্র ও লিফলেটে পরিণত হয়ে গেছে। পাঠক-শ্রোতারাও যেন যে যার রাজনৈতিক বিশ্বাস,অন্ধত্ব আর দাসত্বের ভাগিদার হয়ে ভাগ হয়ে পড়ছে।

এজন্যই হয়তো মার্কিন সাংবাদিক John B Buggert বলেছিলেন, ‘কুকুর মানুষকে কামড়ালে খবর হয় না- মানুষ কুকুরকে কামড়ালে এটি খবর হতে পারে’।

অন্ধভাবে দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা প্রীতি কিংবা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্য তাদের দ্বারা পরিচালিত অনৈতিক মিশনের ফোকাস আড়াল করতে গিয়ে এমনটি হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে তো এসব নিয়ে প্রায়শই লঙ্কাকাণ্ড ঘটে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়ে ওঠে এসব ঘটনা।

এমন সব ঘটনার প্রকৃত চিত্র-আদ্যোপান্ত জানতে আজকাল বিদেশি মিডিয়ার দ্বারস্থ হয় সচেতন নাগরিক সমাজ। এমন ঘটনা দেশ ও জাতির জন্যও বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক বটে।

সাংবাদিক সমাজকে এজন্য জনসমক্ষে মুখ লুকাতে হয়, অথবা লা জবাব হয়ে মুখ বন্ধ রেখে- লজ্জার ঢেঁকি গিলতে হয়।

অতি সম্প্রতিও এ ধরনের বেশ কিছু বহুল আলোচিত ঘটনার এমন পরিণতি আমাদেরকে ভুগিয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনায় সচেতন পাঠক-দর্কদের মতো আমাদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ অনুভব করেছি।

কারণ, আমাদের কিছুই করার নেই। যতদিন মিডিয়া হাউসগুলো কর্পোরেট হাউস থেকে মুক্তি না পায় ততোদিন এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ খুব সহজ কথা নয়।

অবশ্য, আজ যে মিডিয়া গুণে গোটা পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে, তার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা কানাডিয়ান যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হার্বার্ট মার্শাল ম্যাকলোহান বলেছিলেন, গ্লোবাল ভিলেজের স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে ঠিক; কিন্তু ততদিনে মিডিয়া হাউসগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। উচ্ছন্নে যাবে মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত আবেদন।

তিনি তার লিখিত ‘দ্য মিডিয়াম ইজ দ্য ম্যাসেজ’, ‘ফিগার এন্ড গ্রাউন্ড মিডিয়া’, ‘দ্য গুটেন বার্গ গ্যালাক্সি’, ‘ট্রাড অব মিডিয়া ইফেক্টস’, হট অ্যান্ড কুল মিডিয়া নামে গ্রন্থ এবং আণ্ডারস্টেন্ডিং মিডিয়া ; দি এক্সটেনশনস অব ম্যান" ইত্যাদি গ্রন্থে উপসংহারে আভাস দিয়েছিলেন - সেদিন এসব মিডিয়া হাউসের নিয়ন্ত্রণ করপোরেট প্রতিষ্ঠান গুলোর হাতে চলে যাবে।

তিনি আরও ধারণা করেছিলে, তখন হয়তো উচ্ছন্নে যাবে মূল্যবোধের সাংবাদিকতা। তবে, ম্যাকলেহান শুধু বলে যাননি- এমন নির্লজ্জ এমবেডেড জার্নালিজম এবং এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা। তবে, একথা সত্য যে পেটের,পরিবারের চাহিদা- ক্ষুধা নিবৃত করতে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নাগরিক বান্ধব ভূমিকা থেকে দিনে দিনে বিচ্যুত হচ্ছেন সাংবাদিক সমাজ।

এক সময় আমাদের অবিভক্ত ভারতবর্ষেও স্বাধীন গণমাধ্যমের বিপরীতে ইন্ডিয়া গেজেট, কলকাতা গেজেট - এমবেডেড জার্নালিজমের ভূমিকা পালন করে অনেক সত্য আড়ালের প্রয়াস কিংবা প্রভূ তুষ্টির কাজে ব্যবহার হওয়ার নজির রেখে গেছে।

অবশ্য, আজকে প্রেস ফ্রিডমের জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ই প্রথম গণমাধ্যম কর্মীদের বোকা বানিয়ে এ এমবেডেড জার্নালিজমের শিক্ষা দেয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সূত্রের এমন ধারণা রয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট পারমাণবিক এটম বোমা আবিস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। কিন্তু এর আগে থেকেই এই নিউক্লিয়ার বোমার এমন ভয়ঙ্কর সক্ষমতা - যার একটির বিস্ফোরণ কিনা লাখ লাখ মানুষের শুধু মৃত্যুই হবে না, বংশ পরম্পরায় বহন করতে হবে এর ভয়াবহ তেজষ্ক্রিয়তার অভিশাপ।

আর এ বোমাটির এমন প্রলয়ঙ্কারী রূপ আড়াল করে অসাধারণ আবিষ্কার বলে - মহিমা কীর্তনের জন্য সাংবাদিকদের দীর্ঘদিন ধরে এমবেডেড জার্নালিজমের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ানো হয়ছে।

এ কারণে বোমাটির সফল প্রয়োগের আগে থেকেই মিডিয়া কর্মীরা এমন আবিষ্কারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। লেখালেখি শুরু হয়, আহা, বিজ্ঞানীদের কতবড় আবিষ্কার?

একেকটি এটম বোমা কি-না হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, এমনকি বংশানুক্রমে থেকে যাবে প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব!

আর যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বন্ধের প্রাক্কালে ১৯৪৫ সালে ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে লিটল বয় এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে ফ্যাটম্যান নামে দু'টি নিউক্লিয়াস বোমা পরীক্ষামূলকভাবে ফেলে বিস্ফোরণ ঘটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ।

আর এ বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৭৪ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান।

পরবর্তীতে এ বোমার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া-তেজষ্ক্রিয় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ লাখ ১৪ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়। আজও সেই বোমার তেজস্ক্রিয়তার রেশে জাপানে অনেক বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়। কিন্তু গণমাধ্যমে এ বোমা আবিস্কারের অসামান্য অবদানের প্রশংসার স্তুতির ঝড়ের নিচে চাপা পড়ে আদম সন্তান হত্যাযজ্ঞের এমন নৃশংস বর্বরোচিত ঘটনাও অনেকাংশে ম্লান ঠেকে।

যে কোন বিষয় নিয়ে এমন অপরিণামদর্শী এমবেডেড জার্নালিজম যে, কত ভয়ঙ্কর এবং মানব বিধ্বংসী - এ ঘটনার চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?

সুতরাং, রাজনৈতিক চেতনা ও আদর্শ লালন করাও যে কোন শ্রেণি পেশার মানুষের মৌলিক অধিকার। মিডিয়া কর্মীরাও এর বাইরে নন।

তবে, প্রচার ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য নির্ভর নিরপেক্ষ খবরই শুধু জনকল্যাণমুখীতা এবং আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট কাটাতে পারে। আমাদের দেশের অতীত ইতিহাসও এমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার অমলিনস্বাক্ষর বহন করে।

লেখক: এ টি এম নিজাম, সাংবাদিক
ই-মেইল: atmnizam32@gmai.com

এমবেডেড জার্নালিজমের সর্বগ্রাসী নাগপাশ

 এটিএম নিজাম 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:১১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বলতে গেলে আমাদের দেশে এখন এমবেডেড (পরাশ্রিত) জার্নালিজমের প্রতিযোগিতা চলছে। দিনে দিনে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে ওঠেছে এ ন্যাক্কারজনক প্রতিযোগিতা। 

এ প্রতিযোগিতা এবং প্রবণতা জাতির বিবেক ও আয়না হিসাবে বিবেচিত মিডিয়া আজ পাঠক-শ্রোতা সমাজের আস্থা, বিশ্বাস ও বস্তুনিষ্ঠতা সংকটের কাঠগড়ায়। পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার অভিযোগে অভিযুক্ত। এমন পরিস্থিতি সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত গণমাধ্যম কর্মীদের ভাবমূর্তিকে ভূলুণ্ঠিত করে। এ কারণে মিডিয়া সচেতন নাগরিক সমাজের আস্থা ও বিশ্বাসেও চিড় ধরছে। 

আজকাল এ আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটের দোলাচালের ঘূর্ণিপাকের মুখোমুখি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া। দু-একটি উদাহরণ ব্যতীত পৃথিবীর দেশে দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজমান।

সাংবাদিকতার সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য সাক্ষ্য দেয় যে, খবরের প্রধান উপজীব্য বিষয় হচ্ছে রাজনীতি। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত - প্রকাশিত এ সংক্রান্ত বার্তা পাঠক-শ্রোতা সমাজের হৃদয় জয় করে। সৃষ্টি হয় সত্য ও সুন্দরের পক্ষে গণজাগরণ। 

আর আমাদের দেশে আজকাল খবরের প্রধান উপজীব্য সেই রাজনীতি নিয়েই রাজনীতি হচ্ছে। ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এমন ঢামাঢোলের বাহন হচ্ছে মিডিয়া।  

প্রকৃত অর্থে কোনটি খবর, কোনটি খবর নয়, কোনটি দল গোষ্ঠী বিশেষের প্রচারণা, বিজ্ঞাপন, কোনটি দল গোষ্ঠী বিশেষের বিরুদ্ধে বিষোদগার অথবা কোনটি কতটুকু খণ্ডিত-বিকৃত, তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ - এ সবের কোনটিই  সচেতন পাঠক ও শ্রোতা সমাজের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। 

আমাদের দেশের একেকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেন এ ধরনের প্রতিযোগিতায় মেতে দল বিশেষের মুখপাত্র ও লিফলেটে পরিণত হয়ে গেছে। পাঠক-শ্রোতারাও যেন যে যার রাজনৈতিক বিশ্বাস,অন্ধত্ব আর দাসত্বের ভাগিদার হয়ে ভাগ হয়ে পড়ছে। 

এজন্যই হয়তো মার্কিন সাংবাদিক John B Buggert বলেছিলেন, ‘কুকুর মানুষকে কামড়ালে খবর হয় না- মানুষ কুকুরকে কামড়ালে এটি খবর হতে পারে’। 

অন্ধভাবে দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা প্রীতি কিংবা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্য তাদের দ্বারা পরিচালিত অনৈতিক মিশনের ফোকাস আড়াল করতে গিয়ে এমনটি হয়ে থাকে। 

আমাদের দেশে তো এসব নিয়ে প্রায়শই লঙ্কাকাণ্ড ঘটে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়ে ওঠে এসব ঘটনা। 

এমন সব ঘটনার প্রকৃত চিত্র-আদ্যোপান্ত  জানতে আজকাল বিদেশি মিডিয়ার দ্বারস্থ হয় সচেতন নাগরিক সমাজ। এমন ঘটনা দেশ ও জাতির জন্যও বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক বটে।       

সাংবাদিক সমাজকে এজন্য জনসমক্ষে মুখ লুকাতে হয়, অথবা লা জবাব হয়ে মুখ বন্ধ রেখে- লজ্জার ঢেঁকি গিলতে হয়। 

অতি সম্প্রতিও এ ধরনের বেশ কিছু বহুল আলোচিত ঘটনার এমন পরিণতি আমাদেরকে ভুগিয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনায় সচেতন পাঠক-দর্কদের মতো আমাদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ অনুভব করেছি। 

কারণ, আমাদের কিছুই করার নেই। যতদিন মিডিয়া হাউসগুলো কর্পোরেট হাউস থেকে মুক্তি না পায় ততোদিন এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ খুব সহজ কথা নয়।

অবশ্য, আজ যে মিডিয়া গুণে গোটা পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে, তার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা কানাডিয়ান যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হার্বার্ট মার্শাল ম্যাকলোহান বলেছিলেন, গ্লোবাল ভিলেজের স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে ঠিক; কিন্তু ততদিনে মিডিয়া হাউসগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। উচ্ছন্নে যাবে মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত আবেদন। 

তিনি তার লিখিত ‘দ্য মিডিয়াম ইজ দ্য ম্যাসেজ’, ‘ফিগার এন্ড গ্রাউন্ড মিডিয়া’, ‘দ্য গুটেন বার্গ গ্যালাক্সি’, ‘ট্রাড অব মিডিয়া ইফেক্টস’, হট অ্যান্ড কুল মিডিয়া নামে গ্রন্থ এবং আণ্ডারস্টেন্ডিং মিডিয়া ; দি এক্সটেনশনস অব ম্যান" ইত্যাদি গ্রন্থে উপসংহারে আভাস দিয়েছিলেন - সেদিন এসব মিডিয়া হাউসের নিয়ন্ত্রণ করপোরেট প্রতিষ্ঠান গুলোর হাতে চলে যাবে।

তিনি আরও ধারণা করেছিলে, তখন হয়তো উচ্ছন্নে যাবে মূল্যবোধের সাংবাদিকতা। তবে, ম্যাকলেহান শুধু বলে যাননি- এমন নির্লজ্জ  এমবেডেড জার্নালিজম এবং এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা। তবে, একথা সত্য যে পেটের,পরিবারের চাহিদা- ক্ষুধা নিবৃত করতে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নাগরিক বান্ধব ভূমিকা থেকে দিনে দিনে বিচ্যুত হচ্ছেন সাংবাদিক সমাজ। 

এক সময় আমাদের অবিভক্ত  ভারতবর্ষেও স্বাধীন গণমাধ্যমের বিপরীতে ইন্ডিয়া গেজেট, কলকাতা গেজেট - এমবেডেড জার্নালিজমের ভূমিকা পালন করে অনেক সত্য আড়ালের প্রয়াস কিংবা প্রভূ তুষ্টির কাজে ব্যবহার হওয়ার নজির রেখে গেছে।          

অবশ্য,  আজকে প্রেস ফ্রিডমের জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ই প্রথম গণমাধ্যম কর্মীদের বোকা বানিয়ে এ এমবেডেড জার্নালিজমের শিক্ষা দেয়। 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সূত্রের এমন ধারণা রয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট পারমাণবিক এটম বোমা আবিস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। কিন্তু এর আগে থেকেই এই নিউক্লিয়ার বোমার এমন ভয়ঙ্কর সক্ষমতা - যার একটির বিস্ফোরণ  কিনা লাখ লাখ মানুষের শুধু মৃত্যুই হবে না, বংশ পরম্পরায় বহন করতে হবে এর ভয়াবহ তেজষ্ক্রিয়তার অভিশাপ। 

আর এ বোমাটির এমন প্রলয়ঙ্কারী রূপ আড়াল করে অসাধারণ আবিষ্কার বলে - মহিমা কীর্তনের জন্য সাংবাদিকদের দীর্ঘদিন ধরে এমবেডেড জার্নালিজমের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ানো হয়ছে। 

এ কারণে বোমাটির সফল প্রয়োগের আগে থেকেই মিডিয়া কর্মীরা এমন আবিষ্কারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। লেখালেখি শুরু হয়, আহা, বিজ্ঞানীদের কতবড় আবিষ্কার? 

একেকটি এটম বোমা কি-না হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, এমনকি বংশানুক্রমে থেকে যাবে প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব!

আর যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বন্ধের প্রাক্কালে ১৯৪৫ সালে ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে লিটল বয় এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে ফ্যাটম্যান নামে দু'টি নিউক্লিয়াস বোমা পরীক্ষামূলকভাবে ফেলে  বিস্ফোরণ ঘটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । 

আর এ বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৭৪ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান। 

পরবর্তীতে এ বোমার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া-তেজষ্ক্রিয় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ লাখ ১৪ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়। আজও সেই বোমার তেজস্ক্রিয়তার রেশে জাপানে অনেক বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়। কিন্তু গণমাধ্যমে এ বোমা আবিস্কারের অসামান্য অবদানের প্রশংসার স্তুতির ঝড়ের নিচে চাপা পড়ে আদম সন্তান হত্যাযজ্ঞের এমন নৃশংস বর্বরোচিত ঘটনাও অনেকাংশে ম্লান ঠেকে। 

যে কোন বিষয় নিয়ে এমন অপরিণামদর্শী এমবেডেড জার্নালিজম যে, কত ভয়ঙ্কর এবং মানব বিধ্বংসী - এ ঘটনার চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?

সুতরাং, রাজনৈতিক চেতনা ও আদর্শ লালন করাও যে কোন শ্রেণি পেশার মানুষের মৌলিক অধিকার। মিডিয়া কর্মীরাও এর বাইরে নন। 

তবে, প্রচার ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য নির্ভর নিরপেক্ষ খবরই শুধু জনকল্যাণমুখীতা এবং আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট কাটাতে পারে। আমাদের দেশের অতীত ইতিহাসও এমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার অমলিন স্বাক্ষর বহন করে।               

লেখক: এ টি এম নিজাম, সাংবাদিক
ই-মেইল: atmnizam32@gmai.com  

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন