দাদুভাই ও নীল কালির ছন্দ
jugantor
দাদুভাই ও নীল কালির ছন্দ

  স্বপন কুমার কুণ্ডু  

১০ অক্টোবর ২০২১, ২০:০৬:৪২  |  অনলাইন সংস্করণ

‘টেবিলের ওপর অনেকগুলো মেকআপ করা পাতা। একটির ওপর তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পাতাজুড়ে ঘুরছে তার অভিজ্ঞ ও অনুসন্ধিৎসু চোখদুটি। মুহূর্তের মধ্যে সজ্জিত পাতাটি তার নীল কালির ছন্দময় আঁকিবুকিতে ভরে গেল। হয়ে উঠল যেন কোনো শিল্পীর রঙ-তুলির ক্যানভাস। পরিস্ফুটিত হলো একটি পূর্ণাঙ্গ যথার্থ সুসজ্জিত পাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাটাকুটির পর তার কবিতা যেমন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতো।’ যাঁর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সজ্জিত পাতাটির সজ্জা পূর্ণতা পেল, হয়ে উঠল যথার্থ- তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় ‘দাদুভাই’। দেশের অন্যতম বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদুভাই। তিনি একাধারে ছড়াকার, সাংবাদিক, লেখক ও শিশুসংগঠক। এতোগুলো পরিচয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সফল এবং সমহিমায় ভাস্বর। ছড়াকার হিসাবে তিনি যেমন অতুলনীয়, সাংবাদিকতায় তার দক্ষতা প্রবাদতুল্য। লেখক ও শিশুসংগঠক হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্তপ্রতীক দাদুভাইয়ের খুরধার লেখনী সর্বমহলে প্রশংসিত। তার দ্বেষ-হিংসামুক্ত অমায়িক ব্যবহার সবাইকে আকৃষ্ট করে। সব বয়সের মানুষকে আপন করে নেওয়ার যাদু আছে তার। সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি সবাইকে কাছে টেনে নেন, আপন করে নেন। সবার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আমাদের দাদুভাই’।

দেশে অনেক ছড়াকার, প্রথিতযশা সাংবাদিক, শিশু সাহিত্যিক, নামকরা সংগঠক, নাট্যকার ও গীতিকার আছেন। কিন্তু কয়জন আছেন একই সঙ্গে ছড়াকার, সাংবাদিক, সংগঠক, নাট্যকার ও গীতিকার। একমাত্র দাদুভাই-ই এসবগুণের অধিকারী। এই ছড়াটিতে দাদুভাইয়ের পরিচয় স্পষ্ট- ‘সমাজের কাছে তার ছড়া দায়বদ্ধ/আশিতেও তরতাজা নন বুড়োহদ্দ/এখনো চিবোতে মন গরু আর মাটনে/নিবেদিতপ্রাণ আজও শিশু সংগঠনের।/একাধারে গীতিকার নাটকে দক্ষ/সংবাদ-ফিচারেও খুবই পরিপক্ক/তার ছড়া মুখে যত্র ও তত্র/দাদুভাই মানে এক ছড়া নক্ষত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-২৯]।

এশিয়ায় শিশুদের সংবাদপত্র ও শিশু সাংবাদিকতার পথিকৃত দাদুভাই বাংলাদেশের ফিচার এডিটরদের মধ্যে কিংবদন্তি। লম্বা, ফর্সা ও সদা হাস্যময় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দাদুভাই আগামী প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় ও উজ্জ্বল নক্ষত্র। একজন বিনয়ী, সজ্জন ও হৃদয়বান বন্ধুবৎসল মানুষ তিনি। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে সৃজনশীল, মানবিক ও জ্ঞানদীপ্ত সমাজগঠনের মানসে তিনি লিখেছেন, বিশেষ করে ছোটদের জন্য। তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া, গান ও নাটক। তার লেখায় জীবনের দুঃখ-সুখ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ক্ষোভ-জ্বালা সবকিছুই বিমূর্ত হয়ে ওঠে। তার অধিংকাশ লেখাই কালোত্তীর্ণ।

বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক দাদুভাইয়ের জন্ম রংপুরে ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। ১৯৬৩ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি গ্রাজুয়েট হন। তার বাবার নাম ইয়াছিন আহম্মদ ও মায়ের নাম রহিমা খাতুন। তার পৈত্রিক নিবাস রংপুর শহরের কামালকাচনায়। তবে আদিনিবাস পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার শহরে।

বাংলা সংবাদপত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দাদুভাই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬১ সালে দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর দৈনিক জেহাদ, অর্ধ-সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক পয়গাম, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা ও দৈনিক জনতা, আজাদ, লালসবুজে কাজ করেছেন। ১৯৬৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বদেশ ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে সেখানে তিনি ফিচার এডিটরের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে সরকারি পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা’ বের হলে সেখানে তিনি কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। দৈনিক রূপালী পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসাবে দায়িত্বপালনকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুদীর্ঘ ৫৯ বছর তিনি সাংবাদিকতার পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক দাদুভাই দীর্ঘদিন সংবাদ সম্পাদনা করেছেন। তার হাতের স্পর্শে একটি সংবাদের শিরোনাম এক মুহূর্তে হয়ে উঠত আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। তার কলমের নীল কালিতে সংবাদের খোলনলচে পাল্টে পরিশোধিত রূপ নিত। এক দলা নরম মাটি দিয়ে শিল্পী যেমন গড়েন সুন্দর ও আকর্ষণীয় মূর্তি, তিনিও তেমনি একটি অগোছালা ও অবিন্যস্ত সংবাদকে গড়ে তুলতেন পাঠ্যযোগ্য ও সরস। কখনো ভালো শিরোনামের জন্য তিনি সংবাদ-সূচনা পরিবর্তন করতেন। সংবাদ-জ্ঞানের (নিউজ সেন্স) আলোকে তার জহুরি চোখ সংবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ঠিকই খুঁজে পেত। সেটি যে অনুচ্ছেদেই থাকুক না কেন। তথ্যসমূহ পর্যায়ক্রমে সজ্জিত করতে গিয়ে তিনি সংবাদ কপিটি বেশ কাটাকুটি করতেন। কখনো জটিল ও অনুপযুক্ত শব্দ বাদ দিয়ে তিনি মানানসই ও যথার্থ শব্দ বসিয়ে দিতেন। কখনো জটিল বাক্য বাদ দিয়ে তিনি সহজ-সরল বাক্য লিখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ নিচ থেকে তুলে নিয়ে উপযুক্ত স্থানে বসাতেন। আবার কখনো পুরো একটি অনুচ্ছেদই বদলে দিতেন। কপির মার্জিনে নতুন শব্দ বা বাক্য তিনি মুক্তাক্ষরে লিখতেন। তার পরিচ্ছন্ন সম্পাদনায় সংবাদ-কপি শৈল্পিক হয়ে উঠত। তার সম্পাদিত কপি নিয়ে কখনো সম্পাদনা-সহকারীদের সমস্যায় পড়তে হয় না। নীল কালির আঁচড় টেনে তিনি এমন স্থানে এমনভাবে লেখেন যাতে কারো বুঝতে অসুবিধা না হয়। ফলে তার সম্পাদিত কপিটি নীল কালির ছন্দে ভরে উঠে। কালো কালিতে প্রিন্ট করা সংবাদ-কপি অন্যরা লাল কালিতে সম্পাদনা করলেও দাদুভাই নীল কালি ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। দাদুভাইয়ের ভাষায়, ‘সম্পাদনা-সহকারীরা (রিডার) লাল কালি ব্যবহার করেন। আর সম্পাদক হিসাবে তিনি নীল কালি ব্যবহার করেন। কারণ কম্পিউটার অপারেটরা যাতে বুঝতে পারেন সম্পাদক কী সম্পাদনা করেছেন।’ দাদুভাইয়ের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অনেক জটিল, দুর্বোধ্য ও অপাঠ্যযোগ্য ফিচারও পূর্ণতা পায়। ফিচারে তিনি কখনো বিষয়বস্তু সম্পর্কিত কোনো বিখ্যাত কোনো কবিতার দু’একটি লাইন অথবা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির যথার্থ ও মানানসই উক্তি যুক্ত করেন। তার সম্পাদনার গুণে অনেক অখাদ্য ফিচার ও প্রতিবেদনও পুরস্কৃত হয়েছে। দাদুভাই কপি সম্পাদনা করতে গিয়ে কখনো বিরক্ত হন না। বরং সব সময় সস্নেহে লেখককে লেখার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে তিনি পুরো লেখাটাই সংশোধন করে দেন।

১৯৬৯ সাল থেকে তিনি পৃষ্ঠাসজ্জা (পেজ মেকআপ) করেছেন। শিফ্ট-ইনচার্জ হিসাবে দৈনিক পূর্বদেশে তিনি পৃষ্ঠাসজ্জা করতেন খুবই দক্ষতার সঙ্গে। প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানীর ভাষায়, ‘লাল-নীল কলম দিয়ে রফিক আঁকাআঁকি করত। সুন্দর মেকআপের জন্য আকর্ষণীয় হেডিং দিত। এসব কাজে তার সৃজনশীলতা ও পারঙ্গমতা ছিল।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৮]।

সমকালিন বাংলা ছড়া জগতের প্রতিভূ দাদুভাই ছড়ার রাজ্যে মহানন্দে ঘুরে বেড়ান। প্রায় ছয় দশক ধরে ছোট ও বড়দের জন্য তিনি ছড়া লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অকাতরে যুক্ত হচ্ছে তার বিভিন্ন মাত্রার অসংখ্য ছড়া। বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে তিনি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শিশুতোষ বিষয়ের পাশাপাশি তার ছড়ায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, বিভিন্ন ক্রান্তিকালের উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রসঙ্গও স্থান পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জ্বীবিত দাদুভাই স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

স্বভাব ছড়াকার দাদুভাইয়ের ছড়া ছবির মতো। পড়তে পড়তে মন কখনো আনন্দে ভরে যায় ও আশায় উজ্জীবিত হয়। আবার কখনো মন বেদনায় ভারি হয়ে ওঠে। তার ছন্দজ্ঞান ও বিষয় বৈচিত্র্য তুলনাহীন এবং শব্দের ব্যবহার অভিনব। তার ছড়ায় পাওয়া যায় বর্ণের অনুপ্রাস শব্দের গাঁথুনি, অন্ত্যমিল ও ছন্দের কারিগরি। সব মিলিয়ে তাকে বলা যায় ছড়ার যাদুকর। দাদুভাইয়ের ছড়া সম্পর্কে গীতিকবি ও ছড়ালেখক আহমেদ কায়সারের ভাষায়- ‘বিষয় যত কঠিনই হোক/কিংবা সহজ অতি/থামতে কেউ দেখেনি তার/ছড়া লেখার গতি।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৫২]।

অসাধারণ ছড়াকার দাদুভাইয়ের হাতে ছড়ার ছন্দ ফুটে উঠে নিপুণতায়। তার ছড়ার আড়ালে দেশ, সমাজ তথা রাজনীতির চরম ও পরম সত্যের প্রকাশ ঘটে। যেমন- ‘ঘুড়ি বলল, উড়ি?/দূর আকাশে,/দেখাই কারিকুরি?/সূতা বলল,/ওড়ো,/হাওয়ায় ভেসে/মনের সুখে ঘোরো!/লাটাই বলে,/দাঁড়া,/সূতা ছিঁড়লে/ঘুড়ির কম্ম সারা!/নামল হঠাৎ/ বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি/অমনি খতম/ঘুড়ির বাহাদুরি।’

সুকুমার রায় এবং অন্নদাশঙ্কর রায় উভয় ধারাতেই দাদুভাইয়ের ছড়া সমান তালে পথ চলে। তার ছড়ায় বক্তব্যের স্পষ্টতা ও কৌতুকরসের প্রয়াস দুই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলা ছড়ার দুই দিকপালই কল্পনাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন দুই রূপে। সুকুমার রায় উদ্ভটরসের সৃষ্টিতে এবং অন্নদাশঙ্কর রায় বক্তব্যের ইঙ্গিতময়তায়। অথচ দাদুভাইয়ের দুই দিকেরই প্রয়াস আছে। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৬৭]। দাদুভাই নিজেই বলেছেন- ‘আবহমান ছড়ার যে রূপ আর ঢঙটি আমাকে বশিভূত করে রেখেছে সে বশ্যতা আমি কোনোদিন অস্বীকার করতে পারব না।’

আত্মকথন ও অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য বাঁধনে দাদুভাইয়ের ছড়া জড়িয়ে থাকে। তিনি হৃদয় দিয়ে ছড়া বানাতেন। কখনো শুদ্ধ বাংলায়, আবার কখনো রংপুর বা দেশের কোনো আঞ্চলিক ভাষায়। তিনি লেখেন- ‘গ্রামের নাম হিজুলী/ঝড়ের রাতে বিজুলী/রাত থম থম সরোবর/সুখ-দুঃখে কুঁড়েঘর।/বলতো ওমা হিজুলী/আমার জন্য কী থুলি?/আমার একটি পাখি ছিল/পাখিটার নাম ময়না/গান করতো, মান করতো/রাগলে কথা কয় না।/দুঃখ ব্যথায় জ্বলে জ্বলে/বুকটা যখন ঝাঁঝরা/পালিয়ে গেল সেই সে পাখি/ভেঙে খাঁচার পাঁজরা।’ [আমার ছড়া, পৃষ্ঠা-৩১]।

দাদুভাইয়ের ছড়া সমাজ-সচেতন। ছড়ায় তার কর্মজীবনের চিত্র ফুটে ওঠে। সামাজিক দায়িত্ব থেকেই তার কলমে মাঝে-মাঝে পরিস্ফুটিত হয় সামাজিক অসঙ্গতির আখ্যান। তার ছড়ায় এসেছে যানজট, লোডশেডিং ও বৃষ্টিতে ঢাকার দুরবস্থার চিত্র। ঢাকা বিষয়ক তার লিমেরিক ‘ঢামেরিক’ খুবই অর্থবহ। ঢামেরিকের ছড়া- ‘বুড়িয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা/বাড়ছে বহর ঢাকার/চলছে নদীর বাটোয়ারা/খেলটা অঢেল টাকার।/হায়, প্রকৃতির এই পরাজয়/নদীর বুকে রোজ জমা হয়/রাসায়নিক বর্জ্য সমেত আবর্জনা ঢাকার।’ অথবা ‘এক পশলা বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি ছাড়া ঢাকা/নদীর দেখার কষ্ট কি আর, স্পট করে তাকা-/এমন সুখের এ রাজধানী/মেইন সড়কে কোমরপানি/ডুব দিয়ে খুব টোকাইরা বেশ হয় সাঁতারু পাকা।’ এ দুটি ছড়ায় ঢাকার বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছে। সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দাদুভাই ছড়া লিখতেন। তার ছড়া নিজের জীবনের সঙ্গে এবং সমকালীন সংগ্রাম-ভাবনার সঙ্গে একাত্ম। ‘দাদুভাই ছড়া লেখেন না, ঐশ্বরিকভাবে ছড়া বানান। যেমন শব্দের ব্যবহার করেন, তেমনি ছন্দেরও ব্যবহার করেন। তার ছড়ার আঙ্গিক বিন্যাস আরও ভিন্নতর। সবকিছু মিলিয়েই তার ছড়া বাংলার ছড়া হয়ে ওঠে।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১০০]।

দাদুভাইয়ের ছড়ায় দেশ, মানুষ, রাজনীতি, সমাজ সবই বলিষ্ঠভাবে ফুটে উঠে। তিনি লিখেছেন- ‘গিন্নি এবার শিন্নি দেব দরগায়/তিনকুড়ি ধান পেলাম কিনা বরগায়।/নথ দেব যে পথ খোলা নেই/রাগ করো না ময়না,/কিনে দেব মিলের শাড়ি/ইমিটেশন গয়না/বাজারে যে আগুন কেবল বাড়ছে/বর্গিরা সব মুখের আহার কাড়ছে।’ [আগুন : বর্গি এলো দেশে]।

বাংলা ছড়া জগতে এক দ্যুতিময় নাম রফিকুল হক দাদুভাই। প্রাচীন লোকছড়ার আদলটি তার যাদুস্পর্শে নতুন রূপে আধুনিক অবয়ব নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। তার লেখনিতে থাকে প্রাচীনের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন। দাদুভাইয়ের ভাষায়- ‘ছড়া তো সময়ের ছবি। কালজয়ী ছড়াগুলোতে বাঁধা পড়ে আছে ইতিহাস। প্রাচীনকালের এক একটা ছড়ার অবয়বে তৎকালিন মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার সমাজ এবং সামাজিকতার অবিকল রূপটি খুঁজে পাই আমরা। ইতিহাসের পালা বদলের পালা চলছে যুগ যুগ ধরে। সেকালের মানুষগুলো নেই। সমাজ ও সামাজিকতারও রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু, ছড়া জয় করেছে সময়ের গণ্ডিকে, কালের বিবর্তনকে।’ দাদুভাইয়ের ‘বর্গী এলো দেশে’ মূলত এই ভূখণ্ডের একটি সময়ের সমাজচিত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১১৬]। দাদুভাই লিখেছেন- ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/বর্গী এসে দেশ ছেয়েছে/অনেক দিনের কথা/ঘাটতি আজও হয়নি পূরণ/তাই কি নীরবতা?/শালিধানের চিড়ে/বিন্নি ধানের খই/উড়কি ধানের মুড়কি মুড়ি/ডালা মা তোর কই?/কাঁদিস নে মা/আশিস দে মা/খুঁদ কুড়নির ঝি/আবার ডালা ভরব বলে/আমরা এসেছি।’ [আমরা এসেছি, পৃষ্ঠা-৫০]। সমাজের নিুস্তরের মানুষের দৈনন্দিন টানাপোড়নের বাস্তবতার চিত্র তার ছড়ায় ফুটে ওঠেছে। তার ছড়ায় আছে বাস্তবতার ছোঁয়া। যেমন- ‘পাবনা থেকে ভাবনা নিয়ে এলেন তিনি ঢাকা/শুনেছিলেন এই নগরে হাওয়ায় উড়ে টাকা/মনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে/টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে/মস্ত ভুলের আঁস্তাকুড়ে পড়ে গেলেন ঢাকা।’

সমাজ সচেতনতামূলক ও রাজনীতি সচেতন অনেক ছড়া লিখেছেন দাদুভাই। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এ ঘটনা নিয়ে পূর্বদেশ পত্রিকায় দাদুভাই ছড়া লেখেন- ‘ছেলে ঘুমোলো বুড়ো ঘুমোলো/ভোলা দ্বীপের চরে/জেগে থাকা মানুষগুলো/মাতম শুধু করে/ঘুমো বাছা ঘুমো রে/সাগর দিল চুমো রে/খিদে ফুরোলো, জ্বালা জুড়োলো/কান্না কেন ছি!,/বাংলাদেশের মানুষ বুকে/পাষাণ বেঁধেছি।’ সম্পাদকীয় পাতায় ‘গোর্কি ৭০’ নামে ছড়াটি ছাপা হলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বিবরণ দিতে গিয়ে কলকাতার বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমায়’ ছড়াটি প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় তার ভরাট কণ্ঠে ছড়াটি আবৃত্তি করেন। ছড়াটিতে দাদুভাই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের নাম বদলে ‘বাংলাদেশ’ নামটি ব্যবহার করেন। পরে যা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বহু লেখক ও কবি অনুসরণ করেন। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, পৃষ্ঠা-১৫]।

নাগরিক জীবনের বহুবিধ যন্ত্রণা নিয়ে আমাদের টিকে থাকতে হয়। ঢাকা শহরে চলাফেরায় মাঝে মাঝে থাকে না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। ভিড়ের ঠেলায় বাসে ওঠা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঢাকা শহরের পাবলিক বাসের করুণ ও বাস্তব চিত্র দাদুভাইয়ের ছড়ায় ওঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন- ‘লোকাল বাসে বাদুড় ঝোলা প্রচণ্ড ভিড় থাকায়/ছিনিয়ে নিল হাতঘড়িটা কি জানি কোন কাকায়।’ [হ্যাঁচকা টানে : ঢামেরিক]।

সমকালিন ছড়া সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত দাদুভাই। সমাজে যুগ যুগ ধরেই হরিলুটের ঘটনা ঘটছে। তার ছড়ায় সেই হরিলুটের চিত্র স্পট হয়ে ফোটে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ‘বালিশ’ কেলেংকারি নিয়ে তিনি চমৎকার ছড়া লিখেছেন। ২০১৯ সালের ২৬ মে দৈনিক যুগান্তর-এর রোববারের সাময়িকী ‘বিচ্ছু’তে তার নিয়মিত ছড়া ‘রফিকুল হক দাদুভাইয়ের কুট্টুস’-এ তিনি লেখেন ‘জয়, বালিশের জয়’ ছড়া। ‘নালিশ করে বালিশ পাবি’/ছেলেবেলার স্মৃতি,/বালিশটা তো কথার কথা/মূল ছিল ঢের প্রীতি।/ও মনু তোর কোন দেশে ধাম/এক বালিশের কয় টাকা দাম/বালিশে কী হয়?/শুনুন কী কয় প্রাণীবিদরা,/‘বালিশে হয় সুখনিদ্রা/জয়, বালিশের জয়!’/বালিশ যখন ছয়হাজারী/নয় তো বালিশ হাটবাজারী/ বালিশ তখন খাঁটি,/কী কারণে মনের ভুলে/বালিশ নিয়ে নালিশ তুলে/করছো জীবন মাটি!/বালিশ নিয়ে নালিশ ওঠে/দেশের মানুষ কাঁদে/আটশ’ টাকায় একটা বালিশ/যখন ওঠে ছাদে।’ ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, ধ্বনির মধ্য দিয়ে ছড়াকে তিনি সাবালক করে তোলেন। অনাচার, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার ছড়ায় থাকে ছন্দিত ঝংকার। তার লেখায় দৈনন্দিন রোজনামচার মতো অন্যায়ের প্রতিবাদ ধ্বনি উঠে এসেছে। সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে যা থেকে যাবে অনাগত দিনগুলোতে। তার ‘মা- গো আমার’ ছড়া ফুটে ওঠে- ‘সারাজীবন বুকের জ্বালা/কাঁদলি মা তুই বারবার/আর কতকাল দেখবি মা গো/হরিলুটের কারবার।’

দাদুভাইয়ের প্রকাশনা সামান্য হলেও ছড়ার জগতে তিনি অসামান্য। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে দুই বাংলাজুড়ে তার খ্যাতি। দুই বাংলা থেকেই তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সংবর্ধনা। শিশুসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ফেলোশিপ (২০০৯), শিশু একাডেমি পুরস্কার (২০০৯), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৪০৫ বঙ্গাব্দ), নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সম্মাননা (২০০৬), স্ক্রোল অব অনার (২০০৫), অনেক অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। ‘তবে পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিশ্চয়ই যে কোনো লেখক, সংগঠকের কাছে অনেক বেশি সম্মানের। সুদীর্ঘকাল শিশু সংগঠন ও সম্পাদক এবং পরিচালক-সাহিত্যিক-ছড়াকার হিসেবে দাদুভাই তো রাষ্ট্রীয় সম্মান পেতেই পারেন। কিন্তু আজও তিনি পাননি, যা দুঃখজনক।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, কামাল লোহানী, পৃষ্ঠা-২০]। ১৯৯৬ সালে দাদুভাইয়ের ৮০তম জন্মদিনে স্মারকগ্রন্থ ‘হাসিতে হাসিতে আশিতে’ প্রকাশিত হয়।

দাদুভাইয়ের বিষয় বর্ণনা-ভঙ্গিমা একেবারেই তার নিজস্ব। শিশু উপযোগী সহজ শব্দ ও বাক্যে ছন্দের দোলা খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- ‘পুঁ ঝিক্ ঝিক্/পুঁ ঝিক্ ঝিক্/দেশ ঘুরবি/চল নির্ভীক।/ধাক ধিং ধিং/ময়মনসিং/থাম গল্প/আর অল্প।’ তার লেখায় উপস্থাপনা নির্মেদ ও ঝরঝরে। উপমা প্রয়োগেও তিনি অনায়াসলব্ধ দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন।

পশুপাখীদের কাল্পনিক কথোপকথনে তার সরস রসিকতার ছোঁয়া পাঠকের মনে আনন্দ দেয়। তার ছড়াগুলো সহজবোধ্য বলেই কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয়। তিনি লিখেছেন- ‘বিল্লি বলে, ম্যাঁও/জলদি করে/শুঁটকি পোড়া/আইন্যা মোরে দ্যাও!/একটি চালের/কণা এনে/মুরগি বলে, ন্যাও।’ [পুসি, পান্তা ভাতে ঘি]। মাঝে-মধ্যে তিনি কিছু উদ্ভট (ননসেন্স) শব্দও ব্যবহার করেন। যেমন- ‘পেংটি/ ঝেংটি/ফট্টিফোর,/পোক্ত/শক্ত/হাড্ডি তোর।/আলতু/ফালতু/ডান্ডাবাজ/বাদ দে/ভাত দে/আন্ডা ভাজ।’

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দাদুভাই-ই দেশে প্রথম ছড়া লেখেন। লন্ডনে চিকিৎসা শেষে ১৯৭২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন। সেদিনের পূর্বদেশে বিশেষ সংখ্যা বের হয়। এই বিশেষ সংখ্যার নামকরণ করা হয় দাদুভাইয়ের ছড়া ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু বইসো শূন্য পিঁড়ায়’ শিরোনামে। ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু/পাইতা থুইছি পিড়া,/জলপান যে করতে দেব/ইরি ধানের চিড়া।/শালি ধানের চিড়া ছিল/বিন্নি ধানের খই,/কোথায় পাবো শবরীকলা/গামছা বাঁধা দই!/জান মেরেছে খান পশুরা/বর্গী সেজে ফের/আগুন জ্বেলে খাক করেছে/দেশটা আমাদের।/প্রাণের বন্ধু ঘরে আইলা/বসতে দিমু কিসে;/বুকের মধ্যে তোমার বাণী/রক্তে আছে মিশে।/বঙ্গবন্ধু তোমার আসন/বাংলাদেশের মাটি/মনের মধ্যে পাতা আছে/প্রীতির শীতলপাটি।’ ছড়াটি সেদিন দেশবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছিল।

দাদুভাই একজন স্বনামধন্য গীতিকার ও নাট্যকার। তিনি কালজয়ী গান লিখেছিলেন। মরমী সংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের কণ্ঠে তার লেখা ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা,/কোন দূরে যাও চইলা’ আজও গ্রাম বাংলার মানুষের প্রিয় গান। টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত তার অসংখ্য শিশুতোষ নাটক ও গান দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)’ তার প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘নতুন বাড়ি’ প্রচারিত হয়। তার উল্লেখ্যযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’, ‘ঘরে-বাইরে’। বিটিভিতে তিনি শিশু-কিশোরদের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘অঙ্কুর’ পরিচালনা করেছেন। তিন বছর ধরে চলা অঙ্কুরের পরিকল্পনা ও রচনা ছিল তারই। শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি শুধু ঘুমপাড়ানিয়া গান লেখেননি, বরং লিখেছেন ঘুম ভাঙানোর গান।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লঙ্ঘিত হলে পূর্বদেশ পত্রিকা গর্জে ওঠে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় পাতায়, কলামে কলামে গণমানুষের প্রতিবাদী গর্জন ফুটে উঠতো। সাংবাদিক কামাল লোহানির ভাষায়, ‘সেসব দিনে পূর্বদেশের অসাধারণ ভূমিকা ছিল। আর এর একজন সেনানী ছিলেন রফিক। সেদিনের গণমাধ্যমের সাহসি ভূমিকা আমাদের মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেটা অনস্বীকার্য।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৯]।

ছড়াকার ছাড়াও দাদুভাইয়ের আরেকটি পরিচয় তিনি একজন সফল সম্পাদক। ভারতীয় উপমহাদেশের ছোটদের প্রথম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন অনন্য প্রেরণা সৃষ্টিকারী দাদুভাই। দৈনিক বাংলা ভবন থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কিশোর বাংলা’ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বাংলা সাংবাদিকতার এক অভিনব সংযোজন। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৫৩]।

আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে দাদুভাই কাজ করেছেন। সারা দেশে তার অগণিত অনুরাগী রয়েছে। কিশোর বাংলায় তার ‘প্রীতি নিও’ পৃষ্ঠাটির জন্য তৎকালিন পাঠকদের কাছে তিনি খুবই প্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রীতিময় ভাষায় কত উপদেশ দিতেন তিনি। কিন্তু এমন মিষ্টি করে এমন কৌতুকময় আবহ বজায় রেখে কথাগুলো লিখতেন যে ছোটরা পটে যেত। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৬৪]।

শিশুসাহিত্য রচনা এবং সংগঠন গড়া দাদুভাইয়ের কাজের অংশ হয়ে উঠেছিল। দৈনিক পূর্বদেশের ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’ তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন। শিক্ষণীয় লেখা, ছড়া-কবিতা ও মজার গল্পে পাতাটি তিনি সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতেন। চাঁদের হাটের প্রথম ও শেষ পরিচালক/সম্পাদক ছিলেন রফিকুল হক দাদুভাই। দীর্ঘকাল চাঁদের হাটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনি ‘দাদুভাই’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া খেলাঘর শিশু সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা লগ্নে তার বিশেষ অবদান ছিল। তিনি ‘মুকুল ফৌজ’-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন।

সংবাদপত্রের সাময়িকী সম্পাদনা দাদুভাইয়ের পেশা। এ কারণে তার অনেক লেখকের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বহু নতুন লেখক তার হাতে ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে। তিনি একজন মানুষ গড়ার মহান কারিগর। তিনি নিজে যেমন সৃজনশীল তেমনি যে কোনো সৃজনশীল কর্মে তার সমান উৎসাহ-উদ্দীপনা। তার অনুপ্রেরণায় বিকশিত একদল শিষ্য বর্তমান সমাজের নানা স্তরে অবদান রাখছেন। এ সময়ের অনেক খ্যাতিমান লেখক, কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী তার হাতের সৃষ্টি।

দাদুভাই যেমন বর্তমানের সময়ের নামডাকওয়াল সাংবাদিক, ছড়াকার সাহিত্যিকদের গুরু। তিনিও তেমনি আবদুল গাফফার চোধুরী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, এহ্তেশাম হায়দার চোধুরী, কামাল লোহানী, ফয়েজ আহমদ, আবদুল গণি হাজারী, কেজি মোস্তফার মতো প্রথিতযশা সাংবাদিকদের শিষ্য। ছড়াকার সায়কা বানুর ভাষায়- ‘তার গুরুরা অনেক নামি/শিষ্যরা সব মানুষ দামি/তার তুলনা তিনি,/চাঁদের হাটে মনের সুখে/করেন বিকিকিনি।/দুঃখ পেলেও হাসেন/ঠিক বলে যাই/সেই দাদুভাই কেবল ভালোবাসেন।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৮৯]।

দাদুভাইয়ের শিষ্যদের মধ্যে অনেকে বর্তমান সময়ের নামিদামি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ছড়াকার ও সরকারি-বেসরকারি বড় আমলা। তাদের মধ্যে দৈনিক কালেরকণ্ঠের সম্পাদক ও খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, মানবকণ্ঠ সম্পাদক মাহমুদ আনোয়ার হোসেন, পিআইবির সাবেক ডিজি শাহ আলমগীর, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, অভিনেতা আফজাল হোসেন, সাংবাদিক আবু হাসান শাহরিয়ার, আহমদ ফারুক হাসান, রশিদুন নবী বাবু, বিনোদন সাংবাদিক আলিমুজ্জামান, বিনোদন ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত, রাজনীতিবিদ ও সিলেটের সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী ইমাম, ছড়াকার আনজীর লিটন, কবি কাজী রোজী, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, কবি আসলাম সানি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুর রহমান। তার শিষ্যদের মধ্যে আরও রয়েছেন- আখতার হুসেন, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম, দিদারুল আলম, মাহমুদ দিদার, দিদার চৌধুরী, আবদুল লতিফ খান, শামীমউদ্দিন শামীম, শাহানা বেগম, হামিদা খানম, নাসরিন জাহান, এনায়েত রসুল, রোকেয়া খাতুন রুবী, মুনা মালতী প্রমুখ। শিষ্যদের সম্পর্কে জ্যোর্তিময় দাদুভাইয়ের বক্তব্য, ‘যাদের নিয়ে চাঁদের হাট শুরু করেছিলাম, তারা এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রেরণা ও ভালো কাজের ইন্ধন জুগিয়ে যাদের অন্তরে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলাম, তারা এখন দাবানলে পরিণত হয়েছে। আমার তেমন প্রাপ্তি না থাকলেও আনন্দ অনেক। কেননা আমার ‘চাঁদের হাট’ থেকে এমন সব রত্ন বেরিয়ে এসেছে।’

দাদুভাইয়ের ৮০তম জন্মদিনে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘দাদুভাই না থাকলে ইমদাদুল হক মিলন নামে কোনো লেখকের জন্ম হতো না। তিনি চিরনবীন বিস্ময়কর এক মানুষ। অনেকগুলো আলোকস্তম্ভ তিনি তৈরি করেছেন। চাঁদের হাট না থাকলে সেটা সম্ভব হতো না।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, ‘রফিকুল হক শুধু বাংলাদেশের সফল ছড়াকারই নন, সফল শিশু সংগঠন তৈরিতে তিনি বৃক্ষের মতো। হাজার হাজার শিশুর প্রতিভা বিকাশে তিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। আমি বিশ্বাস করি, তার হাতের ছোঁয়া যারা পেয়েছেন, তারা কখনো খারাপ মানুষ হতে পারেন না। তাদের কেউ দুর্নীতি করতে পারেন না, নারীর প্রতি সহিংস হবেন না।’

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন, ‘গত ৫০ বছরের মধ্যে যদি শিল্পসমৃদ্ধ সমাজ সচেতনতা নিয়ে কেউ ছড়া রচনা করে থাকেন, তিনি রফিকুল হক দাদুভাই। বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন দাদুভাই থাকবেন।’

দাদুভাই যেমন বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে ছড়া লিখেছেন তেমনি তাকে নিয়েও ছড়া লেখা হয়েছে। তাকে নিয়ে ছড়া লিখেছেন নামকরা ছড়াকাররা। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ছড়াকার সুকুমার বড়–য়া লিখেছেন- ‘ছড়ার ঘাটে/চাঁদের হাটে/এমন করে/আর কে হাঁটে/সে আমাদের দাদুভাই,/শিশুর কাছে, কী সুর আছে/শোনার মতো সাধু চাই/শব্দে গড়া/মজার ছড়া/ছন্দ মধুর জাদু চাই,/ধন্য ধন্য দাদু ভাই।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৭]।

কলকাতার ছড়ালেখক ইভা চক্রবর্তী লিখেছেন- ‘ঝোলার ভিতর রাখেন পুরে/টাটকা তাজা রস ভরা,/ মানুষটি বেশ দিলখোলা আর/সঙ্গী পেলেই মশকরা।’ আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক লিখেছেন- ‘বয়স টা কম/শিশু একদম/মাত্র তো আশি/ মিষ্টি সে মুখ/ মন ভরা সুখ/খুব ভালোবাসি।’[হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৪৮]। তপন বাগচী লিখেছেন- ‘পেশায় তিনি সাংবাদিক আর নেশায় ছড়া,/তার ছড়াটা সহজ-সরল, আবার মিঠেকড়া।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৫৩]।

কলকাতার ছড়াকার দীপ মুখোপাধ্যায়ের একটি ছড়ায় দাদুভাইয়ের কর্মজীবন সম্পর্কে চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজের কাছে তার ছড়া দায়বদ্ধ/আশিতেও তরতাজা নন বুড়োহদ্দ/এখনো চিবোতে মন গরু আর মাটনে/নিবেদিতপ্রাণ আজও শিশু সংগঠনের।/একাধারে গীতিকার নাটকে দক্ষ/সংবাদ-ফিচারেও খুবই পরিপক্ক/তার ছড়া মুখে যত্র ও তত্র/ দাদুভাই মানে এক ছড়া নক্ষত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-২৯]।

দাদুভাই মজলিশি মানুষ। আড্ডাবাজ নিরহঙ্কার ও বন্ধুবৎসল মানুষটি যেখানে যান সেখানেই আসর জমজমাট করে তোলেন। দিলখোলা আসর-মাতানো দাদুভাইয়ের যাদুকরি গুণ হল- এক মুহূর্তের মধ্যে তিনি শিশু-কিশোরদের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। মনে হয় তারা যেন দাদুভাইয়ের চিরকালের বন্ধু। এ কারণেই তিনি ছোটদের দারুণ প্রিয়ব্যক্তিত্ব। এমন প্রাণোচ্ছল, প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় চরিত্রের মানুষ খুব একটা বেশি মেলে না। ছড়াকার বকুল হায়দারের ভাষায়- ‘শিশুর রাজ্যে বেলুন ফাটাও/ওড়াও খুশির ফানুস/দাদুভাইয়ের পরিচয়/সবার প্রিয় মানুষ। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৪৭]।

নানা মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অনেক কাজ করেছেন দাদুভাই। তবে শিশু সাহিত্যিক ও ছড়াকার হিসেবে তার সাফল্য আকাশছোঁয়া। এমন কিছু ছড়া তিনি রচনা করেছেন যেগুলো কালের নিরীখে কালজয়ী। তার ছড়ার বইগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু বই ছাপাতে তার যেন তার কোনো আগ্রহই নেই। সংখ্যার চেয়ে গুণের দিকে তার খেয়াল বেশি। এজন্য তার বইয়ের সংখ্যা নেহাতই কম। হাতেগোনা তার চারটি ছড়ার বই।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকা থেকে ছোটদের যত সাময়িকী-পত্রিকা বেরিয়েছে সেগুলোর প্রায় সবগুলোতে দাদুভাইয়ের লেখা মেলে। কিন্তু তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোটেও সন্তোষজনক নয়। তার মাত্র দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিশুতোষ মূলক ‘পান্তাভাতে ঘি’, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে লেখা ‘বর্গি এলো দেশে’, ‘নেবুর পাতা করমচা’, ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’, ‘ঢামেরিক’, ‘সমকালীন ছড়া’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘রফিকুল হকের সেরা কুট্টুস ১০০’। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার লেখা ছোটদের উপন্যাস ‘একাত্তরের বিচ্ছু বশির’ এবং রূপকথার গল্প ‘প্রাচীন বাংলার রূপকথা’ নাটকের বই ‘বই বই হই চই’ বিশেষভাবে আলোচিত।

অসম্ভব স্মরণশক্তির অধিকারী দাদুভাই শুধু নিজের ছড়া নয়, যে কোনো বিখ্যাত ছড়া বা কবিতা যে কোনো মুহূর্তে হুবহু আবৃত্তি করতে পারতেন। মাঝেমধ্যে ছড়া আবৃত্তি করে সহকর্মীদের তিনি বিস্মিত করতেন। দৈনিক যুগান্তরের বার্তা বিভাগে দাদুভাইয়ের সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়। তখন খুব কাছ থেকে তাকে ও তার কাজের সঙ্গে আমি পরিচিত হই। পরবর্তী সময়ে একটি বইয়ের সম্পাদনার সময় তার কাজ ও দক্ষতা নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করি। তার সম্পাদিত কপি নাড়াচাড়া করে সম্পাদনার কলকাঠি বোঝার চেষ্টা করেছি। তখন দেখেছি দাদুভাই কেমন করে একটি কপিকে ‘মানুষ’ করেন। কেমন করে সেটিকে পাঠযোগ্য করে গড়ে তোলেন।

চিরসবুজ ও হাস্যোজ্জ্বল দাদুভাই দীর্ঘ ছয় দশক ধরে ছড়া লিখেছেন। তার মতো এতো দীর্ঘ সময় ধরে কেউ ছড়া লিখেছেন বলে জানা যায় না। এক অদ্ভুত তারুণ্যের ওপর ভর করে তিনি লিখেছেন নানা মাত্রিক ছড়া। তার শব্দ চয়ন যেমন আধুনিক তেমনি বিষয় নির্বাচনও অন্যদের চেয়ে অনেকটা স্বতন্ত্র। যে কারণে তিনি স্বকীয় ধারার ছড়াকার হয়ে উঠেন। ছড়ার জগতে তিনি সর্বজন স্বীকৃত প্রজ্ঞাবান ছড়াকার। প্রতি সপ্তাহে দৈনিক যুগান্তরের ফিচার পাতা ‘বিচ্ছু’তে তার ‘রফিকুল হক দাদুভাই-এর কুট্টস’ ছাপা হয়। তার এই ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া খুবই পাঠকপ্রিয়। প্রথিতযশা কলম সৈনিক দাদুভাই সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অবিরাম জীবনঘনিষ্ঠ কর্ম চালিয়ে যান। তার প্রগাঢ় আন্তরিকতা, প্রখর মানবিক চেতনা আর গভীর বিবেক বোধ কখনো ভোলার নয়। তিনি ছড়ার মাধ্যমে যেমন শিশুদের নিষ্কলুষ মনের খোরাক জুগিয়েছেন, তেমনি সামাজিক বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করে বড়দের মনেও দোলা দিতে সক্ষম হয়েছেন। দাদুভাই চমৎকার বক্তৃতা করতেন। তার বক্তব্য শ্রোতারা বিমোহিত হয়ে শোনেন, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান। তার হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে সবাই অভিভূত হতেন। তার নতুন নতুন উপলব্ধিতে শ্রোতা ও পাঠক মুগ্ধ হন। তিনি যে আসরে যেতেন সেখানটা মাতিয়ে রাখতেন কথায়-ছন্দে।

দৃঢ়চেতা উদ্যোগী কর্মপুরুষ দাদুভাইয়ের মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। তিনি হাসতেন দিল খুলে হো হো করে। এমন হাসি ক’জন হাসতে পারেন। তিনি তো হাসির ফেরিওয়ালা, ভালোবাসার ফেরিওয়ালা। তাই তো অফুরন্ত জীবনীশক্তির অধিকারী দাদুভাই লেখেন- ‘হাসি চাই হাসি/ঢেলে দিতে/পৃথিবীতে সুধা রাশি রাশি।’

দাদুভাই নিঃশঙ্কোচে অন্যের প্রশংসা করতেন। তিনি যা জানেন তা অন্যকেও নির্দ্বিধায় শিখিয়ে দিতেন। এতে তার কোনো কার্পণ্য ছিল না। তার পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের খ্যাতিমান অনেক কথাসাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বিশেষ করে ছড়া লেখকের ভিত রচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ সমাজের নামিদামি মানুষ। এতে তিনি ছোট হননি বরং তিনি দিনে দিনে রবীন্দ্রনাথের ‘তালগাছের’ মতো সব গাছ ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সব কিছু বাদ দিলেও ‘দাদুভাই’ পরিচয়ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৪৪]।

ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা দাদুভাই। তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চিত্র জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। শিশু সাহিত্যের মহীরুহ দাদুভাইয়ের লেখক হিসেবে, সম্পাদক হিসেবে, সংগঠক হিসেবে অথবা সৃজনশীল মানুষ হিসেবে তার কোনো তুলনাই পাওয়া যায় না। সংবাদের খেলাঘর-এর ভাইয়া, ইত্তেফাকের রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ও রফিকুল হক দাদুভাইরা নিজকর্ম গুণে বাংলায় অমর হয়ে থাকবেন।

স্বপন কুমার কুণ্ডু, সিনিয়র সাব-এডিটর, দৈনিক যুগান্তরের বার্তা বিভাগে কর্মরত।

দাদুভাই ও নীল কালির ছন্দ

 স্বপন কুমার কুণ্ডু 
১০ অক্টোবর ২০২১, ০৮:০৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

‘টেবিলের ওপর অনেকগুলো মেকআপ করা পাতা। একটির ওপর তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পাতাজুড়ে ঘুরছে তার অভিজ্ঞ ও অনুসন্ধিৎসু চোখদুটি। মুহূর্তের মধ্যে সজ্জিত পাতাটি তার নীল কালির ছন্দময় আঁকিবুকিতে ভরে গেল। হয়ে উঠল যেন কোনো শিল্পীর রঙ-তুলির ক্যানভাস। পরিস্ফুটিত হলো একটি পূর্ণাঙ্গ যথার্থ সুসজ্জিত পাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাটাকুটির পর তার কবিতা যেমন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতো।’ যাঁর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সজ্জিত পাতাটির সজ্জা পূর্ণতা পেল, হয়ে উঠল যথার্থ- তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় ‘দাদুভাই’। দেশের অন্যতম বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদুভাই। তিনি একাধারে ছড়াকার, সাংবাদিক, লেখক ও শিশুসংগঠক। এতোগুলো পরিচয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সফল এবং সমহিমায় ভাস্বর। ছড়াকার হিসাবে তিনি যেমন অতুলনীয়, সাংবাদিকতায় তার দক্ষতা প্রবাদতুল্য। লেখক ও শিশুসংগঠক হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্তপ্রতীক দাদুভাইয়ের খুরধার লেখনী সর্বমহলে প্রশংসিত। তার দ্বেষ-হিংসামুক্ত অমায়িক ব্যবহার সবাইকে আকৃষ্ট করে। সব বয়সের মানুষকে আপন করে নেওয়ার যাদু আছে তার। সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি সবাইকে কাছে টেনে নেন, আপন করে নেন। সবার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আমাদের দাদুভাই’।

দেশে অনেক ছড়াকার, প্রথিতযশা সাংবাদিক, শিশু সাহিত্যিক, নামকরা সংগঠক, নাট্যকার ও গীতিকার আছেন। কিন্তু কয়জন আছেন একই সঙ্গে ছড়াকার, সাংবাদিক, সংগঠক, নাট্যকার ও গীতিকার। একমাত্র দাদুভাই-ই এসবগুণের অধিকারী। এই ছড়াটিতে দাদুভাইয়ের পরিচয় স্পষ্ট- ‘সমাজের কাছে তার ছড়া দায়বদ্ধ/আশিতেও তরতাজা নন বুড়োহদ্দ/এখনো চিবোতে মন গরু আর মাটনে/নিবেদিতপ্রাণ আজও শিশু সংগঠনের।/একাধারে গীতিকার নাটকে দক্ষ/সংবাদ-ফিচারেও খুবই পরিপক্ক/তার ছড়া মুখে যত্র ও তত্র/দাদুভাই মানে এক ছড়া নক্ষত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-২৯]।

এশিয়ায় শিশুদের সংবাদপত্র ও শিশু সাংবাদিকতার পথিকৃত দাদুভাই বাংলাদেশের ফিচার এডিটরদের মধ্যে কিংবদন্তি। লম্বা, ফর্সা ও সদা হাস্যময় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দাদুভাই আগামী প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় ও উজ্জ্বল নক্ষত্র। একজন বিনয়ী, সজ্জন ও হৃদয়বান বন্ধুবৎসল মানুষ তিনি। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে সৃজনশীল, মানবিক ও জ্ঞানদীপ্ত সমাজগঠনের মানসে তিনি লিখেছেন, বিশেষ করে ছোটদের জন্য। তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া, গান ও নাটক। তার লেখায় জীবনের দুঃখ-সুখ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ক্ষোভ-জ্বালা সবকিছুই বিমূর্ত হয়ে ওঠে। তার অধিংকাশ লেখাই কালোত্তীর্ণ।

বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক দাদুভাইয়ের জন্ম রংপুরে ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। ১৯৬৩ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি গ্রাজুয়েট হন। তার বাবার নাম ইয়াছিন আহম্মদ ও মায়ের নাম রহিমা খাতুন। তার পৈত্রিক নিবাস রংপুর শহরের কামালকাচনায়। তবে আদিনিবাস পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার শহরে।

বাংলা সংবাদপত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দাদুভাই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬১ সালে দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর দৈনিক জেহাদ, অর্ধ-সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক পয়গাম, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা ও দৈনিক জনতা, আজাদ, লালসবুজে কাজ করেছেন। ১৯৬৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বদেশ ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে সেখানে তিনি ফিচার এডিটরের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে সরকারি পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা’ বের হলে সেখানে তিনি কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। দৈনিক রূপালী পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসাবে দায়িত্বপালনকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুদীর্ঘ ৫৯ বছর তিনি সাংবাদিকতার পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক দাদুভাই দীর্ঘদিন সংবাদ সম্পাদনা করেছেন। তার হাতের স্পর্শে একটি সংবাদের শিরোনাম এক মুহূর্তে হয়ে উঠত আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। তার কলমের নীল কালিতে সংবাদের খোলনলচে পাল্টে পরিশোধিত রূপ নিত। এক দলা নরম মাটি দিয়ে শিল্পী যেমন গড়েন সুন্দর ও আকর্ষণীয় মূর্তি, তিনিও তেমনি একটি অগোছালা ও অবিন্যস্ত সংবাদকে গড়ে তুলতেন পাঠ্যযোগ্য ও সরস। কখনো ভালো শিরোনামের জন্য তিনি সংবাদ-সূচনা পরিবর্তন করতেন। সংবাদ-জ্ঞানের (নিউজ সেন্স) আলোকে তার জহুরি চোখ সংবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ঠিকই খুঁজে পেত। সেটি যে অনুচ্ছেদেই থাকুক না কেন। তথ্যসমূহ পর্যায়ক্রমে সজ্জিত করতে গিয়ে তিনি সংবাদ কপিটি বেশ কাটাকুটি করতেন। কখনো জটিল ও অনুপযুক্ত শব্দ বাদ দিয়ে তিনি মানানসই ও যথার্থ শব্দ বসিয়ে দিতেন। কখনো জটিল বাক্য বাদ দিয়ে তিনি সহজ-সরল বাক্য লিখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ নিচ থেকে তুলে নিয়ে উপযুক্ত স্থানে বসাতেন। আবার কখনো পুরো একটি অনুচ্ছেদই বদলে দিতেন। কপির মার্জিনে নতুন শব্দ বা বাক্য তিনি মুক্তাক্ষরে লিখতেন। তার পরিচ্ছন্ন সম্পাদনায় সংবাদ-কপি শৈল্পিক হয়ে উঠত। তার সম্পাদিত কপি নিয়ে কখনো সম্পাদনা-সহকারীদের সমস্যায় পড়তে হয় না। নীল কালির আঁচড় টেনে তিনি এমন স্থানে এমনভাবে লেখেন যাতে কারো বুঝতে অসুবিধা না হয়। ফলে তার সম্পাদিত কপিটি নীল কালির ছন্দে ভরে উঠে। কালো কালিতে প্রিন্ট করা সংবাদ-কপি অন্যরা লাল কালিতে সম্পাদনা করলেও দাদুভাই নীল কালি ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। দাদুভাইয়ের ভাষায়, ‘সম্পাদনা-সহকারীরা (রিডার) লাল কালি ব্যবহার করেন। আর সম্পাদক হিসাবে তিনি নীল কালি ব্যবহার করেন। কারণ কম্পিউটার অপারেটরা যাতে বুঝতে পারেন সম্পাদক কী সম্পাদনা করেছেন।’ দাদুভাইয়ের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অনেক জটিল, দুর্বোধ্য ও অপাঠ্যযোগ্য ফিচারও পূর্ণতা পায়। ফিচারে তিনি কখনো বিষয়বস্তু সম্পর্কিত কোনো বিখ্যাত কোনো কবিতার দু’একটি লাইন অথবা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির যথার্থ ও মানানসই উক্তি যুক্ত করেন। তার সম্পাদনার গুণে অনেক অখাদ্য ফিচার ও প্রতিবেদনও পুরস্কৃত হয়েছে। দাদুভাই কপি সম্পাদনা করতে গিয়ে কখনো বিরক্ত হন না। বরং সব সময় সস্নেহে লেখককে লেখার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে তিনি পুরো লেখাটাই সংশোধন করে দেন।

১৯৬৯ সাল থেকে তিনি পৃষ্ঠাসজ্জা (পেজ মেকআপ) করেছেন। শিফ্ট-ইনচার্জ হিসাবে দৈনিক পূর্বদেশে তিনি পৃষ্ঠাসজ্জা করতেন খুবই দক্ষতার সঙ্গে। প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানীর ভাষায়, ‘লাল-নীল কলম দিয়ে রফিক আঁকাআঁকি করত। সুন্দর মেকআপের জন্য আকর্ষণীয় হেডিং দিত। এসব কাজে তার সৃজনশীলতা ও পারঙ্গমতা ছিল।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৮]।

সমকালিন বাংলা ছড়া জগতের প্রতিভূ দাদুভাই ছড়ার রাজ্যে মহানন্দে ঘুরে বেড়ান। প্রায় ছয় দশক ধরে ছোট ও বড়দের জন্য তিনি ছড়া লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অকাতরে যুক্ত হচ্ছে তার বিভিন্ন মাত্রার অসংখ্য ছড়া। বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে তিনি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শিশুতোষ বিষয়ের পাশাপাশি তার ছড়ায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, বিভিন্ন ক্রান্তিকালের উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রসঙ্গও স্থান পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জ্বীবিত দাদুভাই স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

স্বভাব ছড়াকার দাদুভাইয়ের ছড়া ছবির মতো। পড়তে পড়তে মন কখনো আনন্দে ভরে যায় ও আশায় উজ্জীবিত হয়। আবার কখনো মন বেদনায় ভারি হয়ে ওঠে। তার ছন্দজ্ঞান ও বিষয় বৈচিত্র্য তুলনাহীন এবং শব্দের ব্যবহার অভিনব। তার ছড়ায় পাওয়া যায় বর্ণের অনুপ্রাস শব্দের গাঁথুনি, অন্ত্যমিল ও ছন্দের কারিগরি। সব মিলিয়ে তাকে বলা যায় ছড়ার যাদুকর। দাদুভাইয়ের ছড়া সম্পর্কে গীতিকবি ও ছড়ালেখক আহমেদ কায়সারের ভাষায়- ‘বিষয় যত কঠিনই হোক/কিংবা সহজ অতি/থামতে কেউ দেখেনি তার/ছড়া লেখার গতি।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৫২]।

অসাধারণ ছড়াকার দাদুভাইয়ের হাতে ছড়ার ছন্দ ফুটে উঠে নিপুণতায়। তার ছড়ার আড়ালে দেশ, সমাজ তথা রাজনীতির চরম ও পরম সত্যের প্রকাশ ঘটে। যেমন- ‘ঘুড়ি বলল, উড়ি?/দূর আকাশে,/দেখাই কারিকুরি?/সূতা বলল,/ওড়ো,/হাওয়ায় ভেসে/মনের সুখে ঘোরো!/লাটাই বলে,/দাঁড়া,/সূতা ছিঁড়লে/ঘুড়ির কম্ম সারা!/নামল হঠাৎ/ বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি/অমনি খতম/ঘুড়ির বাহাদুরি।’

সুকুমার রায় এবং অন্নদাশঙ্কর রায় উভয় ধারাতেই দাদুভাইয়ের ছড়া সমান তালে পথ চলে। তার ছড়ায় বক্তব্যের স্পষ্টতা ও কৌতুকরসের প্রয়াস দুই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলা ছড়ার দুই দিকপালই কল্পনাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন দুই রূপে। সুকুমার রায় উদ্ভটরসের সৃষ্টিতে এবং অন্নদাশঙ্কর রায় বক্তব্যের ইঙ্গিতময়তায়। অথচ দাদুভাইয়ের দুই দিকেরই প্রয়াস আছে। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৬৭]। দাদুভাই নিজেই বলেছেন- ‘আবহমান ছড়ার যে রূপ আর ঢঙটি আমাকে বশিভূত করে রেখেছে সে বশ্যতা আমি কোনোদিন অস্বীকার করতে পারব না।’

আত্মকথন ও অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য বাঁধনে দাদুভাইয়ের ছড়া জড়িয়ে থাকে। তিনি হৃদয় দিয়ে ছড়া বানাতেন। কখনো শুদ্ধ বাংলায়, আবার কখনো রংপুর বা দেশের কোনো আঞ্চলিক ভাষায়। তিনি লেখেন- ‘গ্রামের নাম হিজুলী/ঝড়ের রাতে বিজুলী/রাত থম থম সরোবর/সুখ-দুঃখে কুঁড়েঘর।/বলতো ওমা হিজুলী/আমার জন্য কী থুলি?/আমার একটি পাখি ছিল/পাখিটার নাম ময়না/গান করতো, মান করতো/রাগলে কথা কয় না।/দুঃখ ব্যথায় জ্বলে জ্বলে/বুকটা যখন ঝাঁঝরা/পালিয়ে গেল সেই সে পাখি/ভেঙে খাঁচার পাঁজরা।’ [আমার ছড়া, পৃষ্ঠা-৩১]।

দাদুভাইয়ের ছড়া সমাজ-সচেতন। ছড়ায় তার কর্মজীবনের চিত্র ফুটে ওঠে। সামাজিক দায়িত্ব থেকেই তার কলমে মাঝে-মাঝে পরিস্ফুটিত হয় সামাজিক অসঙ্গতির আখ্যান। তার ছড়ায় এসেছে যানজট, লোডশেডিং ও বৃষ্টিতে ঢাকার দুরবস্থার চিত্র। ঢাকা বিষয়ক তার লিমেরিক ‘ঢামেরিক’ খুবই অর্থবহ। ঢামেরিকের ছড়া- ‘বুড়িয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা/বাড়ছে বহর ঢাকার/চলছে নদীর বাটোয়ারা/খেলটা অঢেল টাকার।/হায়, প্রকৃতির এই পরাজয়/নদীর বুকে রোজ জমা হয়/রাসায়নিক বর্জ্য সমেত আবর্জনা ঢাকার।’ অথবা ‘এক পশলা বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি ছাড়া ঢাকা/নদীর দেখার কষ্ট কি আর, স্পট করে তাকা-/এমন সুখের এ রাজধানী/মেইন সড়কে কোমরপানি/ডুব দিয়ে খুব টোকাইরা বেশ হয় সাঁতারু পাকা।’ এ দুটি ছড়ায় ঢাকার বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছে। সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দাদুভাই ছড়া লিখতেন। তার ছড়া নিজের জীবনের সঙ্গে এবং সমকালীন সংগ্রাম-ভাবনার সঙ্গে একাত্ম। ‘দাদুভাই ছড়া লেখেন না, ঐশ্বরিকভাবে ছড়া বানান। যেমন শব্দের ব্যবহার করেন, তেমনি ছন্দেরও ব্যবহার করেন। তার ছড়ার আঙ্গিক বিন্যাস আরও ভিন্নতর। সবকিছু মিলিয়েই তার ছড়া বাংলার ছড়া হয়ে ওঠে।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১০০]।

দাদুভাইয়ের ছড়ায় দেশ, মানুষ, রাজনীতি, সমাজ সবই বলিষ্ঠভাবে ফুটে উঠে। তিনি লিখেছেন- ‘গিন্নি এবার শিন্নি দেব দরগায়/তিনকুড়ি ধান পেলাম কিনা বরগায়।/নথ দেব যে পথ খোলা নেই/রাগ করো না ময়না,/কিনে দেব মিলের শাড়ি/ইমিটেশন গয়না/বাজারে যে আগুন কেবল বাড়ছে/বর্গিরা সব মুখের আহার কাড়ছে।’ [আগুন : বর্গি এলো দেশে]।

বাংলা ছড়া জগতে এক দ্যুতিময় নাম রফিকুল হক দাদুভাই। প্রাচীন লোকছড়ার আদলটি তার যাদুস্পর্শে নতুন রূপে আধুনিক অবয়ব নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। তার লেখনিতে থাকে প্রাচীনের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন। দাদুভাইয়ের ভাষায়- ‘ছড়া তো সময়ের ছবি। কালজয়ী ছড়াগুলোতে বাঁধা পড়ে আছে ইতিহাস। প্রাচীনকালের এক একটা ছড়ার অবয়বে তৎকালিন মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার সমাজ এবং সামাজিকতার অবিকল রূপটি খুঁজে পাই আমরা। ইতিহাসের পালা বদলের পালা চলছে যুগ যুগ ধরে। সেকালের মানুষগুলো নেই। সমাজ ও সামাজিকতারও রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু, ছড়া জয় করেছে সময়ের গণ্ডিকে, কালের বিবর্তনকে।’ দাদুভাইয়ের ‘বর্গী এলো দেশে’ মূলত এই ভূখণ্ডের একটি সময়ের সমাজচিত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১১৬]। দাদুভাই লিখেছেন- ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/বর্গী এসে দেশ ছেয়েছে/অনেক দিনের কথা/ঘাটতি আজও হয়নি পূরণ/তাই কি নীরবতা?/শালিধানের চিড়ে/বিন্নি ধানের খই/উড়কি ধানের মুড়কি মুড়ি/ডালা মা তোর কই?/কাঁদিস নে মা/আশিস দে মা/খুঁদ কুড়নির ঝি/আবার ডালা ভরব বলে/আমরা এসেছি।’ [আমরা এসেছি, পৃষ্ঠা-৫০]। সমাজের নিুস্তরের মানুষের দৈনন্দিন টানাপোড়নের বাস্তবতার চিত্র তার ছড়ায় ফুটে ওঠেছে। তার ছড়ায় আছে বাস্তবতার ছোঁয়া। যেমন- ‘পাবনা থেকে ভাবনা নিয়ে এলেন তিনি ঢাকা/শুনেছিলেন এই নগরে হাওয়ায় উড়ে টাকা/মনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে/টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে/মস্ত ভুলের আঁস্তাকুড়ে পড়ে গেলেন ঢাকা।’

সমাজ সচেতনতামূলক ও রাজনীতি সচেতন অনেক ছড়া লিখেছেন দাদুভাই। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এ ঘটনা নিয়ে পূর্বদেশ পত্রিকায় দাদুভাই ছড়া লেখেন- ‘ছেলে ঘুমোলো বুড়ো ঘুমোলো/ভোলা দ্বীপের চরে/জেগে থাকা মানুষগুলো/মাতম শুধু করে/ঘুমো বাছা ঘুমো রে/সাগর দিল চুমো রে/খিদে ফুরোলো, জ্বালা জুড়োলো/কান্না কেন ছি!,/বাংলাদেশের মানুষ বুকে/পাষাণ বেঁধেছি।’ সম্পাদকীয় পাতায় ‘গোর্কি ৭০’ নামে ছড়াটি ছাপা হলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বিবরণ দিতে গিয়ে কলকাতার বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমায়’ ছড়াটি প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় তার ভরাট কণ্ঠে ছড়াটি আবৃত্তি করেন। ছড়াটিতে দাদুভাই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের নাম বদলে ‘বাংলাদেশ’ নামটি ব্যবহার করেন। পরে যা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বহু লেখক ও কবি অনুসরণ করেন। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, পৃষ্ঠা-১৫]।

নাগরিক জীবনের বহুবিধ যন্ত্রণা নিয়ে আমাদের টিকে থাকতে হয়। ঢাকা শহরে চলাফেরায় মাঝে মাঝে থাকে না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। ভিড়ের ঠেলায় বাসে ওঠা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঢাকা শহরের পাবলিক বাসের করুণ ও বাস্তব চিত্র দাদুভাইয়ের ছড়ায় ওঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন- ‘লোকাল বাসে বাদুড় ঝোলা প্রচণ্ড ভিড় থাকায়/ছিনিয়ে নিল হাতঘড়িটা কি জানি কোন কাকায়।’ [হ্যাঁচকা টানে : ঢামেরিক]।

সমকালিন ছড়া সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত দাদুভাই। সমাজে যুগ যুগ ধরেই হরিলুটের ঘটনা ঘটছে। তার ছড়ায় সেই হরিলুটের চিত্র স্পট হয়ে ফোটে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ‘বালিশ’ কেলেংকারি নিয়ে তিনি চমৎকার ছড়া লিখেছেন। ২০১৯ সালের ২৬ মে দৈনিক যুগান্তর-এর রোববারের সাময়িকী ‘বিচ্ছু’তে তার নিয়মিত ছড়া ‘রফিকুল হক দাদুভাইয়ের কুট্টুস’-এ তিনি লেখেন ‘জয়, বালিশের জয়’ ছড়া। ‘নালিশ করে বালিশ পাবি’/ছেলেবেলার স্মৃতি,/বালিশটা তো কথার কথা/মূল ছিল ঢের প্রীতি।/ও মনু তোর কোন দেশে ধাম/এক বালিশের কয় টাকা দাম/বালিশে কী হয়?/শুনুন কী কয় প্রাণীবিদরা,/‘বালিশে হয় সুখনিদ্রা/জয়, বালিশের জয়!’/বালিশ যখন ছয়হাজারী/নয় তো বালিশ হাটবাজারী/ বালিশ তখন খাঁটি,/কী কারণে মনের ভুলে/বালিশ নিয়ে নালিশ তুলে/করছো জীবন মাটি!/বালিশ নিয়ে নালিশ ওঠে/দেশের মানুষ কাঁদে/আটশ’ টাকায় একটা বালিশ/যখন ওঠে ছাদে।’ ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, ধ্বনির মধ্য দিয়ে ছড়াকে তিনি সাবালক করে তোলেন। অনাচার, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার ছড়ায় থাকে ছন্দিত ঝংকার। তার লেখায় দৈনন্দিন রোজনামচার মতো অন্যায়ের প্রতিবাদ ধ্বনি উঠে এসেছে। সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে যা থেকে যাবে অনাগত দিনগুলোতে। তার ‘মা- গো আমার’ ছড়া ফুটে ওঠে- ‘সারাজীবন বুকের জ্বালা/কাঁদলি মা তুই বারবার/আর কতকাল দেখবি মা গো/হরিলুটের কারবার।’

দাদুভাইয়ের প্রকাশনা সামান্য হলেও ছড়ার জগতে তিনি অসামান্য। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে দুই বাংলাজুড়ে তার খ্যাতি। দুই বাংলা থেকেই তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সংবর্ধনা। শিশুসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ফেলোশিপ (২০০৯), শিশু একাডেমি পুরস্কার (২০০৯), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৪০৫ বঙ্গাব্দ), নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সম্মাননা (২০০৬), স্ক্রোল অব অনার (২০০৫), অনেক অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। ‘তবে পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিশ্চয়ই যে কোনো লেখক, সংগঠকের কাছে অনেক বেশি সম্মানের। সুদীর্ঘকাল শিশু সংগঠন ও সম্পাদক এবং পরিচালক-সাহিত্যিক-ছড়াকার হিসেবে দাদুভাই তো রাষ্ট্রীয় সম্মান পেতেই পারেন। কিন্তু আজও তিনি পাননি, যা দুঃখজনক।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, কামাল লোহানী, পৃষ্ঠা-২০]। ১৯৯৬ সালে দাদুভাইয়ের ৮০তম জন্মদিনে স্মারকগ্রন্থ ‘হাসিতে হাসিতে আশিতে’ প্রকাশিত হয়।

দাদুভাইয়ের বিষয় বর্ণনা-ভঙ্গিমা একেবারেই তার নিজস্ব। শিশু উপযোগী সহজ শব্দ ও বাক্যে ছন্দের দোলা খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- ‘পুঁ ঝিক্ ঝিক্/পুঁ ঝিক্ ঝিক্/দেশ ঘুরবি/চল নির্ভীক।/ধাক ধিং ধিং/ময়মনসিং/থাম গল্প/আর অল্প।’ তার লেখায় উপস্থাপনা নির্মেদ ও ঝরঝরে। উপমা প্রয়োগেও তিনি অনায়াসলব্ধ দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন।

পশুপাখীদের কাল্পনিক কথোপকথনে তার সরস রসিকতার ছোঁয়া পাঠকের মনে আনন্দ দেয়। তার ছড়াগুলো সহজবোধ্য বলেই কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয়। তিনি লিখেছেন- ‘বিল্লি বলে, ম্যাঁও/জলদি করে/শুঁটকি পোড়া/আইন্যা মোরে দ্যাও!/একটি চালের/কণা এনে/মুরগি বলে, ন্যাও।’ [পুসি, পান্তা ভাতে ঘি]। মাঝে-মধ্যে তিনি কিছু উদ্ভট (ননসেন্স) শব্দও ব্যবহার করেন। যেমন- ‘পেংটি/ ঝেংটি/ফট্টিফোর,/পোক্ত/শক্ত/হাড্ডি তোর।/আলতু/ফালতু/ডান্ডাবাজ/বাদ দে/ভাত দে/আন্ডা ভাজ।’

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দাদুভাই-ই দেশে প্রথম ছড়া লেখেন। লন্ডনে চিকিৎসা শেষে ১৯৭২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন। সেদিনের পূর্বদেশে বিশেষ সংখ্যা বের হয়। এই বিশেষ সংখ্যার নামকরণ করা হয় দাদুভাইয়ের ছড়া ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু বইসো শূন্য পিঁড়ায়’ শিরোনামে। ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু/পাইতা থুইছি পিড়া,/জলপান যে করতে দেব/ইরি ধানের চিড়া।/শালি ধানের চিড়া ছিল/বিন্নি ধানের খই,/কোথায় পাবো শবরীকলা/গামছা বাঁধা দই!/জান মেরেছে খান পশুরা/বর্গী সেজে ফের/আগুন জ্বেলে খাক করেছে/দেশটা আমাদের।/প্রাণের বন্ধু ঘরে আইলা/বসতে দিমু কিসে;/বুকের মধ্যে তোমার বাণী/রক্তে আছে মিশে।/বঙ্গবন্ধু তোমার আসন/বাংলাদেশের মাটি/মনের মধ্যে পাতা আছে/প্রীতির শীতলপাটি।’ ছড়াটি সেদিন দেশবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছিল।

দাদুভাই একজন স্বনামধন্য গীতিকার ও নাট্যকার। তিনি কালজয়ী গান লিখেছিলেন। মরমী সংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের কণ্ঠে তার লেখা ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা,/কোন দূরে যাও চইলা’ আজও গ্রাম বাংলার মানুষের প্রিয় গান। টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত তার অসংখ্য শিশুতোষ নাটক ও গান দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)’ তার প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘নতুন বাড়ি’ প্রচারিত হয়। তার উল্লেখ্যযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’, ‘ঘরে-বাইরে’। বিটিভিতে তিনি শিশু-কিশোরদের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘অঙ্কুর’ পরিচালনা করেছেন। তিন বছর ধরে চলা অঙ্কুরের পরিকল্পনা ও রচনা ছিল তারই। শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি শুধু ঘুমপাড়ানিয়া গান লেখেননি, বরং লিখেছেন ঘুম ভাঙানোর গান।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লঙ্ঘিত হলে পূর্বদেশ পত্রিকা গর্জে ওঠে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় পাতায়, কলামে কলামে গণমানুষের প্রতিবাদী গর্জন ফুটে উঠতো। সাংবাদিক কামাল লোহানির ভাষায়, ‘সেসব দিনে পূর্বদেশের অসাধারণ ভূমিকা ছিল। আর এর একজন সেনানী ছিলেন রফিক। সেদিনের গণমাধ্যমের সাহসি ভূমিকা আমাদের মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেটা অনস্বীকার্য।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৯]।

ছড়াকার ছাড়াও দাদুভাইয়ের আরেকটি পরিচয় তিনি একজন সফল সম্পাদক। ভারতীয় উপমহাদেশের ছোটদের প্রথম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন অনন্য প্রেরণা সৃষ্টিকারী দাদুভাই। দৈনিক বাংলা ভবন থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কিশোর বাংলা’ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বাংলা সাংবাদিকতার এক অভিনব সংযোজন। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৫৩]।

আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে দাদুভাই কাজ করেছেন। সারা দেশে তার অগণিত অনুরাগী রয়েছে। কিশোর বাংলায় তার ‘প্রীতি নিও’ পৃষ্ঠাটির জন্য তৎকালিন পাঠকদের কাছে তিনি খুবই প্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রীতিময় ভাষায় কত উপদেশ দিতেন তিনি। কিন্তু এমন মিষ্টি করে এমন কৌতুকময় আবহ বজায় রেখে কথাগুলো লিখতেন যে ছোটরা পটে যেত। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৬৪]।

শিশুসাহিত্য রচনা এবং সংগঠন গড়া দাদুভাইয়ের কাজের অংশ হয়ে উঠেছিল। দৈনিক পূর্বদেশের ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’ তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন। শিক্ষণীয় লেখা, ছড়া-কবিতা ও মজার গল্পে পাতাটি তিনি সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতেন। চাঁদের হাটের প্রথম ও শেষ পরিচালক/সম্পাদক ছিলেন রফিকুল হক দাদুভাই। দীর্ঘকাল চাঁদের হাটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনি ‘দাদুভাই’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া খেলাঘর শিশু সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা লগ্নে তার বিশেষ অবদান ছিল। তিনি ‘মুকুল ফৌজ’-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন।

সংবাদপত্রের সাময়িকী সম্পাদনা দাদুভাইয়ের পেশা। এ কারণে তার অনেক লেখকের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বহু নতুন লেখক তার হাতে ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে। তিনি একজন মানুষ গড়ার মহান কারিগর। তিনি নিজে যেমন সৃজনশীল তেমনি যে কোনো সৃজনশীল কর্মে তার সমান উৎসাহ-উদ্দীপনা। তার অনুপ্রেরণায় বিকশিত একদল শিষ্য বর্তমান সমাজের নানা স্তরে অবদান রাখছেন। এ সময়ের অনেক খ্যাতিমান লেখক, কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী তার হাতের সৃষ্টি।

দাদুভাই যেমন বর্তমানের সময়ের নামডাকওয়াল সাংবাদিক, ছড়াকার সাহিত্যিকদের গুরু। তিনিও তেমনি আবদুল গাফফার চোধুরী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, এহ্তেশাম হায়দার চোধুরী, কামাল লোহানী, ফয়েজ আহমদ, আবদুল গণি হাজারী, কেজি মোস্তফার মতো প্রথিতযশা সাংবাদিকদের শিষ্য। ছড়াকার সায়কা বানুর ভাষায়- ‘তার গুরুরা অনেক নামি/শিষ্যরা সব মানুষ দামি/তার তুলনা তিনি,/চাঁদের হাটে মনের সুখে/করেন বিকিকিনি।/দুঃখ পেলেও হাসেন/ঠিক বলে যাই/সেই দাদুভাই কেবল ভালোবাসেন।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৮৯]।

দাদুভাইয়ের শিষ্যদের মধ্যে অনেকে বর্তমান সময়ের নামিদামি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ছড়াকার ও সরকারি-বেসরকারি বড় আমলা। তাদের মধ্যে দৈনিক কালেরকণ্ঠের সম্পাদক ও খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, মানবকণ্ঠ সম্পাদক মাহমুদ আনোয়ার হোসেন, পিআইবির সাবেক ডিজি শাহ আলমগীর, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, অভিনেতা আফজাল হোসেন, সাংবাদিক আবু হাসান শাহরিয়ার, আহমদ ফারুক হাসান, রশিদুন নবী বাবু, বিনোদন সাংবাদিক আলিমুজ্জামান, বিনোদন ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত, রাজনীতিবিদ ও সিলেটের সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী ইমাম, ছড়াকার আনজীর লিটন, কবি কাজী রোজী, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, কবি আসলাম সানি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুর রহমান। তার শিষ্যদের মধ্যে আরও রয়েছেন- আখতার হুসেন, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম, দিদারুল আলম, মাহমুদ দিদার, দিদার চৌধুরী, আবদুল লতিফ খান, শামীমউদ্দিন শামীম, শাহানা বেগম, হামিদা খানম, নাসরিন জাহান, এনায়েত রসুল, রোকেয়া খাতুন রুবী, মুনা মালতী প্রমুখ। শিষ্যদের সম্পর্কে জ্যোর্তিময় দাদুভাইয়ের বক্তব্য, ‘যাদের নিয়ে চাঁদের হাট শুরু করেছিলাম, তারা এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রেরণা ও ভালো কাজের ইন্ধন জুগিয়ে যাদের অন্তরে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলাম, তারা এখন দাবানলে পরিণত হয়েছে। আমার তেমন প্রাপ্তি না থাকলেও আনন্দ অনেক। কেননা আমার ‘চাঁদের হাট’ থেকে এমন সব রত্ন বেরিয়ে এসেছে।’

দাদুভাইয়ের ৮০তম জন্মদিনে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘দাদুভাই না থাকলে ইমদাদুল হক মিলন নামে কোনো লেখকের জন্ম হতো না। তিনি চিরনবীন বিস্ময়কর এক মানুষ। অনেকগুলো আলোকস্তম্ভ তিনি তৈরি করেছেন। চাঁদের হাট না থাকলে সেটা সম্ভব হতো না।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, ‘রফিকুল হক শুধু বাংলাদেশের সফল ছড়াকারই নন, সফল শিশু সংগঠন তৈরিতে তিনি বৃক্ষের মতো। হাজার হাজার শিশুর প্রতিভা বিকাশে তিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। আমি বিশ্বাস করি, তার হাতের ছোঁয়া যারা পেয়েছেন, তারা কখনো খারাপ মানুষ হতে পারেন না। তাদের কেউ দুর্নীতি করতে পারেন না, নারীর প্রতি সহিংস হবেন না।’

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন, ‘গত ৫০ বছরের মধ্যে যদি শিল্পসমৃদ্ধ সমাজ সচেতনতা নিয়ে কেউ ছড়া রচনা করে থাকেন, তিনি রফিকুল হক দাদুভাই। বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন দাদুভাই থাকবেন।’

দাদুভাই যেমন বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে ছড়া লিখেছেন তেমনি তাকে নিয়েও ছড়া লেখা হয়েছে। তাকে নিয়ে ছড়া লিখেছেন নামকরা ছড়াকাররা। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ছড়াকার সুকুমার বড়–য়া লিখেছেন- ‘ছড়ার ঘাটে/চাঁদের হাটে/এমন করে/আর কে হাঁটে/সে আমাদের দাদুভাই,/শিশুর কাছে, কী সুর আছে/শোনার মতো সাধু চাই/শব্দে গড়া/মজার ছড়া/ছন্দ মধুর জাদু চাই,/ধন্য ধন্য দাদু ভাই।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৭]।

কলকাতার ছড়ালেখক ইভা চক্রবর্তী লিখেছেন- ‘ঝোলার ভিতর রাখেন পুরে/টাটকা তাজা রস ভরা,/ মানুষটি বেশ দিলখোলা আর/সঙ্গী পেলেই মশকরা।’ আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক লিখেছেন- ‘বয়স টা কম/শিশু একদম/মাত্র তো আশি/ মিষ্টি সে মুখ/ মন ভরা সুখ/খুব ভালোবাসি।’[হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৪৮]। তপন বাগচী লিখেছেন- ‘পেশায় তিনি সাংবাদিক আর নেশায় ছড়া,/তার ছড়াটা সহজ-সরল, আবার মিঠেকড়া।’ [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-৫৩]।

কলকাতার ছড়াকার দীপ মুখোপাধ্যায়ের একটি ছড়ায় দাদুভাইয়ের কর্মজীবন সম্পর্কে চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজের কাছে তার ছড়া দায়বদ্ধ/আশিতেও তরতাজা নন বুড়োহদ্দ/এখনো চিবোতে মন গরু আর মাটনে/নিবেদিতপ্রাণ আজও শিশু সংগঠনের।/একাধারে গীতিকার নাটকে দক্ষ/সংবাদ-ফিচারেও খুবই পরিপক্ক/তার ছড়া মুখে যত্র ও তত্র/ দাদুভাই মানে এক ছড়া নক্ষত্র। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-২৯]।

দাদুভাই মজলিশি মানুষ। আড্ডাবাজ নিরহঙ্কার ও বন্ধুবৎসল মানুষটি যেখানে যান সেখানেই আসর জমজমাট করে তোলেন। দিলখোলা আসর-মাতানো দাদুভাইয়ের যাদুকরি গুণ হল- এক মুহূর্তের মধ্যে তিনি শিশু-কিশোরদের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। মনে হয় তারা যেন দাদুভাইয়ের চিরকালের বন্ধু। এ কারণেই তিনি ছোটদের দারুণ প্রিয়ব্যক্তিত্ব। এমন প্রাণোচ্ছল, প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় চরিত্রের মানুষ খুব একটা বেশি মেলে না। ছড়াকার বকুল হায়দারের ভাষায়- ‘শিশুর রাজ্যে বেলুন ফাটাও/ওড়াও খুশির ফানুস/দাদুভাইয়ের পরিচয়/সবার প্রিয় মানুষ। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৪৭]।

নানা মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অনেক কাজ করেছেন দাদুভাই। তবে শিশু সাহিত্যিক ও ছড়াকার হিসেবে তার সাফল্য আকাশছোঁয়া। এমন কিছু ছড়া তিনি রচনা করেছেন যেগুলো কালের নিরীখে কালজয়ী। তার ছড়ার বইগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু বই ছাপাতে তার যেন তার কোনো আগ্রহই নেই। সংখ্যার চেয়ে গুণের দিকে তার খেয়াল বেশি। এজন্য তার বইয়ের সংখ্যা নেহাতই কম। হাতেগোনা তার চারটি ছড়ার বই।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকা থেকে ছোটদের যত সাময়িকী-পত্রিকা বেরিয়েছে সেগুলোর প্রায় সবগুলোতে দাদুভাইয়ের লেখা মেলে। কিন্তু তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোটেও সন্তোষজনক নয়। তার মাত্র দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিশুতোষ মূলক ‘পান্তাভাতে ঘি’, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে লেখা ‘বর্গি এলো দেশে’, ‘নেবুর পাতা করমচা’, ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’, ‘ঢামেরিক’, ‘সমকালীন ছড়া’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘রফিকুল হকের সেরা কুট্টুস ১০০’। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার লেখা ছোটদের উপন্যাস ‘একাত্তরের বিচ্ছু বশির’ এবং রূপকথার গল্প ‘প্রাচীন বাংলার রূপকথা’ নাটকের বই ‘বই বই হই চই’ বিশেষভাবে আলোচিত।

অসম্ভব স্মরণশক্তির অধিকারী দাদুভাই শুধু নিজের ছড়া নয়, যে কোনো বিখ্যাত ছড়া বা কবিতা যে কোনো মুহূর্তে হুবহু আবৃত্তি করতে পারতেন। মাঝেমধ্যে ছড়া আবৃত্তি করে সহকর্মীদের তিনি বিস্মিত করতেন। দৈনিক যুগান্তরের বার্তা বিভাগে দাদুভাইয়ের সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়। তখন খুব কাছ থেকে তাকে ও তার কাজের সঙ্গে আমি পরিচিত হই। পরবর্তী সময়ে একটি বইয়ের সম্পাদনার সময় তার কাজ ও দক্ষতা নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করি। তার সম্পাদিত কপি নাড়াচাড়া করে সম্পাদনার কলকাঠি বোঝার চেষ্টা করেছি। তখন দেখেছি দাদুভাই কেমন করে একটি কপিকে ‘মানুষ’ করেন। কেমন করে সেটিকে পাঠযোগ্য করে গড়ে তোলেন।

চিরসবুজ ও হাস্যোজ্জ্বল দাদুভাই দীর্ঘ ছয় দশক ধরে ছড়া লিখেছেন। তার মতো এতো দীর্ঘ সময় ধরে কেউ ছড়া লিখেছেন বলে জানা যায় না। এক অদ্ভুত তারুণ্যের ওপর ভর করে তিনি লিখেছেন নানা মাত্রিক ছড়া। তার শব্দ চয়ন যেমন আধুনিক তেমনি বিষয় নির্বাচনও অন্যদের চেয়ে অনেকটা স্বতন্ত্র। যে কারণে তিনি স্বকীয় ধারার ছড়াকার হয়ে উঠেন। ছড়ার জগতে তিনি সর্বজন স্বীকৃত প্রজ্ঞাবান ছড়াকার। প্রতি সপ্তাহে দৈনিক যুগান্তরের ফিচার পাতা ‘বিচ্ছু’তে তার ‘রফিকুল হক দাদুভাই-এর কুট্টস’ ছাপা হয়। তার এই ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া খুবই পাঠকপ্রিয়। প্রথিতযশা কলম সৈনিক দাদুভাই সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অবিরাম জীবনঘনিষ্ঠ কর্ম চালিয়ে যান। তার প্রগাঢ় আন্তরিকতা, প্রখর মানবিক চেতনা আর গভীর বিবেক বোধ কখনো ভোলার নয়। তিনি ছড়ার মাধ্যমে যেমন শিশুদের নিষ্কলুষ মনের খোরাক জুগিয়েছেন, তেমনি সামাজিক বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করে বড়দের মনেও দোলা দিতে সক্ষম হয়েছেন। দাদুভাই চমৎকার বক্তৃতা করতেন। তার বক্তব্য শ্রোতারা বিমোহিত হয়ে শোনেন, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান। তার হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে সবাই অভিভূত হতেন। তার নতুন নতুন উপলব্ধিতে শ্রোতা ও পাঠক মুগ্ধ হন। তিনি যে আসরে যেতেন সেখানটা মাতিয়ে রাখতেন কথায়-ছন্দে।

দৃঢ়চেতা উদ্যোগী কর্মপুরুষ দাদুভাইয়ের মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। তিনি হাসতেন দিল খুলে হো হো করে। এমন হাসি ক’জন হাসতে পারেন। তিনি তো হাসির ফেরিওয়ালা, ভালোবাসার ফেরিওয়ালা। তাই তো অফুরন্ত জীবনীশক্তির অধিকারী দাদুভাই লেখেন- ‘হাসি চাই হাসি/ঢেলে দিতে/পৃথিবীতে সুধা রাশি রাশি।’

দাদুভাই নিঃশঙ্কোচে অন্যের প্রশংসা করতেন। তিনি যা জানেন তা অন্যকেও নির্দ্বিধায় শিখিয়ে দিতেন। এতে তার কোনো কার্পণ্য ছিল না। তার পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের খ্যাতিমান অনেক কথাসাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বিশেষ করে ছড়া লেখকের ভিত রচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ সমাজের নামিদামি মানুষ। এতে তিনি ছোট হননি বরং তিনি দিনে দিনে রবীন্দ্রনাথের ‘তালগাছের’ মতো সব গাছ ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সব কিছু বাদ দিলেও ‘দাদুভাই’ পরিচয়ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। [হাসিতে হাসিতে আশিতে, পৃষ্ঠা-১৪৪]।

ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা দাদুভাই। তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চিত্র জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। শিশু সাহিত্যের মহীরুহ দাদুভাইয়ের লেখক হিসেবে, সম্পাদক হিসেবে, সংগঠক হিসেবে অথবা সৃজনশীল মানুষ হিসেবে তার কোনো তুলনাই পাওয়া যায় না। সংবাদের খেলাঘর-এর ভাইয়া, ইত্তেফাকের রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ও রফিকুল হক দাদুভাইরা নিজকর্ম গুণে বাংলায় অমর হয়ে থাকবেন।

স্বপন কুমার কুণ্ডু, সিনিয়র সাব-এডিটর, দৈনিক যুগান্তরের বার্তা বিভাগে কর্মরত।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন