সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চ্যালেঞ্জ কোথায়?
jugantor
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চ্যালেঞ্জ কোথায়?

  মো. মাহমুদ হাসান  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:১৪:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের বাংলায় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে ধর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্তান রক্ষার চেষ্টা হয়েছিল; 'গনিমতের মাল' ঘোষণা করে ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকারীরা ধর্ষণকেও জায়েজ করে দিয়েছিল, তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। দেশপ্রেমের জোয়ারে অপশক্তির আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তাই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে উন্মাদের দলকে মাথা নীচু করে স্বাধীন বাংলার দামাল ছেলেদের কাছে অস্ত্র রেখে কুর্নিশ করতে হয়েছিল।

একাত্তরে পরাজিত হলেও প্রতিশোধ স্পৃহায় শকুনিরা বারবারই জেগে উঠে। ১৯৭২-৭৫ সালে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রমাণের জন্য আদা-জল খেয়েই মাঠে নেমেছিল। পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা সৃষ্টির মাধ্যমে একাত্তরের পরাজয়ের নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছিল। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উল্লাস দেখে কেউ কি কখনো ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবারো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এজেন্ডা হাতে মাঠে নামবে? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ শেখ হাসিনার ওপর একুশবার হত্যাচেষ্টা, এর সবই একইসূত্রে গাঁথা। এই পরাজিত শক্তি স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে ভীষণ ভয় পায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এরা যেমন চরম অস্থিরতায় ভোগে, ক্ষমতার বাইরের আওয়ামী লীগকে নিয়েও এদের আতঙ্কের শেষ নেই।

পরাজিত হায়েনাদের চক্রান্ত ও নীলনকশায় ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান ঘটিয়ে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে এক বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এরা বারবার উগ্রপন্থারই আশ্রয় নেয়। তাইতো আওয়ামী লীগ যখন সরকারের বাইরে থাকে তখনো এরা 'একুশে আগস্ট' ঘটায়। আহসান উল্লাহ মাস্টার, শাহ এএমএস কিবরিয়া, খুলনার মনজুর ইমাম, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের মতো মানুষদের হত্যা করে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, তার সিকিভাগ কাজ অন্যান্য সরকারের আমলে না হলেও আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রচারের অপচেষ্টা কোনো দিনই থেমে থাকেনি। যে বঙ্গবন্ধু মদ, জুয়া নিষিদ্ধ করে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ওআইসির সদস্য পদ গ্রহণসহ অনেক বড় বড় কাজ করেছিলেন; যে শেখ হাসিনার আমলে দেশের মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে, প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচশ ষাটটি মডেল মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে, সেই বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকেও এরা ইসলামবিরোধী প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালায়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে, রাষ্ট্রের 'ধর্ম নিরপেক্ষ' চরিত্রকে ধারণ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে যাওয়ার এক কঠিন সময় আজ অপেক্ষমাণ। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থান, আফগানিস্তানে তালেবানী শাসনের পুন:আগমন, বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার ওপর এক সুকঠিন চ্যালেঞ্জ। এক দশকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত আন্তর্জাতিক শক্তির মদতও আজ অস্বাভাবিক নয়। এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে পরাজিত শক্তি আবারো একটি চরম আঘাত হানার মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হবে- এটি ভাবতে কোনো পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন আছে কি?

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের আজ এটি বুঝতে বাকি নেই শুধুমাত্র গণতন্ত্রের ওপর ভর করে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিদায় জানানো সম্ভব নয়। তাইতো এদের কেউ কেউ প্রবাসে বসে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালায়, কেউ বা অর্থের বিনিময়ে বোয়েগেলসীয় কায়দায় বিভিন্ন সামাজিক ও প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করে উগ্রবাদকে উস্কে দেয়। মামুনুল হকরা যখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, কেউ যদি একে মাঠের বক্তৃতা হিসেবে ভেবে থাকেন, তবে এরা এখনো বোকার স্বর্গেই বাস করছেন। চোখ-কান খোলা রেখে উগ্রবাদ মোকাবেলার সকল কৌশলকেই কার্যকর করার এখনই মোক্ষম সময়।

'ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়'- আমাদের আলেম সমাজের মাঝে এ বোধটিকে কার্যকর করতে সরকার তথা আওয়ামী লীগের সফলতা নিতান্তই সামান্য। ধর্মপ্রাণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় একমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষতাই যে কার্যকর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পন্থা সেটিকে তুলে ধরতে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাও কম নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চিন্তাকে অনুসরণ না করেই আজ অনেকেই নেতা হয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘোষণা দেয়ার পরও যখন আওয়ামী লীগের অনেক দায়িত্বশীল নেতাকে মমিনুল হকের পাশে মঞ্চে দেখা যায়, তাতে বুঝতে বাকি থাকে না- বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ না করেও আজ আওয়ামী লীগে নেতা হওয়া যায়। আগামী দিনের উগ্রবাদী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এমন আদর্শহীন নেতৃত্ব বুমেরাং হতেই বাধ্য! স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সামরিক একনায়কদের হাত থেকে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন অবধি আওয়ামী লীগকে যেভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে, ভূ-আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আগামী দিনের ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবেলায়ও আওয়ামী লীগকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। আর সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই তো মোক্ষম সময়।

হিন্দু-মুসলিম উৎসবের ঐতিহ্য বাঙালি সমাজ ব্যবস্থার গৌরব। ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কুমিল্লায় সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার মন্দিরে মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন রেখে দিয়ে যে বা যারাই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অস্থিরতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়েছে, তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়ে বিক্ষুব্ধ দেশবিরোধী, তালেবানি আদর্শে উদ্বুদ্ধ মামুনুলপন্থী আর একুশে আগস্টের পরিকল্পনাকারী তথাকথিত নির্বাসিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা আজ একমঞ্চে। যে কোনো মূল্যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা সৃষ্টি করে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে থমকে দিয়ে পুরনো ভাবধারায় ফিরিয়ে যাওয়াই এদের ধ্যান-জ্ঞান। জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে এদের রুখে না দিলে, শুধু সরকার নয়- রাষ্ট্রকেও এর মাশুল গুনতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যেমন মার্কসবাদের ধারক ছিলেন না, পুঁজিবাদেরও অনুসারী ছিলেন না; আবার পশ্চিমের আগ্রাসনবাদেরও ছিলেন কট্টর সমালোচক। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, কৃষক-শ্রমিক, মেহনতী মানুষের সমন্বয়ে এক ভিন্নধর্মী সুখীসমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শান্তির ধর্ম ইসলামকে বুকে ধারণ করলেও সব ধর্মের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে, ধর্মীয় অনুশাসনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ছিলেন ঘোর বিরোধী। তাই তো সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে নিশ্চিত করে বিভাজনের পথকে চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। একদিকে তালেবান, আইএস, শিয়া-সুন্নি নানা পথে শান্তির ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে উগ্রবাদী আস্ফালন, অন্যদিকে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন, এমন ভূ-আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামাজিক শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর 'ধর্ম নিরপেক্ষতা'র আদর্শকে অনুসরণের পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চ্যালেঞ্জ কোথায়?

 মো. মাহমুদ হাসান 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:১৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের বাংলায় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে ধর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্তান রক্ষার চেষ্টা হয়েছিল; 'গনিমতের মাল' ঘোষণা করে ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকারীরা ধর্ষণকেও জায়েজ করে দিয়েছিল, তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। দেশপ্রেমের জোয়ারে অপশক্তির আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তাই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে উন্মাদের দলকে মাথা নীচু করে স্বাধীন বাংলার দামাল ছেলেদের কাছে অস্ত্র রেখে কুর্নিশ করতে হয়েছিল।

একাত্তরে পরাজিত হলেও প্রতিশোধ স্পৃহায় শকুনিরা বারবারই জেগে উঠে। ১৯৭২-৭৫ সালে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রমাণের জন্য আদা-জল খেয়েই মাঠে নেমেছিল। পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা সৃষ্টির মাধ্যমে একাত্তরের পরাজয়ের নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছিল। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উল্লাস দেখে কেউ কি কখনো ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবারো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এজেন্ডা হাতে মাঠে নামবে? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ শেখ হাসিনার ওপর একুশবার হত্যাচেষ্টা, এর সবই একইসূত্রে গাঁথা। এই পরাজিত শক্তি স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে ভীষণ ভয় পায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এরা যেমন চরম অস্থিরতায় ভোগে, ক্ষমতার বাইরের আওয়ামী লীগকে নিয়েও এদের আতঙ্কের শেষ নেই। 

পরাজিত হায়েনাদের চক্রান্ত ও নীলনকশায় ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান ঘটিয়ে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে এক বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এরা বারবার উগ্রপন্থারই আশ্রয় নেয়। তাইতো আওয়ামী লীগ যখন সরকারের বাইরে থাকে তখনো এরা 'একুশে আগস্ট' ঘটায়। আহসান উল্লাহ মাস্টার, শাহ এএমএস কিবরিয়া, খুলনার মনজুর ইমাম, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের মতো মানুষদের হত্যা করে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালায়। 

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, তার সিকিভাগ কাজ অন্যান্য সরকারের আমলে না হলেও আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রচারের অপচেষ্টা কোনো দিনই থেমে থাকেনি। যে বঙ্গবন্ধু মদ, জুয়া নিষিদ্ধ করে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ওআইসির সদস্য পদ গ্রহণসহ অনেক বড় বড় কাজ করেছিলেন; যে শেখ হাসিনার আমলে দেশের মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে, প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচশ ষাটটি মডেল মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে, সেই বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকেও এরা ইসলামবিরোধী প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালায়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে, রাষ্ট্রের 'ধর্ম নিরপেক্ষ' চরিত্রকে ধারণ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে যাওয়ার এক কঠিন সময় আজ অপেক্ষমাণ। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থান, আফগানিস্তানে তালেবানী শাসনের পুন:আগমন, বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার ওপর এক সুকঠিন চ্যালেঞ্জ। এক দশকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত আন্তর্জাতিক শক্তির মদতও আজ অস্বাভাবিক নয়। এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে পরাজিত শক্তি আবারো একটি চরম আঘাত হানার মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হবে- এটি ভাবতে কোনো পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন আছে কি?

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের আজ এটি বুঝতে বাকি নেই শুধুমাত্র গণতন্ত্রের ওপর ভর করে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিদায় জানানো সম্ভব নয়। তাইতো এদের কেউ কেউ প্রবাসে বসে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালায়, কেউ বা অর্থের বিনিময়ে বোয়েগেলসীয় কায়দায় বিভিন্ন সামাজিক ও প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করে উগ্রবাদকে উস্কে দেয়। মামুনুল হকরা যখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, কেউ যদি একে মাঠের বক্তৃতা হিসেবে ভেবে থাকেন, তবে এরা এখনো বোকার স্বর্গেই বাস করছেন। চোখ-কান খোলা রেখে উগ্রবাদ মোকাবেলার সকল কৌশলকেই কার্যকর করার এখনই মোক্ষম সময়। 

'ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়'- আমাদের আলেম সমাজের মাঝে এ বোধটিকে কার্যকর করতে সরকার তথা আওয়ামী লীগের সফলতা নিতান্তই সামান্য। ধর্মপ্রাণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় একমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষতাই যে কার্যকর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পন্থা সেটিকে তুলে ধরতে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাও কম নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চিন্তাকে অনুসরণ না করেই আজ অনেকেই নেতা হয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘোষণা দেয়ার পরও যখন আওয়ামী লীগের অনেক দায়িত্বশীল নেতাকে মমিনুল হকের পাশে মঞ্চে দেখা যায়, তাতে বুঝতে বাকি থাকে না- বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ না করেও আজ আওয়ামী লীগে নেতা হওয়া যায়। আগামী দিনের উগ্রবাদী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এমন আদর্শহীন নেতৃত্ব বুমেরাং হতেই বাধ্য! স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সামরিক একনায়কদের হাত থেকে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন অবধি আওয়ামী লীগকে যেভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে, ভূ-আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আগামী দিনের ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবেলায়ও আওয়ামী লীগকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। আর সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই তো মোক্ষম সময়।

হিন্দু-মুসলিম উৎসবের ঐতিহ্য বাঙালি সমাজ ব্যবস্থার গৌরব। ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কুমিল্লায় সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার মন্দিরে মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন রেখে দিয়ে যে বা যারাই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অস্থিরতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়েছে, তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়ে বিক্ষুব্ধ দেশবিরোধী, তালেবানি আদর্শে উদ্বুদ্ধ মামুনুলপন্থী আর একুশে আগস্টের পরিকল্পনাকারী তথাকথিত নির্বাসিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা আজ একমঞ্চে। যে কোনো মূল্যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা সৃষ্টি করে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে থমকে দিয়ে পুরনো ভাবধারায় ফিরিয়ে যাওয়াই এদের ধ্যান-জ্ঞান। জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে এদের রুখে না দিলে, শুধু সরকার নয়- রাষ্ট্রকেও এর মাশুল গুনতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যেমন মার্কসবাদের ধারক ছিলেন না, পুঁজিবাদেরও অনুসারী ছিলেন না; আবার পশ্চিমের আগ্রাসনবাদেরও ছিলেন কট্টর সমালোচক। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, কৃষক-শ্রমিক, মেহনতী মানুষের সমন্বয়ে এক ভিন্নধর্মী সুখীসমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শান্তির ধর্ম ইসলামকে বুকে ধারণ করলেও সব ধর্মের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে, ধর্মীয় অনুশাসনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ছিলেন ঘোর বিরোধী। তাই তো সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে নিশ্চিত করে বিভাজনের পথকে চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। একদিকে তালেবান, আইএস, শিয়া-সুন্নি নানা পথে শান্তির ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে উগ্রবাদী আস্ফালন, অন্যদিকে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন, এমন ভূ-আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামাজিক শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর 'ধর্ম নিরপেক্ষতা'র আদর্শকে অনুসরণের পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন