তের বছরে সরকার, ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের অৰ্জন নিম্নমুখী ও নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতা
jugantor
তের বছরে সরকার, ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের অৰ্জন নিম্নমুখী ও নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতা

  দেলোয়ার জাহিদ  

০৯ জানুয়ারি ২০২২, ০৪:১৬:০৮  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীত্তোর বাংলাদেশে অগ্রগতির নতুন এক মাইলফলক সৃষ্টি করে নজিরবিহীন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রত্যয় নিয়ে তের বছর পূর্ণ করেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। ঈর্ষণীয় সাফল্যের এক সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে সরকারের। ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি তৃতীয় বারের মতো সরকার গঠনের পর খাদ্য নিরাপত্তা, শান্তি চুক্তি, সমুদ্র বিজয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি, সড়ক ও রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সহ সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত বাঞ্ছনীয় সাফল্য এসেছে। সরকার বর্তমান মেয়াদের তৃতীয় বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পা রেখেছে।

এমন একটি সময়ে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। দেশের "নির্বাচন সংস্কৃতি" সবচেয়ে কঠিন ও জটিল সময় পাড় করছে। নির্বাচন কমিশনার ব্যর্থতা, নির্লিপ্ততা ও স্থানীয় প্রশাসন সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময় উপযোগী পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে শতাধিক লোকের প্রাণহানী ঘটেছে। দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও এ প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ৭ জানুয়ারী, দৈনিক যুগান্তরে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বক্তব্য রেখেছেন। তারা নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতায় সহিংসতা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিক্রিয়া জানান।

ড. তোফায়েল বলেন, "সমাজটা দিন দিন একতরফা আধিপত্যের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে ক্ষমতাবান হয়ে গেছেন, তারা চান না নতুন করে কেউ আর গজিয়ে উঠুক। তাই যে এগিয়ে আসছে তাকেই মারধর করা হচ্ছে। আর মারধরের শিকার ব্যক্তি যদি প্রতিরোধ করে, তখনই তা মারামারি ও কাটাকাটিতে পরিণত হচ্ছে।" ড. এম সাখাওয়াত বলেছেন, "ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইসির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রথম থেকেই সহিংসতা সামাল দিতে কমিশন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে দিনদিন এটি আরও বাড়ছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় জড়িত কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়নি। কারও বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা। বিচারহীনতার কারণে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জোর যার মুল্লুক তার। এখন ইলেকশন হচ্ছে না, ভোট ছিনতাই হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এ ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা স্থায়ী হলে জাতীয় নির্বাচনে এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হতে পারে।" ..."স্বার্থপরতার রাজনীতির কারণেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। যতদিন রাজনীতির এই ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন সবাই মরিয়া আচরণ করবে-এমন মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যতদিন পার পাওয়া যাবে, ততদিন এই অবস্থা চলতেই থাকবে। এ ঘটনা সামাল দেওয়া সম্ভব না হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কারণ সংসদ-সদস্যের পদবি এখন সোনার হরিণ। সংসদ-সদস্য হওয়া মানে জমিদার হওয়া, যা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বানিয়ে দেয়।" তিনিও যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব করোনা সংকট সহ আকাশচুম্বি চ্যালেঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত সরকারে থাকা এবং উন্নয়নমুখী অর্থনীতির উপর কাজ করার ফলে সদ্য বিদায়ী ২০২১ সালটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মধ্যআয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও উন্নয়নমুখী অর্থনীতির জন্য বিশ্বে সবিশেষ প্রশংসিত হয়েছে। তবে ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি হয়েছে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ও মানবাধিকার বিষয়ে ৭ র্যাব কর্ম্মকর্তার বিরুদ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায়।

"সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কোনো দায় নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনে সহিংসতা ও মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। দায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের। সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছে কেন্দ্রের বাইরে। তাদের বারবার বলি সহনশীল হতে। বরাবরের মতো পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে সংঘাত-সংঘর্ষে। এত প্রাণহানির পরও সিইসি’র দায় এড়ানোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে (মানবজমিন, ৭ জানুয়ারি ২০২২)"

বাংলাদেশে স্থানীয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আবেগপূর্ণ ও বিভাজনকারী। নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার ঘটাতে স্থানীয় নির্বাচনগুলো অতীব গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি টেকসই নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় নির্বাচনে সব অভিনেতাদের এক সঙ্গে কাজ করতে হয়। নির্বাচন প্রশাসনের উচ্চ ক্ষমতা থাকে যেখানে স্বাধীন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের ইচ্ছার জয় হয় । দেশের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে একটি শক্তিশালী আইন কাঠামোর অধীনে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত। আমরা জানি স্থানীয় নির্বাচন দেশ গণতন্ত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থাপনা এ প্রক্রিয়ার জন্য এখন অত্যাবর্ষকীয় হয়ে পড়েছে ।

হ্যামিল্টনের ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিটার গ্রেফ বলেছেন, "গত ১০০ বছরে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা ম্লান হয়ে গেছে।" কানাডায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এদেশের রীতি। কিন্তু অতীতে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যখন চরমপন্থীরা তাদের পয়েন্ট তৈরি করতে বন্দুক ও বোমার দিকে ঝুঁকেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করলে, সেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা সর্বদা বেড়েই চলেছে সে অনুযায়ী মনে হয়, কানাডা একটি শান্ত দেশ তবে চরমপন্থা কখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি । তবে স্থানীয় বা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনে এখন কোনরূপ সংঘাত সহিংসতা নেই ।

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীত্তোর এ সময়ে বাংলাদেশে বিশেষত রাজধানীর বাইরে ইউপি নির্বাচনী এলাকাগুলো ছিলো উত্তপ্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বাদ পড়া প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সন্তোষজনক
ফল লাভ করতে পারেনি। পঞ্চম ধাপে অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭০৮টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানায় যে সর্বশেষ ৬৮৬টি ইউপির ফলাফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে ৩৩২ জন অন্যদিকে ৩৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রতীকের প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। নিবিড় ভাবে পর্যালোচনায় দেখা যায় যে চলমান ইউপি ভোটে নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতায় হতাহতের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী (আওয়ামী লীগ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে পঞ্চম ধাপে ১১ জন সহ চলমান ইউপি ভোটের পাঁচ ধাপে অন্তত ১০০ জন লোক নিহত এবং ৫ শতাধিক আহত হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে । এরমধ্যে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন এগিয়ে আসছে সেখানে সেলিনা হায়াৎ আইভী (আওয়ামী লীগ) তৈমুর আলম খন্দকার (সাবেক বিএনপি নেতা ) এর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্ধন্ধিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জামায়াত হেফাজতের একটি শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে তারা তৈমুর আলম খন্দকারকে সমর্থন জুগাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের ধ্বংস ও ডানপন্থীদের সহিংসতা যখন সমাজকে অসহনীয় করে তুলেছিলো। তখনো, সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য হিসাবে দেখা হত। আমাদের বাংলাদেশে "নির্বাচন সংস্কৃতি" তে যে ভয়াবহ সংঘাত, সংঘর্ষ ও খুন খারাবি শুরু হয়েছে এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শতাধিক লোকের মৃত্যুকে কোনো অবস্থায় মেনে নেয়া যায় না, নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে। ঘটনাগুলোর দায় নিরুপন করে দোষীদের বিরূদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে. স্থানীয় নির্বাচনে এত তীব্র প্রতিযুগিতার মধ্যেও কি বিশেষ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য সংখক প্রার্থী বিনা প্রতিদন্ধিতায় নির্বাচিত হয়েছে তাও খতিয়ে দেখতে হবে. .বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরো মজবুত ও শক্তিশালী করতে হবে. তা না হলে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা আস্থা হারাবে, পথ হারাবে গণতন্ত্র।

তের বছরে সরকার, ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের অৰ্জন নিম্নমুখী ও নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতা

 দেলোয়ার জাহিদ 
০৯ জানুয়ারি ২০২২, ০৪:১৬ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীত্তোর বাংলাদেশে অগ্রগতির নতুন এক মাইলফলক সৃষ্টি করে নজিরবিহীন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রত্যয় নিয়ে তের বছর পূর্ণ করেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। ঈর্ষণীয় সাফল্যের এক সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে সরকারের।  ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি তৃতীয় বারের মতো সরকার গঠনের পর খাদ্য নিরাপত্তা, শান্তি চুক্তি, সমুদ্র বিজয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি, সড়ক ও রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি  ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সহ সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত বাঞ্ছনীয় সাফল্য এসেছে। সরকার বর্তমান মেয়াদের তৃতীয় বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পা রেখেছে।

এমন একটি সময়ে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। দেশের "নির্বাচন সংস্কৃতি"  সবচেয়ে কঠিন ও জটিল সময় পাড় করছে। নির্বাচন কমিশনার ব্যর্থতা, নির্লিপ্ততা ও স্থানীয় প্রশাসন সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময় উপযোগী পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে শতাধিক লোকের প্রাণহানী ঘটেছে। দেশে  ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও এ প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ৭ জানুয়ারী, দৈনিক যুগান্তরে   স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ,  সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বক্তব্য রেখেছেন। তারা নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতায় সহিংসতা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিক্রিয়া জানান।

ড. তোফায়েল বলেন, "সমাজটা দিন দিন একতরফা আধিপত্যের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে ক্ষমতাবান হয়ে গেছেন, তারা চান না নতুন করে কেউ আর গজিয়ে উঠুক। তাই যে এগিয়ে আসছে তাকেই মারধর করা হচ্ছে। আর মারধরের শিকার ব্যক্তি যদি প্রতিরোধ করে, তখনই তা মারামারি ও কাটাকাটিতে পরিণত হচ্ছে।"  ড. এম সাখাওয়াত বলেছেন, "ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইসির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রথম থেকেই সহিংসতা সামাল দিতে কমিশন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে দিনদিন এটি আরও বাড়ছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় জড়িত কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়নি। কারও বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা। বিচারহীনতার কারণে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জোর যার মুল্লুক তার। এখন ইলেকশন হচ্ছে না, ভোট ছিনতাই হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এ ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা স্থায়ী হলে জাতীয় নির্বাচনে এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হতে পারে।" ..."স্বার্থপরতার রাজনীতির কারণেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। যতদিন রাজনীতির এই ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন সবাই মরিয়া আচরণ করবে-এমন মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যতদিন পার পাওয়া যাবে, ততদিন এই অবস্থা চলতেই থাকবে। এ ঘটনা সামাল দেওয়া সম্ভব না হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কারণ সংসদ-সদস্যের পদবি এখন সোনার হরিণ। সংসদ-সদস্য হওয়া মানে জমিদার হওয়া, যা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বানিয়ে দেয়।" তিনিও যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব করোনা সংকট সহ আকাশচুম্বি চ্যালেঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত সরকারে থাকা এবং উন্নয়নমুখী অর্থনীতির উপর  কাজ করার ফলে সদ্য বিদায়ী ২০২১ সালটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর।  বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মধ্যআয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও উন্নয়নমুখী অর্থনীতির জন্য বিশ্বে সবিশেষ প্রশংসিত হয়েছে। তবে ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি হয়েছে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ও মানবাধিকার বিষয়ে ৭ র্যাব কর্ম্মকর্তার বিরুদ্বে যুক্তরাষ্ট্রের  নিষেধাজ্ঞায়।

"সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কোনো দায় নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনে সহিংসতা ও মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। দায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের। সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছে কেন্দ্রের বাইরে। তাদের বারবার বলি সহনশীল হতে। বরাবরের মতো পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে সংঘাত-সংঘর্ষে। এত প্রাণহানির পরও সিইসি’র দায় এড়ানোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন  দেখা দিয়েছে (মানবজমিন, ৭ জানুয়ারি ২০২২)"

বাংলাদেশে স্থানীয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আবেগপূর্ণ ও বিভাজনকারী। নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার ঘটাতে স্থানীয় নির্বাচনগুলো অতীব গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি টেকসই নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় নির্বাচনে সব অভিনেতাদের এক সঙ্গে  কাজ করতে হয়। নির্বাচন প্রশাসনের উচ্চ ক্ষমতা থাকে যেখানে স্বাধীন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের ইচ্ছার জয় হয় । দেশের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে একটি শক্তিশালী আইন কাঠামোর অধীনে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত।  আমরা জানি স্থানীয় নির্বাচন দেশ গণতন্ত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থাপনা এ প্রক্রিয়ার জন্য এখন অত্যাবর্ষকীয় হয়ে পড়েছে ।

হ্যামিল্টনের ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিটার গ্রেফ বলেছেন, "গত ১০০ বছরে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা ম্লান হয়ে গেছে।" কানাডায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এদেশের রীতি। কিন্তু অতীতে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যখন চরমপন্থীরা তাদের পয়েন্ট তৈরি করতে বন্দুক ও বোমার দিকে ঝুঁকেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করলে, সেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা সর্বদা বেড়েই চলেছে সে অনুযায়ী মনে হয়, কানাডা একটি শান্ত দেশ  তবে চরমপন্থা কখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি । তবে স্থানীয় বা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনে এখন কোনরূপ সংঘাত সহিংসতা নেই ।

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীত্তোর এ সময়ে বাংলাদেশে বিশেষত রাজধানীর বাইরে ইউপি নির্বাচনী এলাকাগুলো ছিলো উত্তপ্ত।  দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বাদ পড়া প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সন্তোষজনক
ফল লাভ করতে পারেনি।  পঞ্চম ধাপে অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭০৮টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানায় যে সর্বশেষ ৬৮৬টি ইউপির ফলাফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে ৩৩২ জন অন্যদিকে ৩৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রতীকের প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।  নিবিড় ভাবে  পর্যালোচনায় দেখা যায় যে চলমান ইউপি ভোটে নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতায় হতাহতের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী (আওয়ামী লীগ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  গণমাধ্যমের খবরে পঞ্চম ধাপে ১১ জন সহ চলমান ইউপি ভোটের পাঁচ ধাপে অন্তত ১০০ জন লোক নিহত এবং ৫ শতাধিক আহত হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে । এরমধ্যে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন এগিয়ে আসছে সেখানে সেলিনা হায়াৎ আইভী (আওয়ামী লীগ) তৈমুর আলম খন্দকার (সাবেক বিএনপি নেতা ) এর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্ধন্ধিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জামায়াত হেফাজতের একটি শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে তারা তৈমুর আলম খন্দকারকে সমর্থন জুগাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের ধ্বংস ও ডানপন্থীদের সহিংসতা যখন সমাজকে অসহনীয় করে তুলেছিলো। তখনো, সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য হিসাবে দেখা হত। আমাদের বাংলাদেশে "নির্বাচন সংস্কৃতি" তে যে ভয়াবহ সংঘাত, সংঘর্ষ ও খুন খারাবি শুরু হয়েছে এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শতাধিক লোকের মৃত্যুকে কোনো অবস্থায় মেনে নেয়া যায় না, নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে। ঘটনাগুলোর দায় নিরুপন করে দোষীদের বিরূদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে. স্থানীয় নির্বাচনে এত তীব্র প্রতিযুগিতার মধ্যেও কি বিশেষ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য সংখক প্রার্থী বিনা প্রতিদন্ধিতায় নির্বাচিত হয়েছে তাও খতিয়ে দেখতে হবে. .বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরো মজবুত ও শক্তিশালী করতে হবে. তা না হলে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা আস্থা হারাবে, পথ হারাবে গণতন্ত্র।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন