উচ্চশিক্ষা এবং অভিভাবকদের রক্তক্ষরণ
jugantor
উচ্চশিক্ষা এবং অভিভাবকদের রক্তক্ষরণ

  মনোজ সরকার  

২৩ জুন ২০২২, ২২:২২:৫০  |  অনলাইন সংস্করণ

শুরু হয়েছে ভর্তিযুদ্ধ। এটা শিক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদেরই চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে বেশি। ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে তো তার সন্তান? না হলে তো জীবন বরবাদ। ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না হলে মূল্যায়ন হবে না; ভালো চাকরি হবে না; বিসিএস দিতে পারবে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম। চাকরির বাজারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে।

এদিকে যুদ্ধ করতে করতে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ যুদ্ধ শুরু হয় সেই ছোট থেকেই। ভালো স্কুলে ভর্তি, ভালো ফলাফল না হলে সমাজে স্ট্যাটাস থাকে না। পিতা-মাতার স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের শৈশব-কৈশোর-যৌবন বিসর্জন দিতে হয়। এর ফলে শেষ মুহূর্তে এসে অনেক টপার শিক্ষার্থীদের ছিটকে পড়তে দেখেছি।

এবারের ভর্তি পরীক্ষায় কী হবে জানি না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এক সিটের জন্য লড়বেন ২৭৪ জন শিক্ষার্থী। বুঝুন এবার; কী করবে আমাদের শিক্ষার্থীরা। এ খবর শোনার পর শিক্ষার্থীদের মনের অবস্থা কেমন হবে- সেটাই বিবেচ্য বিষয়। পরীক্ষায় বসার আগে তাদের নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। ২৭৩ জনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। মনের মধ্যে এ বিষয়টি একবার বসে গেলে পরীক্ষায় কী হবে- তা সবার অনুমেয়।

আমি ভাগ্য বিশ্বাস করি না। এবার করতে হবে। এখানে যারা আবেদন করেছেন- জানি তারা সবাই টপার। তাহলে ২৭৩ জনকে টপকিয়ে একজন সিট পাবেন। সেটা ভাগ্য সহায় না হলে- কীভাবে হবে জানি না।

এছাড়া অভিভাবকরা কী করবেন? যারা ভর্তি পরীক্ষায় বসবেন, তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আশপাশের না। আসবেন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে। তাদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাতে হবে অভিভাবকদের। যাদের অর্থ আছে- তাদের সমস্যা না। কিন্তু যারা দরিদ্র, নুন আনতে পান্তা ফুরায়- তাদের অবস্থা কেমন হবে? ভর্তির আবেদন করতে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা খরচ। এরপর বই, কোচিংয়ের খরচ। সব মিলিয়ে অভিভাবকরা পড়েন জাঁতাকলে।

গ্রামের অনেক পিতা-মাতাকে দেখেছি- তাদের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন। তারা আশায় বুক বাঁধেন- সন্তান ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, ভালো ফলাফল করবে; ভালো চাকরি করে সব অভাব মিটিয়ে দেবে। তাদের সেই স্বপ্ন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে গড়াগড়ি খায়। পরে এক বুকভরা কষ্ট নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর ভাগ্যকে দোষারোপ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুসারে, উচ্চশিক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ হাজার আসন আছে। সবার চোখ থাকে এই ৪০ হাজার সিটের দিকেই। সবাই সেভাবেই প্রস্তুতি নেন। যিনি সুযোগ পান তিনি ভাগ্যবান। আর যারা সুযোগ পান না তাদের সামান্য কিছু অংশ যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭৫টি সিট আছে। আসন বেশি থাকলেও সেখানে পড়াতে পারেন না অনেকে। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের খরচ চালানোর মতো অভিভাবক খুব কমই আছেন।

এরপর সিংহভাগ ঝুঁকে পড়েন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজে ডিগ্রি পাশ ও স্নাতকে ১০ লাখ ৯৩ লাখ ৮১১টি আসন আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয় ৮৮১টি কলেজের মধ্যে সরকারি কলেজ ২৬৪টি এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৬১৭টি। এসব কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তিযোগ্য মোট আসন আছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫টি। আর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল ও অনার্স মাদ্রাসায় ৬০ হাজার আসন আছে। বাকি যারা থাকবেন তাদের অধিকাংশ পাশকোর্সে ভর্তি হয়ে সময় পার করবেন। আর একটি অংশ ঝরে পড়বে।

এদিকে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে একজন অভিভাবকের কত কষ্ট, কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়- সন্তানরা জানতেও পারেন না। সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে, সহায় সম্পদ হারিয়ে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু যখন সন্তানরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান না, তখন তাদের বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সেটা সন্তানদের বুঝতে না দিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দিতে পাশে এসে দাঁড়ান বাবা-মা।

উচ্চশিক্ষা এবং অভিভাবকদের রক্তক্ষরণ

 মনোজ সরকার 
২৩ জুন ২০২২, ১০:২২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

শুরু হয়েছে ভর্তিযুদ্ধ। এটা শিক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদেরই চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে বেশি। ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে তো তার সন্তান? না হলে তো জীবন বরবাদ। ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না হলে মূল্যায়ন হবে না; ভালো চাকরি হবে না; বিসিএস দিতে পারবে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম। চাকরির বাজারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে।

এদিকে যুদ্ধ করতে করতে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ যুদ্ধ শুরু হয় সেই ছোট থেকেই। ভালো স্কুলে ভর্তি, ভালো ফলাফল না হলে সমাজে স্ট্যাটাস থাকে না। পিতা-মাতার স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের শৈশব-কৈশোর-যৌবন বিসর্জন দিতে হয়। এর ফলে শেষ মুহূর্তে এসে অনেক টপার শিক্ষার্থীদের ছিটকে পড়তে দেখেছি।

এবারের ভর্তি পরীক্ষায় কী হবে জানি না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এক সিটের জন্য লড়বেন ২৭৪ জন শিক্ষার্থী। বুঝুন এবার; কী করবে আমাদের শিক্ষার্থীরা। এ খবর শোনার পর শিক্ষার্থীদের মনের অবস্থা কেমন হবে- সেটাই বিবেচ্য বিষয়। পরীক্ষায় বসার আগে তাদের নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। ২৭৩ জনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। মনের মধ্যে এ বিষয়টি একবার বসে গেলে পরীক্ষায় কী হবে- তা সবার অনুমেয়।

আমি ভাগ্য বিশ্বাস করি না। এবার করতে হবে। এখানে যারা আবেদন করেছেন- জানি তারা সবাই টপার। তাহলে ২৭৩ জনকে টপকিয়ে একজন সিট পাবেন। সেটা ভাগ্য সহায় না হলে- কীভাবে হবে জানি না।

এছাড়া অভিভাবকরা কী করবেন? যারা ভর্তি পরীক্ষায় বসবেন, তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আশপাশের না। আসবেন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে। তাদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাতে হবে অভিভাবকদের। যাদের অর্থ আছে- তাদের সমস্যা না। কিন্তু যারা দরিদ্র, নুন আনতে পান্তা ফুরায়- তাদের অবস্থা কেমন হবে? ভর্তির আবেদন করতে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা খরচ। এরপর বই, কোচিংয়ের খরচ। সব মিলিয়ে অভিভাবকরা পড়েন জাঁতাকলে।

গ্রামের অনেক পিতা-মাতাকে দেখেছি- তাদের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন। তারা আশায় বুক বাঁধেন- সন্তান ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, ভালো ফলাফল করবে; ভালো চাকরি করে সব অভাব মিটিয়ে দেবে। তাদের সেই স্বপ্ন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে গড়াগড়ি খায়। পরে এক বুকভরা কষ্ট নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর ভাগ্যকে দোষারোপ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুসারে, উচ্চশিক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ হাজার আসন আছে। সবার চোখ থাকে এই ৪০ হাজার সিটের দিকেই। সবাই সেভাবেই প্রস্তুতি নেন। যিনি সুযোগ পান তিনি ভাগ্যবান। আর যারা সুযোগ পান না তাদের সামান্য কিছু অংশ যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭৫টি সিট আছে। আসন বেশি থাকলেও সেখানে পড়াতে পারেন না অনেকে। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের খরচ চালানোর মতো অভিভাবক খুব কমই আছেন।

এরপর সিংহভাগ ঝুঁকে পড়েন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজে ডিগ্রি পাশ ও স্নাতকে ১০ লাখ ৯৩ লাখ ৮১১টি আসন আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয় ৮৮১টি কলেজের মধ্যে সরকারি কলেজ ২৬৪টি এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৬১৭টি। এসব কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তিযোগ্য মোট আসন আছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫টি। আর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল ও অনার্স মাদ্রাসায় ৬০ হাজার আসন আছে। বাকি যারা থাকবেন তাদের অধিকাংশ পাশকোর্সে ভর্তি হয়ে সময় পার করবেন। আর একটি অংশ ঝরে পড়বে।

এদিকে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে একজন অভিভাবকের কত কষ্ট, কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়- সন্তানরা জানতেও পারেন না। সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে, সহায় সম্পদ হারিয়ে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু যখন সন্তানরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান না, তখন তাদের বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সেটা সন্তানদের বুঝতে না দিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দিতে পাশে এসে দাঁড়ান বাবা-মা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন