বৈদেশিক শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হোক
jugantor
বৈদেশিক শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হোক

  আহসান হাবিব  

২৪ জুন ২০২২, ০০:১৫:৪২  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ জনসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন ও বেকারত্ব দূরীকণের লক্ষ্যে সরকার অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব হ্রাস এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিদেশের শ্রমবাজার। তার প্রধান কারণ হচ্ছে সিন্ডিকেট।

একাধিক বড় শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার কারণে বেড়েছে সৌদি আরব নির্ভরতা। গত কয়েক বছরে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরবে। সিন্ডিকেট এবং রিক্রুটিং এজেন্সি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কারণে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে আবারো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বন্ধ দুয়ার খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই আগের অবস্থা। সিন্ডিকেটমুক্ত হতে পারেনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগে বাতিল হওয়া জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতেই বাংলাদেশের ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ১ হাজার ৫২০টি বৈধ এজেন্সির মধ্যে মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর বাছাই করা ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়ার কারণে সেই সিন্ডিকেটের কবলেই থাকল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

২০১৮ সালে ১০টি এজেন্টের সিন্ডিকেটের ব্যাপক অনিয়ম ও পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহাথির মুহাম্মদ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেন। জিটুজি প্লাস বাতিল করেন। সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত ১০ সিন্ডিকেটের ৬টি এজেন্সি বাদ পড়লেও বাকি চারটি থেকে গেছে নতুন ২৫টির তালিকায়। তবে এই চারটি বিতর্কিত রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে তিনটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ভিন্ন নামে। এর একটি ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৫৪৯) এবারও রয়েছে। অর্থাৎ যাহা বায়ান্ন তাহা তেপ্পান্নই রয়ে গেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত চার এজেন্সি নতুন নামে ঢুকেছে ২৫ এজেন্সির তালিকায়। ফলে শ্রমিকদের আবার জিম্মি হতে হবে, বাড়তি টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে হবে।

মালয়েশিয়ার মিডিয়া ‘মালয় মেইল’ সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে- গত ১২ জুন ক্লাং শহরের এমপি চার্লস সান্টিয়াগো জানান, আমিন নামের এক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করেছে। মূলত বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি মোহাম্মদ আমিন আবদুল নুরের কথা উল্লেখ করেন চার্লস। যে কোম্পানিটি মালয় সরকারকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই আমিনের বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে।

২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পৌনে তিন লাখ কর্মী নিয়োগ করে দেশটি। তারা একেকজন শ্রমিকের নিকট থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। আগের সিন্ডিকেটে থাকলেও এবার বাদ পড়া রাব্বি ইন্টান্যাশনালের মালিক মোহাম্মদ বশির বলেছেন, আগেরবার কর্মী পাঠানোর নামে অনৈতিক ব্যবসা হয়েছে। জিটুজি প্লাসে কর্মী প্রতি সরকার নির্ধারিত ব্যয় প্রথমে ছিল ৩৭ হাজার টাকা। পরে তা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। নামে ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট হলেও ব্যবসা ও মুনাফা করেছে তিন চারটি প্রতিষ্ঠান। বাকিরা কলঙ্কের ভাগিদার হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের মতো এবারো নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও অনৈতিক। অনিয়ম হয়েছিল বলেই ২০১৮ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল। অনৈতিক পদ্ধতির পুনরাবৃত্তিতে আবার একই পরিণতি হতে পারে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ জানান, বর্তমানে যারা মালয়েশিয়া যাবেন কর্মী প্রতি খরচ বা অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার কম হবে। অথচ মালয়েশিয়ার মন্ত্রী বলেছেন, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের কথা। এজেন্সি নির্ধারিত ব্যয়ের বেশি টাকা নিলে এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইমরান আহমদ।

এদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী হিসেবে গমনেচ্ছুদের বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিএমইটির আওতাধীন সব জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) অথবা নির্ধারিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) সরাসরি উপস্থিত হয়েও নিবন্ধন করা যাবে। প্রতিটি সফল নিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা সরকারি ফি (অফেরতযোগ্য) পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিকটস্থ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) বা টিটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) ১২০০ সদস্যের অধিকাংশকে বঞ্চিত করে, মাত্র ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক রফতানি হলেই শ্রমিকদের সংকট বাড়বে। তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যয় বাড়ানো হবে। শ্রমিকরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে তাদের চাহিদামতো অর্থ দেবে। নতুবা ওই শ্রমিক যেতে পারবে না। সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়লে শ্রমিককে কিভাবে নির্ধারিত টাকার কয়েক গুণ টাকা দিতে হয় তা আমরা ইতোপূর্বেও জেনেছি।

বাংলাদেশ থেকে এক সময় অনেক দেশে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের জন্য কর্মীরা গেলেও গত কয়েক বছরে সেই বাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বে শ্রমবাজারে আরো চাপে পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭২টি দেশে কাজ করেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কাজ নিয়ে বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশই গেছেন সৌদি আরব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরোনো শ্রমবাজারে মন্দা ও নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে না পারায় চার বছর ধরে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমছে। এর মধ্যে মহামারী করোনার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি কমেছে গত দুই বছরে। ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে প্রবাসী আয়, সামনে এটি আরও কমতে পারে।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে আছে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। করোনার প্রভাবে কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন, লেবাননে কর্মী যাচ্ছেন হাতে গোনা। জর্ডানেও কর্মী পাঠানো অনেক কমে গেছে। নতুন শ্রমবাজারে কর্মী যাচ্ছেন নামমাত্র সংখ্যায়। অভিবাসন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় খাত। অথচ এটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শুধু প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় হবে না।

সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় মিলে একটি সমন্বয় সেল করা দরকার। মহামারির সময়ে কর্মী পাঠানো বাড়াতে আরও আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। করোনার মধ্যে সবার আয় কমলেও দেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেড়েছিল। অনিশ্চয়তা থেকে জমানো টাকা অনেকে দেশে পাঠিয়ে দেন। ওই সময় হুন্ডি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আকাশপথে যোগাযোগ চালুর পর এটি আবার শুরু হয়েছে। গত দুই বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ ফিরে গেলেও বড় অংশ দেশে রয়ে গেছেন।

আমাদের দেশের বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ আসছে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো আয় থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে। এ বিপুল অর্থ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মরত।

আমাদের অর্থনীতিতে তাদের বিশাল অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি শ্রমবাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে শ্রমিকরা হয়রানি-ভোগান্তির শিকার হওয়ার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক। বৈদেশিক শ্রমবাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বিদেশে শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া দেশে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শোনা যায়। এর অবসান হওয়া জরুরি। দূতাবাসগুলোতে শ্রমিকরা কোনো অভিযোগ করলে তা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়, তার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শ্রমিক পাঠানোয় নিয়োজিতরা কোনো অনিয়মে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে কারও দায় পেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই বলেই আমরা মনে করি।

বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর আমাদের নির্ভরতার বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে কিনা, সেটিও চিন্তা করে দেখা দরকার। সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ দেশ এখন অভ্যন্তরীণভাবেই শ্রমিকের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। দিন দিন এসব দেশে বৈদেশিক শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। সৌদি আরব ১২টি সেক্টরকে সৌদিকরণের ঘোষণা দেওয়ায় সেখান থেকে বিদেশি শ্রমিক নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর্মসংস্থানের জন্য বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।

এ বিষয়ে সরকার দ্রুতই প্রয়োজনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সিন্ডিকেটের ব্যাপক অনিয়ম ও পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে ইতিপূর্বে মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারে শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে স্বচ্ছতা জরুরি। নতুবা পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তখন করার কিছুই থাকবে না।

বৈদেশিক শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হোক

 আহসান হাবিব 
২৪ জুন ২০২২, ১২:১৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ জনসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন ও বেকারত্ব দূরীকণের লক্ষ্যে সরকার অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব হ্রাস এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিদেশের শ্রমবাজার। তার প্রধান কারণ হচ্ছে সিন্ডিকেট।

একাধিক বড় শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার কারণে বেড়েছে সৌদি আরব নির্ভরতা। গত কয়েক বছরে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরবে। সিন্ডিকেট এবং রিক্রুটিং এজেন্সি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কারণে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে আবারো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বন্ধ দুয়ার খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই আগের অবস্থা। সিন্ডিকেটমুক্ত হতে পারেনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগে বাতিল হওয়া জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতেই বাংলাদেশের ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ১ হাজার ৫২০টি বৈধ এজেন্সির মধ্যে মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর বাছাই করা ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়ার কারণে সেই সিন্ডিকেটের কবলেই থাকল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

২০১৮ সালে ১০টি এজেন্টের সিন্ডিকেটের ব্যাপক অনিয়ম ও পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহাথির মুহাম্মদ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেন। জিটুজি প্লাস বাতিল করেন। সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত ১০ সিন্ডিকেটের ৬টি এজেন্সি বাদ পড়লেও বাকি চারটি থেকে গেছে নতুন ২৫টির তালিকায়। তবে এই চারটি বিতর্কিত রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে তিনটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ভিন্ন নামে। এর একটি ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৫৪৯) এবারও রয়েছে। অর্থাৎ যাহা বায়ান্ন তাহা তেপ্পান্নই রয়ে গেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত চার এজেন্সি নতুন নামে ঢুকেছে ২৫ এজেন্সির তালিকায়। ফলে শ্রমিকদের আবার জিম্মি হতে হবে, বাড়তি টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে হবে। 

মালয়েশিয়ার মিডিয়া ‘মালয় মেইল’ সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে- গত ১২ জুন ক্লাং শহরের এমপি চার্লস সান্টিয়াগো জানান, আমিন নামের এক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করেছে। মূলত বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি মোহাম্মদ আমিন আবদুল নুরের কথা উল্লেখ করেন চার্লস। যে কোম্পানিটি মালয় সরকারকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই আমিনের বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে।

২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পৌনে তিন লাখ কর্মী নিয়োগ করে দেশটি। তারা একেকজন শ্রমিকের নিকট থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। আগের সিন্ডিকেটে থাকলেও এবার বাদ পড়া রাব্বি ইন্টান্যাশনালের মালিক মোহাম্মদ বশির বলেছেন, আগেরবার কর্মী পাঠানোর নামে অনৈতিক ব্যবসা হয়েছে। জিটুজি প্লাসে কর্মী প্রতি সরকার নির্ধারিত ব্যয় প্রথমে ছিল ৩৭ হাজার টাকা। পরে তা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। নামে ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট হলেও ব্যবসা ও মুনাফা করেছে তিন চারটি প্রতিষ্ঠান। বাকিরা কলঙ্কের ভাগিদার হয়েছে। 

তিনি বলেন, আগের মতো এবারো নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও অনৈতিক। অনিয়ম হয়েছিল বলেই ২০১৮ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল। অনৈতিক পদ্ধতির পুনরাবৃত্তিতে আবার একই পরিণতি হতে পারে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ জানান, বর্তমানে যারা মালয়েশিয়া যাবেন কর্মী প্রতি খরচ বা অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার কম হবে। অথচ মালয়েশিয়ার মন্ত্রী বলেছেন, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের কথা। এজেন্সি নির্ধারিত ব্যয়ের বেশি টাকা নিলে এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইমরান আহমদ।

এদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী হিসেবে গমনেচ্ছুদের বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিএমইটির আওতাধীন সব জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) অথবা নির্ধারিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) সরাসরি উপস্থিত হয়েও নিবন্ধন করা যাবে। প্রতিটি সফল নিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা সরকারি ফি (অফেরতযোগ্য) পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিকটস্থ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) বা টিটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) ১২০০ সদস্যের অধিকাংশকে বঞ্চিত করে, মাত্র ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক রফতানি হলেই শ্রমিকদের সংকট বাড়বে। তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যয় বাড়ানো হবে। শ্রমিকরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে তাদের চাহিদামতো অর্থ দেবে। নতুবা ওই শ্রমিক যেতে পারবে না। সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়লে শ্রমিককে কিভাবে নির্ধারিত টাকার কয়েক গুণ টাকা দিতে হয় তা আমরা ইতোপূর্বেও জেনেছি।

বাংলাদেশ থেকে এক সময় অনেক দেশে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের জন্য কর্মীরা গেলেও গত কয়েক বছরে সেই বাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বে শ্রমবাজারে আরো চাপে পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭২টি দেশে কাজ করেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কাজ নিয়ে বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশই গেছেন সৌদি আরব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরোনো শ্রমবাজারে মন্দা ও নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে না পারায় চার বছর ধরে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমছে। এর মধ্যে মহামারী করোনার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি কমেছে গত দুই বছরে। ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে প্রবাসী আয়, সামনে এটি আরও কমতে পারে।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে আছে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। করোনার প্রভাবে কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন, লেবাননে কর্মী যাচ্ছেন হাতে গোনা। জর্ডানেও কর্মী পাঠানো অনেক কমে গেছে। নতুন শ্রমবাজারে কর্মী যাচ্ছেন নামমাত্র সংখ্যায়। অভিবাসন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় খাত। অথচ এটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শুধু প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় হবে না।

সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় মিলে একটি সমন্বয় সেল করা দরকার। মহামারির সময়ে কর্মী পাঠানো বাড়াতে আরও আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। করোনার মধ্যে সবার আয় কমলেও দেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেড়েছিল। অনিশ্চয়তা থেকে জমানো টাকা অনেকে দেশে পাঠিয়ে দেন। ওই সময় হুন্ডি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আকাশপথে যোগাযোগ চালুর পর এটি আবার শুরু হয়েছে। গত দুই বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ ফিরে গেলেও বড় অংশ দেশে রয়ে গেছেন।

আমাদের দেশের বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ আসছে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো আয় থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে। এ বিপুল অর্থ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মরত।

আমাদের অর্থনীতিতে তাদের বিশাল অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি শ্রমবাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে শ্রমিকরা হয়রানি-ভোগান্তির শিকার হওয়ার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক। বৈদেশিক শ্রমবাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বিদেশে শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া দেশে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শোনা যায়। এর অবসান হওয়া জরুরি। দূতাবাসগুলোতে শ্রমিকরা কোনো অভিযোগ করলে তা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়, তার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শ্রমিক পাঠানোয় নিয়োজিতরা কোনো অনিয়মে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে কারও দায় পেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই বলেই আমরা মনে করি।

বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর আমাদের নির্ভরতার বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে কিনা, সেটিও চিন্তা করে দেখা দরকার। সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ দেশ এখন অভ্যন্তরীণভাবেই শ্রমিকের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। দিন দিন এসব দেশে বৈদেশিক শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। সৌদি আরব ১২টি সেক্টরকে সৌদিকরণের ঘোষণা দেওয়ায় সেখান থেকে বিদেশি শ্রমিক নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর্মসংস্থানের জন্য বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।

এ বিষয়ে সরকার দ্রুতই প্রয়োজনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সিন্ডিকেটের ব্যাপক অনিয়ম ও পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে ইতিপূর্বে মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারে শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে স্বচ্ছতা জরুরি। নতুবা পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তখন করার কিছুই থাকবে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন