লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঠেকাতে আন্তরিক হন
jugantor
লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঠেকাতে আন্তরিক হন

  আহসান হাবিব  

১৩ আগস্ট ২০২২, ০৫:৪৫:৪৪  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ও রাষ্ট্র-পরিচালিত রেল পরিবহন সংস্থা। বাংলাদেশ রেলওয়ে রেল পরিবহন ব্যবস্থার সিংহভাগ পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

তবে এর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোরও অংশগ্রহণ রয়েছে। যেমনখাদ্য ও পানীয় ক্যাটারিং, কিছু নির্বাচিত রুট ও ট্রেনের রেলওয়ে রিজার্ভেশন ও টিকেটিং ব্যবস্থা এবং প্রধান রেলপথসমূহে ফাইবারঅপটিক কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বেসরকারি সংস্থার ওপর দেয়া হয়েছে। ২ হাজার ৮শত ২২টি গেটের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪টি অবৈধ গেট, গেটম্যান নেই ২ হাজার ২৫৮টিতে এবং বৈধ গেটের মধ্যে ৯০৪টি অরক্ষিত।

রেলগেটগুলোয় যত দুর্ঘটনা ঘটছে, এর ৯০ শতাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে। যার বেশির ভাগই অবৈধ। বৈধ রেলগেটের মাত্র গেটম্যান আছে ৫৬৪টিতে। তাও তাদের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী কর্মচারী। স্থায়ী আছেন মাত্র ৩৩১ জন। একটি গেটে ৬ জন গেটম্যান থাকার কথা। অথচ সে হারে কোথাও গেটম্যান নেই।

দেশের লেভেল ক্রসিংয়ের অবস্থা সম্পর্কে কম-বেশি ধারণা সবারই আছে। লেভেল ক্রসিংগুলো ক্রমশ হয়ে উঠছে ভয়াবহ মরণফাঁদ। এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিনই ঘটছে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা। প্রতিদিনই ঝরছে মানুষের প্রাণ। উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে বহু পরিবার বসছে পথে। বহু মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে উঠতে হচ্ছে।

অধিকাংশ সময় দেখা যায় কোটা ফেলানো ছাড়াই রেল ক্রসিংয়ে রেল চলছে। সাধারণত রেল ক্রসিংয়ের কাছেই রয়েছে হাটবাজার। ফলে এসব রেল ক্রসিংয়ের যারা দায়িত্বে তাদের দায়িত্বজ্ঞান নিয়েও কথা আছে। রেল আসার সময় এদের তৎপরতা খুব কম দেখা যায়। তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল কিনা এটাও বড় প্রশ্ন।

বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় সম্প্রতি রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, ট্রেন নিজে নিজে দুর্ঘটনায় পড়ে না। সড়ক যান লাইনের ওপরে উঠে দুর্ঘটনা সৃষ্টি করে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় যানবাহনের চালক ও পথচারীরা উভয় পাশ দেখে নিজ দায়িত্বে রেললাইন পার হবেন। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে রেলকে দায়ী করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ট্রেন কাউকে ধাক্কা দেয় না। বরং বাইরে থেকে এসে ট্রেনকে ধাক্কা দেয়া হয়।’

ট্রেন যদি নিজের লাইন রেখে অন্যের বাড়িতে ঢুকে পড়ে, তাহলে এটা ট্রেনের দুর্ঘটনা হবে। তার দায়িত্ব রেল নেবে।’ এমন কথা একদম গা বাঁচানো বলে আমরা মনে করি। শুধু অবৈধ গেট বেশি থাকার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে রেল তার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী বেশি গতিতে চলতে পারছে না। অর্থাৎ কম গতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে প্রতিটি রুটে। অত্যাধুনিক কোচ-ইঞ্জিন আনা হলেও এগুলো কোনো কাজেই আসছে না।

এক যুগ আগে যে গতি নিয়ে ট্রেন চলত, এখন গতি আরও কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। নতুন আনা ইঞ্জিন-কোচের গতি ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। বর্তমানে গড়ে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চলছে। অতিরিক্ত লেভেল ক্রসিং এবং জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ট্রেনের প্রকৃত গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে দরকার রেলকে আধুনিক করা এবং অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করা।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মীরসরাই লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১২ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহতদের ১১ জনই হাটহাজারীর জুগিরহাট আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের ছাত্র-শিক্ষক। বাড়ি হাটহাজারীর আমানবাজার খন্দকিয়া গ্রামে। তারা খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফিরছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা আর ঘটেনি। এ দুর্ঘটনার পর রেলগেটগুলোর চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়টি ফের সামনে আসে। এর আগে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জে লেভেল ক্রসিংয়ে বর-কনেসহ ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালের ১ আগস্ট ঝিনাইদহের লেভেল ক্রসিংয়ে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২-এর ২৮ জুলাই পর্যন্ত (১৯ মাসে) লেভেল ক্রসিংয়ে ১১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ জন ট্রেনযাত্রীসহ ৮৯ জনের (সড়ক যান যাত্রী) নির্মম মৃত্যু হয়। গত এক যুগে রেলে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯৯৬টি, যার মধ্যে শুধু লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটে ৯৩৬টি।

রেলওয়ের তথ্য, মোট দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই ঘটে বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে। এসব দুর্ঘটনায় ৫৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে লেভেলক্রসিং প্রাণ কেড়েছে ৫১৬ জনের। এছাড়া প্রতিবছর গড়ে শুধু লেভেল ক্রসিং প্রাণ কেড়েছে ৪৪ জন করে। পঙ্গুত্ব করে দিচ্ছে নিহত সংখ্যার দ্বিগুণের বেশি।

রেল বিভাগের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা এখানে পুরোটাই দায়ী। সম্প্রতি নীলফামারীর দারোয়ানী লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ যায় অটোরিকশার চার যাত্রীর। গুরুতর আহত হন আরও ৬ জন, যাদের কয়েকজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এর দুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আলীনগর রেল লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান ৩ নসিমন-যাত্রী। কখনও কখনও এ সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৬টি।

এসব দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হন ৫২ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে রেল দুর্ঘটনায় ২৭ জনের মৃত্যু আর আহত হন ১১১ জন। মার্চ মাসে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩১ জন, আহত হন ১৮৬ জন। এপ্রিল মাসে রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪২ জন, আহত হন ১৬৬ জন। মে মাসে নিহত হন ২৩ জন, আহত হন ২২১ জন।

জুন মাসে নিহত হয়েছেন ১৭ জন, আহত হন ১৭২ জন। আর জুলাই মাসে ঈদযাত্রাসহ দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৪ জন এবং আহত হন ২৩২ জন। রেলওয়ে আইনে রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে একের পর এক রেলক্রসিংয়ে মানুষ মারা গেলেও নেই কোনো জবাবদিহিতা।

‘ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সব দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের। বিশ্বের অন্যান্য দেশে রেলের যেখানে ক্রসিং থাকে, সেখানে সুরক্ষিত ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ক্রসিং অরক্ষিত থাকার কারণে প্রতিনিয়িত দুর্ঘটায় প্রাণহানি ঘটছে। এর দায় কোনোভাবেই রেল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। কারণ গেটম্যানকে সক্রিয় রাখা ও ট্রেন আসার সময় পারাপারের ক্রসিংয়ে ব্যারিকেড দেয়ার দায়িত্ব রেলের, অন্য কারও নয়।

তবে দুর্ঘটনা কমাতে লেভেলক্রসিং পারাপারে আরও সচেতনতা বাড়ানো ও লাইটের সিগনাল ব্যবহার করা উচিত।’ অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করা গেলে রেল দুর্ঘটনা কমে আসবে। রেল কর্তৃপক্ষের উচিৎ যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে রেলের সুব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঠেকাতে আন্তরিক হন

 আহসান হাবিব 
১৩ আগস্ট ২০২২, ০৫:৪৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ও রাষ্ট্র-পরিচালিত রেল পরিবহন সংস্থা। বাংলাদেশ রেলওয়ে রেল পরিবহন ব্যবস্থার সিংহভাগ পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

তবে এর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোরও অংশগ্রহণ রয়েছে। যেমন খাদ্য ও পানীয় ক্যাটারিং, কিছু নির্বাচিত রুট ও ট্রেনের রেলওয়ে রিজার্ভেশন ও টিকেটিং ব্যবস্থা এবং প্রধান রেলপথসমূহে ফাইবারঅপটিক কেবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বেসরকারি সংস্থার ওপর দেয়া হয়েছে। ২ হাজার ৮শত ২২টি গেটের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪টি অবৈধ গেট, গেটম্যান নেই ২ হাজার ২৫৮টিতে এবং বৈধ গেটের মধ্যে ৯০৪টি অরক্ষিত।

রেলগেটগুলোয় যত দুর্ঘটনা ঘটছে, এর ৯০ শতাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে। যার বেশির ভাগই অবৈধ। বৈধ রেলগেটের মাত্র গেটম্যান আছে ৫৬৪টিতে। তাও তাদের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী কর্মচারী। স্থায়ী আছেন মাত্র ৩৩১ জন। একটি গেটে ৬ জন গেটম্যান থাকার কথা। অথচ সে হারে কোথাও গেটম্যান নেই।

দেশের লেভেল ক্রসিংয়ের অবস্থা সম্পর্কে কম-বেশি ধারণা সবারই আছে। লেভেল ক্রসিংগুলো ক্রমশ হয়ে উঠছে ভয়াবহ মরণফাঁদ। এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিনই ঘটছে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা। প্রতিদিনই ঝরছে মানুষের প্রাণ। উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে বহু পরিবার বসছে পথে। বহু মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে উঠতে হচ্ছে।

অধিকাংশ সময় দেখা যায় কোটা ফেলানো ছাড়াই রেল ক্রসিংয়ে রেল চলছে। সাধারণত রেল ক্রসিংয়ের কাছেই রয়েছে হাটবাজার। ফলে এসব রেল ক্রসিংয়ের যারা দায়িত্বে তাদের দায়িত্বজ্ঞান নিয়েও কথা আছে। রেল আসার সময় এদের তৎপরতা খুব কম দেখা যায়। তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল কিনা এটাও বড় প্রশ্ন। 

বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় সম্প্রতি রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, ট্রেন নিজে নিজে দুর্ঘটনায় পড়ে না। সড়ক যান লাইনের ওপরে উঠে দুর্ঘটনা সৃষ্টি করে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় যানবাহনের চালক ও পথচারীরা উভয় পাশ দেখে নিজ দায়িত্বে রেললাইন পার হবেন। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে রেলকে দায়ী করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ট্রেন কাউকে ধাক্কা দেয় না। বরং বাইরে থেকে এসে ট্রেনকে ধাক্কা দেয়া হয়।’

ট্রেন যদি নিজের লাইন রেখে অন্যের বাড়িতে ঢুকে পড়ে, তাহলে এটা ট্রেনের দুর্ঘটনা হবে। তার দায়িত্ব রেল নেবে।’ এমন কথা একদম গা বাঁচানো বলে আমরা মনে করি। শুধু অবৈধ গেট বেশি থাকার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে রেল তার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী বেশি গতিতে চলতে পারছে না। অর্থাৎ কম গতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে প্রতিটি রুটে। অত্যাধুনিক কোচ-ইঞ্জিন আনা হলেও এগুলো কোনো কাজেই আসছে না।

এক যুগ আগে যে গতি নিয়ে ট্রেন চলত, এখন গতি আরও কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। নতুন আনা ইঞ্জিন-কোচের গতি ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। বর্তমানে গড়ে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চলছে। অতিরিক্ত লেভেল ক্রসিং এবং জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ট্রেনের প্রকৃত গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে দরকার রেলকে আধুনিক করা এবং অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করা।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মীরসরাই লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১২ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নিহতদের ১১ জনই হাটহাজারীর জুগিরহাট আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের ছাত্র-শিক্ষক। বাড়ি হাটহাজারীর আমানবাজার খন্দকিয়া গ্রামে। তারা খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফিরছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা আর ঘটেনি। এ দুর্ঘটনার পর রেলগেটগুলোর চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়টি ফের সামনে আসে। এর আগে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জে লেভেল ক্রসিংয়ে বর-কনেসহ ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালের ১ আগস্ট ঝিনাইদহের লেভেল ক্রসিংয়ে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২-এর ২৮ জুলাই পর্যন্ত (১৯ মাসে) লেভেল ক্রসিংয়ে ১১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ জন ট্রেনযাত্রীসহ ৮৯ জনের (সড়ক যান যাত্রী) নির্মম মৃত্যু হয়। গত এক যুগে রেলে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯৯৬টি, যার মধ্যে শুধু লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটে ৯৩৬টি।

রেলওয়ের তথ্য, মোট দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই ঘটে বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে। এসব দুর্ঘটনায় ৫৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে লেভেলক্রসিং প্রাণ কেড়েছে ৫১৬ জনের। এছাড়া প্রতিবছর গড়ে শুধু লেভেল ক্রসিং প্রাণ কেড়েছে ৪৪ জন করে। পঙ্গুত্ব করে দিচ্ছে নিহত সংখ্যার দ্বিগুণের বেশি।

রেল বিভাগের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা এখানে পুরোটাই দায়ী। সম্প্রতি নীলফামারীর দারোয়ানী লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ যায় অটোরিকশার চার যাত্রীর। গুরুতর আহত হন আরও ৬ জন, যাদের কয়েকজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এর দুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আলীনগর রেল লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান ৩ নসিমন-যাত্রী। কখনও কখনও এ সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৬টি।

এসব দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হন ৫২ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে রেল দুর্ঘটনায় ২৭ জনের মৃত্যু আর আহত হন ১১১ জন। মার্চ মাসে দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩১ জন, আহত হন ১৮৬ জন। এপ্রিল মাসে রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪২ জন, আহত হন ১৬৬ জন। মে মাসে নিহত হন ২৩ জন, আহত হন ২২১ জন।

জুন মাসে নিহত হয়েছেন ১৭ জন, আহত হন ১৭২ জন। আর জুলাই মাসে ঈদযাত্রাসহ দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৪ জন এবং আহত হন ২৩২ জন। রেলওয়ে আইনে রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে একের পর এক রেলক্রসিংয়ে মানুষ মারা গেলেও নেই কোনো জবাবদিহিতা।

‘ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সব দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের। বিশ্বের অন্যান্য দেশে রেলের যেখানে ক্রসিং থাকে, সেখানে সুরক্ষিত ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ক্রসিং অরক্ষিত থাকার কারণে প্রতিনিয়িত দুর্ঘটায় প্রাণহানি ঘটছে। এর দায় কোনোভাবেই রেল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। কারণ গেটম্যানকে সক্রিয় রাখা ও ট্রেন আসার সময় পারাপারের ক্রসিংয়ে ব্যারিকেড দেয়ার দায়িত্ব রেলের, অন্য কারও নয়।

তবে দুর্ঘটনা কমাতে লেভেলক্রসিং পারাপারে আরও সচেতনতা বাড়ানো ও লাইটের সিগনাল ব্যবহার করা উচিত।’ অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করা গেলে রেল দুর্ঘটনা কমে আসবে। রেল কর্তৃপক্ষের উচিৎ যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে রেলের সুব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন