বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ
jugantor
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

  আহসান হাবিব  

১৪ আগস্ট ২০২২, ০২:১৫:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালিকে একটি হীন, দুর্বলচিত্ত জাতি
হিসেবে পরিচয় করিয়েছে ব্রিটিশরা। আজ এই পরিচয়ের কালিমায় সিক্ত হয়ে
বাঙালি শাসিত হয়ে আসছে। শাসনের ভার যথার্থ অর্থে বাঙালি কোনো দিন
পায়নি।

ইতিহাস পড়ে জানা যায়, গুপ্তযুগের পূর্বে বাঙালির কোনো পরিচয় ছিল না।
ইতিহাসে শশাঙ্ক ও গোপাল নামক দুই স্বাধীন চেতা রাজার অস্তিত্ব পাওয়া
যায়। কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করেছেন ইতিহাসে এমন প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাস নানা জটিলতার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইংরেজ
এসেছে। ইংরেজরা ছিল সুচতুর জাতি। ইংরেজ তার শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য
নানান কৌশল অবলম্বন করেছে। জন্ম দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার। যে
সাম্প্রদায়িকতায় হিন্দু মুসলিমের গলায় এবং মুসলিম হিন্দুর গলায় ছুরি
বসিয়েছে। মানুষে মানুষে বিশৃঙ্খলায় মেতেছে। অর্থাৎ বাঙালি নিজের অস্তিত্ব
সম্পর্কে জানত না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোপে ইংরেজরা দেশ ছাড়লে
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে দিয়ে যায়। জন্ম নেয় পাকিস্তান
নামের এক বিষবৃক্ষ। চরম ধর্মীয় মনোভাব নিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা
বাঙালিদের শাসনে প্রবৃত্ত হয়। বাঙালিরা হলো পাকিস্তানি। বাঙালির সাহিত্য,
সংস্কৃতি, জীবনবোধ- সব হবে পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া
ভাষাকেন্দ্রিক। পাকিস্তানের শাসকরা বাংলার ভাষাকে উর্দু ভাষায় রূপান্তরিত
করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে
পারল না। বাঙালিকে স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যিনি নেতৃত্ব
দিলেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুজিবের অস্তিত্ব আর ভালোবাসা না থাকলে বাঙালি জাতি আজ বাংলা ভাষায়
কথা বলতে পারত না। বাঙালি জাতি হতে পারত না। পারত না ইতিহাসের গতিধারা

বদলিয়ে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে। মুজিব বাঙালিকে
প্রকৃত বাঙালি হতে শিক্ষা দিয়েছেন। রেসকোর্সের মাঠে ভাষণে বলেছেন- ‘আমি
বাঙালি, আমি মানুষ। আমরা আশা করছি, তার এই আদর্শ প্রতিটি বাঙালি

গ্রহণ করেই বাঙালি হিসেবে ‘ভাইয়ের-মায়ের’ হকে সম্বল করে আমরা
সাম্প্রদায়িকতাহীন জীবনযাপন করব।

আজ রাজনীতির স্বার্থে অনেকেই জাতির পিতার আদর্শকে ম্লান করতে চায়।
আমরা বাঙালি অনেক গ্লানি কাটিয়ে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান
পেয়েছি। শেখ মুজিব না হলে আমাদের এই স্বাধীনতা সম্ভব হতো না। তিনিই
ছিলেন আমাদের দ্রষ্টা, তিনিই ছিলেন আমাদের আদর্শ, তিনিই ছিলেন আমাদের
অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতার জন্য দরকার আদর্শ, দরকার ত্যাগ ও তপস্যা।
স্বাধীনতা এমন জিনিস নয়, যা কখনো বিনা ত্যাগ ও তপস্যায় অর্জন করা যায়।
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি অনেক ত্যাগ ও তপস্যার বিনিময়ে। আমাদের এই ত্যাগ
ও তপস্যার নায়ক শেখ মুজিব। বাঙালি আজ এই দুর্জয় বীরের নেতৃত্বে
স্বাধীনতা পেয়েছে এবং এই দেশের নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি,
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং
তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছাকে এক দল সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির
বাসভবন আক্রমণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডের
শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের
ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা

কামাল এবং রোজি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের,
ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি। ওই
সময় বিদেশে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং
শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান।

শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে- উল্লেখ করে
ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্প্রতি বলেছেন- তাকে
‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি এর চেয়ে বড়
কোনো অভিধা এবং নাম কিনতে চাননি। মানুষ তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট
খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। স্বাধীনতার
স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা ভেবেছিল ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে
দেবে-তা হয়নি। বাঙালি তাকে ভোলেনি। আজ শোক দিবস পালনে বাঙালির

একাগ্রতা তার প্রমাণ। প্রতি বছরের ১৫ আগস্ট জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ
দিবসটি শোকের সাথে পালন করা হয়। এই দিনে কালো পতাকা উত্তোলন ও
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনিমিত রাখা হয়। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে
এ দিবসের উৎপত্তি।

যে সরকারই দেশ শাসন করুন না কেন, মুজিব যেন থাকেন আমাদের আদর্শে,
আমাদের অনুপ্রেরণা ও আমাদের চেতনার প্রতীক মহাপুরুষ হয়ে।
মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের একক মহান পুরুষ। তিনিই

গোটা বাঙালি জাতির আদর্শের নাম। মুজিব বাঙালি জাতির ইতিহাসের নতুন
পরিচয়ের নাম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

 আহসান হাবিব 
১৪ আগস্ট ২০২২, ০২:১৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালিকে একটি হীন, দুর্বলচিত্ত জাতি
হিসেবে পরিচয় করিয়েছে ব্রিটিশরা। আজ এই পরিচয়ের কালিমায় সিক্ত হয়ে
বাঙালি শাসিত হয়ে আসছে। শাসনের ভার যথার্থ অর্থে বাঙালি কোনো দিন
পায়নি।

ইতিহাস পড়ে জানা যায়, গুপ্তযুগের পূর্বে বাঙালির কোনো পরিচয় ছিল না।
ইতিহাসে শশাঙ্ক ও গোপাল নামক দুই স্বাধীন চেতা রাজার অস্তিত্ব পাওয়া
যায়। কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করেছেন ইতিহাসে এমন প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাস নানা জটিলতার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইংরেজ
এসেছে। ইংরেজরা ছিল সুচতুর জাতি। ইংরেজ তার শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য
নানান কৌশল অবলম্বন করেছে। জন্ম দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার। যে
সাম্প্রদায়িকতায় হিন্দু মুসলিমের গলায় এবং মুসলিম হিন্দুর গলায় ছুরি
বসিয়েছে। মানুষে মানুষে বিশৃঙ্খলায় মেতেছে। অর্থাৎ বাঙালি নিজের অস্তিত্ব
সম্পর্কে জানত না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোপে ইংরেজরা দেশ ছাড়লে
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে দিয়ে যায়। জন্ম নেয় পাকিস্তান
নামের এক বিষবৃক্ষ। চরম ধর্মীয় মনোভাব নিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা
বাঙালিদের শাসনে প্রবৃত্ত হয়। বাঙালিরা হলো পাকিস্তানি। বাঙালির সাহিত্য,
সংস্কৃতি, জীবনবোধ- সব হবে পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া
ভাষাকেন্দ্রিক। পাকিস্তানের শাসকরা বাংলার ভাষাকে উর্দু ভাষায় রূপান্তরিত
করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে
পারল না। বাঙালিকে স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যিনি নেতৃত্ব
দিলেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুজিবের অস্তিত্ব আর ভালোবাসা না থাকলে বাঙালি জাতি আজ বাংলা ভাষায়
কথা বলতে পারত না। বাঙালি জাতি হতে পারত না। পারত না ইতিহাসের গতিধারা

বদলিয়ে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে। মুজিব বাঙালিকে
প্রকৃত বাঙালি হতে শিক্ষা দিয়েছেন। রেসকোর্সের মাঠে ভাষণে বলেছেন- ‘আমি
বাঙালি, আমি মানুষ। আমরা আশা করছি, তার এই আদর্শ প্রতিটি বাঙালি

গ্রহণ করেই বাঙালি হিসেবে ‘ভাইয়ের-মায়ের’ হকে সম্বল করে আমরা
সাম্প্রদায়িকতাহীন জীবনযাপন করব।

আজ রাজনীতির স্বার্থে অনেকেই জাতির পিতার আদর্শকে ম্লান করতে চায়।
আমরা বাঙালি অনেক গ্লানি কাটিয়ে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান
পেয়েছি। শেখ মুজিব না হলে আমাদের এই স্বাধীনতা সম্ভব হতো না। তিনিই
ছিলেন আমাদের দ্রষ্টা, তিনিই ছিলেন আমাদের আদর্শ, তিনিই ছিলেন আমাদের
অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতার জন্য দরকার আদর্শ, দরকার ত্যাগ ও তপস্যা।
স্বাধীনতা এমন জিনিস নয়, যা কখনো বিনা ত্যাগ ও তপস্যায় অর্জন করা যায়।
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি অনেক ত্যাগ ও তপস্যার বিনিময়ে। আমাদের এই ত্যাগ
ও তপস্যার নায়ক শেখ মুজিব। বাঙালি আজ এই দুর্জয় বীরের নেতৃত্বে
স্বাধীনতা পেয়েছে এবং এই দেশের নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি,
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং
তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছাকে এক দল সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির
বাসভবন আক্রমণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডের
শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের
ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা

কামাল এবং রোজি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের,
ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি। ওই
সময় বিদেশে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং
শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান।

শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে- উল্লেখ করে
ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্প্রতি বলেছেন- তাকে
‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি এর চেয়ে বড়
কোনো অভিধা এবং নাম কিনতে চাননি। মানুষ তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট
খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। স্বাধীনতার
স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা ভেবেছিল ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে
দেবে-তা হয়নি। বাঙালি তাকে ভোলেনি। আজ শোক দিবস পালনে বাঙালির

একাগ্রতা তার প্রমাণ। প্রতি বছরের ১৫ আগস্ট জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ
দিবসটি শোকের সাথে পালন করা হয়। এই দিনে কালো পতাকা উত্তোলন ও
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনিমিত রাখা হয়। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে
এ দিবসের উৎপত্তি।

যে সরকারই দেশ শাসন করুন না কেন, মুজিব যেন থাকেন আমাদের আদর্শে,
আমাদের অনুপ্রেরণা ও আমাদের চেতনার প্রতীক মহাপুরুষ হয়ে।
মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের একক মহান পুরুষ। তিনিই

গোটা বাঙালি জাতির আদর্শের নাম। মুজিব বাঙালি জাতির ইতিহাসের নতুন
পরিচয়ের নাম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন