‘লিলিবেট’র বিদায়
jugantor
‘লিলিবেট’র বিদায়

  আহসান হাবিব  

১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০১:৫৪  |  অনলাইন সংস্করণ

হাঁটি হাঁটি পা পা যেখানে খুশি সেখানে যা। একটি শিশু যখন পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে, তখন সেই
শিশুটিকে দাদা-দাদি, নানা-নাতি, চাচা-চাচিসহ অন্যরা তাকে বিভিন্ন নামে ডাকে। রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথের বেলাতেও একই রকম ঘটেছে। একদিন তার দাদা রাজা পঞ্চম জর্জ তাকে
বললেন- তোমার নাম কী? তখন রানি এলিজাবেথ আলতো আলতো করে ডাক নাম বলতেন
‘লিলিবেট’।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাম শুনেছেন হয়তো সবাই। যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে
অ্যাবারডিনশায়ারে নিজস্ব বাসভবন বালমোর‌্যাল ক্যাসলে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ মারা
যান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ব্রিটেনের নতুন রাজা হচ্ছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের
জ্যেষ্ঠ পুত্র চার্লস। রানি এলিজাবেথের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল লন্ডনের মেফেয়ারে।
১৯৫২ সালে ব্রিটেনের রানি হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে
বেশি সময় সিংহাসনে ছিলেন তিনি। টানা সাত দশক তিনি ব্রিটেন শাসন করেন। সিংহাসনে বসা
রানিদের মধ্যে তার রেকর্ড সর্বোচ্চ। এর আগে কোনো ব্রিটিশ শাসকের টানা ৭০ বছর
সিংহাসনে আসীন থাকার ইতিহাস নেই।
ব্রিটেনের রাষ্ট্রপ্রধান রানি হলেও যুক্তরাজ্যের সরকার ব্যবস্থার প্রধান প্রধানমন্ত্রী।
দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৭০ বছরের শাসনামলে যুক্তরাজ্য ১৬ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।
তাদের মধ্যে ১১ জন কনজারভেটিভ পার্টির, পাঁচজন লেবার পার্টির। ১৯৫২ সালে রানি যখন
সিংহাসনে বসেন, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা
উইনস্টন চার্চিল। তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সরকারপ্রধান ছিলেন। এরপর দেশটির
প্রধানমন্ত্রী হন একই দলের অ্যান্থনি ইডেন। তিনি সরকারপ্রধান থাকেন ১৯৫৭ সাল
পর্যন্ত।
ব্রিটেনের দ্বিতীয় এলিজাবেথ (এলিজাবেথ আলেকজান্ড্রা মেরি) হচ্ছেন বিশ্বের ১৬টি
সার্বভৌম রাষ্ট্র, অর্থাৎ কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান রানি ও রাষ্ট্রপ্রধান।
কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহ হচ্ছে- যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনি,
নিউজিল্যান্ড, জ্যামাইকা, বারবাডোস, বাহামাস, গ্রানাডা, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টুভালু, সেন্ট
লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট, গ্রেনাডাইন, বেলিজ, অ্যান্টিগুয়া, বার্বুডা, সেন্ট কিট্স ও নেভিস।
কমনওয়েলথ প্রধান ছাড়াও তিনি ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসেরও প্রধান
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

তবে ব্রিটেনের শাসক কিন্তু রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হওয়ার কথা ছিল না। সিংহাসনের
উত্তরাধিকারী হিসেবে তার অবস্থান ছিল চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড এবং বাবা ষষ্ঠ জর্জের
পরে। তবে বিপত্নীক নারী ওয়েলিস সিম্পসনকে বিয়ে করার কারণে ১৯৩৬ সালে সিংহাসন
ত্যাগ করেন অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড। অতঃপর তার স্থলাভিষিক্ত হন এলিজাবেথের বাবা ষষ্ঠ
জর্জ। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্রিটেনের সিংহাসন লাভ করেছিলেন
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ষোলো বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসম্মুখে আসেন। সামরিক
বাহিনীতে প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করেন ১৮ বছর বয়সে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিয়ে
হয় ১৯৪৭ সালে যুবরাজ ফিলিপের সঙ্গে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার বাবার মৃত্যুর পর
তিনি সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসার পর থেকে বহু পরিবর্তন এবং বহু ইতিহাসের সাক্ষী
থেকেছেন তিনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি পৃথিবীর সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ২০১২ সালে রানি এলিজাবেথ হীরকজয়ন্তী উদযাপন
করেন।
ব্রিটিশ রাজ পরিবারের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ৭০ বছরের শাসনামলে নানা
চড়াই-উতরাই পার করেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। নিজে সাক্ষী হয়েছেন বহু ঘটনার।
পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদে মানুষের অবতরণের মতো দুনিয়া কাঁপানো কত শত ইতিহাসের
সাক্ষীও তিনি। রাজপরিবারের নানা স্ক্যান্ডালের সাক্ষীও হতে হয়েছে তাকে। তিনি দেখেছেন
প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে এবং বিচ্ছেদ। সবশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য
বের হয়েছে তার শাসনামলেই।
তার শাসনামল এতটাই দীর্ঘ যে, যুক্তরাজ্যের বহু মানুষ এক জীবনে রানির ছবি ছাড়া কোনো
ব্যাংকনোট দেখেনি। এমনকি দেখেনি অন্য কোনো ছবির কয়েনও। তার দীর্ঘ এ পথচলায়
রাজনৈতিক অঙ্গনেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়েছে বহু দেশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নামে গোটা ইউরোপকে যেমন এক ছাতার তলায় আসতে দেখেছেন, ঠিক
তেমনি দেখেছেন ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে তার বিচ্ছেদও।
পরবর্তীতে ডায়নার মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমে রাজপরিবারের সমালোচনাও দেখতে হয়েছে তাকে।
এছাড়াও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা আর সবশেষ ব্রিটিশ যুবরাজ হ্যারি
স্ত্রী মেগানকে নিয়ে প্রাসাদও ছেড়েছেন তার আমলেই।
রাজতন্ত্র থেকে রাজপরিবার। ক্রমেই রাজতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিচ্ছিন্ন
আনুগত্যে বদল আসতে শুরু করে। সমাজের মধ্যে নানা ধ্যানধারণাও দ্রুত বদলাতে থাকে।
রানিও যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলান। ক্রমেই ‘রাজতন্ত্র’র জায়গা নেয় ‘রাজপরিবার’।
রানির রাজত্বকালের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠে সাংবিধানিক সততা রক্ষা। সরকারের দৈনন্দিন
কর্মকাণ্ড থেকে দূরে চলে যান রানি। রানির দায়িত্ব সীমিত থাকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন,
দেশের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত থাকা, সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে। ২০১৫ সালের ৯
সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে আসীন থাকার
গৌরব অর্জন করেন।

রানির দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী প্রিন্স ফিলিপ প্রয়াত হন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে। রানির
রাজত্বকালের শুরুর সময় ব্রিটিশ রাজতন্ত্র যে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যে
রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের তখন প্রবল আনুগত্য ছিল, তার রাজত্বকালের শেষ সময়ে সেই
উচ্ছ্বাস ও আনুগত্যে কিছুটা ভাটা পড়েছিল বটে! কিন্তু ব্রিটিশ জনগণের হৃদয়ে রাজপরিবারের
প্রতি ভালোবাসা যাতে চিরস্থায়ী হয়, তা নিশ্চিত করতে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন রানি
দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
রানি এবং তার বোন মার্গারেট দুজনই লেখাপড়া শিখেছেন বাড়িতে। বলা হয় খুবই ছোটবেলা
থেকেই তিনি অসাধারণ দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। ব্রিটেনের ভাবী প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন
চার্চিল বলেছিলেন তার চরিত্রে যে কর্তৃত্ববোধ ছিল, তা একজন শিশুর পক্ষে ছিল খুবই
আশ্চর্যজনক। প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে শিক্ষা না পেলেও ভাষার প্রতি এলিজাবেথের ভালো দখল
ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে তরুণী প্রিন্সেস এলিজাবেথ আধাসামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে
লরি চালানো ও লরির সার্ভিস করার শিক্ষা নেন। যুদ্ধ শেষে প্রিন্স ফিলিপকে তিনি বিয়ে
করতে চাইলে তাকে বেশ বাধার মুখে পড়তে হয়। এলিজাবেথ ছিলেন রাজার অনেক আদরের
কন্যা। ফিলিপের বিদেশি বংশ পরিচয়ের কারণে রাজা তার হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি;
কিন্তু তাদের ইচ্ছারই জয় হয় শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর এলিজাবেথ ও ফিলিপ
ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফিলিপের উপাধি হয় ডিউক অব এডিনবরা।
তিনি নৌবাহিনির কর্মকর্তা পদেই বহাল থাকেন। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর তারা
স্বাভাবিক বিবাহিত জীবন কাটান। এ সময়ই তাদের প্রথম পুত্র চার্লস ও কন্যা অ্যান জন্ম
নেন।
১৯৫২ সালে যখন এলিজাবেথের বয়স ২৫, তখন রাজা ষষ্ঠ জর্জ ফুসফুসের ক্যানসারে
আক্রান্ত হয়ে শয্যা নেন। এলিজাবেথ তার স্বামীকে নিয়ে বিদেশ সফরে যান বাবার হয়ে
দায়িত্ব পালন করতে। চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে রাজা তাকে বিমানবন্দরে বিদায়
জানাতে গিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পিতা ও কন্যার শেষ সাক্ষাৎ।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে যখন ব্রিটেনের প্রভাব ক্রমশ কমেছে, সমাজে আমূল পরিবর্তন
এসেছে, রাজতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তখনো অনেকের কাছে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের
জনপ্রিয়তা কমেনি। ব্রিটেনের রাজসিংহাসনে নিজ কর্তৃত্বে তিনি অটল থেকেছেন। অথচ
জন্মের সময়ও কেউ ভাবেননি তার ভাগ্যে রয়েছে ব্রিটেনের সিংহাসনে আরোহণ।
উজ্জ্বল রঙিন পোশাক, সঙ্গে মেলানো টুপি, হাতে এক জোড়া দস্তানা। এমন সাজ দেখে
ব্রিটেনের সদ্য প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে মুহূর্তের মধ্যেই চিনে নেওয়া যেত। তার
পোশাকে যেমন স্বাতন্ত্র্য ছিল, তেমনি ছিল রাজদায়িত্বের সঙ্গে মানানসই। ব্রিটেনের রানি
দ্বিতীয় এলিজাবেথের ফ্যাশন ও পোশাক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা
এএফপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়- ফ্যাশনে নিজস্ব এক স্টাইল গড়ে তুলেছিলেন সদ্য প্রয়াত রানি। যত
দিন শাসন ক্ষমতায় ছিলেন, তত দিন নানা রঙের শেড পোশাকেই ব্যবহার করেছেন তিনি।

দশকের পর দশক ধরে সহযোগী ও নকশাকারদের সহায়তায় পোশাকের অনন্য এই স্টাইল গড়ে
তুলেছিলেন তিনি। এর সূচনা হয়েছিল নরম্যান হার্টনেলের হাত দিয়ে। ১৯৪৭ সালে প্রিন্স
ফিলিপের সঙ্গে রানির বিয়ের পোশাকটি তিনিই বানিয়েছিলেন।
ক্রিস্টাল ও ১০ হাজার ছোট ছোট মুক্তা বসানো ডাচেস সাটিন কাপড় দিয়ে বিয়ের পোশাকটি
তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে রানি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার সময় দ্বিতীয় এলিজাবেথ যে
পোশাক পরেছিলেন, সেটিও হার্টনেলই তৈরি করেছিলেন। পোশাকটিতে সোনালি, রুপালি, সবুজ ও
গোলাপি রঙের এমব্রয়ডারি করা ছিল। যেসব দেশ তার শাসনাধীন ছিল, সবটির প্রতীক ছিল
সেই পোশাকে।
১৯৫৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে রানির পোশাক বানিয়েছেন হার্ডি অ্যামিস।
তিনি বলেন, রানির জন্য পোশাক তৈরির কাজটি সহজ কোনো কাজ ছিল না। অ্যামিস শুরুতে
রানির বিদেশ ভ্রমণকালীন পোশাকগুলো তৈরি করতেন। পরে হার্টনেলের স্থলাভিষিক্ত হন
তিনি। ১৯৭৭ সালে সিংহাসনে বসার রজতজয়ন্তীতে রানি গোলাপি রঙের যে পোশাক পরেছিলেন
তার নেপথ্যেও ছিলেন অ্যামিস।
সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রানির বেশভুষার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন অ্যাঙ্গেলা কেলি। ১৯৯৩
সালে রানির পোশাক প্রস্তুতকারক দলে যোগ দেন তিনি। ২০০২ সালে রানির ব্যক্তিগত
সহকারী ও জ্যেষ্ঠ পোশাক নির্মাতা হিসেবে নিযুক্ত হন। রানির খুব ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের
একজন হয়ে উঠেছিলেন কেলি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন চলার সময়
রানির চুল কাটা ও হেয়ার স্টাইলেরও দায়িত্বে ছিলেন এই নারী।
রাজপরিবারের ড্রেস কোড মেনে রানি এলিজাবেথের পোশাক ডিজাইন করতে হতো। এ ব্যাপারে
রাজপরিবারের সাবেক আপ্যায়নবিষয়ক তদারককারী ও শিষ্টাচারবিশেষজ্ঞ গ্র্যান্ট হ্যারল্ড
এএফপিকে বলেন, লিখিত কোনো আইন নেই, তবে পুরনো শিষ্টাচারসংক্রান্ত প্রটোকল বিধি
আছে।
হ্যারল্ড বলেন, তিনি (রানি) সব সময় টাইটস পরতেন, যা ছিল শরীরের ত্বকের রঙে। তার নখে
লাগানো হতো হালকা গোলাপি রঙের নেইল পলিশ। আপনারা কখনই, বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে
তাকে কখনো হাঁটুর ওপরে স্কার্ট পরতে দেখেননি। গয়নার ক্ষেত্রে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ব্রুচ (সেফটি পিনজাতীয় অলংকার) বা মুক্তার নেকলেস পরতেন।
১৯৬১ সালে প্রথমবার ঢাকা সফরে আসেন (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক রাজকীয় সফরে ঢাকায় আসেন তিনি। রমনা পার্কে
তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ঢাকার রমনা পার্ক তার ভীষণ পছন্দের একটি জায়গা।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অনেক স্মৃতি আছে।
১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। সেই সময় তিনি বাংলাদেশের একটি গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলেন। গ্রামটি গাজীপুর
জেলার শ্রীপুর উপজেলায় অবস্থিত। গ্রামটির নাম বৈরাগীরচালা গ্রাম। ঢাকা থেকে ট্রেনে
করে শ্রীপুর, এরপর সেখান থেকে গাড়িতে করে বৈরাগীরচালায় যান তিনি। রানির এ সফর

এখনো গ্রামটির মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। রানির আগমন উপলক্ষ্যে ওই গ্রামে
ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছিল; যা পরবর্তীতে এলাকায় কলকারখানা গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যে আইন প্রণয়ন বা আইন পাশ করার ক্ষমতা দেশটির পার্লামেন্টের হাতে থাকলেও
সেটি আইনে পরিণত হতে আনুষ্ঠানিকভাবে রানির অনুমতি নিতে হয়। হাজার বছরের ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যে রাজা-রানি এসেছেন অনেক, তবে তাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। ৭০ বছরের এ দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়, তাই মৃত্যুর
পর তাকে স্মরণ করছে গোটা বিশ্ব।
একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি সংঘাত, অন্যদিকে ভারত-
পাকিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ দেখেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। আর সবশেষ
ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হতেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন নন্দিত এই রানি।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

‘লিলিবেট’র বিদায়

 আহসান হাবিব 
১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০১ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

হাঁটি হাঁটি পা পা যেখানে খুশি সেখানে যা। একটি শিশু যখন পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে, তখন সেই
শিশুটিকে দাদা-দাদি, নানা-নাতি, চাচা-চাচিসহ অন্যরা তাকে বিভিন্ন নামে ডাকে। রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথের বেলাতেও একই রকম ঘটেছে। একদিন তার দাদা রাজা পঞ্চম জর্জ তাকে
বললেন- তোমার নাম কী? তখন রানি এলিজাবেথ আলতো আলতো করে ডাক নাম বলতেন
‘লিলিবেট’।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাম শুনেছেন হয়তো সবাই। যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে
অ্যাবারডিনশায়ারে নিজস্ব বাসভবন বালমোর‌্যাল ক্যাসলে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ মারা
যান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ব্রিটেনের নতুন রাজা হচ্ছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের
জ্যেষ্ঠ পুত্র চার্লস। রানি এলিজাবেথের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল লন্ডনের মেফেয়ারে।
১৯৫২ সালে ব্রিটেনের রানি হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে
বেশি সময় সিংহাসনে ছিলেন তিনি। টানা সাত দশক তিনি ব্রিটেন শাসন করেন। সিংহাসনে বসা
রানিদের মধ্যে তার রেকর্ড সর্বোচ্চ। এর আগে কোনো ব্রিটিশ শাসকের টানা ৭০ বছর
সিংহাসনে আসীন থাকার ইতিহাস নেই।
ব্রিটেনের রাষ্ট্রপ্রধান রানি হলেও যুক্তরাজ্যের সরকার ব্যবস্থার প্রধান প্রধানমন্ত্রী।
দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৭০ বছরের শাসনামলে যুক্তরাজ্য ১৬ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।
তাদের মধ্যে ১১ জন কনজারভেটিভ পার্টির, পাঁচজন লেবার পার্টির। ১৯৫২ সালে রানি যখন
সিংহাসনে বসেন, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা
উইনস্টন চার্চিল। তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সরকারপ্রধান ছিলেন। এরপর দেশটির
প্রধানমন্ত্রী হন একই দলের অ্যান্থনি ইডেন। তিনি সরকারপ্রধান থাকেন ১৯৫৭ সাল
পর্যন্ত।
ব্রিটেনের দ্বিতীয় এলিজাবেথ (এলিজাবেথ আলেকজান্ড্রা মেরি) হচ্ছেন বিশ্বের ১৬টি
সার্বভৌম রাষ্ট্র, অর্থাৎ কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান রানি ও রাষ্ট্রপ্রধান।
কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহ হচ্ছে- যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনি,
নিউজিল্যান্ড, জ্যামাইকা, বারবাডোস, বাহামাস, গ্রানাডা, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টুভালু, সেন্ট
লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট, গ্রেনাডাইন, বেলিজ, অ্যান্টিগুয়া, বার্বুডা, সেন্ট কিট্স ও নেভিস।
কমনওয়েলথ প্রধান ছাড়াও তিনি ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসেরও প্রধান
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

তবে ব্রিটেনের শাসক কিন্তু রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হওয়ার কথা ছিল না। সিংহাসনের
উত্তরাধিকারী হিসেবে তার অবস্থান ছিল চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড এবং বাবা ষষ্ঠ জর্জের
পরে। তবে বিপত্নীক নারী ওয়েলিস সিম্পসনকে বিয়ে করার কারণে ১৯৩৬ সালে সিংহাসন
ত্যাগ করেন অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড। অতঃপর তার স্থলাভিষিক্ত হন এলিজাবেথের বাবা ষষ্ঠ
জর্জ। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্রিটেনের সিংহাসন লাভ করেছিলেন
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ষোলো বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসম্মুখে আসেন। সামরিক
বাহিনীতে প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করেন ১৮ বছর বয়সে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিয়ে
হয় ১৯৪৭ সালে যুবরাজ ফিলিপের সঙ্গে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার বাবার মৃত্যুর পর
তিনি সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসার পর থেকে বহু পরিবর্তন এবং বহু ইতিহাসের সাক্ষী
থেকেছেন তিনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি পৃথিবীর সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ২০১২ সালে রানি এলিজাবেথ হীরকজয়ন্তী উদযাপন
করেন।
ব্রিটিশ রাজ পরিবারের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ৭০ বছরের শাসনামলে নানা
চড়াই-উতরাই পার করেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। নিজে সাক্ষী হয়েছেন বহু ঘটনার।
পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদে মানুষের অবতরণের মতো দুনিয়া কাঁপানো কত শত ইতিহাসের
সাক্ষীও তিনি। রাজপরিবারের নানা স্ক্যান্ডালের সাক্ষীও হতে হয়েছে তাকে। তিনি দেখেছেন
প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে এবং বিচ্ছেদ। সবশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য
বের হয়েছে তার শাসনামলেই।
তার শাসনামল এতটাই দীর্ঘ যে, যুক্তরাজ্যের বহু মানুষ এক জীবনে রানির ছবি ছাড়া কোনো
ব্যাংকনোট দেখেনি। এমনকি দেখেনি অন্য কোনো ছবির কয়েনও। তার দীর্ঘ এ পথচলায়
রাজনৈতিক অঙ্গনেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়েছে বহু দেশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নামে গোটা ইউরোপকে যেমন এক ছাতার তলায় আসতে দেখেছেন, ঠিক
তেমনি দেখেছেন ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে তার বিচ্ছেদও।
পরবর্তীতে ডায়নার মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমে রাজপরিবারের সমালোচনাও দেখতে হয়েছে তাকে।
এছাড়াও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা আর সবশেষ ব্রিটিশ যুবরাজ হ্যারি
স্ত্রী মেগানকে নিয়ে প্রাসাদও ছেড়েছেন তার আমলেই।
রাজতন্ত্র থেকে রাজপরিবার। ক্রমেই রাজতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিচ্ছিন্ন
আনুগত্যে বদল আসতে শুরু করে। সমাজের মধ্যে নানা ধ্যানধারণাও দ্রুত বদলাতে থাকে।
রানিও যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলান। ক্রমেই ‘রাজতন্ত্র’র জায়গা নেয় ‘রাজপরিবার’।
রানির রাজত্বকালের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠে সাংবিধানিক সততা রক্ষা। সরকারের দৈনন্দিন
কর্মকাণ্ড থেকে দূরে চলে যান রানি। রানির দায়িত্ব সীমিত থাকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন,
দেশের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত থাকা, সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে। ২০১৫ সালের ৯
সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে আসীন থাকার
গৌরব অর্জন করেন।

রানির দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী প্রিন্স ফিলিপ প্রয়াত হন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে। রানির
রাজত্বকালের শুরুর সময় ব্রিটিশ রাজতন্ত্র যে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যে
রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের তখন প্রবল আনুগত্য ছিল, তার রাজত্বকালের শেষ সময়ে সেই
উচ্ছ্বাস ও আনুগত্যে কিছুটা ভাটা পড়েছিল বটে! কিন্তু ব্রিটিশ জনগণের হৃদয়ে রাজপরিবারের
প্রতি ভালোবাসা যাতে চিরস্থায়ী হয়, তা নিশ্চিত করতে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন রানি
দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
রানি এবং তার বোন মার্গারেট দুজনই লেখাপড়া শিখেছেন বাড়িতে। বলা হয় খুবই ছোটবেলা
থেকেই তিনি অসাধারণ দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। ব্রিটেনের ভাবী প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন
চার্চিল বলেছিলেন তার চরিত্রে যে কর্তৃত্ববোধ ছিল, তা একজন শিশুর পক্ষে ছিল খুবই
আশ্চর্যজনক। প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে শিক্ষা না পেলেও ভাষার প্রতি এলিজাবেথের ভালো দখল
ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে তরুণী প্রিন্সেস এলিজাবেথ আধাসামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে
লরি চালানো ও লরির সার্ভিস করার শিক্ষা নেন। যুদ্ধ শেষে প্রিন্স ফিলিপকে তিনি বিয়ে
করতে চাইলে তাকে বেশ বাধার মুখে পড়তে হয়। এলিজাবেথ ছিলেন রাজার অনেক আদরের
কন্যা। ফিলিপের বিদেশি বংশ পরিচয়ের কারণে রাজা তার হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি;
কিন্তু তাদের ইচ্ছারই জয় হয় শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর এলিজাবেথ ও ফিলিপ
ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফিলিপের উপাধি হয় ডিউক অব এডিনবরা।
তিনি নৌবাহিনির কর্মকর্তা পদেই বহাল থাকেন। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর তারা
স্বাভাবিক বিবাহিত জীবন কাটান। এ সময়ই তাদের প্রথম পুত্র চার্লস ও কন্যা অ্যান জন্ম
নেন।
১৯৫২ সালে যখন এলিজাবেথের বয়স ২৫, তখন রাজা ষষ্ঠ জর্জ ফুসফুসের ক্যানসারে
আক্রান্ত হয়ে শয্যা নেন। এলিজাবেথ তার স্বামীকে নিয়ে বিদেশ সফরে যান বাবার হয়ে
দায়িত্ব পালন করতে। চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে রাজা তাকে বিমানবন্দরে বিদায়
জানাতে গিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পিতা ও কন্যার শেষ সাক্ষাৎ।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে যখন ব্রিটেনের প্রভাব ক্রমশ কমেছে, সমাজে আমূল পরিবর্তন
এসেছে, রাজতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তখনো অনেকের কাছে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের
জনপ্রিয়তা কমেনি। ব্রিটেনের রাজসিংহাসনে নিজ কর্তৃত্বে তিনি অটল থেকেছেন। অথচ
জন্মের সময়ও কেউ ভাবেননি তার ভাগ্যে রয়েছে ব্রিটেনের সিংহাসনে আরোহণ।
উজ্জ্বল রঙিন পোশাক, সঙ্গে মেলানো টুপি, হাতে এক জোড়া দস্তানা। এমন সাজ দেখে
ব্রিটেনের সদ্য প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে মুহূর্তের মধ্যেই চিনে নেওয়া যেত। তার
পোশাকে যেমন স্বাতন্ত্র্য ছিল, তেমনি ছিল রাজদায়িত্বের সঙ্গে মানানসই। ব্রিটেনের রানি
দ্বিতীয় এলিজাবেথের ফ্যাশন ও পোশাক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা
এএফপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়- ফ্যাশনে নিজস্ব এক স্টাইল গড়ে তুলেছিলেন সদ্য প্রয়াত রানি। যত
দিন শাসন ক্ষমতায় ছিলেন, তত দিন নানা রঙের শেড পোশাকেই ব্যবহার করেছেন তিনি।

দশকের পর দশক ধরে সহযোগী ও নকশাকারদের সহায়তায় পোশাকের অনন্য এই স্টাইল গড়ে
তুলেছিলেন তিনি। এর সূচনা হয়েছিল নরম্যান হার্টনেলের হাত দিয়ে। ১৯৪৭ সালে প্রিন্স
ফিলিপের সঙ্গে রানির বিয়ের পোশাকটি তিনিই বানিয়েছিলেন।
ক্রিস্টাল ও ১০ হাজার ছোট ছোট মুক্তা বসানো ডাচেস সাটিন কাপড় দিয়ে বিয়ের পোশাকটি
তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে রানি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার সময় দ্বিতীয় এলিজাবেথ যে
পোশাক পরেছিলেন, সেটিও হার্টনেলই তৈরি করেছিলেন। পোশাকটিতে সোনালি, রুপালি, সবুজ ও
গোলাপি রঙের এমব্রয়ডারি করা ছিল। যেসব দেশ তার শাসনাধীন ছিল, সবটির প্রতীক ছিল
সেই পোশাকে।
১৯৫৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে রানির পোশাক বানিয়েছেন হার্ডি অ্যামিস।
তিনি বলেন, রানির জন্য পোশাক তৈরির কাজটি সহজ কোনো কাজ ছিল না। অ্যামিস শুরুতে
রানির বিদেশ ভ্রমণকালীন পোশাকগুলো তৈরি করতেন। পরে হার্টনেলের স্থলাভিষিক্ত হন
তিনি। ১৯৭৭ সালে সিংহাসনে বসার রজতজয়ন্তীতে রানি গোলাপি রঙের যে পোশাক পরেছিলেন
তার নেপথ্যেও ছিলেন অ্যামিস।
সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রানির বেশভুষার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন অ্যাঙ্গেলা কেলি। ১৯৯৩
সালে রানির পোশাক প্রস্তুতকারক দলে যোগ দেন তিনি। ২০০২ সালে রানির ব্যক্তিগত
সহকারী ও জ্যেষ্ঠ পোশাক নির্মাতা হিসেবে নিযুক্ত হন। রানির খুব ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের
একজন হয়ে উঠেছিলেন কেলি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন চলার সময়
রানির চুল কাটা ও হেয়ার স্টাইলেরও দায়িত্বে ছিলেন এই নারী।
রাজপরিবারের ড্রেস কোড মেনে রানি এলিজাবেথের পোশাক ডিজাইন করতে হতো। এ ব্যাপারে
রাজপরিবারের সাবেক আপ্যায়নবিষয়ক তদারককারী ও শিষ্টাচারবিশেষজ্ঞ গ্র্যান্ট হ্যারল্ড
এএফপিকে বলেন, লিখিত কোনো আইন নেই, তবে পুরনো শিষ্টাচারসংক্রান্ত প্রটোকল বিধি
আছে।
হ্যারল্ড বলেন, তিনি (রানি) সব সময় টাইটস পরতেন, যা ছিল শরীরের ত্বকের রঙে। তার নখে
লাগানো হতো হালকা গোলাপি রঙের নেইল পলিশ। আপনারা কখনই, বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে
তাকে কখনো হাঁটুর ওপরে স্কার্ট পরতে দেখেননি। গয়নার ক্ষেত্রে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ব্রুচ (সেফটি পিনজাতীয় অলংকার) বা মুক্তার নেকলেস পরতেন।
১৯৬১ সালে প্রথমবার ঢাকা সফরে আসেন (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক রাজকীয় সফরে ঢাকায় আসেন তিনি। রমনা পার্কে
তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ঢাকার রমনা পার্ক তার ভীষণ পছন্দের একটি জায়গা।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অনেক স্মৃতি আছে।
১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন রানি দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। সেই সময় তিনি বাংলাদেশের একটি গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলেন। গ্রামটি গাজীপুর
জেলার শ্রীপুর উপজেলায় অবস্থিত। গ্রামটির নাম বৈরাগীরচালা গ্রাম। ঢাকা থেকে ট্রেনে
করে শ্রীপুর, এরপর সেখান থেকে গাড়িতে করে বৈরাগীরচালায় যান তিনি। রানির এ সফর

এখনো গ্রামটির মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। রানির আগমন উপলক্ষ্যে ওই গ্রামে
ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছিল; যা পরবর্তীতে এলাকায় কলকারখানা গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যে আইন প্রণয়ন বা আইন পাশ করার ক্ষমতা দেশটির পার্লামেন্টের হাতে থাকলেও
সেটি আইনে পরিণত হতে আনুষ্ঠানিকভাবে রানির অনুমতি নিতে হয়। হাজার বছরের ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যে রাজা-রানি এসেছেন অনেক, তবে তাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন দ্বিতীয়
এলিজাবেথ। ৭০ বছরের এ দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়, তাই মৃত্যুর
পর তাকে স্মরণ করছে গোটা বিশ্ব।
একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি সংঘাত, অন্যদিকে ভারত-
পাকিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ দেখেছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। আর সবশেষ
ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হতেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন নন্দিত এই রানি।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন