বাণিজ্যিক বেড়াজালে চিকিৎসা ব্যবস্থা
jugantor
বাণিজ্যিক বেড়াজালে চিকিৎসা ব্যবস্থা

  আহসান হাবিব  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৫৪:২৯  |  অনলাইন সংস্করণ

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্রটা কেমন সেটা
দেশবাসী সবচেয়ে বেশি দেখেছে করোনাকালে। সরকারি
হাসপাতাল যেন অনিয়মের আখড়া। এসব কারণেই
আমাদের দেশে একান্ত সংকটে পড়া মানুষ ছাড়া কেউ
সরকারি হাসপাতালে যেতে চায় না। হাসপাতালের
চিকিৎসকদের অধিকাংশই হাসপাতালে বসে রোগী
দেখতে চান না। তারা বড় বড় ক্লিনিক বা প্রাইভেট
হাসপাতালে বসেন। সেখানে একগাদা টেস্ট আর ওষুধ
দিয়ে দেন চিকিৎসকরা। রোগীর কথা শোনার সময় নেই
তাদের। রোগী কথা বলতে চাইলে ডাক্তার ধমক দিয়ে
তাকে দমিয়ে দেন। এসব কারণে দেশের ডাক্তারদের
প্রতি আস্থা নেই সাধারণ মানুষের। তাই অসুখ হলে ধার-
কর্জ করে হলেও পার্শ^র্তী দেশ ভারত পাড়ি দেন
বেশিরভাগ রোগী। আর বিত্তবানরা যান থাইল্যান্ড,
সিঙ্গাপুর বা অন্য দেশে। এ কারণে গত বছর যেসব মানুষ
চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছেন, তাদের শুধু
চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি
টাকা। কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে অসংক্রামক রোগ

ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার
প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে অনেকে বিদেশে গিয়ে এসব
রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গড়ে
প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে
যাচ্ছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে
যাচ্ছে। এর বড় অংশই যায় ভারতে। এ ছাড়া প্রতিটি
রোগীর ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়
রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ
অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) ও বাংলাদেশ সোসাইটি
অব প্রাইভেট হসপিটালস সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য
গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন,
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অদক্ষতা ও আস্থার সংকটে বিদেশে
যাচ্ছে রোগীরা। ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও
সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। ‘কি রিজনস ফর
মেডিক্যাল ট্রাভেল ফ্রম বাংলাদেশ টু ইন্ডিয়া’ শীর্ষক
গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশের কোন শ্রেণি-
পেশার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে বেশি যাচ্ছে তা-ও
উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা যায় ব্যবসায়ী,
বেসরকারি চাকরিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি
কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা বেশি যাচ্ছেন ভারতে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, এই মানুষদের বেশিরভাগই
বলেছে, ডাক্তার ও নার্সিংসেবা ভালো পায় বলে তারা
সেখানে যায়। দেশে কেন চিকিৎসা করাচ্ছেন না এমন
প্রশ্নে তারা বলেছেন, আস্থা কম পান। কারণগুলোর

মধ্যে এর পরই আছে অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, রোগীর
নিরাপত্তা এবং সবার পরে খরচের বিষয়টি। ভারতে
মেডিক্যাল ট্যুরিজমের ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। গত তিন
বছরে মেডিক্যাল ট্যুরিজমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা
বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। দেশটিতে মূলত হƒদরোগ,
চোখের রোগ, ক্যান্সার, কিডনি, ফ্র্যাকচার, মেরুদণ্ড,
পাকস্থলী ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতেই যাচ্ছে
বাংলাদেশের মানুষ। ভারতের কলকাতা, নয়াদিল্লি,
বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে বেশি
যাচ্ছে বাংলাদেশিরা। চিকিৎসা ও চিকিৎসকের প্রতি
আস্থার অভাবে লাখ লাখ রোগী দিগি¦দিক ছোটাছুটি
করছে। যাদের সুযোগ আছে তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা
নিচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে
পড়ছে। এটি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য শুধু হুমকিই
নয়, লজ্জাজনকও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রতিবেদনের তথ্য মতে,
খরচের কথা মাথায় রেখে দেশের ১৬.৪ শতাংশ পরিবার,
অর্থাৎ তিন কোটির বেশি মানুষ হাসপাতাল, ক্লিনিক বা
কোনো চিকিৎসকের কাছে যায় না। প্রয়োজন থাকলেও
তারা সেবা নেয় না। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোট
যে ব্যয় হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে নাগরিকদের
নিজের পকেট থেকে। এটা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে
সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে স্বাস্থ্য
ব্যয়ে ব্যক্তি খরচ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিকিৎসা ব্যয় যে সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে
তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদেশে যাওয়া রোগীদের
আস্থায় আনতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অংশ
সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। করোনাকালে সরকারের
কঠোর তত্ত্বাবধানে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো
সক্ষমতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। গত দুই বছরে
এসব মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে পারেনি, দেশে
চিকিৎসা নিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত একটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
খাত। বলা হয়ে থাকে, যে দেশের জনগণ স্বাস্থ্যের দিক
থেকে এগিয়ে, সে দেশ তত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে
গতিশীল। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টাপিঠ। এ দেশে
স্বাস্থ্যকে সেবা নয়, বাণিজ্যিকিকরণ হিসাবে দেখছে
প্রভাবশালীরা চিকিৎসকরা। এদেশের চিকিৎসকরা
টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। অনেক চিকিৎসক দিনে
সর্বনিমন্ন ৫০ থেকে একশ’ রোগী দেখে। নিু ও
মধ্যবিত্ত রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেলেই
চিকিৎসকরা তার পছন্দের ক্লিনিক বা হাসপাতালে
পাঠায় একগাদা টেস্ট করার জন্য। ওই টেস্টের শতকরা
বিশভাগ কমিশনের টাকা পান চিকিৎসকরা। তাহলে
আমরা এটাকে কি বলব। স্বাস্থ্যসেবা, নাকি চিকিৎসার
নামে বাণিজ্যিকিকরণ। তাহলে কি আমরা এই বাণিজ্যিক

বেড়াজাল থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মানসম্মত
চিকিৎসা সেবায় পরিণত করতে পারব না।
কিছু সমস্যার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফলাফল
মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। গত ৫০ বছরে
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ
হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার
একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে
যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান
হয়। আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির পাঁচ শতাংশের মতো
অর্থ স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া। বাংলাদেশে
এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটে জিডিপির এক
শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত
অর্থেরও কম-বেশি ৭০ শতাংশ বেতন-ভাতা ইত্যাদির
মতো খাতে খরচ হয়। বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার
উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, যা নিতান্তই অপ্রতুল।
স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের কথা ভেবে এ খাতের
জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে
দুর্নীতিমুক্ত রেখে এ অর্থের সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবহার
করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা, সঠিক
কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বর্তমানে
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিপুল অগ্রগতি হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অর্জনগুলো বৈশ্বিক
প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য জনগণের মৌলিক
অধিকারের একটি। এটা নিয়ে বাণিজ্য না করে সেবার
মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে দেশের এই পরিমাণ টাকা
বিদেশে যাবে না, তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল
হবে। তবে দেশের জনসাধারণের সামগ্রিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো
নিরসন করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও স্বচ্ছতা
বজায় রেখে তা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সরকারের
সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেÑএ প্রত্যাশা
আমাদের।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বাণিজ্যিক বেড়াজালে চিকিৎসা ব্যবস্থা

 আহসান হাবিব 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৫৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্রটা কেমন সেটা
দেশবাসী সবচেয়ে বেশি দেখেছে করোনাকালে। সরকারি
হাসপাতাল যেন অনিয়মের আখড়া। এসব কারণেই
আমাদের দেশে একান্ত সংকটে পড়া মানুষ ছাড়া কেউ
সরকারি হাসপাতালে যেতে চায় না। হাসপাতালের
চিকিৎসকদের অধিকাংশই হাসপাতালে বসে রোগী
দেখতে চান না। তারা বড় বড় ক্লিনিক বা প্রাইভেট
হাসপাতালে বসেন। সেখানে একগাদা টেস্ট আর ওষুধ
দিয়ে দেন চিকিৎসকরা। রোগীর কথা শোনার সময় নেই
তাদের। রোগী কথা বলতে চাইলে ডাক্তার ধমক দিয়ে
তাকে দমিয়ে দেন। এসব কারণে দেশের ডাক্তারদের
প্রতি আস্থা নেই সাধারণ মানুষের। তাই অসুখ হলে ধার-
কর্জ করে হলেও পার্শ^র্তী দেশ ভারত পাড়ি দেন
বেশিরভাগ রোগী। আর বিত্তবানরা যান থাইল্যান্ড,
সিঙ্গাপুর বা অন্য দেশে। এ কারণে গত বছর যেসব মানুষ
চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছেন, তাদের শুধু
চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি
টাকা। কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে অসংক্রামক রোগ

ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার
প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে অনেকে বিদেশে গিয়ে এসব
রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গড়ে
প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে
যাচ্ছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে
যাচ্ছে। এর বড় অংশই যায় ভারতে। এ ছাড়া প্রতিটি
রোগীর ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়
রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ
অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) ও বাংলাদেশ সোসাইটি
অব প্রাইভেট হসপিটালস সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য
গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন,
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অদক্ষতা ও আস্থার সংকটে বিদেশে
যাচ্ছে রোগীরা। ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও
সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। ‘কি রিজনস ফর
মেডিক্যাল ট্রাভেল ফ্রম বাংলাদেশ টু ইন্ডিয়া’ শীর্ষক
গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশের কোন শ্রেণি-
পেশার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে বেশি যাচ্ছে তা-ও
উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা যায় ব্যবসায়ী,
বেসরকারি চাকরিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি
কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা বেশি যাচ্ছেন ভারতে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, এই মানুষদের বেশিরভাগই
বলেছে, ডাক্তার ও নার্সিংসেবা ভালো পায় বলে তারা
সেখানে যায়। দেশে কেন চিকিৎসা করাচ্ছেন না এমন
প্রশ্নে তারা বলেছেন, আস্থা কম পান। কারণগুলোর

মধ্যে এর পরই আছে অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, রোগীর
নিরাপত্তা এবং সবার পরে খরচের বিষয়টি। ভারতে
মেডিক্যাল ট্যুরিজমের ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। গত তিন
বছরে মেডিক্যাল ট্যুরিজমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা
বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। দেশটিতে মূলত হƒদরোগ,
চোখের রোগ, ক্যান্সার, কিডনি, ফ্র্যাকচার, মেরুদণ্ড,
পাকস্থলী ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতেই যাচ্ছে
বাংলাদেশের মানুষ। ভারতের কলকাতা, নয়াদিল্লি,
বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে বেশি
যাচ্ছে বাংলাদেশিরা। চিকিৎসা ও চিকিৎসকের প্রতি
আস্থার অভাবে লাখ লাখ রোগী দিগি¦দিক ছোটাছুটি
করছে। যাদের সুযোগ আছে তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা
নিচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে
পড়ছে। এটি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য শুধু হুমকিই
নয়, লজ্জাজনকও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রতিবেদনের তথ্য মতে,
খরচের কথা মাথায় রেখে দেশের ১৬.৪ শতাংশ পরিবার,
অর্থাৎ তিন কোটির বেশি মানুষ হাসপাতাল, ক্লিনিক বা
কোনো চিকিৎসকের কাছে যায় না। প্রয়োজন থাকলেও
তারা সেবা নেয় না। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোট
যে ব্যয় হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে নাগরিকদের
নিজের পকেট থেকে। এটা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে
সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে স্বাস্থ্য
ব্যয়ে ব্যক্তি খরচ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিকিৎসা ব্যয় যে সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে
তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদেশে যাওয়া রোগীদের
আস্থায় আনতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অংশ
সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। করোনাকালে সরকারের
কঠোর তত্ত্বাবধানে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো
সক্ষমতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। গত দুই বছরে
এসব মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে পারেনি, দেশে
চিকিৎসা নিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত একটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
খাত। বলা হয়ে থাকে, যে দেশের জনগণ স্বাস্থ্যের দিক
থেকে এগিয়ে, সে দেশ তত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে
গতিশীল। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টাপিঠ। এ দেশে
স্বাস্থ্যকে সেবা নয়, বাণিজ্যিকিকরণ হিসাবে দেখছে
প্রভাবশালীরা চিকিৎসকরা। এদেশের চিকিৎসকরা
টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। অনেক চিকিৎসক দিনে
সর্বনিমন্ন ৫০ থেকে একশ’ রোগী দেখে। নিু ও
মধ্যবিত্ত রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেলেই
চিকিৎসকরা তার পছন্দের ক্লিনিক বা হাসপাতালে
পাঠায় একগাদা টেস্ট করার জন্য। ওই টেস্টের শতকরা
বিশভাগ কমিশনের টাকা পান চিকিৎসকরা। তাহলে
আমরা এটাকে কি বলব। স্বাস্থ্যসেবা, নাকি চিকিৎসার
নামে বাণিজ্যিকিকরণ। তাহলে কি আমরা এই বাণিজ্যিক

বেড়াজাল থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মানসম্মত
চিকিৎসা সেবায় পরিণত করতে পারব না।
কিছু সমস্যার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফলাফল
মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। গত ৫০ বছরে
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ
হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার
একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে
যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান
হয়। আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির পাঁচ শতাংশের মতো
অর্থ স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া। বাংলাদেশে
এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটে জিডিপির এক
শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত
অর্থেরও কম-বেশি ৭০ শতাংশ বেতন-ভাতা ইত্যাদির
মতো খাতে খরচ হয়। বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার
উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, যা নিতান্তই অপ্রতুল।
স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের কথা ভেবে এ খাতের
জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে
দুর্নীতিমুক্ত রেখে এ অর্থের সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবহার
করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা, সঠিক
কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বর্তমানে
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিপুল অগ্রগতি হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অর্জনগুলো বৈশ্বিক
প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য জনগণের মৌলিক
অধিকারের একটি। এটা নিয়ে বাণিজ্য না করে সেবার
মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে দেশের এই পরিমাণ টাকা
বিদেশে যাবে না, তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল
হবে। তবে দেশের জনসাধারণের সামগ্রিক স্বাস্থ্য
সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো
নিরসন করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও স্বচ্ছতা
বজায় রেখে তা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সরকারের
সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেÑএ প্রত্যাশা
আমাদের।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন