ছোটবেলার দুর্গাপূজা, নাকি নস্টালজিয়া...
jugantor
ছোটবেলার দুর্গাপূজা, নাকি নস্টালজিয়া...

  মনোজ সরকার  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০৩:৫৪  |  অনলাইন সংস্করণ

আগের মতো পূজা-পার্বণগুলো আর টানে না। ধুপের সুগন্ধ আগে যেভাবে মাতাল করত, এখন আর তেমন মনে হয় না। কাসার ঘণ্টা, ঢাক, খোল-করতালের বাজনা আগে সুমধুর সঙ্গীতের মূর্ছনায় মন যেভাবে আন্দোলিত হতো এখন তা হয় না। সব কিছু কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে মনে হয়। আগের মতো সেই হৃদ্যতা নেই মানুষের। নেই সেই প্রাণ খুলে হাসি-আনন্দে মেতে ওঠার মানসিকতা। এখন সবই যে গৎবাঁধা। সবই আর্টিফিশিয়াল মনে হয়।

এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধনী-গরিব নারী, পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই দেবীকে দেখার জন্য মন্দিরে-মন্দিরে গিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতো। সেখানে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একে অপরকে আপন করে নিত। ছিল আত্মিক বন্ধন, ছিল হৃদ্যতা। জানা-অজানা নানা রঙের মানুষ গল্প-গুজবে আপ্যায়নের মাধ্যমে আনন্দে মেতে উঠত একসঙ্গে। সেই সময়কার ঢাকের বাদ্যের তালে ধুনচি নাচ এখনো মনকে দোলা দিয়ে যায়। প্রকৃতি দেবীও যেন সে সময় এ রমণীয় মূর্তি ধারণ করত।

এখন মন্দিরে গেলে বাসে ওঠার লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া। কে কার আগে যাবে তার প্রতিযোগিতা। লাইনে দাঁড়িয়েই দেবী দর্শন-প্রণাম। একটু দেরি হলেই ধাক্কা-গালি। কেউ কারো সঙ্গে কথাও বলত পারছে না। ধনী-গরিবের ভেদাভেদও এখন চোখে পড়ার মতো। গাড়িতে মন্দিরে গেলে আলাদা খাতির; বসার স্থান, ভরপুর আপ্যায়ন। গরিব শ্রেণির মানুষদের জোটে ধাক্কা আর স্বেচ্ছাসেবক-পুলিশের ঝারি। এমনকি লাটির বাড়িতেও আপ্যায়িত হতে হয় মাঝে-মধ্যে।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় কোথাও আর সেই প্রাকৃতিক শাসত রূপ নেই। ডিজিটাল আলোর ঝলকানিতে চোখই ঝলসে যায়। সাউন্ড সিস্টেমের জন্য মন্দিরে মন্দিরে ঢাকের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ধুনচি নাচের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে তরুণ-তরুণীদের নাচন-কুদন। এখন নারী-পুরুষের গল্পের মূল প্রসঙ্গ থাকে বাহারি পোশাক; কার স্বামীর কতো বেতন। কে কত টাকা দামের পোশাক পড়েছে। তাদের গল্পে সেই হৃদ্যতা নেই; আছে দাম্ভিকতা আর অহংকারের ফুলঝুরি।

সেই ছোটবেলায় ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী’ মহালয়ার পুণ্যভোরে বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেজে উঠতেই ঘুম ভাঙত। এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসতাম। একটা পূজা পূজা গন্ধ ছড়িয়ে যেত চারদিকে। আনন্দে ভরে উঠত মন। শুরু হতো ক্ষণগণনা। হাতের কর গুনে ঠিক করতাম পূজার দিনক্ষণ। শুরু হতো নতুন পোশাকের বায়না। দর্জির দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি।

এরপর ষষ্ঠীর দিনে শুরু হয়ে যেত মহাআনন্দের দিন। পড়াশুনা নেই; ৫ দিন ধরে শুধুই আনন্দ। সপ্তমীর সকালে দূর থেকে ভেসে আসা মাইকের গানের শব্দে আনচান করে উঠত মন। কখন যাব মণ্ডপে-মন্দিরে। ঢাকের বাদ্যে আনচান করা মন নিয়ে সারাদিন হৈ-হুল্লোড়-ঘোরাঘুরি। অষ্টমীতে ধুনচি নাচের প্রতিযোগিতা; নবমীতে ঘোরাঘুরি খাওয়া-দাওয়া আর দশমীর দিনে রঙ খেলা- এখনো মনকে টেনে নিয়ে যায় সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে।

দিনে দিনে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই দিনগুলো; কিন্তু স্মৃতির পাতায় সব কিছুই সমুজ্জ্বল। এখন ডিজিটাল যুগের আবির্ভাবে পাল্টে গেছে সবকিছু। আত্মা-হৃদয়ের সেই বন্ধন হারিয়ে গেছে যুগের টানে। গুরুজনদের আশীর্বাদ পেতে এখন আর পায়ে হাত দিতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-টুইটারের কল্যাণে ঘরে বসেই সবার আশীর্বাদ পাওয়া যায়। প্রতিমার সামনে ছবি তুলে ফেসবুক, টুইটার, ইনসটোগ্রাম ভরিয়ে তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে সবাই।

মহালয়ায় এখন ভোরে উঠতে হয় না। ইউটিউবের কল্যাণে সারা বছরই মহালয়ার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই ভরাট কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা যায়। মন্দির-মণ্ডপে গেলে এখন আর ঢাকের গুড়ু গুড়ু ধ্বনি হৃদয়ের কোনায় কোনায় ছন্দ তোলে না; সাউন্ড সিস্টেমের বিটে বুক কেঁপে ওঠে। ধুনচি নাচের জায়গায় এসেছে ডিজে আর হিন্দি গানের তালে তালে কোমর দোলানো আর নাচন-কুদন। সেই রঙ খেলা এখন ডিজিটাল যুগের বর্তমান প্রজন্মের কাছে পচা অতীত। আর আমরাও যুগের তালে আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে দিয়েছি; তবু মাঝে মাঝে সেই পচা অতীতে চলে যেতে, নস্টালজিয়ায় ভুগতে ভালো লাগে।

ছোটবেলার দুর্গাপূজা, নাকি নস্টালজিয়া...

 মনোজ সরকার 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০৩ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আগের মতো পূজা-পার্বণগুলো আর টানে না। ধুপের সুগন্ধ আগে যেভাবে মাতাল করত, এখন আর তেমন মনে হয় না। কাসার ঘণ্টা, ঢাক, খোল-করতালের বাজনা আগে সুমধুর সঙ্গীতের মূর্ছনায় মন যেভাবে আন্দোলিত হতো এখন তা হয় না। সব কিছু কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে মনে হয়। আগের মতো সেই হৃদ্যতা নেই মানুষের। নেই সেই প্রাণ খুলে হাসি-আনন্দে মেতে ওঠার মানসিকতা। এখন সবই যে গৎবাঁধা। সবই আর্টিফিশিয়াল মনে হয়।

এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধনী-গরিব নারী, পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই দেবীকে দেখার জন্য মন্দিরে-মন্দিরে গিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতো। সেখানে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একে অপরকে আপন করে নিত। ছিল আত্মিক বন্ধন, ছিল হৃদ্যতা। জানা-অজানা নানা রঙের মানুষ গল্প-গুজবে আপ্যায়নের মাধ্যমে আনন্দে মেতে উঠত একসঙ্গে। সেই সময়কার ঢাকের বাদ্যের তালে ধুনচি নাচ এখনো মনকে দোলা দিয়ে যায়। প্রকৃতি দেবীও যেন সে সময় এ রমণীয় মূর্তি ধারণ করত।

এখন মন্দিরে গেলে বাসে ওঠার লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া। কে কার আগে যাবে তার প্রতিযোগিতা। লাইনে দাঁড়িয়েই দেবী দর্শন-প্রণাম। একটু দেরি হলেই ধাক্কা-গালি। কেউ কারো সঙ্গে কথাও বলত পারছে না। ধনী-গরিবের ভেদাভেদও এখন চোখে পড়ার মতো। গাড়িতে মন্দিরে গেলে আলাদা খাতির; বসার স্থান, ভরপুর আপ্যায়ন। গরিব শ্রেণির মানুষদের জোটে ধাক্কা আর স্বেচ্ছাসেবক-পুলিশের ঝারি। এমনকি লাটির বাড়িতেও আপ্যায়িত হতে হয় মাঝে-মধ্যে।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় কোথাও আর সেই প্রাকৃতিক শাসত রূপ নেই। ডিজিটাল আলোর ঝলকানিতে চোখই ঝলসে যায়। সাউন্ড সিস্টেমের জন্য মন্দিরে মন্দিরে ঢাকের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ধুনচি নাচের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে তরুণ-তরুণীদের নাচন-কুদন। এখন নারী-পুরুষের গল্পের মূল প্রসঙ্গ থাকে বাহারি পোশাক; কার স্বামীর কতো বেতন। কে কত টাকা দামের পোশাক পড়েছে। তাদের গল্পে সেই হৃদ্যতা নেই; আছে দাম্ভিকতা আর অহংকারের ফুলঝুরি।

সেই ছোটবেলায় ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী’ মহালয়ার পুণ্যভোরে বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেজে উঠতেই ঘুম ভাঙত। এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসতাম। একটা পূজা পূজা গন্ধ ছড়িয়ে যেত চারদিকে। আনন্দে ভরে উঠত মন। শুরু হতো ক্ষণগণনা। হাতের কর গুনে ঠিক করতাম পূজার দিনক্ষণ। শুরু হতো নতুন পোশাকের বায়না। দর্জির দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি।

এরপর ষষ্ঠীর দিনে শুরু হয়ে যেত মহাআনন্দের দিন। পড়াশুনা নেই; ৫ দিন ধরে শুধুই আনন্দ। সপ্তমীর সকালে দূর থেকে ভেসে আসা মাইকের গানের শব্দে আনচান করে উঠত মন। কখন যাব মণ্ডপে-মন্দিরে। ঢাকের বাদ্যে আনচান করা মন নিয়ে সারাদিন হৈ-হুল্লোড়-ঘোরাঘুরি। অষ্টমীতে ধুনচি নাচের প্রতিযোগিতা; নবমীতে ঘোরাঘুরি খাওয়া-দাওয়া আর দশমীর দিনে রঙ খেলা- এখনো মনকে টেনে নিয়ে যায় সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে।

দিনে দিনে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই দিনগুলো; কিন্তু স্মৃতির পাতায় সব কিছুই সমুজ্জ্বল। এখন ডিজিটাল যুগের আবির্ভাবে পাল্টে গেছে সবকিছু। আত্মা-হৃদয়ের সেই বন্ধন হারিয়ে গেছে যুগের টানে। গুরুজনদের আশীর্বাদ পেতে এখন আর পায়ে হাত দিতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-টুইটারের কল্যাণে ঘরে বসেই সবার আশীর্বাদ পাওয়া যায়। প্রতিমার সামনে ছবি তুলে ফেসবুক, টুইটার, ইনসটোগ্রাম ভরিয়ে তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে সবাই।

মহালয়ায় এখন ভোরে উঠতে হয় না। ইউটিউবের কল্যাণে সারা বছরই মহালয়ার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই ভরাট কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা যায়। মন্দির-মণ্ডপে গেলে এখন আর ঢাকের গুড়ু গুড়ু ধ্বনি হৃদয়ের কোনায় কোনায় ছন্দ তোলে না; সাউন্ড সিস্টেমের বিটে বুক কেঁপে ওঠে। ধুনচি নাচের জায়গায় এসেছে ডিজে আর হিন্দি গানের তালে তালে কোমর দোলানো আর নাচন-কুদন। সেই রঙ খেলা এখন ডিজিটাল যুগের বর্তমান প্রজন্মের কাছে পচা অতীত। আর আমরাও যুগের তালে আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে দিয়েছি; তবু মাঝে মাঝে সেই পচা অতীতে চলে যেতে, নস্টালজিয়ায় ভুগতে ভালো লাগে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন