গণমাধ্যমের অনুকরণীয় বার্তা

দূর পাশ্চাত্যে সত্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ফুল

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

  এ টি এম নিজাম, সাংবাদিক

সাংবাদিক তুষার আবদুল্লাহর সঙ্গে যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ এটিএম নিজাম

সত্য প্রকাশে মিডিয়ার দায়,  সীমারেখা -সীমাবদ্ধতা  এবং নীতি - নৈতিকতা ও আদর্শ নির্ধারণ- নিয়ন্ত্রণে এখন আমাদের দেশে আইন  ও আচরণবিধি প্রণয়নে তোড়জোড় চলছে। ঠিক এই সময়েই   ট্রাম্প প্রশাসনের সিরিয়ায় অগ্রাসী  নীতির চাঞ্চল্যকর ব্লু-প্রিন্ট প্রকাশ করে বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে সে দেশেরই সংবাদপত্র ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’। 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট হোয়াইট হাউসের  উর্ধ্বতন কর্মকতার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার বিরোধিতার মুখে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এ প্রতিবেদনটি চলতি সপ্তাহ জুড়ে দুনিয়াব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সংবাদপত্রে  এ সাহসী  প্রতিবেদন প্রকাশের পর   নড়েচড়ে বসেছে মার্কিন প্রশাসন ও  দুনিয়ার সকল সংবাদপত্র শিল্প।

রাষ্ট্রের অন্তর্গত থেকে সংবাদপত্রকে যেমন অনিয়ম-দুর্নীতি, সুন্দর -অসুন্দর, ব্যভিচার-বীভৎসতা নাগরিক সমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে -  ঠিক তেমনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, শাসক শ্রেণি  কর্তৃক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ কিংবা হুমকির সম্মুখীন হওয়ার  মতো কোনো ঘটনা ঘটলে অথবা ঘটার উপক্রম হলে তাও রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক নাগরিক সমাজকে জানানো জরুরি। নিউইয়র্ক টাইমসের এ প্রতিবেদনটি এমন বার্তাই বহন করে। 

১৯৫১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর থেকে যাত্রা শুরু হয় এ বিখ্যাত পত্রিকাটির। সাদামাটা অবয়ব ও অলঙ্করণযুক্ত দেশের সর্ববৃহৎ এ মেট্রোপলিটন সংবাদপত্রটির  ডাক নাম ‘The gray lady’  অর্থাৎ ধুসর রঙধনু। 

জন্মের পর থেকেই সৎ ও নির্ভীক থেকে নাগরিক সমাজের দর্পণ হিসাবে নির্ভুল  ভূমিকা পালন করে আসায় পত্রিকাটিকে দেশটির ঘটনাধারী  পত্রিকা বা ‘News paper of records’- এর মর্যাদা দেয়া হয়। 

পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য বিশ্বের বিস্ময় এ পত্রিকাটির সাফল্যের মুকুটে পুলিৎজারসহ  অসংখ্য পুরষ্কারের হিরণ্ময় পালক যুক্ত রয়েছে।  তবে আমেরিকার ইতিহাসে সংবাদপত্রের এ ধরণের সাহসী ও নির্ভীক ভূমিকা পালনের ইতিহাস নতুন কিছু নয়।

১৭৩৩ সালের কথা। তখন আমেরিকায় স্বাধীনতা-সংগ্রামের মৃদুমন্দ হাওয়া বইছিল। তখন জন পিটার জেনগার নামে এক ব্যক্তি নিউইয়র্ক উইকলি নামে একটি পত্রিকা বের করেন। ওই বছরের ৫ নভেম্বর ‘নিউইয়র্ক উইকলি’ জার্নাল পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা করা হয়। 

পরবর্তী সংখ্যায় ফরাসি যুদ্ধ জাহাজকে আমেরিকান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দাবৃত্তি করার অনুমতি দেয়ার জন্য গভর্নর কসবির নিন্দা করা হয় এবং ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রকে অযোগ্য বলে মন্তব্য করা হয়। গভর্নর কসবি তাতে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। 

১৭৩৪ সালে জন পিটার জেনগার সম্পাদিত ‘নিউইয়র্ক উইকলি’ জার্নালের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। এ মামলায় পিটার জেনগার গ্রেফতার হন। পিটার জেনগার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানহানিকর, বিদ্বেষপ্রসূত ও ক্ষতিকর বক্তব্য পেশ করার অভিযোগ আনা হয়। মামলার রায় নিজের পক্ষে আনার জন্য গভর্নর কসবি বিচারক পরিবর্তন করে নিজের পছন্দসই ব্যক্তিকে নিয়োগ করেন। কিন্তু মামলার জুরিরা রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। 

প্রায় দুই বছর মামলা চলার পর জেনগার নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং মুক্তিলাভ করেন। এ ঘটনা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অন্যতম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। সংবাদপত্র যে কোনো সত্যকে তুলে ধরতে পারে। আধুনিক সমাজে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন, পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের মতো সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের অধিকার সংরক্ষণের এক অজেয় শক্তি। 

জেনেগারের সময় থেকে আমেরিকায় সংবাদপত্র ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা ফোর্থ এস্টেট হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। অবশ্য ইউরোপে তার আগেই সংবাদপত্র চতুর্থ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর পশ্চিমা সমাজে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট) স্বীকৃতি পায়। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে ওই মামলার রায় স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে আমেরিকানদের কাছে আজও বিবেচিত।  একইভাবে ফকল্যান্ভ যুদ্ধে সত্য প্রকাশে ‘বিবিসি’ নিজ রাষ্ট্র ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশে নির্ভীক ভূমিকা পালন করে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। 

আজও বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষের কাছে সত্য ও ন্যায় প্রকাশের বলিষ্ঠ প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে এ মিডিয়াটি।আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিবিসি'র ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ও  মুক্তিকামী মানুষ তখন বিবিসির  মাধ্যমে সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার প্রকৃত তথ্য পেতো। অবশ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ,সামরিক শাসন,   স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ওয়ান-ইলেভেনের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের সময় আমাদের দেশের মিডিয়ার  গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দখলদার বাহিনী, স্বৈরাচার ও সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের হৃদকম্পন সৃষ্টি করে। 

নাগরিক সমাজের কাছে  মিডিয়া ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের মর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় স্থান পায়। আর নাগরিক সমাজের এ ব্যাপক  গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েই দেশে প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়া শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ শিল্পের উৎকর্ষ সাধনের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দিনে দিনে ‘এমবেডেড জার্নালিজম’ সর্বগ্রাসী রূপে দৃশ্যমান হচ্ছে।

এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা   নানা মত ও ধারায় বিভক্ত হয়ে পেশাদারিত্বহীন প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে চির ধরছে এ শিল্পের প্রাণ হিসাবে বিবেচিত  পাঠক-শ্রোতা  নাগরিক সমাজের অন্ধ বিশ্বাসে। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন মুলুকে যখন মিডিয়া সত্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ফুল ফোটায় - তখন আমাদের দেশের  মিডিয়া- মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও কর্মীদের নিয়ে সরব তৈলমর্দন তত্ত্বের আলোচনা-সমালোচনা আমাদের লজ্জা দেয় বৈকি।                                                                                                                   

লেখক: এ টি এম নিজাম, যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ
ই-মেইল: [email protected]