রাতের বেইলী রোড

  মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

রাতের বেইলী রোড

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বেইলী রোড। একসময় এ রোড নাট্যকর্মীদের আড্ডাস্থল হিসেবে বিখ্যাত ছিল। শোনা যেত কেউ যদি নাটক সিনেমার নায়ক-নায়িকা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইত তারা কেবল বেইলী রোডে এসে কিছুদিন ঘোরাফেরা করলে যে কোনো একটি জায়গায় তাদের জায়গা মিলেই যেত। পরে নাটক সরণি হিসেবে এর নামকরণ করা হলেও মানুষ তাকে বেইলী রোড বলেই ডাকে।

সময়য়ের ব্যবধানে নাট্যকর্মীরাও অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী ও সৌখিন হয়ে যাওয়ার কারণে বেইলী রোডে তাদের আর তেমন আড্ডা জমে উঠে না। বিভিন্ন অভিজাত দালান আর ক্লাবে তাদের আড্ডা স্থানান্তর হয়ে যায়। তবে এতে বেইলী রোডের নির্যাস একটুও কমে যায়নি। বেইলী রোড় একের পর এক তার আলাদা যে কোনো একটি বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

রমজানে বেইলী রোডের ইফতারের প্রতিও যে কোনো শ্রেণিপেশার লোকের প্রবল আকর্ষণ। বেইলী রোডের ইফতারের কদরও পুরান ঢাকার চকবাজারের চেয়ে কেবল কম নয়। রমজানের প্রতিটি দিন দুপুর গড়ালেই সেখানে নাটক ছাড়াই নারী-পুরুষ ও শিশুদের ঢল নামে।

তবে বেইলী রোড আরও এক শ্রেণির লোকদের জন্যও সময় কাটানোর উপযুক্ত শান্তির স্থান। সকাল থেকে দিনের যে কোনো সময়ই রোড়ের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদে প্রেমিকদের অনেকগুলো যুগল চোখে পড়ে। তাদের প্রত্যেকে সপ্তম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

এমন বয়সের ছেলে মেয়েদের জীবনের প্রতিটি সময়ই বাবা-মার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে কাছাকাছি আসার যে অনুভূতি তা তো কোনো নিয়ন্ত্রণ মানে না।

তাই বাবা-মার নাগাল থেকে একটু দূরে এসে ক্লাসের ফাঁকে সময় বের করে নিজের ইচ্ছাকে কিছুটা সময় দেয়ার জন্যও উপযুক্ত স্থান হলো বেইলী রোড।

বেইলী রোডকে এমন ভালোলাগার কারণ কেউ উদঘাটন করতে না পারলেও বেইলী রোডই ভালো লাগে। আড্ডা জমানোর জন্য বেইলী রোডে অন্যান্য স্থান থেকে একটু বেশি অসুবিধাই চোখে পড়ে। সেখানে হেঁটে যাওয়া বা কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই মাথা অথবা শরীরের যে কোনো জায়গায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই পড়তে পারে কাক ও বিভিন্ন পাখপাখালির বিষ্টা। তবুও যে কেন শুধু বেইলী রোডই ভালো লাগে।

ইটপাথরের দখল নেয়া ঢাকার মাঝে রমনা পার্ক হলো প্রিয় মানুষের সঙ্গে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার একটি স্থান। কিন্তু সেখানেও আর কতক্ষণ থাকা যায়। সকাল বেলা তো উত্তপ্ত রোদ আর সবারই কর্মব্যস্ততায় কাটে। আর বিকাল তো যেন একটু অপেক্ষা করতে চায় না। বিকালবেলায় প্রিয় মানুষটির হাত ধরে রমনা প্রবেশ করতেই যেন সূর্যটা বিদায় নেয়ার জন্য দু’হাত নাড়াতে থাকে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে রমনায় অবস্থান করার তো আর কোনো সুযোগই নেই।

সূর্য ডোবার পরপরই রমনা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে সবাইকে বের করে পার্কের সবকটি গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। এরপর যেন আর কোথাও তাদের স্থান হয় না।

সন্ধ্যার পরে রমনা ফেরত কিছু যুগলকে বেইলী রোডের দু’ধারে দেখা যায়। কোনো উপায় না পেয়ে প্রিয়জনকে একটু বেশি সময় কাছে রাখতে তারা রাস্তার ধারেই বসে যায়। দেখেতে তাদের ভালোই লাগে। মুহূর্তটি তাদের জন্য যেমন মধুর কাটে অন্যান্যদের চোখেও তাদের তেমন অপরূপ দেখায়। জীবনকে একটু মধুর করতে মনঃপূত মানুষের বিকল্প তো আর কিছুই হতে পারে না।

সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাদের খুব তুচ্ছ ও ঘৃণার চোখে দেখলেও সমাজের বহু রঙিন মুখোশপরা লোকের চেয়ে তারা মানবিক ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তাদের দ্বারা সমাজের কোনো কল্যাণ না হলেও অন্তত অকল্যাণ হয় না।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তারা হয়তো আল্লাহর একটি সীমারেখা অতিক্রম করছে। আর সে কারণেই সমাজে তার খুবই ঘৃণিত। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যারা আল্লাহর কোনো সীমারেখা অতিক্রম করে না। যারা সমাজে সাধারণ দুটো ছেলে ও মেয়ের সম্পর্ককে খুবই ঘৃণিত হিসেবে বিবেচনা করে তারা সমাজে আরও বেশি মানবতাবিরোধী ও আল্লাহর সীমারেখা অতিক্রম করে কাজ করে।

মানবিক দুর্বলতায় পড়ে জীবনে যে দু’একটি পাপ হয় যারা সেগুলোর বিরুদ্ধে লম্বা জামা পরে ও দাড়ি লম্বা করে ফতুয়া দিয়ে বেড়ায় তারা অধিকাংশই সুদের লেনদেনে সম্পৃক্ত, অধিকাংশই এতিম ও নিঃস্বদের সম্মান করে না, অধিকাংশই উত্তরাধিকারের সম্পদ লুট করে, অধিকাংশই মিসকিনের খাবার কেড়ে নেয়, অধিকাংশই ভিক্ষুককে গলা ধাক্কা দেয়, অধিকাংশই মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, অধিকাংশই পকেট ভারি করার জন্য আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করে, তাদের অধিকাংশই নিজের স্বার্থের জন্য সত্য গোপন করে।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter