আঁধারে আলোর মশাল

  আরাফাত শাহীন ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

আঁধারে আলোর মশাল
আরাফাত শাহীন, ফাইল ছবি

জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা মো. শাহজাহান মিয়া মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলে বিশেষ করে নহাটা ইউনিয়ন এবং এর আশপাশের গ্রামগুলোতে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। সবাই তাকে একনামে চেনে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর লক্ষে সারা এলাকায় নিজের নাম এবং ছবিসংবলিত পোস্টারে ছেয়ে ফেলেছেন।

তাহলে কীভাবে তিনি একটা বৃহৎ এলাকায় সুপরিচিত হয়ে উঠলেন? আজ আমি আপনাদের সেই গল্পটাই শোনাব।

মো. শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, যদিও তিনি আমার এলাকারই মানুষ। আমি দীর্ঘদিন এলাকাতে পড়াশোনা করেছি আর সেই সময়টা তিনি কাটিয়েছেন ঢাকাতে। আর আমি যখন পড়াশোনা করার জন্য এলাকা ছেড়ে চলে এসেছি তখন তিনি এলাকায় এসেছেন। ফলে আমাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনে একটু বিলম্ব হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের মাঝে সম্পর্কটা অল্প ক'দিনের হলেও এর মাঝেই সম্পর্কটা একটা বিশেষ গভীরতায় এসে পৌঁছেছে।

শাহজাহান মিয়ার বিশেষত্ব এখানেই। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষকে কাছে টেনে নেয়ার যে ক্ষমতা তিনি প্রকৃতির কাছ থেকে পেয়েছেন তা তার বর্তমান কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

একজন ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে এমনিতেই তাকে মানুষের সঙ্গে প্রচুর মেলামেশা করতে হয়। কিন্তু এরমাঝেও একটা জায়গায় তিনি অনন্য। তার বিকল্প হিসেবে এখানে অন্য কাউকে বসানোর মতো আজও আমি পাইনি।

সরকারি প্রভাবশালী কর্মকর্তা আমাদের এলাকায় অনেকেই আছেন। কিন্তু তাদের ক'জন আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নতি নিয়ে চিন্তিত? নানান ধরনের সামাজিক অবক্ষয় এবং বহুমুখী সমস্যা নিয়ে ক'জনের মন কাঁদে? তারা সবাই কি সমাজের উন্নতিকল্পে কী করা যায় এটা ভেবে রাতের ঘুম হারাম করেন? জানি এর উত্তরে বলবেন, সবাই এটা করেন না। কিন্তু শাহজাহান মিয়া এটা করেন।

নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে শিক্ষা নিয়ে তার ভাবনার কথা জেনে আমরা অবাক হই; সে সঙ্গে হই আনন্দিত। মহম্মদপুরের এই অঞ্চলে কীভাবে শিক্ষাকে আরও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া যায় এই বিষয়ে তার ভাবনা সবসময়ের।

শাহজাহান মিয়া যে বছর এলাকাতে এলেন সে বছর সমগ্র যশোর বোর্ডের রেজাল্টই খারাপ হয়। এর মধ্যে নহাটা অঞ্চলের রেজাল্ট যেন আরও বেশি খারাপ! তিনি ভাবনায় পড়ে গেলেন। এখন কী করা যায়! কীভাবে এর সমাধান করা যায়! গ্রামে ভালো শিক্ষকের সংকট চিরকালই ছিল। এটা এখনো বিদ্যমান।

তিনি চিন্তা করলেন এসব শিক্ষার্থীদের যদি স্কুলে ক্লাসের পাশাপাশি আলাদাভাবে ক্লাস করানো যায় তাহলে হয়তো এদের উন্নতি সম্ভব। কিন্তু বিষয়টা চিন্তা করা যতটা সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে মাঠে নেমে কাজে প্রমাণ করা ততটা সহজ নয়। শাহজাহান মিয়া হাল ছাড়বার পাত্র নন। তার এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য মন-প্রাণ ঢেলে কাজে নেমে পড়লেন।

প্রথমত সমস্যা দেখা দিল জায়গা নির্বাচন নিয়ে। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী পড়ানোর মতো জায়গা জোগাড় করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। তার নিজের গ্রামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শেষমেশ সেখানেই পাঠদানের ব্যবস্থা করা হলো। আজ অবধি সেখানেই তার এই পাঠদান চলছে।

দ্বিতীয় সমস্যা দেখা দিল, শিক্ষার্থীদের পাঠদান করবেন কারা? তার নিজের পক্ষে এত শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পড়ানো সম্ভব নয়। তাছাড়া এখানে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় সব ক্লাসের শিক্ষার্থীরাই উপস্থিত থাকে। একার পক্ষে এদের দেখাশোনা করা কীভাবে সম্ভব? সমস্যা কিন্তু আরও রয়েছে! তিনি যেমন বিনা বেতনে এসব শিক্ষার্থীদের পড়াতে এগিয়ে এসেছেন সবাই কি সেভাবে এগিয়ে আসবেন? প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু একেবারেই সহজ নয়।

তার এমন কিছু শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল যারা নিজেদের স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করবেন। স্বার্থপরতার এই যুগে এমন বড় মননের মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়।

বর্তমান সময়ে যেখানে দেশে কোচিং বাণিজ্যের রমরমা চলছে সেখানে এমন স্বার্থত্যাগী মানুষ পাওয়া একটু কঠিনই বটে! তবে এক্ষেত্রে তিনি ভাগ্যকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন। বেশকিছু মানুষকে পাশে পেলেন যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে তার পাশে থেকে কাজ করা শুরু করলেন।

এবার শুরু হলো শাহজাহান মিয়ার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মিশন; যা তিনি বহুদিন ধরে নিজের অন্তরে লালন করে আসছিলেন। এলাকার মানুষ শিক্ষিত হোক, তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক সভ্যতার সবটুকু আলো- এটা তার বহুদিনের চাওয়া। এবার তিনি সেই পথেই হাঁটতে লাগলেন।

একদিন এক কাকডাকা ভোরে আমি তার পড়ানোর স্থানে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। স্বচক্ষে দেখা ছাড়া কোনো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, নিজের চোখে যা দেখেছি তাই আপনাদের সামনে বর্ণনা করছি।

তখন গ্রামের সব মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি। কিন্তু শাহজাহান মিয়া স্কুলে এসে হাজির হয়ে গিয়েছেন। তার সঙ্গে সব শিক্ষক। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, এই ভোর সকালেও ক্লাসরুমগুলো কানায় কানায় ভর্তি। যেসব ছেলেমেয়েরা একটা সময় পড়াশোনার প্রতি ছিল পুরোপুরি উদাসীন আজ তারা কোন্ মন্ত্রবলে শিক্ষার প্রতি এমন আগ্রহী হয়ে উঠল!

শাহজাহান মিয়ার কৃতিত্ব এখানেই। তিনি কচি কচি শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার চেতনা জ্বেলে দিয়েছেন। আঁধারের মাঝে তিনি আলোর মশাল হাতে করে এসেছেন। ফলে অজ্ঞতার যে আঁধার তা কেটে যেতে শুরু করেছে। হয়তো এই মশাল একদিন পুরো এলাকাকে আলোকিত করে তুলবে।

ব্যাংকে চাকরি করার দরুন প্রতিদিন খুব সকালেই তাকে অফিসে যেতে হয়। এক্ষেত্রে সামান্যতম শিথিলতার সুযোগ নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা কাজ করে যেতে হয়। কখনো কখনো আমি তাকে রাতেও অফিস থেকে বের হতে দেখেছি! এত পরিশ্রমের পরও একজন মানুষ যখন সমাজের আর দশজনের চিন্তা করেন, এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন তখন তাকে একজন মহান মানুষ হিসেবে অভিহিত করলে হয়তো খুব বেশি বলা হয়ে যাবে না। এই মানুষটি একেবারেই প্রচারবিমুখ।

তিনি নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যেতে ভালোবাসেন। যারা সত্যিকারের ভালো মানুষ তারা হয়তো এমনই হন! অনেক বাধা-বিপত্তি এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মনের জোরে তিনি এখনো টিকে আছেন। প্রতিদিন অফিসে আসার আগে তিনি-

শিক্ষার্থীদের ক্লাস করিয়ে তারপর আসেন। দীর্ঘ তিন বছর ধরে একটানা ক্লাস করিয়ে যাচ্ছেন। কখনো এর ব্যত্যয় হয়নি। তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে পারলে একদিন তার লালিত স্বপ্ন অবশ্যই পূরণ হবে।

দেশের প্রতিটি গ্রামে যদি তার মতো একজন মানুষের জন্ম হতো তাহলে অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যেত আমাদের প্রিয় স্বদেশ।

আরাফাত শাহীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter