Logo
Logo
×

দৃষ্টিপাত

আর্মেনীয় গণহত্যার শতবর্ষের প্রতিধ্বনি

ইতিহাসের গহীন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বেদনার অধ্যায়

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫, ০৫:১৪ পিএম

ইতিহাসের গহীন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বেদনার অধ্যায়

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন রক্তে লেখা। সময়ের স্রোত বয়ে নিয়ে যায় সেসব কাহিনি, কিন্তু কিছু ক্ষত থেকে যায় অনির্বাণ আগুনের মতো। এমনই এক ইতিহাস লুকিয়ে আছে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে, যখন মাটির নিচে সমাধিস্থ হয়েছিল হাজারো নিরপরাধ প্রাণের চিৎকার।

১৯১৫ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। সেই ভয়াল সময়েই অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তরালে শুরু হয় এমন এক অভিযান, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক চিরকালীন ক্ষত হয়ে আছে। 

রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যুদ্ধের আতঙ্ক আর ক্ষমতার খেলায় তুর্কি ভূখণ্ডজুড়ে নিঃশব্দে গড়ে ওঠে মৃত্যুর কারাগার। আর্মেনীয়দের ওপর নির্যাতন ও নির্বাসনের সেই অধ্যায় কেবল এক জাতির ইতিহাস নয়, সমগ্র মানবতার গলিত অশ্রু হয়ে আছে আজও।

প্রথমে আসে গোপন নির্দেশ। ইস্তাম্বুলের আঁধার কক্ষে সামরিক ও প্রশাসনিক শীর্ষকর্তাদের বৈঠকে ঠিক হয়—রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীকে ‘চিরতরে সরিয়ে দিতে’ হবে। এরপর ২৪ এপ্রিল ১৯১৫ সালের রাত। শহরের বুকে এক নিস্তব্ধ ঝড় নেমে আসে। শত শত আর্মেনীয় বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাতের অন্ধকারেই যেন সূচনা হয় এক জাতির বিপন্ন যাত্রার।

পরবর্তী মাসগুলোতে অটোমান শাসকরা এক পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পুরুষদের হত্যা করে নারীদের ও শিশুদের মরুভূমির পথে নির্বাসনে পাঠানো হয়। আনাতোলিয়ার গ্রামগুলোতে ধ্বংসের ছায়া নেমে আসে। 

তুর্কি প্রশাসনের সরকারি নথিপত্রে সেই সময়কার ভাষা ছিল শীতল—“পুনর্বাসন”, “স্থানান্তর”, “নিরাপত্তা ব্যবস্থা”—কিন্তু মরুভূমির গরম বালুতে লুটিয়ে পড়া ক্ষুধার্ত মানুষের মৃতদেহ সেই শব্দগুলোকে পরিণত করেছিল মৃত্যুর পরোয়ানায়।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষ সেই ভয়াল পরিকল্পনার শিকার হয়। তবে সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বেদনার গভীরতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আর্মেনীয় মাতৃভূমি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, আর মানবতার বিবেক হয়েছিল নির্বাক।

রক্তের মরুভূমি থেকে ইতিহাসের আদালতে

১৯১৫ সালের সেই রাতের পর ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে রক্তের মরুভূমির দিকে গড়িয়ে যায়।আর্মেনীয়দের জীবনের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর ছায়া। অটোমান শাসকরা একে বলেছিল “পুনর্বাসন”। কিন্তু সেই শব্দের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের নীলনকশা।

মরুভূমির পথে হাজারো নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। খাবার ছিল না, পানি ছিল না, কেবল উত্তপ্ত বালির সমুদ্র আর মৃত্যুর গন্ধ। যে শিশুরা ক্ষুধায় কাঁদতে কাঁদতে পথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিল, তাদের কণ্ঠ যেন আজও বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। ইস্তাম্বুল থেকে সিরিয়ার দেইর এয-জোর পর্যন্ত যে পথে রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিল, সেই পথই আজ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।

১৯১৬ সালের শেষ নাগাদ অটোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক দলিলপত্রে “পুনর্বাসন সম্পন্ন” বলে যে বাক্যটি লেখা হয়েছিল, তার মানে ছিল হাজার হাজার গ্রাম মুছে যাওয়া, অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ইতিহাসবিদদের হিসাবে ১০ থেকে ১৫ লাখ আর্মেনীয় এই পরিকল্পনার শিকার হয়েছিলেন। অনেকেই মরুভূমিতে অনাহারে মারা যান, কেউ রোগে, কেউবা নির্যাতনের নির্মমতায়।

তবে এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো এর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া। ১৯১৫ সালেই মিত্রশক্তি এই ঘটনাকে আখ্যা দিয়েছিল “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” হিসেবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুদ্ধাপরাধের বিচারের চেষ্টা হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের অরাজকতায় সেই বিচার ইতিহাসের আঙিনায় আটকে যায়।

পরবর্তী শতকে আর্মেনীয়রা ছড়িয়ে পড়েন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তাদের স্মৃতিতে রয়ে যায় রক্তাক্ত সেই যাত্রা। প্রতিটি প্রজন্ম যেন বয়ে বেড়ায় মরুভূমির গরম বালু আর ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নার প্রতিধ্বনি। আজও প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে আর্মেনীয়রা স্মরণ করে সেই রাতকে—যখন একটি জাতির ইতিহাস এক মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

ইতিহাসের রক্তাক্ত ছায়া ও আধুনিক রাজনীতির বিতর্ক

শতাধিক বছর কেটে গেছে, কিন্তু আর্মেনীয় গণহত্যার স্মৃতি এখনো বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে আর্মেনীয়রা দাবি করে স্বীকৃতি, অন্যদিকে তুরস্ক এই ঘটনাকে গণহত্যা বলতে অস্বীকার করে। 

আঙ্কারা বলে—“এটি ছিল যুদ্ধকালীন বিপর্যয়, কোনো পরিকল্পিত জাতিগত নিধন নয়।” এই অস্বীকার যেন ক্ষত-বিক্ষত ইতিহাসের ওপর নতুন করে লবণ ছিটিয়ে দেয়।

১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে আর্মেনীয় গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি জোরালো হয়। এরপর ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা সহ ৩০টিরও বেশি দেশ এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উচ্চারণ যেন সেই ইতিহাসের শূন্যে ঝুলে থাকা বাক্যকে নতুন স্বর দেয়: “আর্মেনীয় গণহত্যা।” এই ঘোষণা বিশ্বমিডিয়ায় আলোড়ন তোলে, আর আঙ্কারা ক্ষোভে কেঁপে ওঠে।

তবে এই বিতর্ক কেবল রাজনীতির নয়, এটি স্মৃতিরও। আর্মেনীয় পরিবারের ভেতরে আজও সেই যন্ত্রণা বয়ে চলে। দাদিরা যখন নাতিদের কাছে গল্প বলেন, তখন শব্দের ভেতর দিয়ে ঝরে পড়ে মরুভূমির গরম হাওয়া, ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না। সেই গল্প কেবল ইতিহাস নয়, এটি বংশপরম্পরায় চলা এক জীবন্ত ক্ষত।

তুরস্কে এখনো এই বিষয়ে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিহাসবিদদের অনেকেই রাষ্ট্রীয় চাপে নীরব থাকেন। তবে সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে খুলছে আলাপের দরজা। কিছু তুর্কি লেখক ও বুদ্ধিজীবী সাহস করে স্বীকার করেছেন—“হ্যাঁ, এটি ছিল অপরাধ, যা আমাদের ইতিহাসের বুক চিরে বসে আছে।”

আজ আর্মেনীয় গণহত্যা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি মানবসভ্যতার আয়নায় ভেসে ওঠা প্রশ্ন— “একটি জাতির স্মৃতি কি কেবল রাজনীতির টেবিলে দরকষাকষির বিষয় হতে পারে?”

এই প্রশ্নের উত্তর আজও ঝুলে আছে, ঠিক যেমন মরুভূমির পথে পড়ে থাকা সেই অচেনা কঙ্কালগুলো—যাদের কোনো নাম নেই, কিন্তু যাদের নীরবতা ইতিহাসের গভীরতম ভাষা।

রক্তাক্ত উত্তরাধিকার ও স্মৃতির আগুন

সময়ের ধুলো অনেক কিছু ঢেকে দেয়, কিন্তু কিছু ক্ষত মুছে যায় না। আর্মেনীয় গণহত্যা তারই একটি রক্তাক্ত দগদগে ক্ষত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই মরুভূমির হাহাকার আজও আর্মেনীয় আত্মায় প্রতিধ্বনিত। যে শিশুদের অস্থি বালুর নিচে লুকিয়ে আছে, তাদের অদৃশ্য আর্তনাদ যেন ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লেখা।

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে তসিৎসেরনাকাবের্ড স্মৃতিস্তম্ভ, যার কালো পাথরের শিখা প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯১৫ সালের বসন্তকে। প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল লাখো মানুষ সেখানে মোমবাতি জ্বালায়। শোকের সেই মোমবাতির আলো যেন শুধু আর্মেনীয়দের নয়, পুরো মানবজাতির বিবেককে প্রশ্ন করে—

“আমরা কি শিখেছি কিছু?”

এই ঘটনার উত্তরাধিকার শুধু আর্মেনীয়দের কষ্ট নয়, এটি মানবসভ্যতার দায়িত্বেরও প্রতীক। কারণ, ইতিহাস যখন অস্বীকারের দেয়ালে আটকে যায়, তখন ভবিষ্যতের অন্ধকার আরও গভীর হয়। তুরস্কের রাজনীতি যতই অস্বীকার করুক, সেই মরুভূমির হাড়গোড়ের নীরবতা প্রতিদিন সাক্ষী দেয়।

আজকের বিশ্ব যখন নতুন সংঘাত, নতুন যুদ্ধের মধ্যে ঘুরছে, তখন আর্মেনীয় গণহত্যা এক সতর্কতার ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায়—নীরবতা কখনো নিরপরাধকে রক্ষা করে না, বরং হত্যাকারীর হাতকে শক্ত করে। ইতিহাসকে স্বীকার করা মানে শুধু অতীতের বিচার নয়; এটি ভবিষ্যতকে বাঁচানো।

ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপে মানবতার অমোঘ আহ্বান

এক শতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেছে। কিন্তু ১৯১৫ সালের রক্তমাখা বসন্ত আজও আর্মেনিয়ার ইতিহাসের গায়ে খোদাই হয়ে আছে। কেবল আর্মেনীয় নয়, মানবতার জন্যও এটি এক অন্তহীন শোকগাথা।

বলা হয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করা মানে শুধু তার মানুষকে হত্যা করা নয়; মুছে দেওয়া হয় তার ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের শিকড়। অটোমান সাম্রাজ্যের পরিকল্পিত সেই গণবিধ্বংসে শুধু দেহ নয়, এক জাতির আত্মাও ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। আজও আর্মেনীয় গানগুলিতে লুকিয়ে থাকে সেই হাহাকার, প্রার্থনার শব্দে শোনা যায় মরুভূমির বাতাসের দীর্ঘশ্বাস।

তবে এই গল্প কেবল আর্মেনিয়ার নয়; এটি পুরো পৃথিবীর। কারণ প্রতিটি গণহত্যা শুরু হয় নীরবতার ছায়া থেকে। সেই নীরবতা ভাঙা—এটাই ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিক্ষা। যখন কোনো রাষ্ট্র বা ক্ষমতা সত্যকে মুছে ফেলতে চায়, তখন ইতিহাসের দায়িত্ব হয়ে ওঠে প্রমাণ বহন করা।

 আর সেই দায়িত্ব আজ বহন করছে ইয়েরেভানের স্মৃতিস্তম্ভ, বহন করছে বেঁচে ফেরা কিছু সাক্ষীর লেখা, বহন করছে ছিন্নভিন্ন এক জাতির অশ্রু।

বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে আর্মেনীয় গণহত্যা এক চিরন্তন প্রশ্ন রেখে যায়— “আমরা কি কখনো অতীতের ভুল থেকে শিখব?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই প্রতি বছর আর্মেনিয়ার আকাশে আবারও জ্বলে ওঠে মোমবাতির শিখা। প্রতিটি আলো যেন বলে— “স্মৃতি বাঁচাও, সত্য বাঁচাও, মানবতা বাঁচাও।”

তথ্যসূত্র: ইবন আসাকির, তারিখে দামেস্ক, উইলিয়াম ডালরিম্পল, Jerusalem: The Biography, হেনরি জর্জ ফার্ডিনান্ড, A History of Architecture in Egypt, মার্শাল হডসন, The Venture of Islam, আল-জাজিরা। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম