মোকাম্মেল হোসেন    |    
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০২:০৩:০১ প্রিন্ট
সাক্ষাৎকার
নববর্ষে ইলিশ না খেয়ে বারো রকম ভর্তা খাওয়া যেতে পারে : ড. আশরাফ সিদ্দিকী
ড. আশরাফ সিদ্দিকীর জন্ম ১৯২৭ সালে টাঙ্গাইল জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফোকলোর বিষয়ে এমএ ও পিএইচডি করেন। কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাসসের চেয়ারম্যান ও প্রেস ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ড. সিদ্দিকীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭৫। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় তার কালজয়ী প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তালেব মাস্টার ও অন্যান্য কবিতা’। এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি লিপিবদ্ধ করতে যে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি মনসুরুদ্দিনের মতো সর্বসৃজনশীল ব্যক্তিরা, পরবর্তী সময়ে সেই ধারা নিরন্তর গতিশীল রাখতে যারা কাজ করেছেন- ড. আশরাফ সিদ্দিকী তাদেরই একজন। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. সিদ্দিকী বাংলা নববর্ষ উদযাপন, আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বরূপ বিশ্লেষণসহ অন্যান্য বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -

যুগান্তর : বাংলা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা-ইলিশ কি অপরিহার্য?

আশরাফ সিদ্দিকী : না, অপরিহার্য নয়। পান্তা-ইলিশের ধারণাটা হঠাৎ করেই আমাদের নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মূলত এটি ছিল একটি নাগরিক উদ্যোগ। এর পেছনে ব্যবসায়িক অভিসন্ধিও থাকতে পারে। পান্তা-ইলিশ উৎসব এখন ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় যদি এটি পরিহার করা জরুরি বলে মনে হয়, তাহলে অনায়াসে বাদ দেয়া যেতে পারে। আমার মনে হয়, নববর্ষে পান্তা-ইলিশ না খেয়ে পান্তার সঙ্গে বারো রকম ভর্তা খাওয়া যেতে পারে।

যুগান্তর : মানুষ যদি মাছের বিকল্প হিসেবে ভর্তা গ্রহণ না করে?

আ. সি. : সেক্ষেত্রে আরও তো অনেক মাছ আছে বাংলাদেশে। প্রাপ্যতা অনুযায়ী অন্যান্য মাছ দিয়েও আমরা উৎসব করতে পারি। ইলিশের বদলে কৈ, মাগুর ইত্যাদি নেয়া যেতে পারে। আজকেও পত্রিকায় এসেছে- পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে প্রচুর জাটকা নিধন করা হচ্ছে। এটি আত্মঘাতী প্রবণতা। আর কিছুদিন পরেই এসব জাটকা পূর্ণতা পেত। মনে রাখা দরকার, পূর্ণতাপ্রাপ্ত একটা মা ইলিশ লাখ লাখ ইলিশের উৎস। কাজেই এ সময়টায় তাদের জীবন রথ থামিয়ে দেয়া কিছুতেই উচিত হবে না।

যুগান্তর : আপনার কি মনে হয় না, খাবারটাই উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ নয়?

আ. সি. : খাওয়া অবশ্য চলবে। এটা থেকে মানুষকে বিরত রাখা যাবে না।

যুগান্তর : খাওয়া চলুক, সময়ের প্রয়োজনে খাবারের উপাদানে পরিবর্তন আনলে ক্ষতি কী?

আ. সি. : তা আনা যেতে পারে। এজন্য দরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়া। ভবিষ্যৎ ক্ষতির দিকটি আত্মস্থ করা।

যুগান্তর : এক সময় তো নববর্ষ উদযাপনে ঢেকিছাঁটা মোটা চাল দিয়ে পান্তা করা হতো। সেই পান্তার সঙ্গে থাকত পেঁয়াজ-মরিচ কিংবা আলু ভর্তা। ইলিশটা কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল?

আ. সি. : হ্যাঁ। আগে এরকমটাই প্রচলিত ছিল। সে সময় নববর্ষ সামনে রেখে গ্রামের মহিলারা চৈত্রসংক্রান্তিতে এক ধরনের লোকাচার পালন করতেন, যার নাম ছিল আমানি। ইলিশ এসেছে হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায়। পরে হুজুগে বাঙালি এটাকে নববর্ষ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ করে ফেলেছে।

যুগান্তর : পান্তা-ইলিশের ডামাডোলে দেশের ইলিশ সম্পদের যে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, এ দিকটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা জরুরি নয় কি?

আ. সি. : হ্যাঁ, জরুরি। অবশ্য এরই মধ্যে দেশের রেডিও-টেলিভিশনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে ইলিশ নিধনের বিপক্ষে জনমত তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, এতে ফল পাওয়া যাবে।

যুগান্তর : পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উৎসবের বিবর্তন সম্পকে বলুন।

আ. সি. : বাংলা নববর্ষ আবহমান বাংলার উৎসব। আগে নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে সাধারণত হালখাতা হতো। হিন্দু-মুসলমান জমিদার যারা ছিলেন তাদের বাড়িতে হালখাতা হতো। আর গ্রামে হতো মেলা। বাংলাদেশের অন্তত ৫৭০টির মতো জায়গায় মেলা হতো। এসব মেলায় গ্রামীণ হস্তশিল্প, কাপড়-চোপড়, কামার-কুমোরের তৈরি জিনিসপত্র, স্বর্ণকারদের তৈরি নানারকম স্বর্ণ ও রূপার অলংকার ছাড়াও বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি হতো। মানুষ এসব কিনত, কিনে আনন্দ পেত। আর হতো গান। বারোমাসি গান হতো এসব মেলায়। সকাল থেকে আরম্ভ করে রাত পর্যন্ত। কোনো কোনো জায়গায় থিয়েটার হতো। লাঠি খেলাও হতো। আবার কোনো কোনো মেলায় ঘোড়দৌড়ও হতো। এসব অনুষ্ঠান পল্লীর মানুষকে আনন্দ দিত। উজ্জীবিত করত।

যুগান্তর : ঘোড়দৌড় তো এখন প্রায় হারিয়েই গেছে।

আ. সি. : হ্যাঁ। আগে এটা খুব হতো। এখন ঘোড়া নেই। ঘোড়দৌড়ও খুব একটা চোখে পড়ে না। ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে কোথাও কোথাও সাইকেল রেসও হতো। আমাদের গ্রামীণ মেলার এই যে ঐতিহাসিক দিক, এটাকে অবলম্বন করেই অগ্রসর হওয়া উচিত।

যুগান্তর : নববর্ষ উৎসবের নগরকেন্দ্রিক যে ধারা তৈরি হয়েছে- এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আ. সি. : আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষের উৎসব পালিত হচ্ছে। এক সময় এ উৎসব গ্রামীণ পটভূমিতে উদযাপিত হলেও এখন নগরজীবনে এটা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়েছে। ইদানীং এ উৎসবে কিছু অস্বাস্থ্যকর জিনিস যুক্ত হয়েছে। উৎসবে এখন বাজে গান, বাজে নাচ ইত্যাদি দেখা যায়। অবশ্য এগুলো সংখ্যায় যে খুব বেশি, তা নয়। তবুও আমাদের সাবধান হতে হবে। সাবধান থাকতে হবে। উৎসব পালনে, আচার-আচরণে আমরা যেন এমন কিছু না করি, যাতে আমাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গায়ে কালি লাগে।

যুগান্তর : লোকজ মেলার আদি ও অকৃত্রিম যে রূপ- নগরায়ন ও বিশ্বায়নের প্রভাবে তা কি ম্লান হচ্ছে?

আ. সি. : এটা ঠিক, আমাদের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য- যা আগে গ্রামে-গ্রামে চৈত্রসংক্রান্তির মেলায়, বৈশাখী মেলায় ফুটে উঠত, সেটার ঔজ্জ্বল্য আস্তে আস্তে কমে আসছে। এখন শহরেই শহুরে আমেজে বৈশাখী মেলা, চৈত্রসংক্রান্তি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কারণ শহরের মানুষের টাকা-পয়সা আছে। শহরে বা কোনো কোনো অঞ্চলে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে মেলাগুলো হচ্ছে। ধরুন, এই ঢাকা শহরেই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলা হচ্ছে। এসব মেলায় হরেক রকম জিনিস পাওয়া যায়। ক্রেতা সমাগমও হয় প্রচুর। এসব মেলায় নানারকম লোকশিল্প ঐতিহ্যের দেখা পাওয়া গেলেও নগরায়ন, বিশ্বায়নের চাপে তা কিছুটা নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নষ্ট হলেও একেবারে মরে যায়নি। শেষ হয়ে যায়নি। পার্থক্য এটুকুই- আগে গ্রামকেন্দ্রিক স্বতঃস্ফূর্ত-স্বাভাবিক যে মেলা ছিল, উৎসব ছিল- সেটা এখন গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছে।

যুগান্তর : বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতির যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, আধুনিকতার ধাক্কায় তা নষ্ট হয়ে যাবে কি?

আ. সি. : নষ্ট হবে বলে মনে করি না। তবে আগে এর যে আবেদন, ঐতিহ্য, আনন্দ ও ঔজ্জ্বল্য ছিল- সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সবই নগরায়নের বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই দোলন, রথযাত্রা, মেলা ইত্যাদি এখন উঠে যাচ্ছে। শহরে এখন এগুলো নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করছে। এর সঙ্গে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি-নীতি ও উৎসবের খুব একটা মিল নেই। এ হল শহুরে মেলা। তবুও এসব মেলায় লোকজন যায়। বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে। মেলায় খাবার-দাবারের ব্যবস্থা থাকে, গান-বাজনার ব্যবস্থা থাকে। তবে তা আধুনিক গান। এ যুগের গান। কোথাও আবার নাচেরও আয়োজন থাকে। সেখানে সবাই মিলে নাচে। আনন্দ করে। ফুর্তি করে। এ থেকে একটা জিনিস তো পরিষ্কার- আমাদের উৎসবের প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি-নীতি নষ্ট না হলেও এর রূপ অনেকটাই পাল্টে গেছে।

যুগান্তর : প্রথা ও ঐতিহ্যের নামে কুসংস্কার লালন করা উচিত কি?

আ. সি. : না। কিছুতেই উচিত নয়। অতীতে সমাজে, মানুষের মনে যেসব কুংস্কার প্রকট আকারে বিদ্যমান ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এটা মূলত শিক্ষার প্রসারের জন্যই হয়েছে। মানুষ যত শিক্ষিত হবে, সচেতন হবে, বিজ্ঞানমনস্ক হবে- আস্তে আস্তে এটা আরও কমে যাবে। এজন্য তেমন চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যা ভালো, যা সত্য-সুন্দর-শাশ্বত, মানুষ সেটাই গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : এক্ষেত্রে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি উদ্দীপকের কাজ করবে?

আ. সি. : উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের মূল ভিত্তি। এটার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের নতুন নতুন সাংস্কৃতিক চর্চা করতে হবে। নতুন নতুন সিনেমার গান, নতুন নতুন যাত্রা-থিয়েটারের চর্চা করতে হবে। আমি মনে করি, এ ধারা অনুসরণ করে অগ্রসর হলে আধুনিক যুগের মানুষ এগুলো গ্রহণ করবে। তাদের ভালো লাগবে।

যুগান্তর : প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতিকে আধুনিক সংস্কৃতি থেকে আলাদা রাখা উচিত- নাকি দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে পথ চলাই শ্রেয়?

আ. সি. : আমার মনে হয়, দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে পথ চলাই উত্তম। অতীত সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে যদি আমরা অবজ্ঞা করি, তাহলে নিজেকেই অবজ্ঞা করা হয়। আমার বাবা-মা, দাদা-দাদিকে অবজ্ঞা করা হয়।

যুগান্তর : ঐতিহ্যের নামে আধুনিকতাকে বর্জন করাও তো ঠিক হবে না!

আ. সি. : না, সেটাও ঠিক হবে না। আধুনিকতা ও যুগের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদের পথ চলতে হবে। অগ্রসর হতে হবে।

যুগান্তর : লোকজ সংস্কৃতির বিকৃতি রোধ করতে হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

আ. সি. : আমাদের হাজার বছরের যে লোকজ সংস্কৃতি, তার সবকিছু এ যুগে পালন করা সম্ভব নয়। বর্তমান যুগের আধুনিক যে ভাবধারা আছে, সেই ভাবধারা থাকবে। আবার প্রাচীন যে ঐতিহ্য- সেটাও থাকবে।

যুগান্তর : এ ব্যাপারে সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

আ. সি. : আমার মনে হয়, আমাদের প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠান যেগুলো ছিল, সরকার তা নতুনভাবে গ্রামীণ জনপদে চালু করার উদ্যোগ নিতে পারে। এগুলো শুধু শহরে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। গ্রামেও পুনরায় তার চর্চা শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদকে সরকার বলতে পারে- বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য চৈত্রসংক্রান্তি মেলা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি আগে তোমাদের অঞ্চলে যেভাবে হতো, এখন আবার সেভাবে করার চেষ্টা করো। যেসব এলাকায় মেলা হচ্ছে না, সেখানে মেলার আয়োজন করো।

যুগান্তর : কিন্তু মেলার নামে জুয়া, অশ্লীল নাচ-গান ইত্যাদির চর্চা শুরু হলে কী করব আমরা?

আ. সি. : এগুলো রোধ করার ব্যাপারে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। একদিনে হয়তো রোধ করা যাবে না। আস্তে আস্তে করতে হবে। প্রশাসনের সহায়তায় এটা করা সম্ভব। আস্তে আস্তে এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে। রেডিও-টেলিভিশন-সিনেমা এখন গ্রামগঞ্জে, বাড়িতে-বাড়িতে পৌঁছে গেছে। এসব গণমাধ্যম কাজে লাগিয়ে মানুষকে বোঝানো সম্ভব, আত্মস্থ করানো সম্ভব।

যুগান্তর : আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে এখন, এ অবস্থায় মানুষ কি আমাদের রেডিও-টেলিভিশনের কথা শুনবে?

আ. সি. : এটা সত্য- আকাশ সংস্কৃতির দাপট আমাদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও চেষ্টা করতে হবে, যাতে আকাশ সংস্কৃতি সবকিছু গ্রাস করতে না পারে। আমাদের পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনে আকাশ-সংস্কৃতির ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সমালোচনা করতে হবে। এটা পুরোপুরি হয়তো বন্ধ করা যাবে না। তবে উদ্যোগ নিলে ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

যুগান্তর : এক সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে আপনার লোককাহিনীনির্ভর হীরামন, মেঠোসুর ইত্যাদি অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এসব অনুষ্ঠান পুনরায় নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা যায়?

আ. সি. : আগে একটা টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। এখন তো অনেক চ্যানেল হয়েছে। আমার মনে হয়- সব ক’টি চ্যানেলে না হলেও কিছু কিছু চ্যানেলে এগুলো আবার শুরু করা যায়।

যুগান্তর : গ্রাম ও শহরের সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য আপনি প্রচুর কাজ করেছেন। কতটা সফল হয়েছেন?

আ. সি. : আমি কাজ করেছি, তবে পুরোপুরি সফল হয়েছি- এ কথা বলা যাবে না। দেখা যাচ্ছে, শহুরে সংস্কৃতি গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক-বাহক ও পৃষ্ঠপোষক না হয়ে তার ঘাড়ে চেপে বসতে চাইছে। যারা নগরায়ণের সঙ্গে যুক্ত, যারা নগর নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তাদের উচিত গ্রামীণ সংস্কৃতিকে শহুরে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া। এটাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা। এরপরও মানুষ যদি এটাকে গ্রহণ না করে তাহলে তো সেটা বিলুপ্ত হবেই। আর গ্রহণ করলে এটা টিকে থাকবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। আমি মনে করি, মানুষ এটাকে গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : আধুনিকতা আমাদের জীবন পরিপূর্ণ করছে, নাকি আমাদের জীবনের ছন্দ-মাধুর্য কেড়ে নিচ্ছে?

আ. সি. : আধুনিকতা মানুষের জীবনকে সহজ করে সত্য, তবে এর পাশাপাশি নানা জটিলতারও উদ্ভব ঘটায়। চলার পথে আধুনিক মানুষকে প্রতিনিয়ত এসব জটিলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত তার জীবন। অনেকটা যান্ত্রিকতানির্ভর। এ জীবনে মন-মননশীলতার চর্চা করার সুযোগ খুবই কম। এ অর্থে এ জীবনকে ছন্দ-মাধুর্যহীন জীবন বলা যেতে পারে। তবে সারা পৃথিবী উন্নয়নের পালে হাওয়া লাগিয়ে যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, আমরা চাইলেও তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না। থাকা উচিতও হবে না। আবার আবহমান কালের যে বাংলাদেশ, তাকেও আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না। বাংলার নদী, বাংলার পথ, বাংলার গান, বাংলার উৎসব-অনুষ্ঠান- আধুনিকতার নামে এগুলোকে অবহেলা না করে, অবজ্ঞা না করে যদি আমরা এর ভেতরকার সুর-ছন্দ-মাধুর্য আহরণে মনোযোগী হই- তাহলে আমাদের জীবনও ছন্দ-মাধুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

যুগান্তর : আমাদের বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়েই সমাধান খুঁজতে হবে?

আ. সি. : হ্যাঁ, পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। চর্চা করা দরকার। সংরক্ষণ করা দরকার। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মাধ্যমে আমাদের প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠানগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পুনরুজ্জীবিত করলে গ্রামে গ্রামে কৃষ্টি-সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি পাবে। তখন এর ঢেউ এসে শহরেও লাগবে। যুগান্তর : শহর যদি এটা গ্রহণ না করে?

আ. সি. : এ ক্ষেত্রে আমি বলব, আধুনিকতার দরকার আছে। অধুনা থাকলে আধুনিকতাও থাকবে। কিন্তু আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের বাপ-দাদা, নানা-নানিকে, গৌরবময় সমৃদ্ধ লোকায়ত ঐতিহ্যকে যেন ভুলে না যাই, অবহেলা না করি।

যুগান্তর : গ্রামও তো আর আগের গ্রাম নেই। রাস্তাঘাট হয়েছে। বিদ্যুৎ গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়াও লেগেছে প্রায় প্রতিটি গ্রামে এবং মানুষ এসবে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে...

আ. সি. : সংস্কৃতি একদিনে সমৃদ্ধ হয় না। এটা হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠে। আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির জন্ম-বিকাশ গ্রামকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। এখন এ সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, করতে হবে। আমি আগেও বলেছি, এ কাজটা আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করা যেতে পারে।

যুগান্তর : প্রযুক্তির কল্যাণে এখন তো সবকিছুর বিন্যাস, সংরক্ষণ এবং তা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রাচীন লোকজসংস্কৃতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে কেমন হবে?

আ. সি. : এটা খুবই ভালো হবে এবং এটা করা উচিত। সুন্দরভাবে সবকিছু বিন্যাস করে ছোট ছোট নাটক, সিনেমা, গান ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পদ-ঐশ্বর্য দেশে-বিদেশে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারি।

যুগান্তর : দেশের তরুণ সমাজের জন্য আপনার কী সুপারিশ থাকবে?

আ. সি. : তরুণ সমাজের কাছে আমার সুপারিশ থাকবে, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আমরা যেন ভুলে না যাই। অবজ্ঞা না করি। এগুলোকে ধারণ করেই তারা যেন নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হয়।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

আ. সি. : অসংখ্য ধন্যবাদ।




 



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by